বিজ্ঞাপন
default-image

পাকিস্তানি সেনাদের সীমান্তসংলগ্ন ঘাঁটি কামালপুর দখল করে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকলেন। তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত। একটি দলের নেতৃত্বে গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া। তাঁদের সঙ্গে আছেন মিত্রবাহিনীর সেনারাও। তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য শেরপুর। কিন্তু শেরপুরের উপকণ্ঠে তাঁরা পৌঁছামাত্র পাকিস্তানি সেনারা পশ্চাদপসরণ শুরু করল। তাঁরা ধাওয়া করে আক্রমণ চালালেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পশ্চাদপসরণরত বহরের ওপর। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি সেনারা রণে ভঙ্গ দিল। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বরের।

শেরপুর ভারত সীমান্তসংলগ্ন জেলা (১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত মহকুমা)। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেরপুর সদরে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত একটি ঘাঁটি। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি সেনাদের কামালপুর ঘাঁটি দখল করে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ধাবিত হয় ঢাকার দিকে। সামনে ছিল অনেক প্রতিবন্ধকতা। তাই মুক্তিযোদ্ধারা কামালপুর থেকে দুটি কলামে বিভক্ত হয়ে এগোতে থাকে। একদল শ্রীবরদী থেকে ঝগড়ার চরের কাঁচা রাস্তা ধরে সংক্ষিপ্ত পথে অগ্রসর হয়। অপর দল অগ্রসর হয় শ্রীবরদী-শেরপুরের পাকা সড়ক ধরে। এ দলে সহযোদ্ধাদের নিয়ে ছিলেন গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া।

তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে দ্রুতই শেরপুরের উপকণ্ঠে পৌঁছান। আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কিন্তু আক্রমণ শুরু করার আগেই পাকিস্তানি সেনারা শেরপুর থেকে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালান। শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা কিছুক্ষণ পর রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় দু-তিনজন পাকিস্তানি সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়।

গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া চাকরি করতেন পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। মার্চে সেখান থেকে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠাতে দেখে তাঁর মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তিনি ঢাকায় আসার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ২৫ মার্চ কৌশলে সেখান থেকে বিমানে চেপে ঢাকায় আসেন। সেই রাতেই পাকিস্তানি সেনারা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। দু-তিন দিন পর তিনি বিক্রমপুর-নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী-কিশোরগঞ্জ হয়ে নিজ এলাকায় যান। জুনে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রথমে ভারতে কিছুদিন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে যুদ্ধ করেন ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। তিনি একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন। কামালপুর, বকশীগঞ্জ, শ্রীবরদীসহ আরও কয়েকটি জায়গায় তিনি যুদ্ধ করেন। ১৫ নভেম্বরে কামালপুর যুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের আহত অধিনায়ককে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান