default-image

মাওলানা অলিউর রহমান শিক্ষকতার পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি থাকতেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের আগানগর কাঠুরিয়া গ্রামে। সেদিন ছিল শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর। ঢাকার লালবাগ এলাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে আলবদরদের নজরে পড়ে যান। আলবদররা তাঁকে চোখে চোখে রাখতে থাকে। রাজাকারের দল রাতে ওই বন্ধুর বাসা থেকে অলিউর রহমানকে তুলে নিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আলবদররা অলিউর রহমানকে রায়েরবাজারে তাদের নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যায়। দিনের বেলা তাঁকে একটা কুঠুরিতে আবদ্ধ করে রাখত। রাতে পৌষের কনকনে শীতের মধ্যে উদোম শরীরে পাথরচাপা দিয়ে রায়েরবাজারের ঝিলের পাড়ে ফেলে রাখত। এভাবে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে অলিউর রহমানের দুই চোখ উপড়ে ফেলে ঘাতকেরা। অত্যাচারের একপর্যায়ে তাঁকে মেরে ফেলা হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী তাঁর পরিবারের কাছে এ বর্ণনা দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর লাশ পায়নি পরিবার।

প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানিয়েছেন শহীদ মাওলানা অলিউর রহমানের ছেলে স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ জুনায়েদ খোরাসানী। জুনায়েদ বলেন, পাকিস্তানি শোষকেরা বাঙালিদের যেকোনো দাবিকে অনৈসলামিক কিংবা ভারতের দুরভিসন্ধি বলে প্রচার করত। তারা ছয় দফাকেও ইসলামের পরিপন্থী বলে অপপ্রচার চালাত। তাঁর বাবা একাধিক পুস্তিকা প্রকাশ করে ধর্মীয় আলোকে এসব অপপ্রচারের জবাব দেন। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে তিনি ‘আওয়ামী উলামা পার্টি’ গঠন করেন। তিনি এর সভাপতি ছিলেন। অসহযোগ থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

অলিউর রহমানের বাড়ি সিলেটের সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়নের মইয়ারচর গ্রামে। ১৯৩২ সালে তাঁর জন্ম। বাবা হজরত মাওলানা শাহ হাবিবুর রহমান খোরাসানী (রহ.), মা আজিবুন্নেছা। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি, আলিম, ফাজিলসহ সব পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৩ সালে দওরায়ে হাদিস বিষয়ে (টাইটেল) তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পাকিস্তানের করাচিতে হোমিওপ্যাথিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন চলাকালে সিলেটের গোবিন্দচরণ পার্কে আয়োজিত সভা-সমাবেশে অংশ নেন।

মাওলানা অলিউর রহমানের স্ত্রী তরিকুন্নেসা। তাঁদের দুই ছেলে–মেয়ে। ছেলে মোহাম্মদ জুনায়েদ খোরাসানী জানান, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মায়ের কাছে সহানুভূতি জানিয়ে স্বহস্তে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন, সঙ্গে দুই হাজার টাকার অনুদান। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকায় চিকিৎসক মাওলানা অলিউর রহমানের নাম রয়েছে। এ ছাড়া রশীদ হায়দার সম্পাদিত বাংলা একাডেমির স্মৃতি ১৯৭১–এর পুনর্বিন্যাসকৃত চতুর্থ খণ্ড এবং সাহিত্য প্রকাশ থেকে বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজের সম্পাদনায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবনকোষ বইয়েও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ আছে।

গ্রন্থনা: সুমনকুমার দাশ, সিলেট।