default-image

খুব ভোরে গোলাগুলির শব্দ কানের পর্দায় আছড়ে পড়তেই সতর্ক হয়ে উঠলেন মো. আবদুল মতিন। দ্রুত তৈরি হয়ে একজন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান দেখতে। শেষে গেলেন মেশিনগান পোস্টে। তাঁকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে সেখানে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। সাহসের সঙ্গে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ মোকাবিলা করে চললেন। যুদ্ধ চলল সারা দিন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি এ ঘটনা ঘটেছিল মাস্তাননগরে প্রতিরোধযুদ্ধের সময়।

চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথে মাস্তাননগর। এখানে সংঘটিত এই যুদ্ধের বিবরণ ধরা আছে মো. আবদুুল মতিনের নিজের লেখাতেই। তিনি লিখেছেন, ‘...আমাকে পাঠানো হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল-সড়ক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। আমরা প্রথমে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিই কুমিল্লা আর ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের মাঝামাঝি জায়গায়।

‘আমরা প্রথম ডিফেন্স চার দিন ধরে রাখতে পেরেছিলাম। তারপর পিছিয়ে সীতাকুণ্ডে পরবর্তী ডিফেন্স নিই। সীতাকুণ্ডে সপ্তাহ খানেক ছিলাম। সীতাকুণ্ডের পর মাস্তাননগরে ডিফেন্স গ্রহণ করি। এটাই আমার জীবনের স্মরণীয় ডিফেন্স। সেখানে সাত দিন ছিলাম। শেষ দিন সূর্য ওঠার আগে খুব ভোরবেলায় গোলাগুলির শব্দ পেয়ে হাবিলদার নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমাদের মেশিনগান পোস্টে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

‘আমি যাওয়ার পর গোলাগুলির প্রচণ্ডতা বেড়ে যায়। সারা দিন চলার পর সন্ধ্যার দিকে ট্রেঞ্চে বসে মনে হলো আমাদের পেছনেও গোলাগুলি হচ্ছে। আমার ডান-বামে আমাদের অবস্থান ঠিক আছে কি না জানার জন্য একজন সৈনিককে ডান দিকে পাঠালাম। সে ফিরে এসে জানাল, ডান দিকে আমাদের অবস্থানে পাকিস্তানি সেনারা এসে গেছে। বাম দিক থেকেও একই খবর পেলাম।

‘উদ্বেগে সিগারেট ধরিয়েছি, এ সময় ট্যাংকের গোলা এসে আমাদের বাংকারের ছাদ উড়িয়ে নিয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম, মৃত্যু নিশ্চিত। আবু শামার (সুবেদার, মেশিনগান পোস্টের চার্জে ছিলেন) মতো সাহসী সৈনিক আর দেখিনি। সে বলল, “স্যার, আমি বেঁচে থাকতে আপনার কিছু হবে না, ইনশাআল্লাহ।” আমার কাছে অস্ত্র ছিল না। শামা আমাকে একটা পিস্তল দিল। যেন ধরা পড়লে আত্মহত্যা করতে পারি।’

মো. আবদুল মতিন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তখন তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। তিনি কোম্পানি (ব্রাভো) কমান্ডার ছিলেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে ২ নম্বর সেক্টরে স্টাফ অফিসার হিসেবে কাজ করেন।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন