বিজ্ঞাপন
default-image

গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল একযোগে আক্রমণ চালায় দেওয়ানগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগীদের বিভিন্ন অবস্থানে। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলে আছেন আলী নেওয়াজ। তাঁরা আক্রমণ করলেন চিনিকল, থানা, পাওয়ার হাউস, রেলস্টেশন, মাদ্রাসা ও পরিদর্শন বাংলোর ওপর। মুক্তিযোদ্ধাদের আকস্মিক আক্রমণে চিনিকলে অবস্থানরত রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারিরা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই পালিয়ে গেল। পাওয়ার হাউস ও রেলস্টেশনে অবস্থানরত রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারিরা কিছুক্ষণ প্রতিরোধ গড়ে তুললেও কয়েক মিনিটের মধ্যে তারাও পালিয়ে যায়। মাদ্রাসায় ছিল রাজাকার ক্যাম্প। মাদ্রাসা ও থানায় অবস্থানরত রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারিরা জোর প্রতিরোধ গড়ে তুলল। তখন মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের আক্রমণের প্রচণ্ডতা বাড়িয়ে দিলেন। আক্রমণের তীব্রতার মুখে রাজাকাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। পাঁচজন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করল। এতে ভেঙে পড়ল প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী বাদবাকি রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারিদের মনোবল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে রাতের অন্ধকারে যে যেদিকে পারল পালিয়ে গেল।

বাহাদুরাবাদ রেলঘাটের পূর্বে দেওয়ানগঞ্জ জামালপুর জেলার অন্তর্গত একটি থানা। এখানে তখন ছিল চিনিকল, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, পাওয়ার হাউস ও বেশ কিছু পাটগুদাম। ১৯৭১ সালে সেখানে পাকিস্তানি সেনারা স্থায়ীভাবে ছিল না। তারা দিন ও রাতে বাহাদুরাবাদ বা জামালপুর থেকে এসে টহল দিয়ে চলে যেত। দেওয়ানগঞ্জে মোতায়েন ছিল এক কোম্পানি রাজাকার ও অস্ত্রসজ্জিত একদল বিহারি। ২ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধারা দেওয়ানগঞ্জে আক্রমণ করেন। এ যুদ্ধে আলী নেওয়াজসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন। তাঁদের দুঃসাহসের মুখে পাকিস্তানি সহযোগীদের বেশির ভাগই কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই পালিয়ে যায়।

আলী নেওয়াজ চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। কর্মরত ছিলেন তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল সৈয়দপুর সেনানিবাসে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে যান ভারতে। পরে যুদ্ধ করেন বৃহত্তর সিলেট জেলার ছাতক, গোয়াইনঘাট, রাধানগর, সালুটিকর, গোবিন্দগঞ্জসহ কয়েকটি জায়গায়।

গোয়াইনঘাটের যুদ্ধে আলী নেওয়াজ যথেষ্ট রণকৌশল ও বীরত্বের পরিচয় দেন। ২ বা ৩ ডিসেম্বর ভোর থেকে গোয়াইনঘাটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ধোঁকা দিয়ে কৌশলে তাঁরা সুরমা নদী অতিক্রম করে পাকিস্তানি সেনাদের বাংকার লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এতে পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কারণ, নদী অতিক্রম করে ঘাট এলাকা হয়ে পশ্চিম দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ চালানো ছিল পাকিস্তানি সেনাদের কাছে কল্পনাতীত। তারা এ ঘটনার জন্য প্রস্তুতই ছিল না। বিস্মিত পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে পালাতে শুরু করে। সকাল হওয়ার আগেই গোয়াইনঘাট মুক্ত হয়।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান