১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি। মুক্তিবাহিনীর ১১ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে তুমুল উত্তেজনা। সিদ্ধান্ত হয়েছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কামালপুর ঘাঁটিতে আক্রমণের। কিন্তু ঘাঁটির শক্তি সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধারা কিছু জানেন না। তাই সিদ্ধান্ত হলো সেই ঘাঁটি পর্যবেক্ষণের।
কামালপুর জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত, সীমান্ত এলাকা। কামালপুর গ্রামের মাঝামাঝি সীমান্ত বিওপি। সেখানে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্ভেদ্য এক ঘাঁটি। কামালপুরে আক্রমণ করার আগে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের অধিনায়ক সালাহ্উদ্দীন মমতাজ (বীর উত্তম, শহীদ) সেখানে কয়েকবার পর্যবেক্ষণ করেন। পর পর দুই দিন পর্যবেক্ষণ করার পরও আবদুল হাইসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ২৮ জুলাই রাতে তিনি পর্যবেক্ষণে যান। রাতে পাকিস্তানি সেনারা দূরের বাংকার ছেড়ে সেকেন্ড লাইন প্রতিরক্ষা অবস্থানে চলে যেত। পর্যবেক্ষণের একপর্যায়ে সালাহউদ্দীন মমতাজ ও আবদুল হাই একটি খালি বাংকারের সামনে যান। আবদুল হাই বাংকারে কেউ আছে কি না দেখার জন্য উঁকি দিচ্ছেন, এমন সময় দুই পাকিস্তানি সেনা টহল দিতে দিতে সেখানে আসে। সালাহ্উদ্দীন মমতাজ তাদের দেখে ফেলেন। তিনি হ্যান্ডস আপ বলে একজনকে জাপটে ধরেন। ওই পাকিস্তানি সেনা ছিল বিশালদেহী। সে সালাহ্উদ্দীন মমতাজকে মাটিতে ফেলে তাঁর গলা চেপে ধরে। অপর পাকিস্তানি সেনা আবদুল হাইকে হ্যান্ডস আপ বলে গুলি করতে উদ্যত হয়। আবদুল হাই দ্রুত স্টেনগানের ব্যারেল দিয়ে ওই সেনার মাথায় আঘাত করে তার রাইফেল কেড়ে নেন। সে পালিয়ে বাংকারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে থাকা অস্ত্র দিয়ে সে গুলি করতে থাকে। আবদুল হাই বাংকার লক্ষ্য করে গুলি করেন। তারপর দ্রুত সালাহ্উদ্দীন মমতাজের কাছে গিয়ে তাঁকে জাপটে ধরে থাকা পাকিস্তানি সেনার মাথায় রাইফেলের ব্যারেল দিয়ে গুঁতো দেন। ওই পাকিস্তানি সেনা তখন সালাহ্উদ্দীন মমতাজকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়াতে থাকে। তখন তিনি ওই পাকিস্তানি সেনাকে গুলি করে হত্যা করেন। প্রাণে বেঁচে যান সালাহ্উদ্দীন মমতাজ।
আবদুল হাই চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল যশোর সেনানিবাসে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। কামালপুরসহ কয়েকটি স্থানে তিনি যুদ্ধ করেন।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান