default-image

মানিকগঞ্জের ঘিওরের সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী জমিদার হলেও ছিলেন সমাজসেবক, বিদ্যোৎসাহী, সংস্কৃতিসেবী ও জনদরদি মানুষ। এলাকায় নিজের অর্থে ও নিজের জায়গায় তিনি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনসহ মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মাতৃভূমির সব প্রগতিশীল আন্দোলন–সংগ্রামে সহায়তা করেছেন, যুক্ত থেকেছেন। এ জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজাকারদের রোষানলে পড়েন। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় তাঁকে।

বিজ্ঞাপন

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিখ্যাত তেরশ্রী জমিদার পরিবারে ১৯০৬ সালে সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর জন্ম। তাঁর বাবা জমিদার কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী ও মা চম্পকাসুন্দরী দেবীও ছিলেন পরোপকারী স্বভাবের। পিতামহ হরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী তেরশ্রীতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘রায়চৌধুরী’ তাঁদের ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া উপাধি।

সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি মানিকগঞ্জ জেলার প্রথম কলেজ হিসেবে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘তেরশ্রী কলেজ’। পরে এটি ‘দেবেন্দ্র কলেজ’ নামে মানিকগঞ্জ জেলা সদরে স্থানান্তরিত হয়।

সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্থানীয় খ্যাতিমান নন্দী পরিবারের প্রভাবে তেরশ্রী এলাকায় পাকিস্তানবিরোধী গণ-আন্দোলনের এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটে। এ কারণে তিনি রাজাকার ও পাকিস্তানপন্থীদের বিরাগভাজন হন। একাত্তরের ২২ নভেম্বর সকালে রাজাকার ও আলবদরের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা তেরশ্রী গ্রামে হামলা চালিয়ে মুক্তিকামী ৪৩ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাজাকাররা সেখান থেকে তাঁকে ধরে এনে প্রকাশ্যে গায়ে তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। হানাদাররা এ সময় তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানকেও হত্যা করে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে মানিকগঞ্জের খাবাশপুর আদর্শ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর ছবি ও বিস্তারিত তথ্য পাঠান। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে তাঁর মাঠপর্যায়ে গবেষণার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতি ও শ্রুতিতে মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ বইতে তাঁর জীবনী ও তথ্য রয়েছে। এই তথ্যসূত্র ধরে অনুসন্ধান করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে ও ছোট মেয়ে মারা গেছেন। বড় মেয়ে কলকাতায় শিক্ষকতা করেন। মানিকগঞ্জে আছেন ছোট ছেলে শিক্ষক সোমেশ্বর রায়চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। তেরশ্রী গণহত্যার দিন তাঁর মা গায়ত্রী দেবী চৌধুরীরানী ও ভাইবোনেরা পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। তাঁর বাবার নামে এলাকায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থাপনা বা সড়কের নামকরণ করা হয়নি। এ জন্য পরিবারের সদস্য ও এলাকার সাধারণ মানুষ মর্মাহত।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, শিক্ষা–সংস্কৃতির বিস্তার ও জনকল্যাণে সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর বিপুল অবদান রয়েছে। তাঁর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি নেই। তবে তেরশ্রী গণহত্যার শহীদদের স্মরণে ২০১২ সালে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন পয়লা মোড় এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। এর নামফলকে প্রথম নামটিই জমিদার সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর।


গ্রন্থনা: আব্দুল মোমিন, মানিকগঞ্জ