বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে একদিন সন্ধ্যার পর পার্ক সার্কাসে বন্ধুবর সংগীতশিল্পী বাচ্চু রহমানের বাসায় গিয়েছি। উদ্দেশ্য তার সঙ্গে দেখা করা। সেখানে হঠাৎ কামাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। কামাল ভাই যে কলকাতায় আছেন, তা জানতাম না। ভেবেছিলাম, তিনি ঢাকায়। তাই তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব খুশি হলাম। আমাকে দেখে কামাল ভাই ব্যগ্রভাবে বলে উঠলেন, ‘তুমি এসেছ, ভালোই হয়েছে। বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির ওপর তুমি শিগগিরই আমাকে কিছু জোরালো গান লিখে দাও। দেরি কোরো না। পারো তো এক সপ্তাহের মধ্যে লিখে দিতে পারলে ভালো হয়।’ বললাম, ‘অত তাড়াতাড়ি কী হবে? তবে চেষ্টা করব যত তাড়াতাড়ি আপনাকে লিখে দিতে পারি। কতগুলো গান আপনি চান?’ তিনি বললেন, ‘অন্তত কুড়ি-পঁচিশটা গান একটা খাতায় ভালো করে লিখে খাতাটা আমাকে দিয়ে দেবে।’

যত দূর মনে পড়ছে, এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে আমি প্রথমে পনেরোটি গানসংবলিত ছোট একটা এক্সারসাইজ বুক বা খাতা কামাল ভাইয়ের হাতে তুলে দিই।

তিনি সব কটা গানই খুব মনোযোগ দিয়ে কয়েকবার পড়ে নিলেন। তারপর পাকা জহুরির মতো ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটিকেই খাতার সেরা গান বলে রায় দিলেন।

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথমে যে কথা হয়েছিল, তাতে ঠিক করা হয়েছিল যে তিনি খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে গানের খাতাটা বাংলাদেশের ভেতরে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের’ শিল্পীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু পরে তিনি মত পরিবর্তন করলেন। কেননা, বাংলাদেশের ভেতরে সেদিনকার প্রতি মুহূর্তের অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে হাতে লেখা গানের খাতা কাউকে দিয়ে পাঠানো তিনি নিরাপদ মনে করেননি। আলোচনার পর ঠিক হলো, খাতার গানগুলো ‘জয় বাংলার গান’ নাম দিয়ে একটা ছোট পুস্তিকাকারে ছাপিয়ে তার কিছু বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কামাল ভাই তাঁর পরিচিত একজন প্রকাশকের সঙ্গে কথাবার্তাও প্রায় পাকা করে ফেললেন। প্রকাশক ভদ্রলোক গানের পুস্তিকাটি প্রকাশ করার নিশ্চিত কথা দিয়েও ক্রমাগত টালবাহানা করতে লাগলেন। এভাবে কিছুদিন নষ্ট হলো। শুধু সময়ই নষ্ট হলো না, সেই ডামাডোলের মধ্যে গানের খাতাটাও খোয়া গেল। গভীর হতাশায় মনটা আমার ভরে গেল।

‘স্বাধীন বাংলা বেতারের’ ঠিকানাও তখন অনিশ্চিত। আগরতলা ছাড়ার পর ভ্রাম্যমাণ ট্রাকেই তখন তার সাময়িক অবস্থান। ফলে, গানের বই ছাপিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারে’ পাঠানোর পরিকল্পনা ছাড়তে হলো। তবু, কামাল ভাইয়ের ডেরায় বাড়ি ফেরার পথে মাঝেমধ্যে হাজিরা দিই। বাচ্চুও অফিস ছুটি শেষে কোনো কোনো দিন আসে। নানা গল্পগুজব, আলাপ-আলোচনা হয়। নতুন গান লেখার কথাও হয়। কামাল ভাই হতাশ হতে নিষেধ করেন।

এরই মধ্যে কামাল ভাই হঠাৎ একদিন আমাকে গানগুলো আবারও একটা খাতায় কপি করে দেওয়ার জন্য বললেন। কারণ কিছুই খুলে বললেন না। কামাল ভাইকে দ্বিতীয়বার যখন গানের খাতা দিই, সময়টা তখন মে মাসের মাঝামাঝি কি মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ হবে। দেখা হলে মাঝেমধ্যে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী করলেন গানগুলো নিয়ে?’ তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেন না, শুধু জবাব দেন, ‘পরে বলব।’ আমার মনে কৌতূহল দুর্নিবার হয়ে ওঠে, কিন্তু বাধ্য হয়েই তা দমন করতে হয়।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই কামাল ভাই আমাকে প্রথম জানালেন যে আমার গানের খাতাটি তিনি ‘স্বাধীন বাংলা বেতারে’ পৌঁছে দিয়েছেন। আমার কয়েকটি গানে সুর হচ্ছে। দুজন সুর করছেন। তখন আর বিস্তারিত কিছু বললেন না। আমিও এ বিষয়ে আর কোনো কৌতূহল প্রকাশ করলাম না। তিনি আমাকে গানগুলোর আর একটা ‘কপি’ করে দিতে বললেন। কেননা, যে দুজন আমার গান সুর করছেন—একটা খাতা হওয়ায় তাঁদের দুজনেরই কাজে খুব অসুবিধা হচ্ছে। আমি পরদিনই আর একটি খাতায় গানগুলো ‘কপি’ করে তাঁকে দিয়ে দিলাম। এ ব্যাপারে যে বিস্তারিত তথ্য আমি পরে তাঁর মুখ থেকে শুনেছিলাম তা নিম্নরূপ—

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের’ গোপন কেন্দ্র একরকম পাকাপাকিভাবে স্থাপিত হয়ে যায় কলকাতায়। কর্মকর্তাদের অন্যতম প্রধান এবং বেতারের সংবাদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিখ্যাত সাংবাদিক কামাল লোহানী সাহেব ছিলেন কামাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ফলে, লোহানী সাহেব কলকাতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই কামাল ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং স্বাধীন বাংলা বেতারের গোপন কেন্দ্রে নানা কর্মসূত্রে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। অনুষ্ঠান প্রচারের প্রথম যুগে ভালো গানের অভাবের কথা শুনে তিনি আমার গানের খাতাটি লোহানী সাহেবের হাতে তুলে দেন। লোহানী সাহেব তখন খাতাটি বেতারের সংশ্লিষ্ট সুরকারদের দেন খাতা থেকে গান বাছাই করে সুর করা এবং তা প্রচার করার জন্য। খাতার ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটির কথা লোহানী সাহেবেরও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। গানটির যাতে ভালো সুর হয়, সে জন্য দুই বন্ধুতে পরামর্শ করে লোহানী সাহেব প্রথম আমার গানের খাতাটি বেতারের বর্ষীয়ান অভিজ্ঞ সুরকার ও সংগীত স্রষ্টা সমর দাস মহাশয়কে দেন। কিন্তু আপেল মাহমুদ নামে বেতারের একজন তরুণ সংগীতশিল্পী খাতা থেকে ওই গানটি পছন্দ করে বেছে নিয়ে সুর করতে আরম্ভ করেন। আপেল মাহমুদ অভিজ্ঞ সুরকার না হওয়ায় তাঁর দেওয়া সুর কেমন হবে, এ বিষয়ে লোহানী সাহেব ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও গানটিতে ইচ্ছামতো সুর করার জন্য তাঁকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ও সুরকাররা নিজেদের মধ্যে সব সময় আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে মিলেমিশে কাজ করতেন। ফলে, অনেক নতুন শিল্পীকেও পরীক্ষামূলকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্বাধীনতা দেওয়া হতো।

যা-ই হোক, আপেল মাহমুদ তো অতি অল্প সময়ের মধ্যে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটির সুর করে ফেললেন। সুর করে তিনি লোহানী সাহেব ও অন্যদের শোনালেন। একদিন কামাল ভাইকে ডেকে নিয়ে গিয়েও গানটি তাঁকে শোনানো হলো। সবাই মোটামুটি তাঁর সুর পছন্দ করলেন। গানটিতে তিনি ভালো সুর দিয়েছেন বলেও অভিমত প্রকাশ করলেন তাঁরা। এরপর আপেল গানটি রেকর্ড করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে তাঁর কণ্ঠেই গানটির প্রচার শুরু হয়। আমার যত দূর স্মরণে আসছে, তাতে ১৯৭১-এর জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের গোড়ার দিকে গানটি প্রথম ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচার করা হয়। কারণ, নির্দিষ্ট দিন ও তারিখ মনে না থাকলেও এটুকু মনে আছে যে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই আমি গানটি প্রথম স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে শুনেছিলাম। কেননা, স্বাধীন বাংলা বেতারের দেশাত্মবোধক সংগীতের অনুষ্ঠান সে সময় আমি নিয়মিত দুই বেলাই শুনতাম। বিশেষ করে, আমার গানগুলো স্বাধীন বাংলা বেতারে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি গানে সুর দেওয়া হচ্ছে—কামাল ভাইয়ের মুখে এ কথা শোনার পর আরও বেশি আগ্রহ নিয়ে বেতারের অনুষ্ঠান শুনতাম।

‘স্বাধীন বাংলা বেতার’ থেকে গানটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে বিরাট সাড়া পড়ে গেল। বাংলার মাঠ-ঘাট-প্রান্তর, প্রতিটি ঘর, মুক্তিযোদ্ধাদের শিবির—সর্বত্র অনুরণিত হয়ে। ফিরতে লাগল এই গানের সুর। তরুণ আপেল মাহমুদ রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। শুধু বাংলাদেশের মানুষের মনেই নয়, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীদের মধ্যেও তিনি হয়ে উঠলেন ‘হিরো’। আমার ভূমিকা রইল নেপথ্যে। মুষ্টিমেয় দু-তিনজন ছাড়া বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কোটি কোটি মানুষের কেউ জানল না গানটির প্রকৃত স্রষ্টা কে? কারণ, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত কোনো দেশাত্মবোধক গানের রচয়িতার নাম তখন ঘোষণা করা হতো না। সেই জরুরি অবস্থায় তখন তা সম্ভবও ছিল না।

গোবিন্দ হালদার: পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত গীতিকার