default-image

ইউ কে চিং বয়সের কারণে অনেক কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না। তাঁর বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর। তিনি মারমা আদিবাসী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাঙালিদের সঙ্গে তিনিও তাতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে তিনি রংপুর ইপিআর উইংয়ের অধীন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর তিনি পাটগ্রাম এলাকায় অবস্থান নেন। পরে ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীসংলগ্ন চৌধুরীহাটের যুদ্ধের ঘটনা ইউ কে চিংয়ের প্রায়ই মনে পড়ে। ওই যুদ্ধের স্মৃতি তাঁকে বেশ পীড়া দেয়। সেখানে মুক্তিবাহিনীর লেফটেন্যান্ট সামাদসহ (আবু মঈন আশফাকুস সামাদ, বীর উত্তম) তাঁর আরও কয়েকজন সহযোদ্ধা শহীদ হন। তিনিও শহীদ বা আহত হতে পারতেন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

বিজ্ঞাপন

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জের অন্তর্গত চৌধুরীহাট সীমান্তবর্তী এলাকা। নভেম্বরের মাঝামাঝি একদল মুক্তিযোদ্ধা সেখানে অবস্থান নেন। তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিলেন। একটি দলে ছিলেন ইউ কে চিং। সেখানে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি শক্ত অবস্থান। রাতে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে আক্রমণ চালান। সারা রাত যুদ্ধ চলে। ভোরে পাকিস্তানি সেনাদের দিক থেকে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। রায়গঞ্জের পূর্ব দিকে দুধকুমার নদ। ইউ কে চিংরা ছিলেন এর উত্তর পারে। লেফটেন্যান্ট সামাদও সেদিকে ছিলেন। তাঁরা সেদিক দিয়ে রায়গঞ্জের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের অ্যামবুশে পড়েন। সেখানে একটি সেতুর নিচে বা বাংকারে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যামোফ্লেজ করা একটি এলএমজি পজিশন। রেকি করার কাজে জড়িত মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ওই সুরক্ষিত অবস্থান সম্পর্কে কিছুই টের পাননি। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পাওয়ামাত্র সেখান থেকে পাকিস্তানি সেনারা বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে। পরে মুক্তিবাহিনীর মূল দল এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ ও স্থল আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা সেখান থেকে পিছু হটে নাগেশ্বরীতে অবস্থান নেয়।

ইউ কে চিং চৌধুরীহাট ছাড়াও হাতীবান্ধা, পাখিউড়া, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারীসহ কয়েকটি জায়গায় সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। শুধু অস্ত্র নিয়েই নয়, তিনি কখনো কখনো আদিবাসীদের নিজস্ব প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার কৌশল প্রয়োগ করেও যুদ্ধ করেন। এর মাধ্যমে তিনি কয়েকটি জায়গায় পাকিস্তানি সেনাদের হতাহত করেন। আদিবাসীদের মধ্যে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র ইউ কে চিংই খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধা। বিডিআরের চাকরি থেকে ১৯৮২ সালে অবসর নেন।

বিজ্ঞাপন