বিজ্ঞাপন
default-image

যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার বর্নি বিওপি। সেখানে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত একটি ঘাঁটি। ছিল প্রায় ৭৫ জন পাকিস্তানি সেনা। ওই ঘাঁটির কারণে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে সহজে অপারেশন করতে পারছিলেন না। আগস্টের প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা সিদ্ধান্ত নিলেন সেখানে আক্রমণের। ৫ আগস্ট দুই কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা তাঁর নেতৃত্বে আক্রমণ চালান। তাঁর পণ, পাকিস্তানি সেনাদের সেখান থেকে তাড়াবেনই। শেষ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ১৫ জনের লাশ ফেলে পালিয়ে যায়।

যুদ্ধ জয়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। নাজমুল হুদা তা তদারক করছিলেন। হঠাত্ আরেক দল পাকিস্তানি সেনা পেছন থেকে এসে তাঁদের ওপর আক্রমণ করে। এর জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। মুহূর্তে হকচকিত অবস্থা কাটিয়ে উঠে তাঁরা আবার শুরু করেন আক্রমণ। খন্দকার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করতে থাকেন। তিনি নিজেও অস্ত্র হাতে সহযোদ্ধাদের পাশে থেকে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের আওতার মধ্যে পড়ে যান। তখন কয়েকজন সহযোদ্ধা তাঁকে পেছনে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন। সেদিন চারজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং কয়েকজন আহত হন।

খন্দকার নাজমুল হুদা ৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি শুধু অধিনায়কত্ব বা নির্দেশ দিতেন না, বেশির ভাগ সময় নিজেও প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিতেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বয়রা সাব-সেক্টরের অধীনে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসবের মধ্যে রঘুনাথপুর, যাদবপুর, বেলতা, গঙ্গানদ, বর্নি, চৌগাছা-মাসলিয়া ও চৌগাছার যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। ২০-২১ নভেম্বর চৌগাছার গরীবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এ ছাড়া তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী অসংখ্য অ্যামবুশ, ডিমোলিশনসহ আকস্মিক আক্রমনও চালায়।

খন্দকার নাজমুল হুদা চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি তথাকথিত আগরতলা মামলার অভিযুক্ত হিসেবে অনেকের সঙ্গে তাঁকেও আটক করা হয়। তিনি ছিলেন ২৭ নম্বর আসামি। তখন ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনি বেকসুর খালাস পান। কিন্তু তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি এতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তখন তাঁর পদবি ছিল কর্নেল।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান