বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের প্রবল দমন-পীড়ন শুরু হলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে ঢুকতে থাকে, ফলে ভারত সরকার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। এপ্রিলের শুরুর দিকে তত্কালীন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ আমাকে বললেন, ‘সৈন্যবাহিনী নিয়ে অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়া দরকার।’

আমি তাঁকে বললাম, ‘সেটা সম্ভব নয়, কারণ আমাদের মাউন্টেন ডিভিশন আছে কিন্তু কোনো সেতু নেই; আমাদের ও ঢাকার মধ্যে অনেক নদী, বেশ প্রশস্ত সেসব নদী, কিন্তু সেগুলোর ওপর সেতু নেই। সামনে বর্ষাকাল। নদীনালা অধ্যুষিত অঞ্চলে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ আমাদের সৈন্যদের নেই, আমাদের পরিবহন-ব্যবস্থাও নেই (মাউন্টেন ডিভিশনের আছে খুব সামান্য), ফলে আমাদের পক্ষে ওদিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।’

সব শুনে মানেকশ বললেন, তিনি আবার আসবেন।

পরদিন আবার এসে বললেন যে তাঁকে ও সেনাবাহিনীকে কাপুরুষ বলা হচ্ছে। আমি তাঁকে বললাম, ‘তাদের গিয়ে বলুন, আপনি কিছু করছেন না, তা নয়; ইস্টার্ন কম্যান্ড অগ্রসর হচ্ছে না।’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে নাগাদ আপনারা পারবেন?’

উত্তরে আমি বললাম, ‘যদি সেতুসহ প্রয়োজনীয় আর সবকিছুর ব্যবস্থা করেন, তারপর প্রশিক্ষণের সময় দেন, তাহলেও ১৫ নভেম্বরের আগে নয়।’ এ কথা বললাম এ জন্য যে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে মাটি শুকিয়ে উঠবে, তখন আমরা অগ্রসর হতে পারব। তারপর ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে এ বিষয়ে অবহিত করার জন্য যান মানেকশ।

আমাদের জানা ছিল যে একটা যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। আমি পূর্ব পাকিস্তান দখল করার একটা পরিকল্পনা তৈরি করলাম। আমি জানতাম, পাকিস্তানিরা শহরগুলোকে রক্ষা করতে চাইবে, তাই আমার পরিকল্পনায় মূল কৌশল ছিল, ঢাকা হবে আমাদের চূড়ান্ত ও প্রধান লক্ষ্য, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত কেন্দ্র ঢাকা। অন্যান্য সেক্টরে, যেমন যশোর সেক্টরে আমরা লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিই যোগাযোগকেন্দ্রগুলোকে।

আমরা স্থির করলাম, বাইরের শহরগুলোকে এড়িয়ে, প্রচলিত পথ ব্যবহার না করে বিকল্প নানা পথে সোজা ঢাকার দিকে অগ্রসর হব। আমরা কোনো শহর দখলে নিতে চাইনি, কারণ একটা শহর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক সময় লাগে। আমি জানতাম, যুদ্ধটা হবে সংক্ষিপ্ত; জানতাম, জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে, তাই শহরগুলো দখল করতে গিয়ে আমাদের সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। অর্থাত্, আমাদের কৌশল ছিল, পাকিস্তানিদের সীমান্তের দিকে টেনে আনা, শহরগুলো ও পাকিস্তানিদের প্রতিরক্ষাব্যূহ এড়াতে বিকল্প পথগুলো ব্যবহার করা এবং সব দিক থেকে সরাসরি ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া।

এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থীদের ভারতে আসা চলছেই। তাজউদ্দীন ও তাঁর সহযোগীরা কলকাতায়। তাঁদের স্বাধীনতার ঘোষণার প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজে আমি সহযোগিতা করলাম। ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য আমাদের আদেশ দিল। সীমান্ত এলাকাগুলোতে প্রশিক্ষণ-শিবির স্থাপন করে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও অস্ত্রসজ্জিত করার কাজ চলল। মুক্তিবাহিনী ও পরে ইস্টবেঙ্গল ব্যাটালিয়নস বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। তারা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পাকিস্তানিরা নির্বিঘ্নে কোথাও যেতে পারত না, কোথাও বেরোলেই তাদের একটা না একটা আক্রমণের শিকার হতেই হতো। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যোগাযোগ-ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল এবং পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দিয়েছিল, ফলে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছিল।

আমাদের জন্য প্রধান সমস্যা ছিল লজিস্টিকস, ওই যুদ্ধে জেতার জন্য সেটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মে মাসে, কারও কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পাওয়ার আগেই ত্রিপুরায় এক কোর সেনাদলের জন্য লজিস্টিকস গড়ে তুলতে শুরু করি। একইভাবে তুরা ও অন্যান্য স্থানে আমরা বর্ডারস রোডস অর্গানাইজেশনকে দিয়ে রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, এয়ারফিল্ড ইত্যাদি বানিয়ে নিই। মে মাসে আমি একটি পরিকল্পনা সেনা সদর দপ্তরে পাঠাই, সে পরিকল্পনায় ঢাকাকে করি প্রধান লক্ষ্যস্থল; সৈন্য বরাদ্দের কথাও সে পরিকল্পনায় ছিল। সেনাসদর সেটি নিয়ে বেশ কিছুটা সময় ধরে ভাবে।

তারপর আগস্ট মাসে জেনারেল মানেকশ ও ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশান্স কে কে সিং আমাদের একটা পরিকল্পনা দেন। লিখিতভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় যে আমাদের খুলনা ও চট্টগ্রাম বন্দর দখল করতে হবে, সেই লক্ষ্যেই যেন আমরা বেশি শক্তি নিয়োগ করি। আমি যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করি যে আমাদের উচিত, ঢাকা দখল করা। কিন্তু আমাকে বলা হলো, না, আমরা যদি খুলনা আর চট্টগ্রাম জয় করতে পারি, তাহলেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমি জানতে চাই, কীভাবে সেটা সম্ভব, কারণ খুলনা হচ্ছে আমাদের সীমান্ত থেকে ৩০ মাইল দূরে সামান্য একটা নদীবন্দর, আর চট্টগ্রামের গুরুত্ব নিছকই প্রান্তিক বা পেরিফেরিয়াল। এভাবে কিছুদিন যুক্তিতর্ক চলে, অবশেষে মানেকশ ওই লিখিত আদেশে একমাত্র যে পরিবর্তনটা আনেন, সেটা হচ্ছে ‘বেশি শক্তি’ কথাটা বাদ দেওয়া।

অর্থাত্ যে আদেশ নিয়ে আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম, তাতে বলা ছিল, খুলনা ও চট্টগ্রাম দখল করতে হবে। ঢাকার উল্লেখ কোথাও ছিল না।

কিন্তু আমরা খুলনাও জয় করিনি, চট্টগ্রামও জয় করিনি, তবু যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম।

ঢাকা আক্রমণের জন্য আমার সৈন্য প্রয়োজন ছিল। ছয় মাউন্টেন ডিভিশনকে রাখা হয়েছিল উত্তরে—ভুটানের জন্য। সেই ডিভিশনের কাছে আমি সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ জানালাম। কিন্তু আমাকে জানানো হলো, সেখান থেকে কোনো সৈন্য আমি পাচ্ছি না, কারণ উত্তর দিক থেকে চীনারা আক্রমণ করে বসতে পারে। মানেকশ তাই সেখান থেকে কোনো সৈন্য নিয়ে ঢাকার জন্য পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালেন। আমাকে একটা প্যারা ব্যাটালিয়ন গ্রুপ দেওয়া হয়। আমি সেই গ্রুপকে টাঙ্গাইলে নামানোর পরিকল্পনা করি এবং সেই আদেশ স্বাক্ষর করি অক্টোবরে। আমরা স্থির করি, ছত্রীবাহিনীর ওই গ্রুপটি নামবে সংকেত পাওয়ার সাত ঘণ্টা পর এবং তাদের লিংক আপ করা হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। আমরা যেভাবে পরিকল্পনা করেছিলাম ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

নভেম্বর মাসে আমরা ৫০ প্যারা ব্রিগেডের ক্যাপটেন পি কে ঘোষকে ‘টাইগার’ সিদ্দিকীর (কাদের সিদ্দিকী) সঙ্গে টাঙ্গাইলে পাঠাই ছত্রীবাহিনীর অবতরণের জায়গা নির্ধারণের জন্য। কিন্তু আমাদের সৈন্য দরকার ছিল। মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে যে দুটি ডিভিশন ছিল তাদের আর্টিলারি ছিল না। আমি তাই চীনা সীমান্ত থেকে সব আর্টিলারি সরিয়ে এনে এই দুটি ডিভিশনের ঘাটতি পূরণ করি। ঢাকায় আঘাত হানার জন্য তিনটি ব্রিগেডও আমি নিয়ে আসি।

৩০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর অভিযান শেষ হয়। তাই আমি আর্মি কম্যান্ডার লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে বলি, এই হচ্ছে ঢাকার ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পনা। তিনি আমাকে বলেন যে তিনি তা মানেকশকে জানাবেন। আমি বলি, মানেকশকে জানাবেন না; কারণ তিনি বলেছেন, চীনারা আমাদের আক্রমণ করতে পারে, তিনি আমাদের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানেন না। আর ঢাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, এটাও মানেকশ মনে করেন না।

৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মানেকশকে কিছুই জানানো হয়নি। ওই তারিখে অরোরা তাকে একটি বার্তায় জানান যে ঢাকা অধিকারের উদ্দেশ্যে আমি তিনটি ব্রিগেড নামিয়ে এনেছি। দুই ঘণ্টার মধ্যে মানেকশ’র কাছ থেকে এ রকম উত্তর আসে: এই ব্রিগেডগুলো সরাতে আপনাকে কে বলেছে? আপনি এক্ষুনি তাদের ফেরত পাঠান! অরোরা এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী করা যায়? আমি বললাম, বিষয়টা আমি দেখব। নতুন ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশান্স ইন্দর গিল এ ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি কেন এই বার্তাটা পাঠাতে গেছেন? মানেকশ আমার ওপর চোটপাট করছেন—কেন বিষয়টি তাকে জানাইনি।’

আমি বলি ওই বার্তা আমি পাঠাইনি; আর এখন ব্রিগেডগুলো ফেরত পাঠানোরও কোনো উপায় নেই। আমরা সবাই জানি যে যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, আর আমরা সবাই এও জানি যে আমি যদি ব্রিগেডগুলো ফেরত পাঠাই, তাহলে তাদের আবার ফেরত পাব না। গিল বললেন, ‘ঠিক আছে, ফেরত না পাঠালেন; কিন্তু সেনাসদরের অনুমোদন ছাড়া তাদেরকে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকাবেন না, কারণ সেনাপ্রধান এ ব্যাপারে অনড়।’ উত্তরে আমি বললাম, ‘ইন্দর, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি।’

আমি জানতাম না যে যুদ্ধ শুরু হলেও ডিসেম্বরের ৮ তারিখের আগে পর্যন্ত মানেকশ এই ব্রিগেডগুলো নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার অনুমতি আমাকে দেবেন না। ডিসেম্বরের তিন তারিখ সন্ধ্যায় মানেকশ আমাকে ফোন করে বলেন, পাকিস্তানিরা পশ্চিমে আমাদের এয়ারফিল্ডের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছে। আমি তাকে বললাম, তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন আপনি এগিয়ে যান। মিসেস গান্ধী কলকাতা গিয়েছেন, তাঁকে সব বিষয়ে অবহিত করুন।’ আমি বলি, ঠিক হ্যায়।

তারপর আমি অরোরাকে বলি, ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, আমাকে নির্দেশনামা তৈরি করতে হবে, তাই আপনি রাজভবনে গিয়ে মিসেস গান্ধীকে অবহিত করুন।’ তারপর বিমানবাহিনীর সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করে আমি নির্দেশগুলো ইস্যু করি।

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

যুদ্ধে আমাদের অগ্রযাত্রা ছিল বেশ ভালো। উত্তর দিক থেকে আমাদের অগ্রাভিযান খুব ভালোভাবে এগোয়, দুটি ব্রিগেডের আসতে দেরি হলেও ছত্রীবাহিনীর অবতরণ পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই ঘটে এবং ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ নাগাদ আমরা প্রায় তিন হাজার সৈন্য নিয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে যাই।

ইতিমধ্যে মালাকা-প্রণালী ধরে মার্কিন নৌবহর এগিয়ে আসছিল। এ খবরে দিল্লিতে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য যেসব রেডিও সংকেত পাঠানো হচ্ছিল, সেগুলোতে আড়ি পেতে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, সেসব সংকেতে বলা হচ্ছিল, ‘লড়াই চালিয়ে যাও। আমাদের সাহায্য করার জন্য উত্তর দিক থেকে আসছে চীনারা আর দক্ষিণ দিক থেকে আসছে আমেরিকানরা।’ নিয়াজি এটা বিশ্বাস করেছিলেন।

১৩ ডিসেম্বর রাতে আমি ওয়্যারলেসে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে যোগাযোগ করে বলি, ‘আমরা ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছি, আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী, তা ছাড়া মুক্তিবাহিনীর উত্থান অত্যাসন্ন। এ অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনী যদি আত্মসমর্পণ করে, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করব এবং সংখ্যালঘু (অবাঙালি) জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেব।’

১৪ ডিসেম্বর আমরা খবর পাই যে সেদিন ঢাকায় গভর্নর-হাউসে একটা বৈঠক হবে। ঢাকায় গভর্নর-হাউস ছিল দুটি, আমরা আন্দাজ করে একটা বেছে নিই এবং সৌভাগ্যক্রমে আমাদের আন্দাজ সঠিক হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনী দুই ঘণ্টার মধ্যে গভর্নর হাউসে বোমা ফেলে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদত্যাগ করেন। সেদিন বিকেল চারটায় নিয়াজি ও রাও ফরমান আলী আমেরিকান কনসাল জেনারেল স্পিভাকের সঙ্গে দেখা করে কয়েকটি প্রস্তাব রাখেন। সেগুলি ছিল: জাতিসংঘের অধীনে যুদ্ধবিরতি, জাতিসংঘের অধীনে সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার, পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার জাতিসংঘের ওপর ন্যস্ত করা এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে কোনো বিচার হবে না ইত্যাদি।

অন্য একটা দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে এটা আমি জানতে পারি। বিষয়টি মানেকশকে জানাই, মানেকশ ভারতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন। রাষ্ট্রদূত এ ব্যাপারে কিছু জানতেন না। একই দিনে ইসলামাবাদের আমেরিকান দূতাবাস ওই প্রস্তাব নিউইয়র্কে পাঠায় এবং সেটা ১৫ ডিসেম্বর পাঠানো হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে, যিনি তখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি এটা মানতে অস্বীকৃতি জানান। তারপর আমেরিকানরা সেটি আমাদের কাছে পাঠায়। ১৫ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দেওয়া হয়। একই দিন সন্ধ্যায় (আমাদের সময় অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর সকাল) সোভিয়েত শিবিরের অন্যতম দেশ পোল্যান্ড নিউইয়র্কে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব পেশ করে। ভুট্টো সে প্রস্তাব ছিঁড়ে ফেলে দেন কারণ সে প্রস্তাবে ভারতকে আগ্রাসনকারী হিসেবে নিন্দা করা হয়নি।

১৬ ডিসেম্বর সকালে মানেকশ আমাকে ফোন করে বলেন, ‘যান, ওদের আত্মসমর্পণ করান।’

আমি ঢাকায় নামার পর জাতিসংঘের কয়েকজন প্রতিনিধি আমার কাছে এসে বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও শাসনভার গ্রহণের বন্দোবস্ত করার জন্য আমরা আপনার সঙ্গে আসব।’

আমি তাদের বলি, ‘ধন্যবাদ, আপনাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে না।’

তখন ঢাকার সবখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড লড়াই চলছিল। আমাকে নিয়াজির কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আমার কাছে এলেন। পথে মুক্তিবাহিনীর একটি ইউনিট আমাদের থামায় এবং সামনে যেতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাঁরা বলেন, ‘আমরা নিয়াজির সদর দপ্তরে হামলা চালাতে যাচ্ছি।’ আমি তাঁদের বলি, ‘উনি আত্মসমর্পণ করবেন। প্লিজ, আমাকে যেতে দিন।’ অনেকক্ষণ কথাকাটাকাটি চলল। অবশেষে আমি বললাম, ‘দেখুন, আগামী কাল আপনাদের নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে আসছে, নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে চান। ঈশ্বরের দোহাই, আমাদের যেতে দিন!’ তারপর তাঁরা আমাদের পথ ছাড়লেন। আমি নিয়াজির সদর দপ্তরে পৌঁছে আত্মসমর্পণ দলিলের খসড়াটি তাঁকে পড়ে শোনালাম। শুনে নিয়াজি বললেন, ‘এটা তো নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল। কিন্তু আপনি তো এসেছেন শুধু যুদ্ধবিরতি আর পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা করার জন্য।’

উত্তরে আমি বললাম যে তা নিঃশর্ত নয়। কিন্তু তিনি সম্মত হলেন না। তাঁর কোনো কোনো সহযোগী, যেমন রাও ফরমান আলী, তাঁকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে রাজি হতে নিষেধ করছিলেন। অবশেষে আমি নিয়াজিকে বললাম, ‘জেনারেল, আপনারা আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের পরিবার-পরিজন, সংখ্যালঘু অবাঙালি, প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এবং আপনাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হবে। তার পরও যদি আপনারা আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে আপনার ও আপনাদের পরিবার-পরিজনের কিছু হলে আমি দায়িত্ব নিতে পারব না। তা ছাড়া, শিগগিরই আবার লড়াই শুরু করার আদেশ দেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্পও থাকবে না। আমি আপনাকে ৩০ মিনিট সময় দিচ্ছি।’

এ কথা বলে আমি বেরিয়ে আসি। আধঘণ্টা পর গিয়ে দেখি, আত্মসমর্পণের দলিলটি টেবিলের ওপরেই রয়েছে। আমি নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করি, ‘জেনারেল, আপনি কি এটি গ্রহণ করেছেন?’

তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন। আমি তাঁকে একই কথা জিজ্ঞেস করলাম তিন বার। কোনো উত্তর পেলাম না। তারপর কাগজটি টেবিল থেকে নিয়ে ওপরে তুলে ধরে বললাম, ‘তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি আপনি এটিতে সম্মত হয়েছেন।’

তখন নিয়াজির চোখে পানি দেখতে পাই। অন্যান্য পাকিস্তানি জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের চোখগুলো ক্রোধে জ্বলছিল।

নিয়াজি বললেন, ‘আমি আত্মসমর্পণ করব আমার অফিসে।’

আমি বললাম, ‘না। আমি ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছি যে আপনি আত্মসমর্পণ করবেন রেসকোর্স ময়দানে, ঢাকার জনতার সামনে।’

তিনি বললেন, ‘আমি তা করব না।’

‘করবেন’—আমি বললাম, ‘আপনি একটা গার্ড অব অনারও প্রদান করবেন।’

তারপর আমরা যখন নিয়াজির গাড়িতে চড়ে বিমানবন্দরে যাচ্ছি, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আমাদের গাড়ি থামিয়ে তার ওপর লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। ভাগ্যক্রমে আমার স্টাফ অফিসার খারা ছিল শিখ, সে তার পাগড়িবাঁধা মাথা বের করে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে চিত্কার ছাড়ে। বিমানবন্দরের কাছে গিয়ে দেখতে পাই, আমাদের অল্প কয়েকজন সৈন্য এদিক-সেদিক থেকে আসছে। একটা জিপে আমি দুজন ছত্রীসেনা দেখে তাদেরকে নিজের সঙ্গে নিলাম। বিমানবন্দরে পৌঁছুলে এক ট্রাক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আবির্ভূত হলেন টাইগার সিদ্দিকী। কী তাঁর মতলব ছিল জানি না, কিন্তু আমার বোধ হচ্ছিল, তিনি নিয়াজিকে গুলি করতে চেয়েছিলেন। নিয়াজি যদি বিমানবন্দরে খুন হয়ে যেতেন, তাহলে আত্মসমর্পণ ঘটত না। আমি দুই ছত্রীসেনাকে বললাম, নিয়াজিকে ঘিরে রাখতে, তাঁর দিকে রাইফেল তাক করে থাকতে বললাম এবং ওই অবস্থায় এয়ারফিল্ড থেকে তাঁকে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিলাম। তারপর (কাদের) সিদ্দিকীর কাছে হেঁটে গেলাম।

তখন অরোরা, তাঁর স্ত্রী ও সফরসঙ্গীরা এসে নামলেন। ভেবেছিলাম, অরোরা ও নিয়াজির সঙ্গে আমিও যাব; কিন্তু আমাকে বলা হলো অরোরার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে। যেহেতু ততক্ষণে সবাই চলে গেছে এবং ওটাই ছিল শেষ গাড়ি, আমি তাই একটি ট্রাকে উঠে পড়লাম।

আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর শেষ হওয়ার পর জনতা নিয়াজিকে ফাঁসিতে লটকাতে চাইছিল। সে মুহূর্তে সেখানে আমাদের সৈন্য ছিল খুব কম; তাই আমরা নিয়াজিকে ঘিরে রেখে কর্ডন করে একটা সামরিক জিপে তুলে দিই, জিপটি তাঁকে নিয়ে দ্রুত ছুটে চলে যায়।

সেটা ছিল এক অনন্য ধরনের আত্মসমর্পণ; নিয়াজির সামর্থ্য ছিল আরও অন্তত দুই সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং জাতিসংঘের অধিবেশন চলমান ছিল। তবুও যুদ্ধবিরতি রূপান্তরিত হয়েছিল প্রকাশ্য আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে, এমন ঘটনা যুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য।

সূত্র: ২৬ মার্চ ২০০৭ প্রথম আলোর "স্বাধীনতা দিবস" বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত