ভোরে গুপ্তচরের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা খবর পান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল হিজলী হয়ে আন্দলিয়া যাবে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওই দলকে অ্যামবুশ করার জন্য দ্রুত প্রস্তুত হলেন মুক্তিবাহিনীর ২৭ জন যোদ্ধা। তাঁরা মোট তিনটি দলে বিভক্ত। প্রতি দলে নয়জন করে সদস্য। একটি দলের নেতৃত্বে মোক্তার আলীর। অন্য দুই দলের নেতৃত্বে যথাক্রমে আসাদ আলী (বীর প্রতীক) ও জাকির। তাঁদের সবার নেতৃত্বে লেফটেন্যান্ট অলিক কুমারগুপ্ত (বীর প্রতীক)। হিজলী গ্রামের এক জায়গায় জমির আইলে এসে তাঁরা অবস্থান নিলেন। মোক্তার আলীর দল সবার মাঝখানে। ডানে ১০০ গজ দূরে আসাদ আলীর দল, বাঁয়ে জাকিরের দল। এরপর অপেক্ষা।
সূর্য তখন মাথার ওপর। এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের বড়সড় একটি দল চলে এল মোক্তার আলী ও আসাদ আলীর দলের কাছাকাছি। গুলির আওতায় আসামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা একযোগে গুলি করতে শুরু করলেন। লুটিয়ে পড়ল কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। বেঁচে যাওয়া হতভম্ব বাকি সেনারা দ্রুত পজিশন নিয়ে শুরু করল পাল্টা আক্রমণ। এরপর চলতে থাকল যুদ্ধ। মোক্তার আলী দেখলেন, আসাদ আলীর দলের একজন ছাড়া বাকি সবাই কোনো কিছু না বলে পিছে হটে গেছেন। পাকিস্তানি সেনারা ততক্ষণে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে এবং প্রচণ্ড পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকাতে পারছেন না। এখন পিছু হটে যাওয়া ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। তিনি আসাদ আলীর দলের ওই মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পেছাতে থাকেন। গুলির আওতার বাইরে এসে মাথা নিচু করে তাঁরা দৌড়াতে থাকেন। পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ধাওয়া করে। মোক্তার আলী একটু পেছনে পড়ে যান। পথে ছিল এক আমবাগান। দৌড়াতে গিয়ে সেই আমবাগানের একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যান তিনি।
পাকিস্তানি সেনারা তখন একদম কাছে। আমবাগানের শেষে একটা জলাধার। মোক্তার আলী উঠে আবার দৌড়াতে থাকেন। পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া বুলেট ছুটে যাচ্ছিল তাঁর ডান ও বাঁ দিক দিয়ে। জলাধারের ভেতর দিয়ে বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারলেন না। পড়ে গেলেন পানিতে। পাকিস্তানি সেনারা মনে করল, গুলি লেগেছে। তারা জলাধারে না নেমে ফিরে যেতে থাকল। একটু পর মোক্তার আলী জলাধার থেকে উঠে মিলিত হন নিজের দলের সঙ্গে। সহযোদ্ধাদের সংগঠিত করে তিনি আবারও পিছু নেন পাকিস্তানি সেনাদের। অ্যামবুশ স্থানের কাছাকাছি গিয়ে দেখেন, পাকিস্তানি সেনারা হতাহত সেনাদের লাশ সরাতে ব্যস্ত। এ সময় শুরু হয় ভারত থেকে আর্টিলারি গোলাবর্ষণ। আর্টিলারি সাপোর্ট পেয়ে তাঁরা আবার পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করেন। একদিকে তাঁদের আক্রমণ, অন্যদিকে আর্টিলারি গোলাবর্ষণ। পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর তারা নিহত সেনাদের লাশ ফেলেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
হিজলী যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার অন্তর্গত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এর অবস্থান। ৩ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্যাট্রোল দলকে অ্যামবুশ করে। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের একজন আহত হন।
শেখ মোক্তার আলী চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন যশোর ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারের অধীনে। তিনি প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন, পরে ভারতে সংগঠিত হওয়ার পর যুদ্ধ করেন ৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরে। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ছুটিপুর ও গরীবপুরের যুদ্ধ। গরীবপুরের সম্মুখযুদ্ধে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে তাঁদের সবার কাছে অস্ত্র ও গুলি থাকলেও অস্ত্রে গুলি ভরার সময় ছিল না। তখন বেয়নেট চার্জ করা হতে থাকে। অনেকের বেয়নেট ভেঙে যায়। এরপর রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটাপিটি করতে থাকেন। শেষে শুরু হয় দুই পক্ষের হাতাহাতি। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা জয়ী হন।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান