default-image

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২০ জুলাই দিল্লিতে তাঁর বাসভবনে এক সমাবেশে বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বীর ওপর উৎপীড়ন করছে। কিন্তু কিছু লোক পরিস্থিতির অপব্যাখ্যা করে বলছে, শুধু হিন্দুদের ওপরই অত্যাচার হচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন মিলিতভাবে সাম্প্রদায়িকতা মোকাবিলা করা।

ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সদস্যদের তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের কিছু অংশ মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি কবলমুক্ত করতে পারলে সেই সাফল্যকে পাকিস্তান যদি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অছিলা হিসেবে কাজে লাগায়, তাহলে আমরাও আত্মরক্ষায় প্রস্তুত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি বলেন, বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে, তাহলেই কেবল বর্তমান সংকটের মোচন হতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা হবে পাগলের কাণ্ড।

বিজ্ঞাপন

সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান ভারতের গুজরাটের রাজ্যপালের কাছে এক চিঠিতে বাংলাদেশে পাকিস্তানি নৃশংসতার নিন্দা করে মন্তব্য করেন, এটা খুবই দুঃখের যে বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে তামাশা মনে করছে। তাদের নীরবতাই এর প্রধান সাক্ষ্য। বাংলাদেশের অসহায় নিপীড়িত জনগণের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর কোনো আন্তরিক সহানুভূতি নেই।

ভুট্টোর ছলচাতুরী

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো লাহোরে সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর দল ২৮ জুনের পর থেকে চার মাসের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে অপেক্ষা করতে রাজি আছে। এরপর আবার কোনো প্রকার ছলচাতুরীর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর দীর্ঘায়িত করা উচিত হবে না।

ভুট্টো আরও বলেন, কিছু লোক ক্রমাগত বলছেন যে তিনি কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৃহত্তর জোটের কথা বলেন, আবার কখনো আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নিন্দা করেন। এটা করে তারা তাঁকে শেখ মুজিবের সমপর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিব যখন সত্যিকার ফেডারেশনের প্রস্তাব করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গে জোটের কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে শেখ মুজিব ছয় দফার ভিত্তিতে কনফেডারেশনের দাবি উত্থাপন করলে তিনি বৃহত্তর জোটের অবস্থান থেকে সরে এসে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ধারণা দেন।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান সফররত ইসলামিক সেক্রেটারিয়েটের মহাসচিব টুংকু আবদুল রহমান করাচিতে বলেন, ১৭ জুলাই তাঁর সঙ্গে আলাপে ইয়াহিয়া খান আশ্বাস দিয়েছেন যে শরণার্থীরা বিনা শঙ্কায় পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসতে পারে। তিনি আরও জানান, ২১ জুন থেকে ইসলামিক সেক্রেটারিয়েটের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তান সফরে পাঁচ সদস্যের একটি মিশনের তিনি নেতৃত্ব দেবেন। তবে এই মিশন কোনোভাবেই রাজনৈতিক নয়।

তেহেরিকে ইশতিকলাল পার্টির আহ্বায়ক এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বলেন, যেসব রাজনৈতিক দলের জাতীয় বৈশিষ্ট্য নেই, তাদের নিষিদ্ধ করা উচিত। দেশের সংহতি ও অখণ্ডতা রক্ষার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলের মধ্যে মৌলিক বিষয়ের ব্যাপারে মতৈক্য হওয়া উচিত।

গেরিলা অভিযান

একদল গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লা শহরে পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন অবস্থানের ওপর মর্টার আক্রমণ চালান। আজাদ স্কুল, গোয়ালপট্টি এবং সাধনা ঔষধালয়, কালীবাড়ি ও সদর মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) অফিসের কাছে সেসব গোলা বিস্ফোরিত হয়। এতে পাকিস্তানি সেনারা সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে।

উত্তরাঞ্চলে আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা রাজশাহী শহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি টহল দলকে ফুদকিপাড়ায় অ্যামবুশ করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। নাটোরে মুক্তিযোদ্ধারা লালপুর থানা রেড করে। এতে কয়েকজন অবাঙালি পুলিশ হতাহত হয়।

বৃহত্তর সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল দিলখুশা চা–বাগানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের একজন পথপ্রদর্শক শহীদ এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই, পাঁচ ও সাত; ইত্তেফাক, ২১ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ২১ ও ২২ জুলাই ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন