পূর্বকথা

default-image

১৯৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষাবলম্বন করে, এ কথা আমরা সবাই জানি। আমরা এও জানি, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দূতালিতে চীনের সঙ্গে গোপন আঁতাত নির্মাণে ব্যস্ত মার্কিন প্রশাসন সে সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিকার গণহত্যার কোনো নিন্দা জ্ঞাপন করেনি। এমনকি সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টাও সে করেছে। তা ছাড়া জাতিসংঘের ভেতরে ও বাইরে বাংলাদেশ প্রশ্নেও আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সরকারি নীতির প্রকৌশলী ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। নিক্সন নিজেও প্রথম থেকেই সে নীতির প্রতি জোর সমর্থন দিয়ে এসেছেন।

কিন্তু মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট, বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে যার ভূমিকা মুখ্য, বাংলাদেশ প্রশ্নে নীতিগতভাবে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ কূটনীতিক ও বিভাগীয় কর্মকর্তারা পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার কেবল বিরোধিতাই করেননি, হোয়াইট হাউস সে সময় যে পাকিস্তান-তোষণ নীতি গ্রহণ করে, তার বিরুদ্ধে কার্যত অসহযোগিতামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিল রজার্স নিজে খানিকটা মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করলেও ইয়াহিয়াকে তোষণ করে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না, স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই মনোভাব তিনি সমর্থন করেন। কংগ্রেসে সংখ্যাগুরু ডেমোক্রেটিক সদস্য ও মার্কিন তথ্যমাধ্যম পাকিস্তানের প্রতি যে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করে, তার সঙ্গে এই ভূমিকা সঙ্গতিপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

৬ মার্চ ১৯৭১

৬ মার্চ সকাল ১১: ৪০ থেকে দুপুর ১২: ২০ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের আন্তঃবিভাগীয় কমিটি ‘সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ’ এসআরজি-এর সভা ডেকেছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তিনি এই গ্রুপের সভাপতি। সে বৈঠকে কিসিঞ্জার স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন বাংলাদেশে সামরিক হামলা শুরু হলে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের সমালোচনা করবে না। কিন্তু কেন, সে গুমর সে বৈঠকে পরিষ্কার হলো না।

প্রধানত পররাষ্ট্র ও যুদ্ধ মন্ত্রণালয় এবং সিআইএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে রিভিউ গ্রুপ গঠিত হয়েছিল। এর কাজ ছিল জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ প্রদান এবং অনুসৃত রণকৌশলের আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়। খুব নিয়মিত যে এই গ্রুপের সভা বসত তা নয়। জরুরি কোনো বিষয়ে মতবিনিময়ের প্রয়োজন পড়লে অথবা তার সহকর্মীদের কাছে প্রেসিডেন্টের কোনো নির্দেশনামা পৌঁছে দিতে হলে কিসিঞ্জার এই গ্রুপের ব্যবহার করতেন। পরিস্থিতি সংকটের আকার ধারণ করলে জরুরিভাবে তলব পড়ত এই গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। এদের নিয়ে গঠিত হতো ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ ডব্লিউএসএজি।

ঢাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে আসছে, ঢাকায় মার্কিন কনসাল-জেনারেল আর্চার ব্লাডের দপ্তর থেকে পাঠানো রাজনৈতিক প্রতিবেদনে গোড়া থেকেই সাবধান করা হচ্ছিল।

গোপন বা ক্লাসিফাইড এসব প্রতিবেদন পড়ার সুযোগ পেতেন হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বৈদেশিক নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন। হেনরি কিসিঞ্জার তাদের একজন। প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বৈদেশিক নীতি-নির্ধারণে তার ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ছিল, যদিও সে নীতি বাস্তবায়নে ও পররাষ্ট্র বিষয়ে দৈনন্দিন কার্যকলাপে নেতৃত্ব দিতেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স।

৬ মার্চের বৈঠকে কিসিঞ্জার জানালেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নিক্সনের এক ধরনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে। ইয়াহিয়া ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত হয়, এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি অনাগ্রহী হবেন। নিক্সন-ইয়াহিয়ার ব্যক্তিগত সখ্য নিয়ে এই পর্যায়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের গোপন দূতালিতে কিসিঞ্জার যে নিক্সনের চীন ভ্রমণের ব্যবস্থা করছেন, সে কথাও তাদের কারো জানা ছিল না। বৈঠকে প্রধানত স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৈরি করা ‘পেপার’-এর ভিত্তিতে আমেরিকার সামনে কোন পথ খোলা আছে, তা নিয়েই আলোচনা হয়। সৈন্য ব্যবহার না করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী সচিব এলেকসিস জনসন সম্ভাব্য ‘অপশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিসিঞ্জারের উত্তর ছিল, এই সময় আমাদের এমন কিছু করা ঠিক হবে না যার ফলে ইয়াহিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে কোনো রকম চিড় ধরে। ‘তার ক্ষমতা যেমনই হোক না কেন, তাকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করাই আমাদের জন্য ঠিক হবে।’

পূর্ব পাকিস্তানে বল প্রয়োগ না করার ব্যাপারে ইয়াহিয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে পাঠাতে পর্যন্ত কিসিঞ্জার রাজি হলেন না। ‘ওকে পাঠিয়ে কী হবে, ইয়াহিয়া তার কথার থোড়াই কেয়ার করবে’, বলে তিনি মন্তব্য করলেন। ‘এই মুহূর্তে একদম কোনো কিছু না করা’র সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে সে বৈঠক শেষ হলো।

বিজ্ঞাপন

৬ এপ্রিল ১৯৭১

ঢাকায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে গণহত্যা শুরু হয়েছে, সে খবর বিদেশী সাংবাদিকরা ২৫ মার্চ রাত থেকেই দেওয়া শুরু করেন। গণহত্যা শুরুর খবর দিয়ে ২৭ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমস তার নিজস্ব সংবাদদাতা সিডনি শ্যানবার্গের পাঠানো এক দীর্ঘ প্রতিবেদন গুরুত্ব সহকারে প্রথম পাতায় ছাপে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর পত্রিকাতেও সে খবর ছাপা হয়। ঢাকায় মার্কিন কনসাল-জেনারেল আর্চার ব্লাডও প্রায় প্রতিদিন সে গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ পাঠাতে থাকেন। তার কাছ থেকে একটি দীর্ঘ বার্তা ওয়াশিংটনে এসে পৌঁছায় ২৮ মার্চ। তাতে ব্লাড প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সেনা কার্যকলাপকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ (সিলেকটিভ জেনোসাইড) বলে অভিহিত করে তার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ‘পাক বাহিনীর কার্যকলাপে আমরা বাকহীন ও স্বতন্ত্র হয়ে পড়েছি’, ব্লাড লিখলেন। মন্ত্রণালয়ের কাছে তিনি দাবি জানালেন, পাকিস্তানি সরকারের মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস না করে ব্যক্তিগতভাবে হলেও, মার্কিন সরকারের উচিত ইয়াহিয়াকে তার প্রতিবাদ জানানো। একদিন পর দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং আরো কঠোর ভাষায় নিজ স্বাক্ষরসহ একটি বার্তা পাঠালেন। তিনি লিখলেন, এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে দ্রুত, সর্বসমক্ষে এবং কোনো রাখঢাক ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে নির্যাতনের নিন্দা করা। পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধেরও পরামর্শ দিলেন তিনি। মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে এই নির্বিকার হত্যাকাণ্ড চলছে এবং এই সামরিক সন্ত্রাসের সঙ্গে আমেরিকা যুক্ত, সে সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে কিটিং তার আপত্তির কথা বললেন। ‘রাজনীতি নয়, আদর্শ সমুন্নত রাখার সময়এখন’, তিনি লিখলেন।

ঢাকায় গণহত্যা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার ভেতরে ২৬ মার্চ অপরাহ্নে কিসিঞ্জার অ্যাকশন গ্রুপের বৈঠক ডাকলেন। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠল। এবারো কিসিঞ্জার সেই আগের কথাই বললেন। না, এ নিয়ে এখন কথা বলার প্রয়োজন নেই, ইয়াহিয়া চটে যায় এমন কিছুই করা যাবে না। কিসিঞ্জার বললেন, ‘দুপুরের খাবারের আগে এ নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এখন কোনো কিছুই তিনি করতে চান না। পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো করায় তিনি উত্সাহ দিয়েছেন এমন অভিযোগের মুখোমুখি তিনি হতে চান না। খুব ‘অ্যাকটিভ’ এমন কোনো নীতি তিনি (এই মুহূর্তে) অনুসরণ করতে চান না।

default-image

২৮ ও ৩০ তারিখে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মধ্যে এ নিয়ে টেলিফোনেও মতবিনিময় হয়। তাতে নিক্সন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে নাইজেরিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী বায়াফ্রার সঙ্গে তুলনা করে বললেন, বাঙালিদের শাসন করা বরাবরই কঠিন। ‘কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো মাথা ঠাণ্ডা রাখা। (ওদের ব্যাপারে) মাথা গলিয়ে আমাদের কোনো লাভ হবে না।’ কিসিঞ্জার তার সে কথায় একমত হয়ে বললেন, (কিছু করতে গেলে) পশ্চিম পাকিস্তানিদের চটানো হবে। তা করে পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছ থেকেও আমরা কোনো ফায়দা পাব না। আর ভারতীয়রা তো বরাবরই অকৃতজ্ঞ।’

পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা নিয়ে চুপ থাকার ফলে স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভেতরে কোনো রকমের প্রতিবাদ উঠবে, কিসিঞ্জার বা নিক্সন কেউই ঠাহর করে ওঠেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সও এ ব্যাপারে তাদের কোনোরকম সাবধান করে দেননি। কিন্তু নাটকীয় একটি ঘটনা ঘটল ৬ এপ্রিল। এদিন ঢাকায় মার্কিন কনসাল-জেনারেল অফিসের মোট ২০ জন সদস্য যৌথভাবে পাঠানো এক টেলিগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের নীরবতার প্রতিবাদ করে তাদের ‘ভিন্নমত’ প্রকাশ করলেন। ১৯৬৯-এর জানুয়ারিতে এক নির্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স সকল কূটনীতিক যাতে খোলামেলাভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে, সে জন্য একটি ‘ডিসেন্ট চ্যানেল’ খোলার কথা বলেছিলেন। ঢাকার কূটনীতিকরা এই চ্যানেলের সুযোগ গ্রহণ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, গণহত্যা সত্ত্বেও নীরব থাকার মার্কিন নীতিকে তারা নৈতিকভাবে বা জাতীয় স্বার্থে কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারেন না।

‘আমাদের সরকার গণতন্ত্রের দমন ও নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার তার নিজের নাগরিকদের পর্যন্ত রক্ষা করতে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ একই সময়ে তারা পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারকে আগ বাড়িয়ে সমর্থন জুগিয়েছে এবং তাদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে যে আন্তর্জাতিক নিন্দা হয়েছে, তার ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাসে উদ্যোগী হয়েছে।’ এই নীতিকে তারা ‘নৈতিক দিক দিয়ে দেউলিয়া’ বলে উল্লেখ করলেন।

একই দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর-পূর্ব এশিয়া ব্যুরোর সাতজন, গোয়েন্দা ও বিশ্লেষণ বিভাগের একজন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে পাওয়া এই ‘ভিন্নমত’ জ্ঞাপনকারী বার্তার সঙ্গে তাদের ঐকমত্যের কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সকে জানিয়ে দেন। ১২ এপ্রিল ঢাকা থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের পাঠানো আরেকটি যৌথ তারবার্তায় দাবি করা হলো, পাকিস্তানে সব মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া হোক, কারণ ‘পাকিস্তান এই সাহায্য পাওয়ার যোগ্য নয়।’

ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিকদের এই ‘বিদ্রোহ’ হোয়াইট হাউসের জন্য একদম অভাবিত ছিল। নিক্সন, কিসিঞ্জার, এমনকি রজার্স পর্যন্ত এ বার্তা পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বার্তাটি ‘অতিগোপনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত না করে ‘নিয়ন্ত্রিত বণ্টনের জন্য’ প্রেরণ করা হয়। কিসিঞ্জার ধরে নেন বার্তাটি যাতে ফাঁস হয়ে যায়, সে জন্যই তাকে ‘অতি গোপনীয়’ সিল দিয়ে পাঠানো হয়নি। কিসিঞ্জারের সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডিকে নিয়ে। উদ্বাস্তু বিষয়ক সাবকমিটির সবচেয়ে উদারনৈতিক সদস্য তিনি, অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিনি পাকিস্তানি হামলার নিন্দা করেছেন। এই বার্তা তার হাতে পৌঁছালে তিনি তুলকালাম কাণ্ড করে ছাড়বেন, তা নিশ্চিত। ৬ এপ্রিল সকালে টেলিফোনে রজার্স ও কিসিঞ্জার সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাপারটা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে। এমনকি নিক্সনকেও এখনি জানানো হবে না।

এক সপ্তাহ পর ১২ এপ্রিল, ঢাকা থেকে পাওয়া জরুরি বার্তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে নিক্সন-কিসিঞ্জারের কথা হলো। ঢাকায় কনসুলেটের কর্মকর্তাদের বার্তা প্রেরণকে কিসিঞ্জার ‘খোলাখুলিভাবে বিদ্রোহ’ বলে উল্লেখ করলেন। কিসিঞ্জার তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলিতে যদি আমেরিকা এখন জড়িয়ে পড়ে, ‘তাহলে পাকিস্তান আমাদের ওপর ক্ষেপে যাবে।’ নিক্সন তার সঙ্গে একমত হলেন। ‘ঘটনার মাঝখানে গিয়ে যদি আমরা পড়ি তাহলে সেটি ভীষণ ভুল হবে।’ ভিয়েতনামের গৃহযুদ্ধে আমেরিকার হস্তক্ষেপকে যারা সমালোচনা করেছে তাদের কথা উল্লেখ করে নিক্সন বলেন, ‘ওই হারামজাদারাই এখন আবার আমাদের এই গৃহযুদ্ধে নাক গলাতে বলছে।’ কিসিঞ্জার ফোড়ন কেটে বললেন, সেসব লোক শুধু ‘আদর্শগত কারণে’ পাকিস্তানে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধের দাবি তুলেছে। ভারতের সমালোচনার কথাও বললেন কিসিঞ্জার। ‘ওরা চেঁচাচ্ছে, কারণ ভারতীয়রা নিজেদের বাঙালিদের নিয়েই ভয়ে অস্থির। আসলে ভারতীয়রা স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান চায় না, কারণ তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা নিজেদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলবে।’

ব্লাড তার স্মৃতিকথা দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ গ্রন্থে (ইউনিভার্সিটি প্রেস, ঢাকা ২০০২) এই বার্তা প্রেরণের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন। যে ২০ জন কর্মকর্তা তাতে স্বাক্ষর করেন তাদের তালিকাকে ‘রোল অব অনার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, বার্তাটি না পাঠাতে বা তার ভাষা আরেকটু নরম করতে হয়তো তিনি পারতেন। কিন্তু তার কোনোটাই তিনি করেননি, কারণ ‘এই সব কর্মচারীর মতো আমিও (পররাষ্ট্র) বিভাগ পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ না করায় বিস্মিত ও আহত হয়েছিলাম।’ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণে পাকিস্তানি ওকালতির খবর তারা কেউ জানতেন না, ব্লাড সে কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু সে কথা জানলে কি ভিন্নমত প্রকাশ থেকে তারা বিরত থাকতেন? ‘না, আমরা বিরত থাকতাম না বলেই আমার ধারণা’, তিনি লিখেছেন। ওয়াশিংটনে কর্তারা তাদের ওপর কী পরিমাণ ক্ষেপেছে, সে কথা ব্লাড অনেক পরে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে আসার পর জানতে পারেন। কিসিঞ্জারকে নিয়ে লেখা রজার মরিসের বই আনসার্টেন গ্রেটনেস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র বিভাগের উপমন্ত্রী জোসেফ সিসকো কিসিঞ্জারের সঙ্গে এই ‘বিদ্রোহ’ নিয়ে কথা বলেন। কিসিঞ্জার তাকে সরাসরি জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের ব্যাপারে প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনের কোনো আশা নেই। যারা ভিন্নমত পোষণ করছে, তাদের ‘সোজাপথে’ আনার নির্দেশ দিলেন তিনি। ‘ভিন্নমত প্রকাশের’ জন্য ব্লাডকে কড়া মূল্য দিতে হয়। কিসিঞ্জার নিজে হোয়াইট হাউস ইয়ার্স-এ স্বীকার করেছেন, ক্ষিপ্ত নিক্সন ব্লাডকে ঢাকা থেকে বদলির নির্দেশ দেন। ব্লাড লিখেছেন, পরবর্তী ছয় বছর—যতদিন কিসিঞ্জার ক্ষমতায় ছিলেন, তাকে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় বদলি করে প্রধানত প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ করা হয়। সময়টি তার জন্য কষ্টের ছিল, কিন্তু সহকর্মীদের সমর্থনে তা সহনীয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ব্লাড তার ‘সাহসিকতা ও সৃজনশীল ভিন্নমতে’র জন্য আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার লাভ করেন।

কিসিঞ্জার তার গ্রন্থে স্বীকার করেছেন, পাকিস্তানিদের হাতে গণহত্যার খবর চারদিকে রটে গেলে তার সমালোচনা না করে আমেরিকার চুপ করে থাকার কথা নয়। গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনাকে তিনি ‘জাস্টিফায়েড আউটরেজ’ বলে মেনে নিয়ে লিখেছেন: ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শক্তি ব্যবহার করছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু পাকিস্তান ছিল আমাদের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণে একমাত্র পথ। একবার সে পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথ নির্মাণে হয়তো মাসের পর মাস লেগে যেত।’

অন্যকথায়, তার কূটনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে একটি গণহত্যা হজম করতে, এমনকি তার পক্ষাবলম্বন করতেও কিসিঞ্জারের আপত্তি ছিল না। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণ আমেরিকার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে খুব গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা ঠিক হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান সে কাজে একমাত্র সূত্র ছিল, এ কথা মোটেই ঠিক নয়। ১৯৭১-এ মার্কিন উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ক্রিস্টোফার ভ্যান হলেন। এশিয়ান সার্ভে (এপ্রিল ১৯৮০) পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে তিনি লিখেছেন: চীনের সঙ্গে দূতালিতে পাকিস্তানই একমাত্র সূত্র ছিল তা সত্য নয়। আমেরিকা অনায়াসে রুমানিয়ার মাধ্যমে সে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারত। ১৯৬৯ সাল থেকে এই দুই দেশের মাধ্যমেই তেমন চেষ্টা চলছিল। ভ্যান হলেন দাবি করেছেন, নিক্সন বরাবরই ভারতবিদ্বেষী। ১৯৬৭-তে তার ভারতভ্রমণের সময় যে শীতল সংবর্ধনা তিনি দিল্লিতে পান, সে কথা তিনি ভোলেননি। অন্যদিকে ১৯৬৯-এ পাকিস্তান ভ্রমণে এসে সামরিক একনায়ক ইয়াহিয়া তাকে যে উষ্ণ আতিথেয়তা দেখান, তাতে তিনি মুগ্ধ হন। সে সফরকালেই নিক্সন ইয়াহিয়াকে চীনের সঙ্গে আমেরিকার গোপন সূত্র হিসেবে কাজে আমন্ত্রণ জানান। ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা বাঙালি বুদ্ধিজীবী জি ডব্লিউ চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে ভ্যান হলেন লিখেছেন, নিক্সনের কাছ থেকে এমন অনুরোধ শুনে ইয়াহিয়া আনন্দে আটখান হয়েছিলেন। পরের বছর ওয়াশিংটনে ইয়াহিয়া বেড়াতে এলে নিক্সন তাকে আশ্বাস দেন, পাকিস্তানের প্রতি তার চেয়ে অধিক বন্ধুভাবাপন্ন কেউ হোয়াইট হাউসে স্থান পায়নি ।

