default-image

পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে শরণার্থী আসছিল। ক্রমেই তাদের আকার স্ফীত হচ্ছিল আর অনেকটা দেশত্যাগের রূপ লাভ করেছিল। বাক্স-পেটরা গুছিয়ে সকালের বিমানে কলকাতায় এসে পৌঁছালাম। নেমেই সোজা ছুটলাম যশোর রোডের দিকে। যশোর রোড বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি স্থান।

তখন আগস্ট মাস, বর্ষা মৌসুম তুঙ্গে। আকাশে ঘন ধূসর মেঘ। অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। সীমান্তে আগত মানুষের সংখ্যাকে শুধু বেশি বললে কম বলা হবে, বানের জলের মতো মানুষ যেন এখানে সবদিক থেকে উপচে পড়ছে। যত্সামান্য সম্বল নিয়ে দলে দলে এসে জড়ো হচ্ছে শরণার্থীরা। সামান্য কিছু মানুষের সঙ্গে গরুর গাড়ি ছিল, বৃষ্টিতে ভিজে কষ্ট করে তারা শ্রান্ত। বাতাসে ঝুলে ছিল নীরবতা, কারও মুখে কোনো নেই। গোপন কোনো ব্যাপার সেখানে নেই, সবাই সবার অবস্থা জানে। এটা ছিল একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি।

বিজ্ঞাপন
default-image

সীমান্তের এপারের বনগাঁ নামে ছোট গ্রামটিতে এত শরণার্থীর স্থান হওয়া সম্ভব ছিল না। এই উদ্বাস্তু মানুষগুলোর তো শুধু খাবার ও কাপড়ই নয়, বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথার ওপর ছাদেরও দরকার ছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এত বড় মেহমানদারির জন্য প্রস্তুত ছিল না। এদের কারও কারও ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। তারা স্যুয়ারেজ পাইপে স্থান পেয়েছিলেন।

বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের দূরত্বটা বেশিই মনে ছিল। তাঁবু খাটানোর কাজ তখনো শেষ হয়নি। ভবিষ্যত্ তখনো অনিশ্চিত। বাধ না-মানা আবেগের ধারা ছিল দুর্বিষহ বেদনাদায়ক। এক বৃদ্ধা যে বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তাতে তিনি বেদনায় পাথর হয়ে গেছেন। খাদ্যের অভাবে একটি শিশু তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, চোখে তার অশ্রুধারা। কিছুদিন পর আমার তিন বছরের শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ছবিগুলো দেখছিলাম। মুখে একরাশ বেদনা নিয়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন?

তবে সোনার বাংলায়, যাকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তান, তাদের পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমান ভাইয়েরা যে হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল, সেটি ছিল মাত্র তার শুরু। দুই পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল হাজার মাইলেরও অধিক। ভারত যখন ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হয়, তখন ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে দুই টুকরো করে দেয়—ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, দুটো রাজ্যই ছিল বেশ বড়। পশ্চিম পাঞ্জাবের অর্ধেক ও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়, আর দক্ষিণ বাংলার অর্ধাংশ হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিম বাংলার অনেক কাছের হলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের বাঙালি ভাইদের হত্যা করতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে আলোচনা ভেস্তে গেলে এ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। দুঃস্বপ্নের মতো নয়টি মাস লড়াই করার পর অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়।

এই পৈশাচিকতা ও বিভীষিকার গল্প মানব-ইতিহাসের অন্যতম লোমহর্ষক ঘটনা। হাজার হাজার নারী পাকিস্তানি সেনাদের ধর্ষণের শিকার হয়। যে ভীতিকর পরিবেশের মধ্য দিয়ে তারা গেছে, তাতে অসংখ্য শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানি সেনাদের ধর্ষণের শিকার তরুণীরা নিষ্প্রাণ-নিশ্চল ভঙ্গিমায় অসম্ভব কষ্ট নিয়ে হাঁটত। বেশি দূর যাওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। এদের অনেককেই পাকিস্তানিরা বাংকারে তাদের সেবাযত্নের জন্য রাখত। তারপরও একজনকে দেখলাম, তাঁর সন্তানকে আঁকড়ে ধরে আছে। সে আতঙ্কিত।

default-image

প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী ভারতে এসে আশ্রয় নেয়। স্রোতের মতো তারা আসতেই থাকে। প্রায় ২০ লাখ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর ঔপনিবেশিক জিঘাংসার শিকার হয়। অথচ একটি উপনিবেশের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এদের হাতেই বাঙালিরা তাদের নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছিল। কেন? ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জাতির সামনে এক নবযাত্রার সম্ভাবনা হাজির করেছিলেন, এক নতুন পরিচয়ের দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তা হলো বাংলাদেশ।

পাকিস্তানি জান্তা এক বিদ্রোহের গন্ধ পেল। শেখ মুজিবুর রহমান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে বললেন, তিনি যেন পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাঙালিদের ভবিষ্যত্ তাদের নিজেদের হাতে গড়ার অনুমোদন দেন।

জেনারেল এই দাবি অগ্রাহ্য করলেন না। উল্টো তাঁর সেনাদের এক নিষ্ঠুর নির্দেশ দিয়ে লেলিয়ে দিলেন, বিদ্রোহ দমন কর, তা যা কিছুর বিনিময়েই হোক না কেন। পূর্ব পাকিস্তানের অমানবিক ঘটনায় সারা বিশ্ব থমকে যায়। ভারত ছিল তার পাশে। সেখান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এই নির্যাতিত, অঙ্গহীন, ভেঙে পড়া ও মৃতপ্রায় মানুষগুলো প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়।

১৯৭১ সালের এপ্রিলে ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট ওয়াশিংটনে তাঁদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক তারবার্তা পাঠায়। ইসলামাবাদের দূতাবাস এবং করাচি ও লাহোর কনস্যুলেটে এর কপি দেওয়া হয়। তাতে লেখা ছিল ‘গোপনীয়’। এর বিষয় ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানবিষয়ক মার্কিন নীতির সঙ্গে ভিন্নমত’। তাতে পরিষ্কার বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহবিষয়ক মার্কিন নীতি সামগ্রিকভাবে আমাদের নৈতিক স্বার্থ, এমন কি ক্ষুদ্র অর্থে আমাদের জাতীয় স্বার্থেরও পরিপন্থী। অ্যামকনজেন ঢাকা, ইউএসএইড ঢাকা ও ইউসিস ঢাকার বিভিন্ন কর্মকর্তারা এই নীতির মূল দিকগুলোর সঙ্গে মতানৈক্য পোষণ করেছেন। আমাদের সরকার গণতন্ত্রকে টুঁটি চেপে হত্যা করার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। আমাদের সরকার নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি। তার নিজের জনগণকে রক্ষা করার জন্য এখানে বলিষ্ঠ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারকে তুষ্ট করার জন্য তাদের নেতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি থেকে রক্ষায় আমাদের সরকার চেষ্টা করছে। আমাদের সরকার যা করছে, তা নৈতিক দীনতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময় গণতন্ত্রকে রক্ষা জন্য ইয়াহিয়া খানকে ভর্ত্সনা করে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দলের নেতাকে—যিনি ঘটনাচক্রে পশ্চিমপন্থী—গ্রেপ্তার করার নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রক্তপাত বন্ধের ও নিপীড়নমূলক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আমাদের সর্বশেষ পাকিস্তানি নীতির মূলকথা হিসেবে বলা হয়েছিল, এটা প্রাথমিকভাবে মানবিক।’

একজন সত্ মার্কিন কূটনীতিক সেদিন বাংলাদেশে নয় মাসে সংঘটিত নির্যাতনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানবিষয়ক মার্কিন নীতির যথার্থতাকে প্রশ্ন করেন। যে নীতির বলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দোসররা নির্যাতন, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এদিকে বাংলাদেশের ভেতর তরুণেরা যুদ্ধ করার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। কিন্তু সেগুলো ছিল পুরোনো ও অকার্যকর। মুক্তিবাহিনী মূলত রিকশা, বাস ও হেঁটে মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো অত্যাচারী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শপথ নেয়। তাদের বিজয়ের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ভারতের ওপর নৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেলে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখার আগ পর্যন্ত সংকটের ভয়াবহতা আঁচ করতে পারেননি। শিবিরগুলো ভারতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। সেগুলো একপ্রকার দায়ও হয়ে উঠেছিল। তিনি খোলাখুলি স্বভাবের মানুষ ছিলেন, তাঁকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়। সারা দুনিয়া বিশ্বাস করেনি যে এত পরিমাণ শরণার্থী ভারতে এসেছে।

ইন্দিরা গান্ধী এক জরুরি সভা তলব করেন। পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য এতে তিনি জেনারেল স্যাম মানেকশকেও আমন্ত্রণ করেন। কিন্তু ভারত কিছু করার আগেই ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ভারতের সীমান্ত-সংলগ্ন বেশ কিছু বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়।

চূড়ান্ত যুদ্ধ। জেনারেল স্যাম মানেকশ ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর পদাতিক বাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আমি ছিলাম এই বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী প্রথম কলামের সঙ্গে। যশোর রোড হয়ে খুলনার দিকে আমরা এগোচ্ছিলাম। পাকিস্তানি বাহিনী আগেই বোমা মেরে জায়গাটা ধ্বংস করে দিয়েছিল। প্রথম ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ বিনা বাধায় অতিক্রম করলাম। খুলনা সেক্টরের কাছাকাছি যাওয়ার পর আর্টিলারির গোলা ও শূন্যে নানা বিস্ফোরণ ঘটতে থাকল। বেতারের মাধ্যমে তথ্যদাতাদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী শত্রুসেনার অবস্থান জেনে যায়। তারা শত্রুর কাছাকাছি চলে আসছিল। আমাদের অবস্থান চিহ্নিত হয়ে যায়, আমরা ওত পেতে থাকা শত্রুর আক্রমণের মুখে পড়ি। শূন্যে বিস্ফোরণের কারণে অনেকে হতাহত হয়। আমরা চলাচল করছিলাম খোলা আকাশের নিচে। আমি আহত সেনাদের নিয়ে যাওয়ার বেশ কিছু ছবি তুলি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সে রকম কটি ছবি আমি তুলতে পারতাম? এরপর তো আমরা নিজেরাও আহত হয়ে যেতে পারতাম।

যে মেজর আমাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন, তিনি আমাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চাইছিলেন। ‘নিরাপদ স্থানের’ দিকে আমরা প্রায় আধা কিলোমিটার দৌড়ালাম। এর মধ্যে একটি চায়ের দোকান দেখে স্বস্তি পেলাম। চা দিতে বলে আমি বিস্কুট খেলাম। বেশ ভালো লাগছিল। যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, কিছু ছবি তুললাম, আবার পালিয়েও এলাম! আমি হাত-পা ছড়িয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। আর ঠিক তখনই একটি বুলেট শাঁ করে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। মেজর চিত্কার করে শুয়ে পড়তে বললেন। আমি তা-ই করলাম। আমার পাশ কাটিয়ে আরেকটি বুলেট চলে গেল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে চায়ের দোকানটায় চলে এলাম। দোকানি বলল, রেল লাইনের ওই পারে, আধা কিলোমিটার দূরেই, পাকিস্তানি বাহিনী আছে।

এই যুদ্ধ ছিল সম্ভবত সবচেয়ে স্বল্প মেয়াদি প্রকৃতির। এত অল্প সময় যুদ্ধ করে কোনো জাতি জয়লাভ করেছে, এমন নজির সম্ভবত নেই। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে ফুঁসে উঠেছিল, সে কারণেই হয়তো তা সম্ভব হয়েছে। ভারতীয় বিমানসেনারা বাকি কাজটুকু সেরে দেন। যুদ্ধের ১২তম দিনে, অর্থাত্ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯৩ হাজার সেনা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে আমি ঢাকায় যাই, একই সঙ্গে বিজয়ের আনন্দ ও পরাজয়ের অপমান দেখার জন্য। ইন্দিরা গান্ধীর সাহসী সিদ্ধান্ত, জেনারেল মানেকশর অসাধারণ যুদ্ধশৈলী ও জেনারেল জ্যাকবের কৌশলগত পরিকল্পনার ফলে দুঃস্বপ্নের মতো এই নয় মাসের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। পৈশাচিকতা, ধর্ষণ, নির্যাতন, বাংলাদেশি জনগণের অমানবিক নিপীড়ন—এসবের বিনিময়ে তারা স্বাধীনতা অর্জন করে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন