বিজ্ঞাপন
default-image

প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর নিজস্ব ভবনে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। নতুন ঠিকানা এফ-১১/এ-বি, সিভিক সেক্টর, আগারগাঁও, ঢাকা। শুধু নতুন ভবনই নয়, এটির পরিসরও বাড়ছে। যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নিদর্শন।

জনসাধারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের দেওয়া তহবিলে জাদুঘরের নয়তলা ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। গ্যালারিগুলোতে সংগৃহীত নিদর্শন সাজানো হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এর দ্বারোদ্‌ঘাটন করবেন। তিনিই ২০১১ সালের ৪ মে ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নির্মাণকাজের সূচনা করেছিলেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। ৫ সেগুনবাগিচার ছোট্ট দোতলা বাড়িটিতে দিন দিন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানো, মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহসহ বহুমুখী কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ফলে এর একটি সুপরিসর নিজস্ব ভবনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছিল।

ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর জাদুঘর ভবনটি আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতালের উল্টো দিকে। ছাদের ওপর আর সামনের দেয়াল থেকে কামান-বন্দুকের নলের মতো নানা আকারের কংক্রিটের নল বেরিয়ে এসেছে। কাছে গেলে দেয়ালেও কিছু কিছু ক্ষতচিহ্ন দেখা যাবে। স্থপতি তানজিম হাসান জানান, ভবনটির কাছে গেলেই যুদ্ধের ক্ষতের একটি আবহ তৈরি হবে দর্শনার্থীর মনে।

প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত এই ভবনের ব্যবহারযোগ্য আয়তনের পরিমাণ ১ লাখ ৮৫ হাজার বর্গফুট।

জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন তারিক আলী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, নতুন ভবনে চারটি গ্যালারি রয়েছে। জাদুঘর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান গ্যালারিতে নিদর্শন উপস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। গ্যালারিগুলো ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায়। প্রথম গ্যালারিতে থাকবে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কালপর্বে এই জনপদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রত্ননিদর্শন।

দ্বিতীয় গ্যালারি সাজানো হবে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ঘটনা থেকে
১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী সরকার গঠন পর্ব পর্যন্ত। এই গ্যালারিতে শব্দ ও আলোর প্রক্ষেপণের একটি বিশেষ প্রদর্শনী থাকবে। এতে ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বর্বরতা তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণা, ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ার যুদ্ধ এবং সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শন থাকবে এই গ্যালারিতে। আর থাকবে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া বাঙালিদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে যাত্রা, সেখানে আশ্রয়, জীবনযাপনের ঘটনাবলি।

চতুর্থ গ্যালারিতে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালির প্রতিরোধ গড়ে তোলার নিদর্শন থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গণমানুষের দুরবস্থা, যৌথ বাহিনীর অভিযান, বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঢাকায় পাকিস্তানি দখলদারদের আত্মসমর্পণ—এই ক্রমানুসারে সাজানো হবে শেষ গ্যালারিটি।

বাছাই করা নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনা উঠে আসে। বাকিগুলো সংরক্ষিত থাকবে জাদুঘরের আর্কাইভে। সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন তারিক আলী বললেন, গবেষকেরা আর্কাইভের এসব নিদর্শন তাঁদের গবেষণাকাজে ব্যবহার করতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ে একটি গবেষণাকেন্দ্র এখানে গড়ে তোলা হবে। ভবনটির ভূগর্ভে রয়েছে তিনটি তলা। ওপরের ছয়টি তলায় অফিস মিলনায়তন, পাঠাগার, গবেষণাকেন্দ্র, ক্যানটিন, প্রদর্শনী কক্ষ—এসব থাকবে। শিখা অনির্বাণ থাকবে প্রথম তলায়।

সূত্র: ৩ এপ্রিল ২০১৭, ২০ চৈত্র ১৪২৩, সোমবার, প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।