default-image

স্বাধীনতার কাছেপিঠে জন্ম বলে তার ডাকনাম হয়েছিল ‘স্বাধীন বাবু’। তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মরে গিয়েছিলেন মা। সেই ছোট্ট বাবু একদিন জল্লাদখানার ট্যাঙ্কিতে পড়ে যায়। তাকে তুলতে গিয়ে বাবার হাতে উঠে আসে মাংস-খসা খুলির চুল।

সে কথায় আমরা পরেই যাই।

কিন্তু মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া সেই মসজিদের পাশের পুকুরটা? ডুব দিয়ে পুকুরের তলার কাদা হাতড়ালেই হাতে হাড্ডি বাঁধত। মাথার খুলি আর ছেঁড়াখোড়া জামাকাপড়ও। সেখান থেকে হাড় তুলে দেখালে দর্শনার্থীরা সিকি-আধুলি দিত তাঁকে। সে পয়সায় বাবুল বিস্কুট খাওয়া যেত। এদিক-সেদিকে গুলির খোসা মিলত। তার পিতলটুকু বেচে কটকটিও খাওয়া চলত।

তখন কি তাঁরা জল্লাদখানায় থাকছেন? হতেও পারে। ৭ তারিখের হিসাব আউলে যায়। স্মৃতি হাতড়ানোর অবকাশ কবে আর পেয়েছেন? ঝরা পাতার মতো জীবন শুধু ঘূর্ণিপাকে ঘুরিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২.

বাবা ফজল মিয়া ভোলায় নদীভাঙনের তাড়া খেয়ে স্ত্রী আর ছেলের হাত ধরে একাত্তরের ১০-১২ বছর আগে ভেসে আসেন ঢাকার মিরপুরে। জীবিকা হয় নদী-খালবিল-পুকুরে মাছ ধরা। খোদেজার জন্ম ঢাকায়। তারপর জোবেদা। জোবেদার পরে ফাতেমা জন্মায়, মরেও যায়। তারপর হাজেরা ও রহিমার যমজ জন্ম। তারও পরে বাবুর।

একাত্তরের বছর দশেকের মধ্যে পরিবারটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। পথে নেমে খোদেজা হন ‘শাহনাজ বেগম’, ভাসমান জীবনেই একটা সময়ে খুঁজে পান হাজেরাকে।

মানুষ হারিয়ে যায়, সময়ের খেই তো হারাতেই পারে। কিছু স্মৃতি তবু বড়ই জীবন্ত থাকে, পুকুরতলের কাদায় ডুবে থাকা হাড়গোড়ের মতোই।

একাত্তরের গোড়ায় খোদেজারা থাকতেন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে। যুদ্ধ বাধলে তাঁরা চলে যান আলোকদি গ্রামে। পল্লবী থানার এই গ্রামে একাত্তরের ২৪ এপ্রিল যে গণহত্যা হয়, হাজেরাকে কোলে নিয়ে সেটি দেখেছিলেন নয়-দশ বছর বয়সী খোদেজা। ঘাতকেরা গ্রাম ছেড়ে গেলে খোদেজার মনে হয় চারদিক ‘লাশ আর রক্তের মরুভূমি’। ভাইকে নিয়ে বাবা লুকিয়ে বেঁচেছিলেন নদীর অন্য পারে। ফিরে এসে তিনি পরিবার নিয়ে সরে যান সাভারের দিকে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যে মামলার বিচার চলছে, তাতে পঞ্চম অভিযোগটি এই আলোকদি গণহত্যার।

খোদেজার মনে আছে, একাত্তরে বাবা নৌকায় করে মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপার করতেন, জগে ভরে পানি খাওয়াতেন; চাল-ডাল এনে মাকে বলতেন রেঁধে দিতে। ‘বঙ্গবন্ধুরে যখন বন্দী কইরা রাখছিল পাকিস্তানে নিয়া, তখন তাঁর জন্য রোজা রাখছিল আমার মা,’ বলেন খোদেজা।

বিজয়ের পর পরিবারটি উঠেছিল মিরপুরেই ‘বাস্তুহারা’ বসতির একটি ঘরে। ‘প্রতাপশালী’রা সেখান থেকে তাদের ভাগিয়ে দেয়। তত দিনে স্বাধীন বাবুর জন্ম দিয়ে মা মারা গেছেন। ‘আধপাগলা’ এক খালা এসেছেন পাঁচটি শিশু ভাইবোনকে সামলাতে। সংসারে দারুণ অভাব।

সবাইকে নিয়ে বাবা গিয়ে উঠলেন মিরপুর ১০ নম্বরে জল্লাদখানা বলে কুখ্যাত ওয়াসার পরিত্যক্ত পাম্পহাউসের ছোট পাকা ঘরটিতে। সেটা ১৯৭২ কি ’৭৩ হবে। ১৯৭৪-ও হতে পারে? জল্লাদখানার গা ঘেঁষে তখন ছিল বড় একটা খাল। ‘মাছ ধরারও জায়গা পাইছি, আবার থাকার জায়গাও পাইছি,’ বলেন খোদেজা ওরফে শাহনাজ।

সেই ছেলেবেলার পর গত সপ্তাহে এই প্রথম আবার সেখানে ফিরে এলেন খোদেজা আর হাজেরা। তাঁদের চোখ হতবিহ্বল। চারদিকে এখন ঘনবসতি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সেই জল্লাদখানাকে এখন রক্ষণাবেক্ষণ করছে, তাকে রূপ দিয়েছে বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে।

বাইরে কালো সাইনবোর্ডে লেখা ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১’। ব্যানার বলছে, ‘কান পেতে শুনি কী বলতে চাইছে বধ্যভূমি’।

‘জল্লাদখানা’ নামটা হয়েছিল মানুষের মুখে মুখে। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর থেকে ১৯৭২-এর ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত হওয়ার দিন পর্যন্ত এই পাম্পঘরে আশপাশ ও বাইরে থেকে বাঙালিদের ধরে এনে জবাই করা হতো। আঞ্চলিক সামরিক শাসকদের সহায়তায় কাজটি করত তাদের বাঙালি ও অবাঙালি সহযোগীরা। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় তৃতীয় অভিযোগটি শহীদ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে একাত্তরের ২৯ মার্চ এখানে এনে জবাই করে মারার। মানুষজন আখতার গুন্ডার নাম করেন।

পাম্পঘরের ভেতরে হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হতো ভূগর্ভের জলভরা চৌবাচ্চায়। বাইরে হত্যা করেও লাশ ফেলা হতো এখানে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা বলেন, ১৯৭২ সালে এখান থেকে ‘তিন ট্রাক’ হাড় ও খুলি তোলা হয়। পরে ১৯৯৯ সালে এলাকাবাসীর তাগিদে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ট্যাঙ্কিটি খনন করে ৭০টি খুলি ও প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার অস্থিখণ্ড উদ্ধার করা হয়। এসব নিদর্শনের ফরেনসিক পরীক্ষা করে যুদ্ধাপরাধ-অনুসন্ধানী নাগরিক উদ্যোগ ‘ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’।

স্মৃতিপীঠের তত্ত্বাবধায়ক কে এম নাসিরউদ্দিন বলেন, ভূগর্ভস্থ চৌবাচ্চাটি আয়তনে ২০ বর্গফুট, গভীরতায় ৩০ ফুট। একটা চওড়া নলপথে এটি নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর কুয়ার মতো একটি মুখ ঘরটার ভেতরে, আরেকটি বাইরে।

বিজ্ঞাপন

৩.

এই একচিলতে পাম্পঘরেই থাকত খোদেজা-হাজেরার পরিবার। খোদেজা বলেন, ‘যেদিনকা আমরা প্রথম আসি, অনেক হাড্ডি, মাথা, পুরানা রক্তমাখা কাপড়চোপড় পাইছিলাম। আমি আর আমার বাপে পরিষ্কার কইরা বাইরে যে হাউসটা ছিল, ওইটার ভিতরে ফালাইছিলাম।’ প্রথমটায় ভয়ে কিছু ধরতে না চাওয়ায় বাবা তাঁকে থাপ্পড় মেরেছিলেন।

ঘরটি এখন বড় মমতায় সাজানো। এক পাশের দেয়ালে জল্লাদখানায় শহীদ এলাকাবাসী ৩৯ জনের নামের তালিকার নিচে লেখা, ‘অসম্পূর্ণ’। চৌবাচ্চার কূপ-লাগোয়া একটা বেদি কাচ দিয়ে ঢাকা। সেখানে সাজানো রয়েছে উদ্ধার করা খুলির ছবি, খুঁড়ে তোলা চশমার ফ্রেম, তসবি, জুতা, চুড়ি...। এর কিছু এসেছে একই বছর খনন করা নূরী মসজিদ বধ্যভূমি থেকেও।

কুয়ার মুখে মাথা রেখে শিরশ্ছেদ করা হতো। হাজেরার মনে আছে, বাবা ঘরের কুয়াটা টিনচাপা দিয়ে দেন। তবু গন্ধ আসত। বেদিটায় তিনি নামাজ পড়তেন, কাউকে উঠতে দিতেন না। খালা ঘরে কোরআন শরিফ পড়তেন।

‘ভয় তো খুবই লাগত, আপা,’ বলেন খোদেজা। ‘এইখানে লাখ লাখ লাশ শুইয়া রইছে আমাগো পিঠের নিচে আর আমরা উপরে শুইয়া আছি।’ এখানে আসার পর বাবা আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। নতুন সেই স্ত্রী পরদিনই পালিয়ে যান।

পরিবারটি এখানে ছিল দুই-আড়াই বছর। ঘরের বাইরের কুয়ার মুখটা বাবা ঢেকে রেখেছিলেন বড় একটা ভাঙা কড়াই দিয়ে। ছোট্ট বাবু একবার লাফিয়ে তার ওপরে উঠলে চৌবাচ্চায় পড়ে যায়। বাবা তক্ষুনি ভেতরে নামার শিক বেয়ে নামেন। খোদেজার মনে আছে, ‘আব্বা একটা মাথার চুল ধরছে, মনে করছে আমার ভাইয়ের চুল। কিন্তু মরা মানুষের মাথা, চুল হাতে উইঠ্যা আসছে।’ বহু কষ্টে ভাইকে জীবন্ত ওঠানো যায়।

হাজেরা তখন খুবই ছোট। কিন্তু তাঁরও চোখে ভাসে, ওঠার সময় বাবা আর ভাইয়ের গায়ে লেগে ছিল পোকা, ময়লা, পচা কাপড়, চুল। ‘আমরা ভূত ভূত বলছি, ভয়ানকভাবে উইঠা আইছিল তো!’ তারপর বাবা বলেন, এখানে আর থাকা যাবে না।

দুটি কুয়ার মুখই এখন পুরু কাচে ঢাকা। তার ওপর লেখা: ‘মাথা নত করে শ্রদ্ধা নিবেদন করি সকল শহীদের প্রতি।’

৪.

দুই বোন বলছিলেন, কাছেই নাকি আরেকটা ‘জল্লাদখানা’ ছিল। স্মৃতিপীঠের তত্ত্বাবধায়ক নাসিরউদ্দিন বলেন, এখন ঘরবাড়ি উঠে অ্যাভিনিউ ফাইভের কোনার সেই বধ্যভূমিটি হারিয়ে গেছে। খোদেজার মনে আছে, একবার তিনি আর বাবা সেখানে পড়ে থাকা অনেক দেহাবশেষ জড়ো করে পাশের একটি চৌবাচ্চায় রেখেছিলেন।

বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে হতো খোদেজাকে, ‘নদীতে অনেক লাশ পাইছি। জালের সাথেও অনেক হাড্ডিহুড্ডি, মাথা উইঠ্যা আসত। বাবা একটা লাশ দেখলে অন্তত একটু মাটি খুইদ্যা ঢাইক্যা দিত। হাড্ডি পাইলে একটু নিরাপদ জায়গায় নিয়া রাখত গর্ত কইরা।’

ছেলেবেলায় খেলার সাথিরা ওদের দেখিয়ে বলত, ওই ‘জল্লাতখানা’ আসে। এতে তখন গর্ব হতো যে, সবাই ওদের চেনে। আজ স্মৃতিপীঠে বিহ্বল হাজেরা বলেন, ‘এইখানে শহীদ মানুষের সাথে আমরা ঘুমায়া গেছি!...আরেকটা রাত যদি থাকতে পারতাম, ভালো কইরা অনুভব করতে পারতাম এইখানে আসলে কী ঘটছে। তখন তো বুঝতাম না, জীবন বাঁচানোর আশ্রয়ের জন্য এখানে আইসা জুটছিলাম।’

জল্লাদখানার উঠানের দুই পাড়ে প্রাচীরঘেঁষে সমাধিফলকের মতো শ্বেতপাথরে কালো হরফে একাত্তরের বধ্যভূমির বিভাগওয়ারি তালিকা। শেষ ফলকটিতে লেখা, ‘স্টপ জেনোসাইড’। ‘গণহত্যা বন্ধ করো’।

যেসব জায়গায় একাধিক দিন হত্যাকাণ্ড হয়েছে অথবা বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এনে মারা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সেগুলোকেই বধ্যভূমি বলছে। ৪৭৬টি নামের শেষে লেখা, ‘অসম্পূর্ণ’। যুদ্ধাপরাধ-অনুসন্ধানী কমিটির হিসাবে সংখ্যাটি এর চেয়ে ঢের বেশি। দেশজুড়ে এসব হত্যাকাণ্ড করেছিল পাকিস্তানি সেনা, মিলিশিয়া, সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী আর বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী (এপকাফ)।

প্রাচীরের ভেতরগাত্রে আরও রয়েছে বিশ শতকের বিশ্বে প্রধান গণহত্যাগুলোর বিবরণ। বিবরণের শেষে লেখা: ‘চলছে’। জল্লাদখানার এই স্মৃতিপীঠ নানা মাত্রায় কথা বলে, প্রশ্ন তোলে, জীবন পায়।

কানে বাজে খোদেজার কথা, ‘যুদ্ধ কী, যুদ্ধ কারে কয়, বুঝতাম না। বুঝতাম, মানুষ মাইরা ফালায়। অন্য দ্যাশের মানুষ এই দেশের মানুষেরে মাইরা এই দেশ দখল করবে, এইটুক বুঝতাম।’

সে সময় পাকিস্তানপন্থী অবাঙালি-অধ্যুষিত মিরপুরের এই পাড়াতেই বড় হয়েছেন শেখ শরিকুল ইসলাম। একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল ১৫। ২৮ জুলাই দুপুরে অবাঙালি তিন যুবক তাঁকে মরণ-মার মেরে দীর্ঘ রাস্তা পা ধরে ছেঁচড়ে নিয়ে যায় জল্লাদখানায়। জবাই করতে তাঁর গলায় ছুরিও চালানো হয়। কিন্তু কাটা শেষ হওয়ার আগেই খেলার সঙ্গী আরও দুজন অবাঙালি তরুণ এসে তাঁকে উদ্ধার করেন।

মারের শুরুতে শরিকুল জানতে চেয়েছিলেন, কেন ওরা এমনটা করছে? মা তুলে গালি দিয়ে ওরা বলে, ‘ব্যাটা, তুই বাঙালি! তোরা দেশ স্বাধীন চাস!’

পাম্পঘরের চৌবাচ্চায়—কিংবা যেকোনো খানেই—লাশ গুম করে দিয়ে কি অপরাধ নিশ্চিহ্ন করা যায়? ইতিহাস অতীতে আটকে থাকে না। স্পর্শ করে বর্তমান ও ভবিষ্যেক। দাবি তোলে ন্যায়ের, স্বদেশি-বিদেশি জল্লাদদের বিচারের, সত্যের সঙ্গে বোঝাপড়ার, মীমাংসার।

বিজ্ঞাপন