রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছোট এক ক্যাম্পে অতর্কিতে আক্রমণ চালালেন আবুল হাসেমসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা। প্রচণ্ড আক্রমণে একসময় পাকিস্তানি সেনারা অনেক গোলাবারুদ ও বেশ কিছু অস্ত্র ফেলে রাতের অন্ধকারে পালাতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করলেন। কিন্তু বেশিদূর গেলেন না। কারণ, সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁরা বেশ ভেতরে চলে এসেছেন। তা ছাড়া সামনে আছে শত্রুদের মূল ঘাঁটি। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁরা পারবেন না। তাই পেছন ফিরে দ্রুত যেতে থাকলেন সীমান্তের দিকে। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ২৮ জুলাইয়ের। ঘটেছিল চাওই নদের তীরে।
চাওই নদ পঞ্চগড় জেলার সীমান্তে। জেলার উত্তর-দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত। এই এলাকার সীমান্তসংলগ্ন স্থানগুলো মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে অনেক দিন মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। জুনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত এলাকায় অবস্থান করে রেইড ও অ্যামবুশের মতো তত্পরতা চালান। জুলাই থেকে ওই এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তত্পরতা বেড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের মাঝামাঝি এক দিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন প্রধানপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া ও নুনিয়াপাড়া গ্রামে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একযোগে আক্রমণ শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে বাধ্য হন। তিনটি গ্রামে তাঁরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও (১২০ জন) একই কোম্পানিভুক্ত ছিলেন। একটি দলে ছিলেন আবুল হাসেম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে সেদিন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও আহত হন।
এ ঘটনায় আবুল হাসেম হতাশ হননি বা ভেঙে পড়েননি। তিনি তাঁর দল নিয়ে পেছনে এক জায়গায় সমবেত হন। কয়েক দিন পর মুক্তিযোদ্ধারা নদীর পূর্ব পারের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। এ আক্রমণে আবুল হাসেমও অংশ নেন। তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন হতাহত হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে অগ্রবর্তী ঘাঁটির পাকিস্তানি সেনারা হতাহত সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যায়।
আবুল হাসেম চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন ঠাকুরগাঁও উইংয়ে। তখন তাঁর পদবি ছিল হাবিলদার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত বিওপি থেকে এসে যুদ্ধে যোগ দেন। তিনি যুদ্ধ করেন ৬ নম্বর সেক্টরের ভজনপুর সাব-সেক্টরের অধীনে।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান