default-image

নাট্যকার, অভিনয়শিল্পী ও সৎসঙ্গ পত্রিকার সহসম্পাদক প্যারী মোহন আদিত্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন এবং সহায়তা করতেন নানাভাবে। এ খবর গোপন থাকেনি। স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জেনে যায়। তারা টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে সৎসঙ্গ আশ্রমে অভিযান চালিয়ে হত্যা করে তাঁকে।

বিজ্ঞাপন

শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৫ জুন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া গ্রামে। বাবার নাম মুকন্দ মোহন আদিত্য, মা মহামায়া আদিত্য। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই নাটক, যাত্রাপালা লেখা এবং অভিনয়ে জড়িয়ে পড়েন। এলাকার সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি মুখ্য ভূমিকায় থাকতেন। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। সৎসঙ্গের মুখপত্র ত্রৈমাসিক সৎসঙ্গ সংবাদ (বর্তমানে মাসিক) পত্রিকার সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া সাহিত্যবিষয়ক লেখালেখি ও জনকল্যাণমূলক কাজেও যুক্ত থাকতেন। সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের পর তিনি সহযোগীদের নিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

একাত্তরের ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহে যাওয়ার সময় পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে প্রবেশ করে। তাদের ছোড়া শেলের আঘাতে আশ্রম মন্দিরের চূড়া ভেঙে যায়। হানাদারদের আসার খবর পেয়ে সবাই নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। তাই সেবার প্রাণে রক্ষা পান সবাই। পাকুটিয়া আশ্রমে প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ছিল প্যারী মোহনের যোগাযোগ। তিনি গোপনে তাঁদের আশ্রয়, খাদ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা করতেন।

একাত্তরের ৮ আগস্ট বেলা তিনটার দিকে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের একটি দল দ্বিতীয় দফা হামলা চালায় পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে। গুলি চালাতে চালাতে তারা সেখানে প্রবেশ করে। প্যারী মোহনের পেটে গুলি লাগে, তিনি লুটিয়ে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে চেয়ে আহত প্যারী মোহনকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে শুরু করে পাকিস্তানি হানাদাররা। বেয়নেটের আঘাতে সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত হলেও তিনি মুখ খোলেননি। নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেদিন শুধু প্যারী মোহন নন, ওই আশ্রমে অবস্থানরত ব্যামাচরণ শর্মা নামের আরেক নিরীহ বাঙালিকেও হত্যা করে ঘাতকেরা।

আশ্রমে হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানি বাহিনী আশপাশের বাড়িঘরে লুটপাট করে। আতঙ্কে মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যায়। প্যারী মোহনের মরদেহ তিন দিন পড়ে ছিল আশ্রমে। পরে স্থানীয় কয়েকজন গোপনে এসে তাঁর শেষকৃত্য করেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি ১৯৭১–এর পুনর্বিন্যাসকৃত চতুর্থ খণ্ডে প্যারী মোহন আদিত্য সম্পর্কে লিখেছেন তাঁর ছেলে নট কিশোর আদিত্য। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের গবেষক শফিউদ্দিন তালুকদারের একাত্তরের গণহত্যা-যমুনার পর্ব ও পশ্চিম তীর, জুলফিকার হায়দারের ঘাটাইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং টাঙ্গাইলের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থে প্যারী মোহন আদিত্যের জীবনীতে শহীদ হওয়ার বিবরণ রয়েছে। প্যারী মোহন আদিত্যের স্মরণে পাকুটিয়া সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাকুটিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সৎসঙ্গ আশ্রম পর্যন্ত সড়কটি ‘শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য সড়ক’ নামকরণ হয়েছে।

গ্রন্থনা: কামনাশীষ শেখর, টাঙ্গাইল