বিজ্ঞাপন
default-image

হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড-এর প্রধান বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। অথবা শুধুই যুদ্ধ। যেহেতু সেকালের সম্মুখসমর রক্তপাত আর বীভৎসতার পাশাপাশি মানুষের মহত্ত্ব অথবা তার অন্তরের সত্যগুলোর প্রকাশ ঘটাত। এ যুদ্ধে দুই গ্রিক নায়ক আগামেমনন ও আকিলিসের মধ্যে কথোপকথনের একপর্যায়ে আগামেমনন বলেন, ইতিহাস রাজাদের মনে রাখে, সৈনিকদের নয়।

প্রথাগত যুদ্ধে হয়তো তা-ই, সৈনিকরা সেখানে কামানের গোলা—জয় নিশ্চিত করার জন্য তাদের খরচ করতে হয়, কিন্তু তাদের নাম মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। তারা বিস্মরণযোগ্য। মনে রাখতে হয় সেনাপতিদের নাম। ইউরোপের নানা শহরে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার বহু সেনাপতির ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু। কোনো সাধারণ সৈনিকের একটা আবক্ষ মূর্তিও আমার চোখে পড়েনি।

কিন্তু কোনো কোনো যুদ্ধ আছে, যেগুলোতে সেনাপতি-সৈনিকের দূরত্বটি ঘুচে যায়। একজন সৈনিক নিজেকে নিয়ে যান সেনাপতির ভূমিকায়। সমর-সাহিত্যে সেনাপতিদের যেসব গুণ আবশ্যিক বলে বিবেচনা করা হয়, এক অবাক রসায়নে তিনি সেসব নিজের ভেতর আবিষ্কার করে অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়ান। এ রকম এক যুদ্ধ, জনযুদ্ধ—একাত্তরে ঘটে যাওয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সাহসিকতা আর বীরত্বের শ্রেষ্ঠ প্রকাশগুলো দেখিয়েছিলেন এবং একটা সময় নিজের জীবনও বিলিয়ে দিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ; অনেক প্রশিক্ষিত সৈনিক, সীমান্তরক্ষী, পুলিশ ও আনসার। ওই জনযুদ্ধে কৃষক আর খেটে খাওয়া মানুষ ছিলেন, সক্রিয় আর অবসরে যাওয়া সেনাকর্তা ছিলেন, পেশাজীবী ছিলেন, নারীরাও ছিলেন। একাত্তর এক অদ্ভুত সময় ছিল, যখন একজন সাধারণ সৈনিক দায়িত্ব নিয়েছেন একটি যোদ্ধা দলের, যে দলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও ছিলেন। এই যুদ্ধ অনেক আত্মত্যাগের, যদিও সব শহীদের নাম আমরা মনে রাখিনি।

তবে কিছু অকুতোভয় সৈনিকের—যাঁরা অসামান্য শৌর্য আর বীরত্বের সঙ্গে লড়েছেন এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দ্বিধার একটি পলকও ফেলেননি চোখে, বরং স্থির প্রত্যয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন—তাঁদের নাম আমরা মনে রেখেছি। তাঁদের প্রত্যেকে লাখো শহীদের প্রতিনিধি হয়ে আমাদের ইতিহাসকে চিরদিন মহিমা দিয়ে যাবেন। তেমন এক বীর নূর মোহাম্মদ শেখ, যাঁকে জাতি বীরশ্রেষ্ঠ বলে সম্মান জানিয়েছে। তাঁর বীরত্বগাথা দুটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে—এর একটি ইতিহাসের সত্য, আরেকটি মানবসত্য। ইতিহাসের সত্যটি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতার এবং এর সফল পরিসমাপ্তির, যার পেছনে অনেক শহীদের সঙ্গে তিনিও ছিলেন। ইতিহাস বলে, যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান, তাঁরা বিজয়ী হন। তবে এই বিজয়ের জন্য ত্যাগেরও প্রয়োজন হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ গড়েছিলেন ত্যাগের এক অনুপম উদাহরণ।

আর মানবসত্যের বিষয়টি হলো একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠা, মৃত্যুতেও অমর হয়ে যাওয়া। নূর মোহাম্মদ প্রাণ দিয়েছেন দেশের জন্য, দেশ মানে মাতৃভূমি, মানবভূমি। মানবের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আত্মদান।

দুই

নূর মোহাম্মদকে নিয়ে আমাকে লিখতে বলা হয়েছে—না, একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে নয়, একজন মুক্তিযুদ্ধ-গবেষক হিসেবেও নয়; বরং একজন গল্পকার হিসেবে। লিখতে বসার আগে তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই পড়তে হলো। আগেও পড়েছি, এবারও পড়লাম। যেটুকু আগে থেকেই জানতাম, তার থেকে খুব বেশি কিছু জানা হলো না। আমরা স্কুলে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী পড়াই। কয়েক বছর আগে এক ঝড়-জলের দিনে এক গ্রামের স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক মহোদয় ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন। আমাকে দেখতে পেয়ে ভেতরে ডাকলেন এবং বললেন, ‘বৃষ্টির দিন ওদের সঙ্গে একটু গল্প করুন’। আমি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলাম, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তারা কতটুকু জানে।

বেশি কিছু না। শহরের স্কুলের শিক্ষার্থীদের মতোই; মোটামুটি তাদের জ্ঞান। তবে তারা জানে বীরশ্রেষ্ঠদের সম্পর্কে। একটি ছেলে নূর মোহাম্মদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানাল, তিনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। ‘একমাত্র সন্তান’ কথাটায় সে জোর দিয়েছিল কেন, বলতে পারি না।

নূর মোহাম্মদকে নিয়ে লিখতে বসে ‘একমাত্র সন্তান’ কথাটা আমাকে নতুন করে ভাবাল। কেমন ছিল এই একা মানুষটির শৈশব? কোন বন্ধনে বাঁধা ছিলেন মা-বাবার সঙ্গে? নিশ্চয় বন্ধনটি মা অটুট রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, বুকের একমাত্র ধন যেহেতু। কিন্তু শৈশবেই তো হারালেন মা-বাবাকে। কীভাবে তিনি বড় হলেন? হ্যাঁ, আমি কিছুটা জানি কারা তাঁর লালন-পালন করেছেন।

নূর মোহাম্মদ শেখ জন্ম: ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬, মৃত্যু: ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, জন্মস্থান: মহিষখোলা, নড়াইল, যোদ্ধা: ৮ নম্বর সেক্টর, যুদ্ধ: যশোরের শার্শার বয়রা অঞ্চলে, পদবি: ল্যান্স নায়েক, সমাধি: যশোরের কাশিপুর গ্রামে

কিন্তু একটা বিশাল শূন্যতা নিয়ে যে তিনি বেড়ে উঠলেন, নিজের সঙ্গে নিশ্চয় অনেক বোঝাপড়া যে হয়েছিল—তার কিছুই তো আমরা জানি না, শুধু আন্দাজ করতে পারি। একসময় বাবার রেখে দেওয়া জমিজমা বিক্রি করে দিলেন, যদিও পৈতৃক বাড়িটা হাতছাড়া করেননি। এ কি তাঁর বিষয়-অনাসক্তি, নাকি একধরনের বন্ধনমুক্তি? এই বন্ধনমুক্তিকে একটা আনুষ্ঠানিকতা দিতেই কি যোগ দিলেন আনসার বাহিনীতে, যেহেতু এই বাহিনীতে তাঁর কিছু সহকর্মী হবেন, একটি পরিচিত বৃত্ত হবে, হয়তো বাহিনীটাকেই তিনি পরিবার হিসেবে পাবেন এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াবেন।

আমি তাঁর সম্পর্কে যত লেখা পড়েছি, কোথাও তাঁর শৈশবের পরিষ্কার কোনো বর্ণনা পাইনি। হয়তো সেই লক্ষ্যে কোনো গবেষণাও হয়নি। কিন্তু আন্দাজ করি, তাঁর ভেতরে একটি সৈনিক সত্তা তৈরি হচ্ছিল যে শৃঙ্খলা পছন্দ করে, বিপদে ভয় পায় না, বরং বিপদে নিজেকে পরীক্ষা করতে আগ্রহী। তা না হলে আনসার বাহিনীর তুলনামূলক নিরুপদ্রব জীবন ছেড়ে ২৩ বছর বয়সে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) হয়তো যোগ দিতেন না। ইপিআর যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করত, সেগুলোতে যথেষ্ট বিপদ থাকত, উত্তেজনাও থাকত। আমার এই ধারণাটি দৃঢ় হয়, যখন দেখি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি দিনাজপুর অঞ্চলে লড়েছেন এবং আহতও হয়েছেন। যুদ্ধটাকে তিনি দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন তাঁর অন্তর্গত একটা তাগিদ থেকেই। সে তাগিদ বিপদে নিজেকে প্রমাণ করার।

আইরিশ কবি ডব্লিউবি ইয়েটসের একটি কবিতা আছে, একজন আইরিশ বিমানযোদ্ধা কীভাবে নিজের মৃত্যুকে আগে থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন, তা নিয়ে। ওই যোদ্ধা—মেজর গ্রেগরি—বলছেন, মেঘের অঞ্চলে তিনি বিমান নিয়ে উড়ছেন এক ‘নিঃসঙ্গ আনন্দের তাড়নায়’। তাড়নাটি শত্রুকে নিধন করার নয়, বরং নিজেকে প্রমাণ করার। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ নিজের কাছে নিজেকে সব সময় প্রমাণ করেই গেছেন।

যে পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করে তিনি আহত হয়েছিলেন, মাত্র ছয় বছর পর তাদের বিরুদ্ধেই তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নিলেন, কারণ একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, সে যুদ্ধ ছিল এক বর্বর বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, সে যুদ্ধ ছিল ওই কাপুরুষদের বিরুদ্ধে সাহসী মানুষের যুদ্ধ। তিনি সাহসী মানুষ ছিলেন, যুদ্ধে নেমে পড়তে তাঁর সময় লাগেনি।

নূর মোহাম্মদ তাঁর ভিটেবাড়িটা রেখেছিলেন, তাঁর শিকড়ের সাক্ষী হিসেবে, মা-বাবার প্রতি তাঁর ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে। সেই বাড়িতে তিনি একাত্তরের মার্চে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাতে নাম লেখালেন। মার্চ মাসের এই যোগাযোগটি আমাকে বিস্মিত করে। তিনি কি ৮ মার্চ রেডিওতে প্রচার হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি শুনেছিলেন? ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা যে বীভৎসতার সূচনা করেছিল, তার খবর তাঁর মনে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল? আফসোস, এ দুই প্রশ্নের উত্তর কোনো দিন জানা হবে না। কিন্তু আন্দাজ করছি, ২৫ মার্চের পর তাঁর সৈনিক মনে ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষকে দলে দলে হত্যা করার মতো এক ক্ষমাহীন পাপ মানবসত্যের বিপরীতেই দাঁড়িয়েছিল। তিনি নিশ্চয় বুঝেছিলেন, এই কাপুরুষদের হাতে মারণাস্ত্রের একটা পাহাড় আছে। নূর মোহাম্মদ যোদ্ধা ছিলেন ৮ নম্বর সেক্টরে।

যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে তিনি যুদ্ধ করেছেন ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে। আমরা জানি, যশোরের গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে একটি পেট্রল দলের অধিনায়ক করে পাঠানো হয়। তারিখটা ছিল ৫ সেপ্টেম্বর। এরপর যা ঘটে, তা আমাদের স্মৃতি থেকে কোনো দিন মুছে যাবে না। আমরা জানি, পাকিস্তানিদের একটি বাহিনী অতর্কিতে এই পেট্রল দলটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।

নূর মোহাম্মদের পেছনে একটি প্রতিরক্ষা দল ছিল। তারা গুলিও চালিয়েছিল, কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। তাঁর দলের একজন সিপাহি নান্নু মিয়ার গায়ে গুলি লাগলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। নূর মোহাম্মদ তাঁকে কাঁধে তুলে নেন। তাঁর হাতে একটি এলএমজি ছিল। তা দিয়ে তিনি ডানে-বাঁয়ে সমানে গুলি ছুড়তে থাকেন। এতে শত্রু পিছু হটে, কিন্তু এবার তারা মর্টারের গোলা ছুড়তে থাকে। একটি গোলা এসে তাঁর কাঁধে লাগে। নূর মোহাম্মদ বুঝতে পারেন, সহযোদ্ধাদের বাঁচানোটাই এখন জরুরি। তাঁর এক সহযোদ্ধা মোস্তফাকে তিনি এলএমজিটা দিয়ে তাঁর রাইফেলটা নিয়ে নেন এবং সহযোদ্ধাদের নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে বলেন। রাইফেল থেকে গুলি ছুড়ে তিনি তাঁদের আড়ালে চলে যাওয়াটা নিশ্চিত করেন। একসময় পাকিস্তানিরা এসে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত নূর মোহাম্মদকে ধরে ফেলে। আরেকবার চরম কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে বেয়োনেটের খোঁচায় তাঁর দুটি চোখ উপড়ে ফেলে। একসময় তারাও ফিরে যায়। নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধারা এসে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করেন। যশোরের কাশিপুরে তাঁকে তাঁরা সমাহিত করেন।

তিনি যখন মারা যান, তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর।

তিন

কদিন থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের সকালবেলাটা আমার ঘুমে হানা দিচ্ছে। আমি ঘুমের ভেতরে চোখ মেলে দেখি, নূর মোহাম্মদ চলছেন তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে। নিচু গলায় হয়তো টুকটাক নির্দেশনা দিচ্ছেন, দু-একটি প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিচ্ছেন। দিনটা পরিষ্কার ছিল, আকাশে সুন্দর আলো ছিল। সেবার বৈশাখ থেকেই বৃষ্টি হয়েছিল, ফলে ভাদ্রে খালপুকুরে পানি ছিল। গাছপালা জঙ্গলের সবুজ ছিল তীব্র। নূর মোহাম্মদের হাতে ছিল একটি এলএমজি, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় একটি কার্যকর অস্ত্র। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শত্রুর মোকাবিলা এই এলএমজি ও রাইফেলে করা সম্ভব। কিন্তু শত্রু যখন অতর্কিতে তাঁদের ঘিরে ফেলল, তিনি অত্যন্ত দ্রুততায় কিছু সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিশ্চয় চেয়েছিলেন সবাই অক্ষত অবস্থায় ফিরে যাবেন, শত্রুকে যতটা সম্ভব নিষ্ক্রিয় করে। কিন্তু এক সহযোদ্ধা যখন পড়ে গেলেন, তিনি নিশ্চয় বুঝলেন, বিপদটা অনেক বড় এবং তাঁর ভেতরের সৈনিক আর অধিনায়কের বৈশিষ্ট্যগুলো জেগে উঠল। তিনি সহযোদ্ধাদের রক্ষার দায়িত্ব নিলেন, আহত সহযোদ্ধাকে কাঁধে তুলে নিলেন। একসময় বুঝলেন, বাকিদের রক্ষা করতে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে।

তিনি তা-ই করলেন।

এই বীরশ্রেষ্ঠ শত্রুর বেয়োনেটে চোখ হারানোর আগে নিশ্চয় সকালের আকাশটাতে চোখ মেলেছিলেন। শেষবারের মতো। বাংলাদেশের পুরো আকাশ সে দুই চোখে প্রতিফলিত হয়েছিল।

শত্রুরা তাঁর চোখ নিয়েছিল। কিন্তু তাঁর চোখে প্রতিফলিত বাংলাদেশ এবং চোখভরা স্বাধীনতার স্বপ্ন—কিছুই মলিন করতে পারেনি। সেই সাধ্য তাদের ছিল না।

এরপর ৫ সেপ্টেম্বরের আকাশ অন্ধকারে ঢেকেছিল কি না, জানি না। আমি নূর মোহাম্মদকে নিয়ে গল্প লিখলে ওই আকাশটাকে হয়তো কিছুটা অন্ধকারে ঢাকতাম।

অথবা হয়তো না। কারণ নূর মোহাম্মদের চোখে প্রতিফলিত আকাশটা তো কোনো দিন মলিন হওয়ার নয়।

চার

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদকে নিয়ে আমি হয়তো কোনো গল্প লিখতেও পারব না। তাঁর জীবনের, মধ্যযৌবনে শেষ হয়ে যাওয়া আশ্চর্য এক জীবনকালের, কোনো আখ্যান সাজাতে গেলে যে অধিকার থাকতে হয় ভাষার এবং চরিত্রায়ণের ওপর, আমার তা নেই। আমি জানি না কী করে তাঁর জীবনের, আত্মবিশ্বাসের, অহংকারের এবং আত্মবলিদানের মুহূর্তগুলোকে বাঙ্‌ময় করে তোলে।

আমি বরং খণ্ড খণ্ড ছবিতে তাঁকে দেখি—তাঁর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার, যুদ্ধের মাঠে লড়াই করার, আর ৫ সেপ্টেম্বরের সকালটা সম্পূর্ণ দখল করে নেওয়ার নানান রঙের ও গভীরতার ছবিতে।

এসব ছবির প্রতিটিতেই আছেন একজন সপ্রাণ ও পরিপূর্ণ মানুষ, যিনি মৃত্যুতে স্পর্শ করেছেন বাংলাদেশের মনের আকাশের অবারিত বিশালতা আর উচ্চতাকে।

সামান্য এক গল্পের আয়োজনে এই বিশালতাকে কি মাপা যায়?

সূত্র: ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত