default-image

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে সুপারিশ করা হয়, বাংলাদেশকে বিশ্বজনীন ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আর এতে নেতৃত্ব দিক ভারত।

সম্মেলনে আরও কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়: ১. বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একদল অহিংস পদযাত্রী ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হোক। ২. বাংলাদেশে যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত পাকিস্তানে সব সামরিক-অসামরিক সাহায্য বন্ধ রাখা হোক। ৩. বাংলাদেশের বাঙালিদের সংগ্রাম মুক্তিসংগ্রাম। ৪. বিশ্ব রাষ্ট্রগোষ্ঠী বাংলাদেশকে সামরিক-অসামরিক সব রকমের সাহায্য দিক। ৫. কাবুল, তেহরান বা দিল্লি থেকে ইসলামাবাদে একটি আন্তর্জাতিক যাত্রী দল পাঠানো হোক। ৬. প্রতিনিধিরা দিল্লির পাকিস্তানি মিশনে গিয়ে সম্মেলনের বক্তব্য এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি জানাবেন। ৭. প্রতিনিধিরা আগামীকাল শরণার্থীশিবিরগুলো পরিদর্শন করে বাংলাদেশের সীমানায় পার হবেন। তাঁরা প্রমাণ করবেন যে তাঁরা বাংলাদেশে পাকিস্তানি কর্তৃত্ব মানেন না। ৮. শরণার্থীদের জন্য ভারত সরকারের ভূমিকায় তাঁরা আনন্দিত।

দিল্লিতে ঘোষণা করা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। তাঁর প্রধান কাজ হবে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের বক্তব্য শোনানো এবং সাধারণ পরিষদকে দিয়ে এমন একটি প্রস্তাব অনুমোদন করানো, যাতে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দাবি করা হবে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল

মুজিবনগরে ঘোষণা করা হয়, বাংলাদেশের যে প্রতিনিধিদল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে জাতিসংঘে যাবে, তাঁদের মধ্যে আটজন ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে কলকাতা হয়ে দিল্লি যাবেন। এ জন্য তাঁরা মুজিবনগর থেকে কলকাতা রওনা হয়েছেন। প্রতিনিধিদলটি কলকাতা রওনা হওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে বৈঠক করে জাতিসংঘে তাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করে।

ঘোষণায় আরও বলা হয়, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি এবং আরও কয়েকজন দলের সঙ্গে নিউইয়র্কে যোগ দেবেন।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে এই প্রতিনিধিদল গঠন করেন। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এর আগে খন্দকার মোশতাক আহমদের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়।

উ থান্টের কাছে টি এন কাউল

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল এদিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথাও তিনি তাঁকে জানান।

নিউইয়কে৴র কূটনৈতিক মহল সাংবাদিকদের জানায়, তাদের ধারণা, পাকিস্তানের অপচেষ্টা সত্ত্বেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এবং অন্য ফোরামে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হবে। জাতিসংঘের তৃতীয় ও পঞ্চম কমিটিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে এবং মানবাধিকার রক্ষা কমিটিতেও এ প্রসঙ্গ উঠবে।

আফগানিস্তানের রাজা জহির শাহ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের পর এদিন প্রাভদায় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দাবি জানানো হয় যাতে শরণার্থীদের নিরাপত্তার পূর্ণ প্রতিশ্রুতিসহ দেশে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত রাশিয়ার ঘোষণায় এই প্রথম এ ধরনের কথা বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

গেরিলা অভিযান

১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা এদিন পাকিস্তানি বাহিনীর চম্পকনগর সীমান্তঘাঁটি অবস্থানে আক্রমণ করে তাদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি করেন। এই সেক্টরের আরেক দল গেরিলাযোদ্ধা চট্টগ্রাম-কুমিল্লা সড়কে জগন্নাথদীঘির কাছে একটি সেতুর উত্তরে অ্যামবুশ পাতেন। ফেনী থেকে পাকিস্তানি সেনারা সেতুর দিকে এলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর আক্রমণ চালান। পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কায়েমপুরে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের পেছনে ঢুকে অতর্কিতে হামলা করলে তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই সেক্টরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাদের রামগঞ্জ অবস্থানে আক্রমণ চালান। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়।

৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দল আবার পঞ্চগড়ে পাকিস্তানি সেনাদের অমরখানা অবস্থানে আক্রমণ চালায়। তবে দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে চুই নদের পশ্চিম পাশে নিজেদের প্রতিরক্ষা এলাকায় ফিরে যান।

৭ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় গোলন্দাজ সহায়তায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকায় পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে। মুক্তিযোদ্ধারা কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা সাতক্ষীরার আশাশুনির চাপড়ায় রাজাকার ক্যাম্পের ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করেন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই ছয়, সাত ও আট; মূলধারা ’৭১, মঈদুল হাসান, ইউপিএল, ঢাকা এবং আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান