বিজ্ঞাপন
default-image

রাত তখন গভীর। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চৌগাছা গ্রামে মৃত্যুদূতের মতো প্রবেশ করে পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের একটি ট্রাক। এসে থামে একটি বাড়ির সামনে। অস্ত্র নিয়ে বর্বরের দল ঢুকে পড়ে বাড়ির ভেতরে। বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলেন শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার। হানাদারের দল তাঁকে ও তাঁর আত্মীয় আরেক শিক্ষক হাফিজ উদ্দীনকে চোখ বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায় ভাটপাড়া গ্রামের ক্যাম্পে। সেখানে তাঁদের গুলি করে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দেয় কাজলা নদীতে। ঘটনা একাত্তরের ১৫ আগস্টের।

শহীদ আবুল হাশেম সরকার ছিলেন গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও শরণার্থীদের বিষয়ে জেনে আসেন। মেহেরপুরে ফিরে তিনি গোপনে এলাকার তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন। বিশেষ করে তরুণ ছাত্রদের নিয়ে তিনি একটি সংগঠনও করেছিলেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করতেন তাঁর ভগ্নিপতি হাফিজ উদ্দীন। তিনিও স্কুলশিক্ষক ছিলেন। এলাকার রাজাকাররা বিষয়টি জানতে পেরে তাঁদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ওরা রাতের আঁধারে হানাদার সেনাদের নিয়ে এসে আবুল হাশেম সরকার ও হাফিজ উদ্দীনকে ধরিয়ে দেয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সেলিম রেজা শহীদ আবুল হাশেম সরকারের ছবি ও তথ্য পাঠান। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করা হয়।

শহীদ শিক্ষক আবুল হাশেম সরকারের জন্ম ১৯৩৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর গ্রামে। তিনি এসএসসি থেকে এমএড (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগেও কিছুদিন (১৯৫৭) পড়ালেখা করেন তিনি। আবুল হাশেম সরকার ১৯৫৭ থেকে ১৯৭১ সময়ে কুষ্টিয়ার বাগোয়ান কেসিভিএন স্কুল, ঢাকার শাহীন স্কুল, সাতক্ষীরার তুজুলপুর হাইস্কুল, ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুলে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬২ থেকে ’৬৬ এবং ’৬৬ থেকে ’৭১ পর্যন্ত দুই দফায় গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

হাশেম সরকারের স্ত্রী হাসিনা খাতুন এখন অশীতিপর। তাঁদের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে। এক ছেলে আবু সাঈদ ব্যবসায়ী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। বাবার স্মৃতি তেমন মনে নেই। দেশের জন্য তিনি শহীদ হয়েছেন, এটা তাঁদের গর্ব।

আবুল হাশেম সরকারের ছাত্র কবি ও লেখক অধ্যাপক রফিকুর রশীদের মেহেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে আবুল হাশেমের জীবনী রয়েছে। প্রথম আলোকে তিনি জানান, ১৯৯৫ সালে গাংনী হাইস্কুলের সুবর্ণজয়ন্তীতে এই গুণী শিক্ষককে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১১ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অনুমোদিত কুষ্টিয়ার স্বনির্ভরতায় আশার আলো মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি তাঁকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা’ প্রদান করে। ২০১৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক লে. কর্নেল কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক বাংলাদেশ টেলিভিশনে শহীদ শিক্ষক আবুল হাশেম সরকারকে নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক অনুষ্ঠান করেন।

গ্রন্থনা: তৌহিদী হাসান, কুষ্টিয়া