নওগাঁ জিলা স্কুলের (তৎকালীন নওগাঁ ইউনাইটেড হাইস্কুল) ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন অহীভূষণ সাহা। ইংরেজির পাশাপাশি গণিতও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পড়াতেন তিনি। বিনয়ী ও সজ্জন স্বভাবের কারণে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে খুব প্রিয় ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নিতে তরুণদের উদ্দীপ্ত করেছিলেন অহীভূষণ সাহা। হানাদার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
শহীদ শিক্ষক অহীভূষণের জন্ম নওগাঁ সদর উপজেলার দুবলহাটি গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে তিনি ইউনাইটেড হাইস্কুল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়ে শহরের হাট-নওগাঁ হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তাঁর ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতেন। এ জন্য তিনি হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। অহিভূষণ সাহার একমাত্র ছেলে চিকিৎসক জপদ সাহা ভারতের কলকাতায় বসবাস করেন।
অহীভূষণ সাহার নাতি চিত্তরঞ্জন সাহার স্ত্রী আলো রানী সাহা এ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আত্রাই নদের ধারে বান্দাইখাঁড়া গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। এপ্রিলের শেষের দিকে অহীভূষণ সাহা নওগাঁ শহর থেকে তাঁদের বাড়িতে চলে আসেন। অহীভূষণ সাহার প্রশ্রয়ে সে সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয়স্থল ছিল তাঁদের বাড়ি। কিন্তু এ খবর জেনে যায় রাজাকাররা। একাত্তরের ৭ জুলাই খুব ভোরে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা বান্দাইখাড়া ঘাটে এসে নামে। এদের দেখে লোকজন বাড়ি ছেড়ে মাঠের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পালানোর সময় স্থানীয় কুখ্যাত রাজাকার জানা সরদার অহীভূষণ সাহাকে দেখে ফেলে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে চিনিয়ে দেয়। সেনারা পেছন থেকে অহীভূষণের পিঠে গুলি করে। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নওগাঁর সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ গবেষক মোস্তফা-আল-মেহমুদ রাসেল শিক্ষক অহীভূষণ সাহার ছবি ও তথ্য পাঠান। একাত্তরে নওগাঁর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করে রক্তঋণ ১৯৭১: নওগাঁ নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাতে শহীদ অহীভূষণ সাহার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও মুক্তিসংগ্রামে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
স্বাধীনতার পর বান্দাইখাড়া বাজারে গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলকে অহীভূষণ সাহাসহ ৫২ জন শহীদের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ সালে আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ চত্বরে নির্মিত স্মৃতিসৌধেও অহীভূষণ সাহার নাম রয়েছে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আফজাল হোসেন বলেন, ‘শহীদ অহীভূষণ সাহা নওগাঁর একজন স্বনামধন্য শিক্ষক ছিলেন। স্যারের উৎসাহেই আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতের বালুরঘাট যাই। প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে জানতে পারি, স্যারকে হানাদার বাহিনী হত্যা করেছে।’
গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, প্রতিনিধি, নওগাঁ