আবুল হোসেন ১৯৭১ সালে যশোর ইপিআর সেক্টরের অধীন যাদবপুর ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। ২৭ মার্চ সকালে তাঁদের ক্যাম্পে সহকারী উইং কমান্ডার অবাঙালি ক্যাপ্টেন সাদেক পরিদর্শনে আসেন। এ সময় আবুল হোসেন কৌশলে চুয়াডাঙ্গা ইপিআর উইংয়ে যোগাযোগ করে করণীয় সম্পর্কে জানতে চান। সেখান থেকে নির্দেশ আসে, ক্যাপ্টেন সাদেককে অস্ত্রমুক্ত করা হোক। এর মধ্যে কয়েকজন বাঙালি ইপিআর সদস্য অস্ত্র হাতে ক্যাপ্টেন সাদেককে ঘেরাও করেন। সাদেকের সঙ্গে ছিল কয়েকজন অবাঙালি ইপিআর গার্ড। উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে ক্যাপ্টেন সাদেক তাঁর দলবলসহ নিহত হন।
এ ঘটনার মধ্য দিয়েই আবুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এপ্রিলের শেষে (২৪ বা ২৬) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরাট একটি বহর তাঁদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে আক্রমণ করে। তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাঁদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। এই যুদ্ধে আবুল হোসেনের ডান পায়ে গুলি লাগে। ভারতে চিকিত্সা নিয়ে তিনি আবার যুদ্ধে যোগ দেন। ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন বয়রা সাব-সেক্টরে সম্মুখ ও গেরিলাযুদ্ধ করেন। জুন মাসের এক দিন তাঁদের কাছে খবর আসে, কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ছুটিপুর এসেছে। তারা বাঙালিদের মারধর করছে এবং জোর করে টাকাপয়সা নিচ্ছে। তিনি পাঁচজন সহযোদ্ধা নিয়ে গেরিলা কায়দায় অতর্কিতে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করেন। তাতে দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। একটি গাড়ি, পাঁচটি অস্ত্রসহ একজনকে তাঁরা জীবিত আটক করেন।
পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তাঁদের একটা বড় যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে তিনিই নেতৃত্ব দেন। ঘটনাটা ঘটেছিল আগস্ট মাসে। এক দিন বয়রা ক্যাম্পে তাঁরা যুদ্ধকৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন। খবর আসে, কাশিপুরে পাকিস্তানি সেনারা ঢুকে পড়েছে। আবুল হোসেনের ওপর দায়িত্ব পড়ে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করার। তিনি আরব আলী (বীর বিক্রম), মোস্তফা কামালসহ (বীর প্রতীক) আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কাশিপুরের বেলতায় অ্যামবুুশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা আওতার মধ্যে আসামাত্র তাঁদের অস্ত্রগুলো একসঙ্গে গর্জে ওঠে। দুজন পাকিস্তানি সেনা সঙ্গে সঙ্গে নিহত হয়। পাকিস্তানি সেনা ছিল ৩০-৩৫ জন। তারাও পাল্টা আক্রমণ করে। আবুল হোসেন ও তাঁর সঙ্গীরা কিছুটা বেকায়দায় পড়েন। তবে আরও কয়েকজন সহযোদ্ধা এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলে পাকিস্তানি সেনারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং পালিয়ে যায়। একজন পাকিস্তানি সেনাকে তাঁরা আটক করতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধে তাঁর সহযোদ্ধা আরব আলীর হাতে গুলি লাগে। আবুল হোসেন আরও কয়েক স্থানে যুদ্ধ করেন। এর মধ্যে একটি হলো গোয়ালহাটি-ছুটিপুরের যুদ্ধ।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান