বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৭১ সালে আমি ২৮ দিনের ট্রেনিং শেষ করি। লালমনিরহাট সীমান্তবর্তী ভারতের গিতালদহ পুরোনো রেলস্টেশন। তার পাশে আমরা ২০০ মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন উইলিয়ামের নেতৃত্ব তাঁবু গেড়ে যুদ্ধে রত হলাম। প্রথম দিন আমি ডেমোলেশন কমান্ডার, আমার তিনজন যোদ্ধাসহ লোহাকুচি হয়ে হেঁটে গিয়ে আদিতমারী রেলওয়ে ব্রিজে অপারেশন করি। লোহাকুচি পৌঁছানোর পর আদিতমারী ব্রিজ অপারেশন পর্যন্ত আলী চাচা নামে মধ্যবয়সী এক স্থানীয় সাহসী লোক আমাদের সাহায্য করেন। উত্তর জনপদে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সফল রেলওয়ে ব্রিজ অপারেশন এটাই।

ক্যাপ্টেন উইলিয়ামের নির্দেশে সিরাজুল ভাই মাত্র ৩০ জন যোদ্ধা নিয়ে আমাকে তালতলা বর্ডারহাট এলাকায় ক্যাম্প স্থাপনের জন্য পাঠান। আমরা এসে ধনিগাগলা নেছর মুন্সির বাড়িতে প্রথমে অবস্থান নিই। দু-তিন দিন এলাকা চিনে নেওয়ার পর মালডাঙ্গা ক্যাম্পে হানা দেওয়ার জন্য প্ল্যান করছিলাম। এমন সময় খবর পেলাম হাজি সাইফুর রহমান ও রাজাকার জয়নাল মেকার পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু সদস্য নিয়ে আমাদের দিকে আসছে। অমনি দল নিয়ে ছুটলাম সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতে। কিন্তু আগেই জয়নাল মেকারের বাহিনী বল্লমপুর গিয়ে এক গর্ভবতীকে গুলি করে হত্যার পর নাগেশ্বরী চলে যায়।

একটা ছোট দল নিয়ে আমরা রাত চারটার দিকে গোরখমণ্ডল নামে একটা ছোট্ট চরে গিয়ে উঠলাম। চরটি ছিল মোগলহাট ও গিতালদহ ভারত-বাংলাদেশ সংযোগস্থল। এপার-ওপার রেলওয়ে ব্রিজের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে। যুদ্ধ শুরুর আগে জনবসতি ছিল। এখন শূন্য। ভিটা বালুময়, আর কিছু কলাগাছ। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল মোগলহাট পাকিস্তানি বেনিয়া বাহিনীর গতিবিধির খবর সংগ্রহ করা। তা আর হয়ে উঠল না। রামচরের রাজাকারের লোকজন আমাদের উপস্থিতি পাকিস্তানিদের জানিয়ে দেয়।

বিকেল চারটা থেকে শুরু হয় লঞ্চার ও আর্টিলারির শেলিং। লুকানোর মতো আশ্রয় আমাদের ছিল না। নিরুপায় হয়ে আমরা আল্লাহকে ডাকছিলাম। রাত শেষ হওয়ার পর আমরা রেহাই পেলাম। রেয়ার হেডকোয়ার্টারে পাঠালাম দুই যোদ্ধাকে। খবর নিয়ে রাত একটায় পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে দুই দিক থেকে আক্রমণ করলাম। শুধু অস্ত্র নয়, বাংকারে গ্রেনেড ফেলে তাদের হত্যা করা হয়। আমরা হারালাম তিনজন যোদ্ধাকে।

ক্যাম্প কমান্ডারের নির্দেশে সিরাজুল ভাই আর আকরাম ভাইয়ের সমন্বয়ে কুড়িগ্রামের একমাত্র মুক্ত এলাকা ফুলবাড়ীতে ক্যাম্প করার জন্য প্রায় ১০০ লোকের একটা দল নিয়ে বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তরে ভোরবেলা এক বাড়িতে উঠলাম। সকালের নাশতা প্রায় তৈরি। খবর এল, পাকিস্তানি বাহিনী কিছু সেনা নিয়ে কুলাঘাট পার হয়ে তাদের দোসর সাংবাদিক হক সাহেবের বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। আমরা যার যার মতো অস্ত্র হাতে নিয়ে সেদিকে ছুটে গেলাম।

আমাদের সহযোগিতা করলেন ফুলবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ মেম্বারের ৩০ জন আনসারের একটি দল। আমাদের খবর তাদের কানে পৌঁছানোর পরপরই তারা পালিয়ে যায়। তবে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আর কোনো দিন পাকিস্তানি বাহিনী কুলাঘাট পার হওয়ার সাহস বা সুযোগ কোনোটাই পায়নি।

ক্যাপ্টেন উইলিয়ামের নির্দেশমতো একটা ছোট্ট দল নিয়ে আমরা মোগলহাটের পাকিস্তানি বাহিনীকে আক্রমণের জন্য গিয়েছিলাম। আক্রমণ শেষে নদী পার হয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসছি। এক জংলা জায়গায় সহযোদ্ধা ভোগডাঙার কাজী জাকির হোসেন ও কিবরিয়া ভাই পাকিস্তানিদের পাতানো অ্যান্টি-পার্সোনাল মাইনে পড়েন। জাকিরের এক পা এবং কিবরিয়ার দুটি পা উড়ে যায়। কিবরিয়া মারা যান। জাকির ভাই এখনো বেঁচে আছেন। আমার জানামতে, তিনি কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করেন।

বর্ণনাকারী আবদুল আউয়াল (অব.) সার্জেন্ট, গ্রাম: দক্ষিণ রামখানা, কুড়িগ্রাম

সূত্র: ছাত্রছাত্রীদের সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী-ভাষ্য , দ্বিতীয় পর্ব, সম্পাদনা: মফিদুল হক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর