বিজ্ঞাপন
default-image

আমি ১৯৬১ সাল থেকে ঢাকা পৌরসভার অধীনে সুইপার ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আমি আমার সুইপারের দল নিয়ে দায়িত্ব পালন করে সন্ধ্যায় ৪৫/১, প্রসন্ন পোদ্দার লেনে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। রাত নয়টার দিকে আমি ঢাকা ইংলিশ রোডের দিকে বের হয়ে দেখলাম, রাস্তাঘাট চারদিকে থমথমে, সব ধরনের যানবাহনকে দ্রুত গন্তব্যস্থলের দিকে যেতে দেখলাম। ছাত্র-জনতাকে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করতে দেখলাম। প্রতিরোধ তৈরিতে ব্যস্ত ছাত্র-জনতার কাছে জানতে পারলাম, ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি সেনারা রাজধানী ঢাকার দিকে সামরিক ট্রাক নিয়ে এগিয়ে আসছে। পাকিস্তানি পশুদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্র-জনতার এ প্রচেষ্টা ও প্রয়াস। আমি সবকিছু দেখে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে বাসায় চলে গেলাম। রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, পুলিশ অফিস ও মালিবাগ, গোয়েন্দা অফিসের দিকে আকাশফাটা গোলাগুলির ভীষণ গর্জন শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখলাম, রাজধানীর উত্তরে বস্তি এলাকা জ্বলছে। রাজারবাগ থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনার সময় ঢাকা শাঁখারীবাজার প্রবেশপথে বাবুবাজার ফাঁড়িতে ভীষণ শেলিংয়ের গর্জন শুনলাম। আমি নিকটবর্তী নয়াবাজার সুইপার কলোনির দোতলায় দাঁড়িয়ে চারদিকে গোলাগুলির ভীষণ গর্জন শুনলাম।

২৬ মার্চ প্রত্যুষে আমি সুইপার কলোনির দোতলা থেকে দৌড়ে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম ফাঁড়ির প্রবেশপথ, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ১০ জন পুলিশের ইউনিফর্ম পরা গুলির আঘাতে ঝাঁজরা ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। আমি ফাঁড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম ফাঁড়ির চারদিকের দেয়াল হাজারো গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে আছে। দেয়ালের চারদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে, দেখলাম কেউ জিব বের করে পড়ে আছে, কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে, প্রতিটি লাশের পবিত্র দেহে অসংখ্য গুলির আঘাত। মানবতার অবমাননা ও লাঞ্ছনার বীভৎস দৃশ্য দেখে আমি একটি ঠেলাগাড়িতে করে সব লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘরে রেখে আবার ঠেলাগাড়ি নিয়ে শাঁখারীবাজারে প্রবেশ করে একেবারে পূর্বদিকে ঢাকা জজকোর্টের কোণে হোটেল-সংলগ্ন রাস্তায় ১০টি ফকির-মিসকিন ও রিকশার মেরামতকারী মিস্ত্রির উলঙ্গ ও অর্ধ-উলঙ্গ লাশ ওঠালাম। কোনো হিন্দুর লাশ আমি রাস্তায় পাইনি। সব কটি লাশ মুসলমানের ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ঝাঁজরা ১০টি লাশ ঠেলাগাড়িতে তুলে আমি মিটফোর্ড নিয়ে গিয়েছি। মুসলমানদের লাশ এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেওয়া যায় না। তাই আমরা স্থানীয় ছাত্র-জনতা সবাই মিলে লাশগুলো তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি।

রাজধানীতে ছাত্র-জনতা রাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে পড়লে পাকিস্তানি সেনারা ঘোষণা করে, ঢাকায় কারফিউ বলবৎ রয়েছে, কেউ রাস্তায় বের হলে গুলি করা হবে। পাকিস্তানি সেনাদের এ ঘোষণার পর আমরা সরে পড়লাম। দিনের শেষে বিকেল পাঁচটার সময় তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার ও কোর্ট হাউস স্ট্রিট এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে বৃষ্টির মতো অবিরাম গুলিবর্ষণ। সারা রাত পাকিস্তানি সেনারা তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়ালনগর এলাকায় অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বেলা একটার সময় পাকিস্তানি সেনারা নবাবপুর থেকে ইংলিশ রোডের বাণিজ্য এলাকার রাস্তার দুই দিকের সব দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। বেলা তিনটা পর্যন্ত ইংলিশ রোডের রাস্তার দুই দিকে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকে। পালাতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির আঘাতে অনেকে প্রাণ হারায়। বেলা তিনটায় পাকিস্তানি সেনারা তাঁতিবাজারের বাহির পথ ও মালিবাগের পুলের পশ্চিম পাশে হিন্দু মন্দিরের ওপর শেলিং করে মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়।

ইংলিশ রোডের আগুন বাসাবো এলাকা অতিক্রম করে সুইপার কলোনির দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে আমি সুইপারদের কলোনির পানি রিজার্ভ করে রাখার নির্দেশ দিই। পাকিস্তানি সেনাদের ডিঙিয়ে সব সুইপার মিলে সুইপার কলোনিটি রক্ষা করার জন্য অগ্রসর হলে আমরা পাকিস্তানি সেনাদের গুলির মুখে চলে আসি। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ সকালে রেডিও মারফত সব সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীকে অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে, এ নির্দেশ পেয়ে পরদিন আমি সকাল ১০টার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটি রিপোর্ট করলে ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন কনজারভেন্সি অফিসার ইদ্রিস আমাকে ডোম নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন। ইদ্রিস সাহেব অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলতে থাকেন, সাহেব আলী, বের হয়ে পড়ো, যদি বাঁচতে চাও, তবে ঢাকার রাজপথ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তোলার জন্য বের হয়ে পড়ো। কেউ বাঁচবে না, কাউকে রাখা হবে না, সবাইকে পাক সেনাদের গুলিবর্ষণে মরতে হবে, সবাইকে কুকুরের মতো হত্যা করা হবে। পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে কুকুরের মতো উত্তেজিত হয়ে, অত্যন্ত কর্কশ স্বরে ক্রুদ্ধভাবে বকাবকি করতে থাকেন। সেখানে আমি, সুইপার ইন্সপেক্টর আলাউদ্দিন, সুইপার ইন্সপেক্টর কালীচরণ, সুইপার সুপারভাইজার পাঞ্চাম, সুইপার ইন্সপেক্টর আওলাদ হোসেন—আমরা পাঁচজন উপস্থিত ছিলাম। আমাকে পরদেশি ডোম, মন্টু ডোম, লেমু ডোম, ডোম গোলাপ চান, দুঘিলা ও মধু ডোমকে নিয়ে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটকলে ফেলতে বলা হয়।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমার দল ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর থেকে দুই ট্রাক লাশ তুলেছে। আমার দল যেসব লাশ তুলেছে, আমি স্বচক্ষে তা দেখেছি। অধিকাংশই ছিল সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও পাওয়ারম্যানদের খাকি পোশাক পরা বিকৃত লাশ। লাশ তুলতে তুলতে পরদেশি নামে আমার জনৈক ডোমের হাতে এক ষোড়শী রূপসীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখলাম, দেখলাম সেই যুবতীর পবিত্র দেহে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, তাঁর বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে, লজ্জাস্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, পেছনের মাংস তুলে নেওয়া হয়েছে। হরিণের মতো মায়াভরা মধুময় বড় বড় চোখ ঘুমিয়ে আছে, সারা দেহে সৃষ্টিকর্তা যেন দুধের সর দিয়ে আবৃত করে দিয়েছেন, মাথায় কালো কালো চুল তাঁর কোমর পর্যন্ত লম্বা হয়ে পড়েছিল, তাঁর দুই গালে আঘাতের চিহ্ন দেখলাম। পরক্ষণেই দেখলাম ১০ বছরের এক কিশোরীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ। অপরূপা রূপসী ফলের মতো টকটকে চেহারা, সারা দেহে বুলেটের আঘাত। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনাদের মেজর পৌরসভায় টেলিফোনে সংবাদ দেন রোকেয়া হলের চারদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে সেখানে বসা যাচ্ছে না, অবিলম্বে ডোম পাঠিয়ে লাশ তুলে ফেলা হোক।

আমি ছয়জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে রোকেয়া হলের সব কক্ষে তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোনো লাশ না পেয়ে চারতলার ছাদের ওপর গিয়ে ১৮ বছরের জনৈক রূপসী ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখতে পেলাম। আমার সঙ্গে দায়িত্বরত জনৈক পাকিস্তানি সেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ ছাত্রীর দেহে গুলির কোনো আঘাত নেই, দেহের কোনো স্থানে কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই অথচ মরে চিত হয়ে পড়ে আছে কেন? সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল, আমরা সব পাকিস্তানি সেনা মিলে ওকে ধর্ষণ করতে করতে মেরেছি। পচা-ফোলা সেই রূপসীর উলঙ্গ দেহ পড়ে আছে দেখলাম। ডাগর ডাগর চোখ ফুলে বের হয়ে আছে, মাথার চুল কাছেই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, লজ্জাস্থান তার পেট থেকে ফুলে অনেক ওপরে উঠে আছে, যোনিপথ রক্তাক্ত। তার দুই দিকের গালে পশুদের কামড়ের চিহ্ন দেখলাম, বক্ষের স্তনে মানুষের দাঁতের দংশনের চিহ্ন দেখলাম। আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসি। রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে প্রবেশ করে পাঁচজন মালির স্ত্রী-পরিজনদের পাঁচটি লাশ এবং আটটা পুরুষের লাশ (মালি) পেয়েছি। লাশ দেখে মনে হলো মৃত্যুর আগে সবাই শুয়ে ছিল। আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ির তেতলা থেকে জনৈক হিন্দু অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের লাশ তুলেছি।

স্থানীয় জনতার মুখে জানতে পারলাম, তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। সংগৃহীত লাশ স্বামীবাগ আউটকলে ফেলে দিয়ে আমরা ট্রাক নিয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। আমরা ৩০ মার্চ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগ ফেলেছি। পাকিস্তানি সেনারা কুলি দিয়ে আগেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল। পরের দিন আমরা মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোনির কাছ থেকে সাতটি পচা-ফোলা লাশ তুলেছি। ইকবাল হলে (সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) আমরা কোনো লাশ পাইনি। পাকিস্তানি সেনারা আগেই ইকবাল হলের লাশ পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা ১০ জন নর-নারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি।

ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর থেকে চারজন ছাত্রের উলঙ্গ লাশ তুলেছি। ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল আমরা কচুক্ষেত, ড্রাম ফ্যাক্টরি, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, দ্বিতীয় রাজধানী এলাকার ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তর, ঢাকা স্টেডিয়ামের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকজন ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। এরপর প্রতিদিন আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় থেকে হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে ১০ জন ছাত্রের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। রায়েরবাজার রাস্তা, পিলখানা, গণকটুলী, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য মানুষের পচা-ফোলা লাশ তুলেছি। অনেক লাশের হাত-পা পেয়েছি, মাথা পাইনি। মেয়েদের লাশ সবই উলঙ্গ ও ক্ষতবিক্ষত দেখেছি।

কিছুদিন পর আমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশমতো কারখানায় গিয়ে সাধনা ঔষধালয়ের মালিক প্রফেসর যোগেশ চন্দ্রের বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত তাজা লাশ তুলে স্বামীবাগ ফেলেছি। পাকিস্তানি পশুরা যোগেশ বাবুর সর্বস্ব লুণ্ঠন করে তাঁকে তাঁর নিজস্ব কামরায় বক্ষে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে রেখে যায়। পরে তাঁর পবিত্র ক্ষতবিক্ষত লাশ নিচে নামিয়ে এনে খাটের ওপর রেখে দিয়েছিল। আমরা গিয়ে দেখলাম, যোগেশবাবুর লাশ জিব বের করে হাঁ করে আছে। গায়ে ছিল ধুতি আর গেঞ্জি।

স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, খণ্ড ৮

সাহেব আলী: তৎকালীন সুইপার ইন্সপেক্টর, ঢাকা পৌরসভা, ঢাকা

সূত্র: ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত