বিজ্ঞাপন
default-image

কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী সড়কে চণ্ডীপুর এবং দক্ষিণ ব্যাপারীর হাটের মাঝখানে ঠিক সড়কের পাশে একটা স্মৃতিসৌধ আছে। স্বল্প খরচে নির্মিত এই সৌধ ১৭ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি বহন করছে। প্রতিবছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর সেখানে ফুল দেওয়া হয়। মহান শহীদদের আত্মার মঙ্গলের জন্য মাগফিরাত কামনা করা হয়।

স্থানীয় মুরব্বিদের মুখে শোনা গেল, কুড়িগ্রাম শহরের পুবে ধরলা নদীর উত্তর পাড়ে মুক্তিযোদ্ধারা বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী তিস্তা নদীর প্রতিরোধ ভেঙে কুড়িগ্রাম শহর পর্যন্ত এসেছিল। ধরলার ওপর তখন সেতু ছিল না। রংপুর অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বিভিন্ন জায়গায়। যত দিন পারেন পাকিস্তানি বাহিনীকে বাধা দেন। প্রথম দিকে বহু পাকিস্তানি সেনাকে পরাজিত করেন।

কিছুদিন পর পাকিস্তানি সেনারা বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদসহ প্রতিশোধ নিতে উপস্থিত হয়। আধুনিক ভারী অস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হতে পড়েন। পুনরায় একত্র হয়ে তাঁরা নতুন করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তেমনি একটা প্রতিরোধ ছিল ধরলা নদীর উত্তর পাশে। ওপার থেকে পিছিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধা এবং উত্তর ধরলার নাগেশ্বরী-ভূরুঙ্গামারী এলাকার জনতা, ইপিআর, আনসার ও পুলিশ মিলে ধরলার উত্তর পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে বাধা দেওয়ার
জন্য একত্র হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নাগেশ্বরী এলাকার মানুষ তাঁদের জন্য খাবার এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ করেন। এ অবস্থা কিছুদিন চলতে থাকে। হঠাৎ একদিন কুড়িগ্রাম থেকে পাকিস্তানি সেনার দল আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ধরলার প্রতিরোধ ভেঙে ফেলে। নাগেশ্বরীতে অবস্থিত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাকে তারা হত্যার পরিকল্পনা আঁটে। তারা পাটেশ্বরী এলাকার এক লোকের মাধ্যমে খবর পাঠায় যে মুক্তিযোদ্ধারা এখনো ধরলার ব্যারিকেড ধরে আছে। তাদের খাদ্য ও গুলির বাক্স দরকার। এ কথা শুনে নাগেশ্বরী এলাকায় অবস্থিত সংগ্রাম কমিটির লোকজন তাদের জন্য খাবারসহ কয়েকজন ইপিআর সদস্যকে ট্রাকে করে কুড়িগ্রামে ধরলার পাড়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

কিছুসংখ্যক উদ্যোগী যুবক ওই ট্রাকে করে প্রতিরোধ দেখতে, প্রয়োজনে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সঙ্গে সঙ্গে যায়। চতুর ও ধূর্ত পাকিস্তানি বাহিনীর কৌশল বুঝতে না পেরে সেদিন প্রাণ দিতে হয় ইপিআর জোয়ানসহ আরও কয়েকজন তরতাজা তরুণকে। দুজন ড্রাইভারকেও। চণ্ডীপুরের কাছাকাছি কদমতলায় এসে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের পাতানো ফাঁদে পড়ে গেলেন। পাতানো মাইন বিস্ফোরিত হলো। গগনবিদারী শব্দে চারদিক প্রকম্পিত হলো। আশপাশে অ্যামবুশ পেতে পজিশনে থাকা পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে আহত মুক্তিসেনার দলটিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল।

খানসেনারা চলে গেলে স্থানীয় গ্রামবাসী লাশগুলোকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। থানা প্রশাসন থেকে বহুদিন পর সেখানে গণকবরটির ওপর লোহার ঘের দিয়ে ছোট একটা স্মৃতিফলক তৈরি করেছে। যাঁদের পরিচয় উদ্ধার করা গেছে, শ্বেতপাথরে আছে তাঁদের নাম:

শহীদ আবদুল ওহাব, শহীদ রইচ উদ্দিন, শহীদ আসাদ আলী, শহীদ আব্দুল জব্বার, শহীদ আবুল (ড্রাইভার), শহীদ গোলাম রাব্বানী, শহীদ আবুল কালাম আজাদ (ইপিআর), শহীদ সেকেন্দার আলী, শহীদ আফজাল হোসেন (ড্রাইভার), শহীদ আবুল কাসেম (ইপিআর), শহীদ খয়বর আলী, শহীদ আব্দুল আলী, শহীদ এম আবুল কাসেম, শহীদ আনছার আলী, শহীদ দেলোয়ার হোসেন, শহীদ আতিকুর রহমান এবং শহীদ মোজাম্মেল হক।

যেকোনো পথিক হেঁটে যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাভরে তাকিয়ে থাকেন নামফলকটির দিকে। বাসযাত্রীরা পশ্চিম দিকে তাকালে ওই স্মৃতিসৌধ দেখতে পাবেন। মুক্তিযুদ্ধ যাঁরা দেখেছেন এবং বেঁচে আছেন, ওই স্থানে গেলে তাঁদের তখনকার স্মৃতি মনের পাতায় ভেসে ওঠে।

(বর্ণনাকারী কুড়িগ্রামের চণ্ডীপুরবাসী)

সূত্র: ছাত্রছাত্রীদের সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী-ভাষ্য, দ্বিতীয় পর্ব, সম্পাদনা: মফিদুল হক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর