বিজ্ঞাপন
default-image

সকাল হতেই শুরু হলো ব্যাপক গোলাবর্ষণ। প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংক তাঁদের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করল। একই সঙ্গে তাদের কামান থেকেও গোলাবর্ষণ চলল। পাকিস্তানি সেনাদের প্রচণ্ড আক্রমণে আয়েজউদ্দিন আহমদ ও তাঁর সহযোদ্ধারা তখন রীতিমতো বিপর্যস্ত। কামান ও ট্যাংকের গোলা তখন সরাসরি এসে পড়ছে তাঁদের বাংকারে। গোলার আঘাতে বাংকার ধসে তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধা মাটিচাপা পড়েন। শেলের স্প্লিন্টারের আঘাতেও সহযোদ্ধারা আহত হচ্ছেন। তার পরও তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। তাঁদের মনোবল ভেঙে পড়েনি। একপর্যায়ে আয়েজউদ্দিনও আহত হন। ক্রমেই আহত যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুুপুরের মধ্যে তাঁদের প্রায় অর্ধেক সহযোদ্ধাই আহত হন।

এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ১২ মে মাসের। ঘটেছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীসংলগ্ন শুভপুর সেতুর কাছে। ২৫ এপ্রিল করেরহাটের পতন হলে প্রতিরোধযোদ্ধারা শুভপুর সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে সরে উত্তর প্রান্তে অবস্থান নেন। তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিলেন। আয়েজউদ্দিন ছিলেন একটি দলে। তাঁর কাছে ছিল মর্টারগান। তাঁদের অন্য দলটির কাছে ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র থাকলেও গোলার অভাবে সেটি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

আয়েজউদ্দিন আহমদ ও তাঁর সহযোদ্ধারা শেষ পর্যন্ত ওই অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুভপুর দখল করার পর আশপাশের গোটা এলাকা নির্জন হয়ে পড়ে। শুভপুরের কাছেই ছিল ভারতীয় সীমান্ত। সেখান দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রতিরোধযোদ্ধারা। তাঁরা কিছুটা উদাস-নির্বাক। নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছেন সীমান্তের দিকে। সবাই আহত। কেউ লাঠিতে, কেউ বা অন্য একজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছেন। দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যেও তাঁদের মুখে হাসি।

আয়েজউদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের হালিশহর ইপিআর উইংয়ে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিসহ এক প্লাটুন ইপিআর সদস্য পাহাড়তলী রেলওয়ে বিল্ডিংয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন। ২৬ মার্চ রাত ১০টা থেকে তাঁদের অবস্থানের ওপর পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয়। নায়েক সুবেদার আয়েজউদ্দিন তিন ইঞ্চি মর্টারের সাহায্যে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। সারা রাত উভয় পক্ষে গোলাগুলি হয়। সকালের দিকে আয়েজউদ্দিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের গোলাগুলি প্রায় শেষ হয়ে যায়। এ সময় পাকিস্তানি সেনারা তাদের আক্রমণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। তখন প্রতিরোধযোদ্ধারা ওই অবস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। শুভপুরের যুদ্ধে আহত হওয়ার পর আয়েজউদ্দিন ভারতে গিয়ে চিকিত্সা নেন। সেপ্টেম্বরে আবারও যুদ্ধে যোগ দেন তিনি। পরে তিনি উৎমা বিওপিসহ কয়েকটি জায়গায় যুদ্ধ করেন।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান