বিজ্ঞাপন
default-image

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অনেক ব্যক্তিত্বই আমাদের আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছেন। আমি আমার এই ক্ষুদ্র লিখনে তাঁদেরই একজনের কথা বলব। তিনি হলেন মমতাজ বেগম। তিনি আমার ফুফু ও একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি আজও শিউরে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভাই সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য: একাত্তরের মার্চ মাসের শেষের দিকে আমার ভাই ফিরোজ কবির কাউকে না জানিয়ে স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করে। তখন আমি ও আমার মা ছিলাম আমাদের গ্রামের বাড়ি রাজাপুর থানার সাকরাইল গ্রামে। যুদ্ধ চলাকালে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরোজ আসত কালেভদ্রে। একবার ফিরোজ ও তার সঙ্গের মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে মিলিটারিরা আমাদের গ্রামের বাড়িতে হানা দেয়। নগদ টাকা-পয়সা ও চাল-ডাল দিয়ে তাদের বিদায় করা হলেও তারা আবার বরিশালেও আসে। বাড়ির আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে ফিরোজকে না পেয়ে বাড়ির পেছনের পানির ট্যাংকে বাবাকে নামায়। কারণ, তাদের ধারণা ছিল যে এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া অস্ত্র রয়েছে।

ফিরোজ ধরা পড়ে ডিসেম্বরের শেষে দিকে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাসহ। দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় এলাকার রাজাকার মুনসুর মিয়া মিলিটারি ডেকে ধরিয়ে দেয়। প্রথমে তাদের ঝালকাঠি জেল ও পরে ত্রিশ গোডাউনে নিয়ে যায়। ত্রিশ গোডাউন ছিল তখন মিলিটারি ও রাজাকারদের ঘাঁটি। ফিরোজদের সঙ্গে দুজন নারী মুক্তিযোদ্ধাও ছিল। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে ফিরোজদের ত্রিশ গোডাউনে আনা হয় ও তার দু-এক দিন পরই রাতের অন্ধকারে ফিরোজসহ চারজন মুক্তিযোদ্ধার হাত-পা ও চোখ বেঁধে পেছন থেকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

মমতাজ বেগমের বৃদ্ধ মা এখনো বিশ্বাস করেন যে তাঁর ছেলে বেঁচে আছে। তিনি আজও আশায় বুক বাঁধেন যে তাঁর ছেলে একদিন আসবে।

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি ছোট অংশ এটি। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের প্রতি আমাদের যে আশা ছিল তা অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে গেছে। দেশের এই পরিস্থিতি দেখে হয়তো আজও কোনো মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসনকেন্দ্রের অন্ধকার কোনায় চোখের পানি মোছেন। আর ভাবেন, ‘এ জন্যই কি আমরা একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলাম।’

সৈকত কবির

বরিশাল জিলা স্কুল

সপ্তম শ্রেণী, শাখা: খ (দিবা), রোল-১৩