default-image

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চিকিৎসাবিষয়ক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সাম্প্রতিক একটি বিশেষ কৌতূহলোদ্দীপক উন্মোচনের কথা আমরা এই সুবর্ণজয়ন্তীতে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। প্রসঙ্গটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা হত্যাসংক্রান্ত। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে যুদ্ধের প্রথম প্রহরে তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতাসহ আরও অনেকের স্মৃতিচারণামূলক লেখার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই আলোচিত। কিন্তু সেটি একটি বীভৎস ঘটনাক্রমের প্রথম পর্ব মাত্র। আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই ঘটনাক্রমের পরবর্তী পর্বের অজানা কিছু তথ্যপ্রমাণ। সে তথ্য উন্মোচনের পাশাপাশি আমরা এ-সংক্রান্ত একটি জরুরি প্রস্তাব রাখতে চাই।

আমরা জানি, ২৫ মার্চের প্রথম প্রহরে অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ৩৪ /এ নম্বর কোয়ার্টার থেকে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মুনীরুজ্জামানকে বের করে এনে কোয়ার্টারের সামনেই গুলি করে। মুনীরুজ্জামান ঘটনাস্থলেই নিহত হন কিন্তু জ্যোতির্ময় মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। পাকিস্তানি সেনারা চলে গেলে রক্তস্নাত অধ্যাপক জ্যোতির্ময়কে টেনে ঘরে নিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতা, মেয়ে স্কুলছাত্রী মেঘনা আর বাড়ির কাজের মেয়ে স্বর্ণা।

বাইরে তখন প্রচণ্ড গোলাগুলি, কারফিউ। এই তিন নারী রক্তক্ষরণ হতে থাকা মুমূর্ষু মানুষটিকে একটি পুরো রাত এবং পরের পুরোটা দিন আপ্রাণ চেষ্টায় ঘরের ভেতর রেখে শুশ্রূষা দিতে থাকেন। ঢাকা মেডিকেল তাঁদের বাড়ি থেকে দূরে নয়, কিন্তু সেখানে যাওয়া তখন অসম্ভব। ২৭ তারিখ ভোরে কারফিউ কিছুক্ষণের জন্য শিথিল হলে মরিয়া হয়ে অচেনা এক পথচারী নারীকে ডেকে একটা চিরকুট লিখে বাসন্তী গুহঠাকুরতা অনুরোধ করেন ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে পৌঁছে দিতে। চিরকুট পেয়ে হাসপাতালের কর্মীরা স্ট্রেচারে করে নিয়ে যান অধ্যাপক জ্যোতির্ময়কে। সেই ভবনের অন্য শিক্ষকেরা তাঁদের পরিবার নিয়ে তখন যে যাঁর মতো পালাচ্ছেন। মেঘনা আর স্বর্ণাকে নিয়ে বাসন্তী গুহঠাকুরতা চলে গেলেন ঢাকা মেডিকেলে।

বিজ্ঞাপন

সেদিন দুপুরে অধ্যাপক জ্যোতির্ময়কে ইমার্জেন্সি থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো সার্জারি বিভাগের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর বেডে। তিনি ভর্তি হলেন ডা. মতিউর রহমানের অধীনে এবং ডা. আলী আশরাফের ইউনিটে। প্রায় পাঁচ দশক পর ২০১৯ সালে আমরা যখন অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমানের সঙ্গে কথা বলি, তিনি স্পষ্ট স্মরণ করতে পারেন সেদিনের জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে। তিনি বলেন, মেরুদণ্ডে গুলি লাগায় জ্যোতির্ময়ের তখন প্যারাপ্লেজিয়া হয়ে গিয়েছিল। হাত-পা সবই ছিল অবশ। ছিল সেপটিসেমিয়া, অর্থাৎ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল রক্তে আর দুদিন ধরে রক্তক্ষরণে তাঁর শরীরের অবস্থা ছিল সঙিন। ২৮ মার্চ জ্যোতির্ময়কে বন্ধু ডা. টি হোসেন তাঁর প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তা আর সম্ভব হয়নি। ২৯ তারিখ থেকে জ্যোতির্ময়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৩০ মার্চ সকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

default-image

জটিলতা শুরু হয় তাঁর লাশ স্থানান্তর নিয়ে। ডা. টি হোসেন ঢাকা মেডিকেলে অ্যাম্বুলেন্স পাঠান লাশ নিতে। কিন্তু এ ধরনের গুলি ও অপঘাতের মৃত্যু হাসপাতালে ‘পুলিশ কেস’ হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকে এবং সে ক্ষেত্রে লাশ নিতে স্থানীয় থানার অথবা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন লাগে। ঢাকা মেডিকেল তখন রমনা থানার অধীনে। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী রমনা থানায়ও হত্যাযজ্ঞ চালানোয় থানা তখন অকার্যকর। তা ছাড়া কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগেরও তখন পরিস্থিতি নেই। হাসপাতালে তখন টহলে আছে পাকিস্তানি সেনা। যথাযথ নিয়ম না মেনে লাশ বাইরে নেওয়া দুরূহ। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃতদেহ পড়ে থাকে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায়। ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। গুমোট আর বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখে বাসন্তী গুহঠাকুরতা চলে আসেন হাসপাতাল থেকে।

পরবর্তী সময়ে জ্যোতির্ময়ের সন্ত্রস্ত পরিবার তাদের ড্রাইভার গোপালকে পাঠায় লাশ নেওয়ার জন্য। পরপর দুই দিন গিয়েও লাশ হাসপাতাল থেকে ছাড়াতে পারেননি গোপাল। ৫ এপ্রিল হাসপাতালে গিয়ে গোপাল জানতে পারেন ড. জ্যোতির্ময়ের লাশ হাসপাতালে নেই। লাশ কোথায় নেওয়া হয়েছে, সেটি কেউ বলতে পারে না। গোপালকে ভবিষ্যতে হাসপাতালে যেতেও বারণ করা হয়।

default-image

আমরা গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকা মেডিকেলের ৫০ বছরের পুরোনো ১৯৭১ সালের ডেথ রেজিস্টার অনুসন্ধান করি এবং তাতে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য পাই। আমরা দেখতে পাই, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের একটি নির্দিষ্ট সময় পরে দাগ টেনে সেই রেজিস্টার খাতায় আর কোনো মৃত্যু লিপিবদ্ধ করা হয়নি। কাকতালীয়ভাবে নতুন করে আবার ডেথ রেজিস্টার লেখা শুরু হয় ৩০ মার্চ থেকেই, যেদিন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মারা গেছেন। সে তারিখে আরও মৃত্যুর ভিড়ে আবিষ্কার করি অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার নাম। আমার দেখতে পাই, তাঁর ভর্তি নিবন্ধন নম্বর ১৪৪৪ / ১২। মৃত্যুর সময় উল্লেখ আছে ৩০ মার্চ, সকাল ৯টা ৩০ মিনিট। লাশ কে নিয়েছে, এ প্রশ্নের কলামে দেখতে পাই, ‘পুলিশ’, নিচে একটি লাল দাগ দেওয়া। জ্যোতির্ময়ের লাশ তাঁর পরিবার হাতে পায়নি। লাশ কোথায় নেওয়া হয়েছে, আদৌ কোনো সৎকার হয়েছে কি না, তা কোনো দিন আর জানতে পারেনি পরিবার।

এরপর সেই যুদ্ধের দিনে বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবনে শুরু হয় আরেক ব্যক্তিগত যুদ্ধ। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুর পর নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে বাসন্তী গুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাঁর নিজের বাড়িতে ফিরে যাননি। প্রতিবেশীর কাছে পরিচয় গোপন রেখে কখনো শুভানুধ্যায়ীদের বাড়িতে, কখনো রোগী সেজে বিভিন্ন হাসপাতালে উদ্বাস্তুর মতো থেকেছেন। আবার সেই ঘোর বিপদের দিনেই তাঁর ফেলে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকা বাড়ি থেকে চুরি হয় মূল্যবান সামগ্রী। একপর্যায়ে অর্থকষ্টে পড়ে যান বাসন্তী গুহঠাকুরতা। এ সময় তিনি তাঁর স্বামী জ্যোতির্ময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষকের কাছে আবেদন করেন।

default-image

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ-সংক্রান্ত নথি নিরীক্ষা করে এক নাটকীয় পাকচক্রের সন্ধান পাই। সেই নথিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাসন্তী গুহঠাকুরতাকে জানাচ্ছে, মৃত্যু-পরবর্তী আর্থিক সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য তাঁকে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুসনদ জমা দিতে হবে। কিন্তু ইতিমধ্যে মৃত্যুসনদ ছাড়াই জ্যোতির্ময়ের লাশ ঢাকা মেডিকেল থেকে উধাও হয়ে গেছে। তিনি যে মারা গেছেন, তার কোনো প্রমাণ পরিবারের হাতে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নথি থেকে আরও দেখতে পাই, অর্থ জোগাড়ের বিকল্প পথ হিসেবে বাসন্তী গুহঠাকুরতা ১৯৭১ সালের ২৪ মে জ্যোতির্ময়ের ফেডারেল ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে করা একটি জীবনবিমার টাকা পরিশোধের আবেদন করেছেন। কিন্তু সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ৩০ জুন লিখিতভাবে বাসন্তীকে জানায়, সেই বিমাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামানত হিসেবে রক্ষিত আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দিলেই কেবল তাঁকে বিমার টাকা পরিশোধ করা হবে।

ঘোর চক্করে পড়ে যান বাসন্তী গুহঠাকুরতা। নথি থেকে আমরা জানতে পারি, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা পিএইচডি করতে বিদেশে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আট হাজার টাকা শিক্ষাঋণ নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই ঋণের বিপরীতে জ্যোতির্ময়ের ১৫ হাজার টাকার জীবনবিমা জামানত হিসেবে রেখে দিয়েছিল। আমরা লক্ষ করি, বাসন্তী গুহঠাকুরতা ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে সেই জামানতের ছাড়পত্রের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন করছেন। অবশেষে দেখতে পাই, ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট একটি চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিখছে, জ্যোতির্ময়ের ছাড়পত্র তারা দিতে পারছে না। কারণ, তাঁর কাছে তাদের কিছু পাওনা আছে। কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, তারা হিসাব কষে দেখেছে, শিক্ষাবৃত্তি ঋণের আসল বাবদ ২,১৫৫. ৩০ টাকা এবং সুদ বাবদ ১,৭১০. ৬০ টাকা, অর্থাৎ সর্বমোট ৩,৮৬৫. ৯০ টাকা জ্যোতির্ময়ের পক্ষ থেকে অনাদায়ি রয়ে গেছে। জ্যোতির্ময়ের পক্ষ থেকে সে টাকা ফেরত দিলেই কেবল বিমার টাকার ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

default-image

সুদ পরিশোধের এই আমলাতান্ত্রিকতা চলতে থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। ইতিমধ্যে বাসন্তী গুহঠাকুরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করা টাকার সমপরিমাণ চেক জমা দেন কর্তৃপক্ষের কাছে। নথি বলছে, অবশেষে ওই বছরের ৩০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ সুদ নিয়ে বিমাটির স্বত্ব হস্তান্তর করে বাসন্তী গুহঠাকুরতার হাতে।

কিন্তু নাটক তখনো শেষ হয়নি। আমরা দেখতে পাই, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বাসন্তী গুহঠাকুরতাকে জানিয়েছে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়পত্রে হবে না, টাকা পেতে হলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিতকরণের একটি ফরমও পূরণ করতে হবে। সেটি করতে হবে একজন চিকিৎসককে, দ্বিতীয় আরেকজন চিকিৎসককে সাক্ষী রেখে। বাসন্তী গুহঠাকুরতা জ্যোতির্ময়ের মৃত্যুসনদ উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু থানা-পুলিশসহ নানা জটিলতায় ঢাকা মেডিকেল থেকে মৃত্যুসনদ পাওয়াটি অনিশ্চিতই থেকে যায়। তবে আনুষ্ঠানিক মৃত্যুসনদ প্রস্তুত না হলেও বিমার ফরমে তাঁর মৃত্যুসংক্রান্ত স্বাক্ষর করতে রাজি হন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক আলী আশরাফ এবং ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ডা. এম এ আবদুল মজিদ।

বিজ্ঞাপন

পুরোনো দলিলে আমরা তাঁদের দুজনের স্বাক্ষর করা মৃত্যুসংক্রান্ত ফরমটিও উদ্ধার করি। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে এই দুজন চিকিৎসক জ্যোতির্ময়ের মৃত্যুবিষয়ক ফরমে সই করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন নিঃসন্দেহে। তবে আমরা লক্ষ করি, তাঁর মৃত্যুবিষয়ক তথ্যে এক কৌতূহলোদ্দীপক ধাঁধা আছে। দেখতে পাই, জ্যোতির্ময়ের মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি’। এটি সত্য, আবার সত্য নয়। কারণ, ‘বুলেট ইনজুরি’ কথাটির উল্লেখ না থাকায় এটি যে নিরীহ কোনো আঘাত নয়, এর পেছনে যে রয়েছে ভয়ংকর এক নির্মমতা, সেটি বোঝার কোনো উপায় নেই। পাকিস্তানি সেনা পরিবেষ্টিত সেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে এমন একটা দ্ব্যর্থবোধক কারণ উল্লেখ করে বিমার অর্থ পাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দেওয়াটাই হয়তো তখন সবচেয়ে সমীচীন পথ মনে করেছেন তাঁরা। বাসন্তী গুহঠাকুরতাও তাঁর স্মৃতিচারণায় মৃত্যুর কারণ হিসেবে এই ‘বুলেট’ শব্দের অনুপস্থিতিতে বিস্মিত হয়েছেন। যদিও তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছিল “নিউমোনিয়া”।’ তার কোনো দালিলিক প্রমাণ অবশ্য আমরা পাইনি।

default-image

যাহোক, মৃত্যুর এই প্রত্যয়নে বিমার অর্থ পাওয়ার জটিলতা মিটলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক পাওনা আদায়ের আমলাতান্ত্রিকতা তখনো মেটেনি। নথিপত্রে আমরা দেখতে পাই, বাসন্তী গুহঠাকুরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ছাড়ের জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবিধ চিঠি-চালাচালি করছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে মৃত্যুসনদ এবং নানা জটিল দেনা-পাওনার পাকচক্রে ঘোরাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান জানাচ্ছেন, জ্যোতির্ময়ের কাছে ২০৫ টাকা মূল্যমানের চারটি বই পাওনা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ার জানাচ্ছেন, জ্যোতির্ময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাটে বেশ কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি, যার আনুমানিক মূল্য ৭৪৮ টাকা। হিসাবরক্ষণ বিভাগ জানাচ্ছে, জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট হিসেবে জ্যোতির্ময় ছাত্রদের কশনমানির যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতেন, সেখানেও কিছু টাকার হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। ছাড়পত্রের আগে কর্তৃপক্ষ বাসন্তী গুহঠাকুরতার কাছ থেকে এসব বিষয়ে সদুত্তর চায়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এসব চিঠি-চালাচালি হচ্ছে ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে। যুদ্ধের সময়জুড়েই এই চিঠি-চালাচালি চলে, কিন্তু অর্থ ছাড় তিনি পাননি।

অবশেষে অর্থ ছাড়ের নথিতে চূড়ান্ত অনুমোদন আসে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ আগস্টে, তৎকালীন উপাচার্য মোজাফফর হোসেন চৌধুরীর স্বাক্ষরে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে নিহত বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুকেন্দ্রিক ঐতিহাসিক একটি ক্ষতকে উন্মোচন করতে আমাদের অনুসন্ধান। আমরা আবিষ্কার করি, হাসপাতালে মৃত্যু হলেও তাঁর পরিবার জ্যোতির্ময়ের মৃতদেহটি পায়নি, পায়নি একটি যথার্থ মৃত্যুসনদ এবং আরও দেখি, তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাপ্য অর্থ প্রদানে জ্যোতির্ময়ের পরিবারকে যুদ্ধের পুরো সময়টিতে অপদস্থ করেছে আমলাতান্ত্রিকভাবে। আমরা মনে করি, স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক লজ্জা মোচনের সুযোগ আছে সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের। লেখার শুরুতে যে প্রস্তাবটির কথা বলেছি, সেটি উল্লেখ করতে চাই এবার।

আমরা প্রস্তাব করি, এই সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুর সঠিক কারণটি উল্লেখ করে একটি প্রতীকী মৃত্যুসনদ ইস্যু করুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের শতবর্ষপূর্তির এই বছরে যুদ্ধকালীন দুর্দিনে জ্যোতির্ময়ের পরিবারের কাছ থেকে যে সুদের টাকাটি আদায় করেছিল, সেটি প্রতীকীভাবে ফিরিয়ে দিক এবং আমলাতান্ত্রিক নির্যাতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করুক।
ঢাকা মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি ব্যতিক্রমী যৌথ অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার পরিবারের সদস্যের কাছে ইতিহাসের এই ঋণ শোধ করার সুবর্ণ সুযোগ নিতে পারে এই ঐতিহাসিক বছরে।

শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক ও জনস্বাস্থ্যবিদ।
খায়রুল ইসলাম: ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক।