default-image

সেদিন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনায় যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তা বাংলাদেশ এবং এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বার্থেই নিয়েছিলাম। বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা আর বাঁচা-মরার প্রশ্নকে সেদিন সবচেয়ে উঁচুতে স্থান দিয়েই আমি কাজ করে গিয়েছি। আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এবং একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে আমার দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করতে পারায় আমি খুশি। তবে সামগ্রিক সাফল্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরই। আমরা যা করেছি তা তাঁরই নির্দেশিত পথ।

বাংলাদেশের এই বিপ্লব কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এর জন্য আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বাঙালি জাতিকে ধীরে ধীরে বিপ্লবের দিকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছে এবং এভাবেই তাদের মানসিক প্রস্তুতি ঘটিয়েছে। এরপর ২৫ মার্চ রাতে জেনারেল ইয়াহিয়ার বর্বর বাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে সমগ্র বাঙালি জাতি তার প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ শপথ নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলা শুরু হওয়ার পর ঢাকা থেকে পালিয়ে আমি জীবননগরে পৌঁছাই। সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

পালিয়ে যাওয়ার পথে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা লাভের যে চেতনার উন্মেষ দেখে গিয়েছিলাম, সেটাই আমাকে আমার ভবিষ্যত্ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে অনিবার্য সুযোগ দিয়েছিল। জীবননগরের কাছে সীমান্তবর্তী টঙ্গি নামক স্থানে একটি সেতুর নিচে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো: একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।

সেদিন ওই সীমান্তেই মেজর ওসমানের সঙ্গে আমার দেখা। তাঁর কমান্ডে একটি ব্যাটালিয়ন তখন। কিন্তু হাতে সেই সেকেলে রাইফেল। এর বিপরীতে পাকিস্তানি খানসেনাদের হাতে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বিপুল সম্ভার। সেদিন মেজর ওসমানের বাহিনীর কাছে একটি লাইট মেশিনগানও ছিল না। যা হোক ১ এপ্রিলের মধ্যেই আমি কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সংগ্রহ করি এবং সেগুলো মেজর ওসমানের হাতে দিয়ে দিই, যা দিয়ে তিনি ওই সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রগতি রোধ করেন এবং তাদের হাত থেকে আরও বহু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দখল করেন।

এরপর ১০ এপ্রিল আমি স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার গঠন করি এবং এদিনই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। ১১ এপ্রিল মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য আমি বিভিন্ন সেক্টরের নাম ঘোষণা করে সেক্টর কমান্ডারও নিয়োগ করি।

default-image

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী চুয়াডাঙ্গায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিই ১৪ এপ্রিল। এ খবরটা পত্রিকায় আগাম প্রকাশ হয়ে পড়ায় বর্বর পাকিস্তানিরা পরের দিনই চুয়াডাঙ্গায় নির্বিচারে বোমা বর্ষণ শুরু করে। ফলে সেখানে বহু লোক হতাহত হয়। এই বোমাবর্ষণের জন্য সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের চুয়াডাঙ্গা শহর ছাড়তে হয়েছিল। এরপর আমরা মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলা নামক স্থানকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মনোনীত করে এর নাম দিই ‘মুজিবনগর’। ১৮ এপ্রিল কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করি। সেই সঙ্গে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীতে লোক নিয়োগ। নিয়মিত, অনিয়মিত, আনসার, পুলিশ, যুবক, তরুণ মিলিয়ে মুক্তিবাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা ছিল এক লাখ এক হাজার।

আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন যুদ্ধ করতে হয়েছিল, তেমনি কূটনৈতিক ফ্রন্টেও যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ করার লক্ষ্য ছিল নভেম্বর মাস। কেননা, আমি জানতাম বাংলাদেশে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পরাস্ত করতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ সফলকাম হবে না এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাও আসবে না। এ ছাড়া আরও বুঝেছিলাম যে ওই সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে না যাওয়া হলে মার্কিনরা তার সুযোগ নেবে এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধকে নিয়ে আসবে বাংলার মাটিতে। কেননা, আমেরিকাকে ভিয়েতনাম থেকে সরতেই হবে। আর এ সম্পর্কে আমরা খুবই হুঁশিয়ার ছিলাম।

মার্কিনরা সব সময়ই আওয়ামী লীগের ‘র্যাংক ও ফাইলে’র মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার কাজে নিযুক্ত ছিল। এ জন্য তারা নানা রকমের গুজব ছড়াত—দলীয় নেতা, উপনেতা ও কর্মীদের মধ্যে। সেদিন তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামই যে ব্যর্থ হয়ে যেত, সে কথা জোর করেই বলা যায়। পাকিস্তানি এজেন্টদের চেয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্টরা আমাদের বেশি উত্পাত করেছিল। তারা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিল এবং আমাদের অগ্রগতি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ করত।

সূত্র: দৈনিক পূর্বদেশ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২। সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাত্কার।

সংক্ষেপিত

বিজ্ঞাপন