বিজ্ঞাপন

২৮ এপ্রিল ১৯৭১

বাংলাদেশ প্রশ্নে হোয়াইট হাউস এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভেতর বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সে কথা আরো স্পষ্ট হলো এপ্রিলের মাঝামাঝি। এ সময় স্টেট ডিপার্টমেন্ট হোয়াইট হাউসের পূর্ব সম্মতি ছাড়াই পাকিস্তানে সব ধরনের সামরিক সাহায্য বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ব্যাখ্যা ছিল, গৃহযুদ্ধের ফলে চলতি উন্নয়ন কর্মসূচিসমূহ সেখানে আর কার্যকরভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়। কিসিঞ্জার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই ব্যাখ্যাকে ‘ইনজিনিয়াস’ বলে উপহাস করেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিপরীত বলে উল্লেখ করে কিসিঞ্জার লিখেছেন, যারা প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার বিষয়ে জানতেন না, তাদের উচিত ছিল এ নিয়ে খোঁজ-খবর করা। ইয়াহিয়ার সাহায্যে তার চীন ভ্রমণ তখন খুব ঘনিয়ে এসেছে। ঠিক এই সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই সিদ্ধান্ত কিসিঞ্জারকে খুবই বিচলিত করে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে বিরোধ জটিল হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের পাকিস্তানের প্রতি সদয় নীতিতে ক্ষিপ্ত, সেসব বিবেচনা মাথায় রেখে কিসিঞ্জার ২৮ এপ্রিল নিক্সনের জন্য ৬ পাতার এক ‘অপশন পেপার’ তৈরি করে তার হাতে পৌঁছে দিলেন। এর আগে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে তিনি একটি পলিসি পেপার তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তাদের সব প্রস্তাবই ‘আজগুবি’ আখ্যা দিয়ে কিসিঞ্জার সেসব বাতিল করে দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের স্টাফদের দিয়ে নিজের পছন্দমতো পলিসি পেপার লিখলেন। পাকিস্তানকে তার কথা শুনতে বাধ্য করার মতো যথেষ্ট অর্থনৈতিক শক্তি আমেরিকার আছে, এ কথা উল্লেখ করে সে পেপারে কিসিঞ্জার আমেরিকার জন্য তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প পথের কথা লিখলেন। সেগুলো হলো : ১. পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার গৃহীত ব্যবস্থা পুরোপুরি সমর্থন করা। ২. সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। ৩. যুদ্ধ বন্ধে ইয়াহিয়াকে সমর্থন এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনে ব্যবস্থা গ্রহণ।

কিসিঞ্জার পরামর্শ দিলেন সবচেয়ে উত্তম হলো তৃতীয় পথটি, কারণ এই পথ পাকিস্তান ও আমেরিকার স্বার্থের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। নিক্সন তার নিরাপত্তা উপদেষ্টার প্রস্তাবিত তিন নম্বর ‘অপশন’ অনুসরণেই সম্মত হলেন। স্টেট ডিপার্টমেন্ট খুশি হবে, এই বিবেচনায় তিনি পাকিস্তানে শুধু খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বিধ্বংসী নয় এমন অস্ত্র প্রেরণে সম্মতি জানিয়ে একটি নির্দেশনামাও জারি করলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাপারে তার আসল মনোভাব কী, তা নিয়ে যেন স্টেট ডিপার্টমেন্টে কেউ দ্বিধান্বিত না হয়, সে জন্য কিসিঞ্জারের তৈরি পলিসি পেপারে নিজের হাতে নিক্সন লিখে দিলেন, ‘টু অল হ্যান্ডস্। ডোন্ট স্কুইজ ইয়াহিয়া অ্যাট দিস টাইম। আরএন।’ ‘ডোন্ট’ শব্দটির ওপর জোর দেওয়ার জন্য নিক্সন তার নিচে তিনবার দাগ টেনে দিলেন। কিসিঞ্জার পরে লিখেছেন, নিক্সনের স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্টের নির্দেশিত নীতি বাস্তবায়নে তিনটি বাধা প্রবল হয়ে দেখা দিল: ভারতের অনুসৃত নীতি, দেশের ভেতর এ প্রশ্নে বিতর্ক এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের বেয়াড়াপনা।

চীনের সঙ্গে আঁতাতের একটি চেষ্টা চলছে, এ কথা স্টেট ডিপার্টমেন্টের অনেকে জানলেও কিসিঞ্জার যে পাকিস্তানের সাহায্যে পিকিং যাচ্ছেন, সে কথা কাকপক্ষীও জানত না। পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে সে কথা জানানো হলো সফরের ঠিক আগে আগে, কিন্তু বলে দেওয়া হলো এ কথা কারো কাছে যেন তিনি ফাঁস করে না দেন। কিসিঞ্জার সফর শেষ করে আসার পর ১৫ জুলাই প্রথম সে খবর প্রচারিত হলো। স্বাভাবিকভাবেই খবরটি শুনে বিশ্ব হতবাক হয়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্টও এই প্রথমবার জানতে পারল ইয়াহিয়ার সঙ্গে নিক্সনের ‘স্পেশাল রিলেশনশিপ’-এর যে কথা কিসিঞ্জার বারবার বলে এসেছেন, তার মানে কী।

এই ঘোষণার পর তার সতীর্থদের আরো একটি প্রতিক্রিয়ার কথা লিখেছেন ভ্যান হলেন। তারা ভাবলেন, যেহেতু চীনের সঙ্গে একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, এখন থেকে ওয়াশিংটনের জন্য ইয়াহিয়া বা অন্য কারো দূতিয়ালির কোনো প্রয়োজন পড়বে না। ইসলামাবাদের ‘জিম্মি’ না হয়ে স্বাধীনভাবে আমেরিকা তার জাতীয় স্বার্থ অনুসারে বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করতে পারবে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তারা বুঝলেন কিসিঞ্জার ও নিক্সন পাকিস্তানের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে আগের মতোই একগুঁয়ে রয়ে গেছেন।

কিসিঞ্জার তার স্মৃতিকথায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট যেভাবে প্রেসিডেন্টের (এবং তার) নির্দেশ নির্বিকারভাবে অমান্য করেছে, তাতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভারত-পাকিস্তানকে নিয়ে হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিরোধ ১৯৭১-এর গ্রীষ্মে যেমন তীব্র হয়ে ওঠে, অন্য কোনো বিষয়ে তা কখনোই হয়নি (একমাত্র ব্যতিক্রম কম্বোডিয়ার প্রশ্ন), এ কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন: “নীতি বাস্তবায়নের সব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করত স্টেট ডিপার্টমেন্ট। নিক্সন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন যাতে তার অনুসৃত নীতি প্রতিপালিত হয় তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল একদম খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে (তাদের সঙ্গে) সারাক্ষণ কোন্দল লেগেই আছে। ব্যাপারগুলো এত সামান্য বা এত টেকনিক্যাল যে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলা অযৌক্তিক। কিন্তু সেসব খুঁটিনাটি বিষয়ই জমা হতে হতে শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারক হয়ে পড়ত। নিক্সন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (রজার্স) সঙ্গে এই সব ক্ষুদ্র ‘অপারেশনাল’ বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না। স্টেট ডিপার্টমেন্ট নিজের খুশিমতো প্রেসিডেন্টের নির্দেশ ব্যাখ্যা করত। ফলে যা দাঁড়াত তা হলো প্রেসিডেন্টের নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে মতভেদের একটা বড় কারণ, উপমহাদেশে আমেরিকার অগ্রাধিকার নির্ধারণে তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বরাবর বলে এসেছে, পাকিস্তান নয়, ভারতের সঙ্গেই আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ জড়িত। ওয়াশিংটনের উচিত সেই স্বার্থ সংরক্ষণে মনোযোগী হওয়া। ১৯ এপ্রিল রিভিউ গ্রুপের বৈঠকে সে সুপারিশ জানিয়ে একটি বিশ্লেষণ হোয়াইট হাউসের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল। নিক্সন ও কিসিঞ্জার উভয়েই সেই সুপারিশ এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারা কাজ করে তারা সবাই ভারতের দালাল সফ্ট্ অব ইন্ডিয়া।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে মতভেদের আরেক কারণ: পাকিস্তানের সামরিক সরকারের ওপর কোনো রকম চাপ প্রয়োগে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অনাগ্রহ। কিসিঞ্জারের চীন যাত্রার আগে তো বটেই, পরেও ইয়াহিয়া অসন্তুষ্ট হয়, এমন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব উত্থাপনে তারা কোনো আগ্রহ দেখাননি। অথচ স্টেট ডিপার্টমেন্ট বরাবর দাবি করে এসেছে, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান অর্জন করতে হলে ইয়াহিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ভ্যান হলেনের কথায়, ‘প্রাইভেট ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেল’-এর মাধ্যমে সেই চাপ আরোপ সম্ভব ছিল, কিন্তু হোয়াইট হাউস সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি।

এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় পাকিস্তানি লেখক হাসান জহিরের লেখায়। তিনি দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান গ্রন্থে (অক্সফোর্ড ইউ. প্রেস, ইসলামাবাদ, ২০০০) মন্তব্য করেছেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট পাকিস্তানের ওপর কড়া চাপ দিতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু হোয়াইট হাউস সে চাপ দিচ্ছিল খুবই তাচ্ছিলের সঙ্গে। এই উল্টো বার্তার ফলেই ইয়াহিয়া রাজনৈতিক সমঝোতার পথ অনুসরণ না করার সাহস পেলেন।

৩১ জুলাই ১৯৭১

কিসিঞ্জার তার বইতে বারবার দাবি করেছেন, পূর্ব পাকিস্তান যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। তার আসল উদ্বেগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকে নিয়ে। যাতে ভারত পশ্চিম পাকিস্তানকে গিলে না খেতে পারে তা নিশ্চিত করাই ১৯৭১-এ মার্কিন নীতির একটি প্রধান উদ্দেশ্য বলে তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু ভারত পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণ করবে, এ ব্যাপারে এত নিশ্চিত হলেন কোত্থেকে তিনি? কিসিঞ্জার লিখেছেন, মে মাসের গোড়ার দিকে একটি গোপন সূত্র থেকে তারা জানতে পারেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলি কায়দায় পূর্ব পাকিস্তানের ওপর এক ঝটিকা আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু এক পূর্ব পাকিস্তান দখল করে তিনি সন্তুষ্ট থাকবেন না, তার আসল লক্ষ্য পশ্চিম পাকিস্তান। চীন সফর শেষ করে আসার পর সে বিষয়ে কিসিঞ্জার যেন আরো নিশ্চিত হলেন।

‘আমার বিবেচনা, বর্ষার মৌসুম শেষ হতে না হতেই ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করবে। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম যে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যাপারে ইসলামাবাদকে আমরা রাজি করাতে পারব। কিন্তু ভারত আমাদের সে সময়টুকু দেবে কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। যে দেশের অস্তিত্বকে ভারতের অনেকে আপত্তিজনক মনে করে, তাকে ধ্বংস করার এমন সুযোগ (তাদের জন্য) পরে আর নাও আসতে পারে।’

বলা বাহুল্য কিসিঞ্জারের প্রতিটি ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়। যুদ্ধ শুরু হয় শীতের শুরুতে, আক্রমণের সূচনা করে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে ভারত এককভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।

জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ প্রশ্নে নিক্সন-কিসিঞ্জার যে নীতি অনুসরণ করছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী: একদিকে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্টের প্রতি নমনীয় থেকে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে উত্সাহ যোগান; অন্যদিকে আমেরিকায় তাদের পাকিস্তানপন্থি নীতি বিষয়ে যে সমালোচনা হচ্ছিল, তা সামাল দেওয়ার জন্য ভারতকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও মানবিক সাহায্য দেওয়া। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এল কে ঝা-র সঙ্গে হোয়াইট হাউসে এক সাক্ষাতের সময় কিসিঞ্জার উদ্বাস্তুদের সাহায্যের লক্ষ্যে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের কথা বলেছিলেন। জবাবে ঝা ‘পয়সা দিয়ে ভারতকে কেনা যাবে না’ বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের পছন্দসই রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে কলকাতায় খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একাংশের সঙ্গে গোপন সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অন্তরীণাবদ্ধ শেখ মুজিবকে ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সমাধান অসম্ভব, টেস্ট ডিপার্টমেন্টের ভেতরে অনেকে সে কথা ভালোভাবেই জানত। সে কথা উল্লেখ করে ভ্যান হলেন লিখেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে যারা স্টেট ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন, তারা প্রত্যেকে জানতেন হোয়াইট হাউস যে রণকৌশল নিয়েছে, তা সফল হবে না।’

রাজনৈতিক সমাধানের কথা বললেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করার জন্য ইয়াহিয়ার ওপর কোনো চাপ দিতে কিসিঞ্জার প্রস্তুত ছিলেন না। অনেকে আশা করেছিল, তার ইসলামাবাদ সফরকালে তিনি মুজিবের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা খুঁজে দেখবেন। কিন্তু কিসিঞ্জার সে পথেই পা বাড়াননি। [১০ ডিসেম্বর ১৯৭১, মার্কিন সিনেটে এক ভাষণে এডওয়ার্ড কেনেডি মন্তব্য করেন, ‘তার ইসলামাবাদ অবস্থানকালে কিসিঞ্জার (বাংলাদেশ প্রশ্নে) কোনো রকম সমঝোতা করার চেষ্টা তো করেনইনি, সমস্যার আদত কারণ খুঁজে দেখার ব্যাপারেও কোনো উত্সাহ দেখাননি]’

৪ আগস্ট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নিক্সন নিজে তার পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে পড়া নীতির সমর্থনে বক্তব্য রাখলেন। উদ্বাস্তুদের জন্য আমেরিকার সাহায্য অব্যাহত থাকবে, এই আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এ কথাও বললেন, পাকিস্তানের ওপর কোনো প্রকাশ্য চাপ তিনি দেবেন না, কারণ তাতে কোনো লাভ হবে না।

ভারত পাকিস্তান গ্রাস করতে বদ্ধপরিকর, এমন একটি দাবি কিসিঞ্জার বরাবরই করে এসেছেন। আগস্টে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর কিসিঞ্জার আরো নিশ্চিত হন যে, ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করতে যাচ্ছে। নিদেনপক্ষে ‘আজাদ কাশ্মীর’ দখলে সে বদ্ধপরিকর। এই চুক্তিকে কিসিঞ্জার একটি ‘বম্বশেল’ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিশেষজ্ঞরা তার সে ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হননি। ভ্যান হলেন লিখেছেন, এ চুক্তি মোটেই কোনো বম্বশেল ছিল না। এ ধরনের একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে, সে কথা এক বছর আগে থেকেই সবার জানা ছিল। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও এ নিয়ে তেমন কোনো বাড়তি উত্তেজনা দেখা যায়নি।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের চোখে চুক্তিটি ইন্দিরার জন্য অবশ্যই একটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় ছিল। কারণ অভ্যন্তরীণভাবে এই চুক্তির ফলে দেশের ভেতর ইন্দিরা তার অবস্থান আরো পোক্ত করতে সক্ষম হন। পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে চীন ও আমেরিকা তার পক্ষাবলম্বন করবে, এমন একটা ভয় দেশের ভেতরে অনেকের মধ্যেই ছিল। এই চুক্তির ফলে সে ভয় খানিকটা হলেও দূর হলো। ভ্যান হলেন এমন কথাও লিখেছেন, চীনের সঙ্গে আঁতাতের যে গোপন তত্পরতা চলছিল, ভারতের অগোচরে পাকিস্তানের হাত ধরে সে পথে এগোনোর ফলে কিসিঞ্জার ও নিক্সনই যেন ভারতকে জোর করে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দিলেন।

এই চুক্তির ব্যাপারে সিআইএর মূল্যায়ন ছিল খানিকটা ভিন্ন। আগস্টের মাঝামাঝি সিআইএ যে গোপন প্রতিবেদন পেশ করে, তাতে বলা হয় ভারতকে সংযত হতে অধিক কার্যকরভাবে চাপ দেওয়া যাবে, সেই রণকৌশল থেকেই সোভিয়েতরা এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। কিসিঞ্জার সিআইএর এই বিশ্লেষণকে এক কথায় ‘ভ্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এই চুক্তি, তার কথায়, উপমহাদেশে যে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছিল, তাতে যেন ঘৃতাহুতি দিল। সে কথা প্রত্যাখ্যান করে ভ্যান হলেন লিখেছেন, সোভিয়েতরা পাকিস্তানের বিভক্তি সমর্থন করেনি। নিজেদের কৌশলগত কারণেই তারা অবিভক্ত পাকিস্তান ধরে রাখার পক্ষে ছিল। এমনকি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, যখন যুদ্ধের আশঙ্কা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রকট, তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে ভারতকে পরামর্শ দেয়। তাদের আসল ভয় ছিল মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে। বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানকে যদি আমেরিকা ও চীনের ক্যাম্পে ঠেলে দেওয়া হয়, আখেরে তা সোভিয়েতদের জন্য মোটেই ভালো হবে না।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১

যুদ্ধ শুরুর ঠিক মুখে, হোয়াইট হাউসের সিটুয়েশন রুমে অ্যাকশন গ্রুপের এক জরুরি বৈঠক হলো। সে বৈঠকে কিসিঞ্জার ক্রুদ্ধকণ্ঠে পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভারতের প্রতি শক্ত হতে এবং পাকিস্তানের প্রতি নরম হতে নির্দেশ দিলেন। নিক্সনের কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট আমাকে আধঘণ্টা অন্তর অন্তর শাসাচ্ছেন, বলছেন, ভারতের প্রতি আমরা যথেষ্ট কঠোর হচ্ছি না। এই মাত্র তিনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমরা তার নির্দেশ পালন করছি, তিনি সে কথা বিশ্বাস করেন না। তিনি চান পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে থাকতে। তার ধারণা, আমরা যা করছি, সবই তার নির্দেশের বিপরীত।’

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয় ৩ ডিসেম্বর। এ দিন পাকিস্তানি বিমানবহর ভারতের আটটি বিমানবন্দর আক্রমণ করে বসে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই হোয়াইট হাউস আক্রমণকারী হিসেবে ভারতকে চিহ্নিত করে বিবৃতি দেওয়ার জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টকে চাপ দেওয়া শুরু করে। হোয়াইট হাউসের নির্দেশে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতকে এ সময় সব রকম অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ৩ ডিসেম্বর সিনিয়র অ্যাকশন গ্রুপের এক বৈঠকে তাদের এই মতানৈক্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এই সভার প্রস্তুতি হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশে সিআইএ যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত ঘটনাক্রমের একটি তালিকা প্রস্তুত করে। পাকিস্তান ও ভারত একে অপরকে দোষারোপ করলেও ভারতের ওপর বিমান হামলা পাকিস্তানই শুরু করেছিল। সিআইএর প্রতিবেদনে সে কথা বেশ স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। কিসিঞ্জার প্রস্তাব করলেন, জাতিসংঘে ভারতীয় আগ্রাসনের নিন্দা করে একটি বিবৃতি দেওয়া হোক এবং যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হোক। তিনি প্রস্তাব রাখলেন, বিবৃতিতে ইন্দিরার আক্রমণাত্মক বিবৃতি থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হোক তার আগ্রাসী চেহারা প্রমাণের জন্য। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদস্যরা তাতে আপত্তি তুললেন।

নিক্সন নিজেও বুঝতে পারছিলেন তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যে বিবাদ গভীরতর হচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হচ্ছিলেন এই কারণে যে, সরকারের ভেতরের অনেক খবর পত্রপত্রিকায় ফাঁস হচ্ছিল। শুধু তাকে বিব্রত করার জন্যই এসব করা হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি সন্দেহশূন্য ছিলেন। ৬ ডিসেম্বর তিনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠক ডাকলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স ও কিসিঞ্জারের মধ্য বিবাদ মেটানো সে বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল; কিন্তু কিসিঞ্জার তার বইতে উল্লেখ করেছেন, বিবাদ মেটানোর বদলে সে বৈঠকে তাদের দুজনের ‘আদর্শগত ব্যবধান’ আরো সুস্পষ্ট হলো। কিসিঞ্জার লিখেছেন, “(সে বৈঠক শেষ হতে না হতেই) নিক্সন আমাকে নির্দেশ দিলেন যাতে রজার্স হোয়াইট হাউসের ‘লাইন’ মেনে চলে। যেহেতু রজার্স সে কথা নিক্সনের কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি, তিনি ভাবলেন তিনি যা করছেন তা প্রেসিডেন্টের নির্দেশমাফিকই করা হচ্ছে। আমিই বরং নিজের পছন্দমতো ভিন্ন এক লাইন অনুসরণ করার কথা বলছি।”

যুদ্ধ শুরুর পরপরই আমেরিকার ভারতবিরোধী অবস্থান প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হলো। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিরোধিতা সত্ত্বেও শুধু হোয়াইট হাউসের ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে দিল্লির বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে, ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস সে অভিযোগ তুলে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করল। ভারতের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার সাফাই গাইতে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ওয়াশিংটন পোস্ট তাকে ‘হাস্যকর’ বলে বর্ণনা করল। বিপদ সামলানোর জন্য কিসিঞ্জার নিজে হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে এলেন ৯ ডিসেম্বর, তথ্যমাধ্যমকে শুধু এ কথা বোঝতে যে, তিনি বা নিক্সন মোটেই ভারতবিদ্বেষী নন। ‘প্রেসিডেন্ট যে ভারতের নেতাদের তুলনায় পাকিস্তানি নেতাদের বেশি পছন্দ করেন, এমন কথা আমার জানা নেই’ বলে কিসিঞ্জার সেখানে বক্তব্য রাখলেন।

সে কথা যে ডাহা মিথ্যা তা বলাই বাহুল্য। নিক্সনের নিজের হাতে লেখা ‘ঝুঁকে পড়া’ নীতির নির্দেশ তার মোক্ষম প্রমাণ। ভ্যান হলেনও সে কথা উল্লেখ করে কিসিঞ্জারকে মিথ্যাবাদী বলেছেন।

৯ ডিসেম্বর নিক্সন নিজেই সিনিয়র অ্যাকশন গ্রুপের ঊর্ধ্বতন সদস্যদের ডেকে পাঠালেন। উদ্দেশ্য: পাকিস্তান ও ভারত প্রশ্নে স্টেট এবং অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট যাতে তার নীতি অনুসরণ করে, তার কড়া নির্দেশ দেওয়া। কিসিঞ্জার সে বৈঠকের কথা স্মরণ করে লিখেছেন, ‘আমাদের সরকারের ভেতরে ঊর্ধ্বতন সদস্যরা প্রেসিডেন্টের ভারতবিরোধী মনোভাবের বিপক্ষে, এ কথা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে নিক্সন খেপে আগুন হয়ে যান। তিনি বললেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে তার প্রতি ব্যক্তিগতভাবে অনুগত হবে, তা তিনি আশা করেন না, কিন্তু আমেরিকার প্রতি তাদের অনুগত হতে হবে।’

স্টেট ডিপার্টমেন্ট কীভাবে হোয়াইট হাউসের বিরোধিতা করছে, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে কিসিঞ্জার মন্তব্য করেছেন, ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিটিংকে নয়াদিল্লির সমালোচনা করে বিবৃতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে যে বার্তা পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল, সে নির্দেশ পালন করতে লেগেছিল দুই দিন। আর পাকিস্তানের সমালোচনা করে বার্তা পাঠাতে যে নির্দেশ দেওয়া হয় তা পালনে সময় লেগেছিল ২ ঘণ্টা।

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের এই পর্যায়ে, যখন পাকিস্তানের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত, কিসিঞ্জার তার সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলা শুরু করলেন। একদিকে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে এই বলে ধমকে দিলেন যে, সে যদি ভারতকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পরের বছর তার মস্কো ভ্রমণ বাতিল করবেন। অন্যদিকে তিনি তার চীনা বন্ধুদের কাছে তদবির করা শুরু করলেন, তারা যেন পাকিস্তানের পক্ষে সৈন্য ব্যবহারের হুমকি দেয়।

১০ ডিসেম্বর ওভাল অফিসে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মধ্যে এ নিয়ে সরাসরি কথা হলো। নিক্সন জানতে চাইলেন, পাকিস্তানকে সাহায্য করা যায় এমন আর কী করা যায়? তিনি জানতে চাইলেন চীন ভারতকে সাবধান করে দিয়েছে কি না।

কিসিঞ্জার: আজ রাতেই আমি সে কথা জানতে পারব।

নিক্সন: খুব ভালোভাবে চেষ্টা করো হেনরি। অনেক আগেই চীনাদের উচিত ছিল ভারতকে ধমকে দেওয়া। তারা যে আসছে (অর্থাত্ সৈন্য পাঠাচ্ছে) সে কথাটা বলতে হবে। খুব বেশি কিছু না, কয়েক ডিভিশন সৈন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরালেই হবে। বুঝলে না, গোটাকয় ট্রাক, গোটাকয় প্লেন। মানে, প্রতীকী একটা কিছু।

এই আলোচনার একদিন পর, ১১ ডিসেম্বর, কিসিঞ্জার যুদ্ধমন্ত্রী মেল লেয়ার্ডকে নির্দেশ দিলেন আণবিক অস্ত্র সজ্জিত নৌবহর এন্টারপ্রাইজকে বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠাতে। এই নৌবহর কেন পাঠানো হচ্ছে, কী তার উদ্দেশ্য, এ কথা স্টেট ডিপার্টমেন্টকে যেমন বুঝিয়ে বলা হয়নি, তেমনি নৌবহরের কমান্ডার এলমো জামভালটও তার কিছু জানেতন না। ততদিনে ঢাকায় নিয়াজি আত্মসমর্পণে রাজি বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কিসিঞ্জার লিখেছেন, সে খবরে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু তিনি ভাবলেন, এখন পূর্ব পাকিস্তানের পতন হলে ইন্দিরা নির্ঘাত তার সৈন্য সেখান থেকে সরিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান ফ্রন্টে এনে জড়ো করবে। তার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

একদিন পর চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়ার সঙ্গে কিসিঞ্জারের এক গোপন সাক্ষাত্ হলো নিউইয়র্কে। সেখানে তিনি হুয়াকে জানালেন, ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করবে, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। এখন পাকিস্তানকে বাঁচানোর একটাই পথ: ভারতের ওপর সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ।

১২ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে আলেকজান্ডার হেইগের সঙ্গে এক বৈঠকের সময় কিসিঞ্জার খবর পেলেন, হুয়াং হুয়া তার সঙ্গে জরুরিভাবে কথা বলতে চাইছেন। কিসিঞ্জার ভাবলেন, চীন নিশ্চয়ই পাকিস্তানের পক্ষে সৈন্য নামাতে যাচ্ছে, আর সে কথা জানাতেই হুয়ার এই জরুরি তলব। চীন যদি সৈন্য নামায়, সোভিয়েত ইউনিয়নও ভারতের পক্ষে অস্ত্র ধরতে পারে। এ অবস্থায় আমেরিকা কী করবে? কিসিঞ্জার উল্লসিত হয়ে লিখেছেন, নিক্সন কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিলেন, তেমন কোনো পরিস্থিতির সূচনা হলে আমেরিকা তার নতুন মিত্র চীন ও পুরনো বন্ধু পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করবে।

এই সিদ্ধান্তের অর্থ ছিল একটাই: একটি নতুন বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। তিন আণবিক অস্ত্রধারী দেশ সে যুদ্ধে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করবে না, সে কথা আগেভাগে কারোর পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল না। নিক্সন নিজে ১৯৭৫-এ ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি নিয়ে শুনানির সময় স্বীকার করেছিলেন, প্রয়োজন হলে আণবিক অস্ত্র ব্যবহারেও তিনি দ্বিধা করতেন না।

অথচ হাস্যকর ব্যাপার হলো, হুয়া মোটেই পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ শুরুর কোনো সুখবর দেওয়ার জন্য কিসিঞ্জারের সাক্ষাত্ প্রার্থনা করেননি। তিনি শুধু এ কথা বলতে চেয়েছিলেন, জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মেনে নিতে তার সরকার রাজি আছে। কিসিঞ্জার স্বাভাবিকভাবে সে কথা শুনে হতাশ হলেন। দুই দিন পর, কোনো পরাশক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই পূর্ব পাকিস্তানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তান দখলের বদলে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ভেতর দিয়ে ভারত পশ্চিম পাকিস্তানেও যুদ্ধ থামাল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, তার অনুসৃত রণকৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হওয়ার পরেও কিসিঞ্জার দাবি করেছেন, ভারত যে পাকিস্তান আক্রমণ করেনি, তার সব কৃতিত্ব তার ও প্রেসিডেন্ট নিক্সনের। ইন্দিরা মার্কিন নৌবহর দেখে ভয় পেয়ে যান। শীর্ষ বৈঠক বন্ধের যে হুমকি নিক্সন দিয়েছিলেন, তাতে রাশিয়াও ভড়কে গিয়েছিল। ভরাডুবি এড়াতে তারাও ইন্দিরার ওপর চাপ দেয়, ফলে যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি হয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সনও একই রকম দাবি করেছেন। ১৯৭৭-এ ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে নিক্সন বলেন, আমরাই পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলাম, আমরা এ কাজ করেছিলেম এই বিশ্বাস থেকে যে, কাজটি ঠিক ও ন্যায়সঙ্গত।

ভ্যান হলেন কিসিঞ্জারের আত্মম্ভরিতাকে উপহাস করে লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়া প্রশ্নে কিসিঞ্জার-নিক্সন যে রণকৌশল গ্রহণ করেছিলেন তা চিন্তার দিক থেকে যেমন, সম্পাদনের দিক থেকেও ভুলে ভরা ছিল। তার কথায়: দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা কার্যত একটি আঞ্চলিক সমস্যা, অথচ তারা তাকে ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা করে তোলেন। এর জন্য দায়ী ছিল এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ডিনামিক্স বুঝতে তাদের ব্যর্থতা এবং বহির্গত শক্তিগুলোর ভূমিকা বাড়িয়ে দেখার প্রবণতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্য সব প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময় চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত টেনে নেওয়ার জন্য যেন তারা বদ্ধপরিকর ছিলেন।

ভ্যান হলেন লিখেছেন, ভারত যে মার্কিন নৌবহরের ভয়ে বা সোভিয়েত চাপে পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণ করেনি সে কথার কোনো প্রমাণই নেই। বরং এ কথা বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তানে তার রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয় অর্জিত হওয়ার পর এই যুদ্ধ প্রলম্বিত করার কোনো প্রয়োজন ভারতের আর ছিল না। আমেরিকার সামরিক চাপের তুলনায় জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, ভারতের ওপর তার প্রভাব বরং ছিল অনেক বেশি। দুইবার সোভিয়েত ভেটোর পর সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব ওঠে, তাতে ১০৪টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ছিল মাত্র ১১টি দেশ। অন্য কথায়, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই তখন সেখানে একা হয়ে পড়েছিল। এক ভুটান ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশই ভারতকে সে সময় সমর্থন করেনি।

এন্টারপ্রাইজ নৌবহরের উপস্থিতি যে ভারতের ওপর তাও কোনো প্রভাবই ফেলেনি তার একটা প্রধান কারণ, ১৫ ডিসেম্বরের আগে সে নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশই করেনি। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার আগেই পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করে বসে।

শেষ কথা

১৯৭১-এ দক্ষিণ এশিয়ায় যে ভুল ও বিভেদাত্মক রণনীতি আমেরিকা অনুসরণ করে, তার জন্য প্রায় এককভাবে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জার দায়ী। ২৩ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স কার্যত সে কথাই বুঝিয়ে বলেন। কিসিঞ্জার বরাবর দাবি করে এসেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে গোপন সামরিক চুক্তির কারণে তাকে সামরিকভাবে সাহায্য করতে আমেরিকা দায়বদ্ধ। রজার্স বললেন, এ কথা একদমই ঠিক নয়। পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকার কোনো ‘সামরিক অঙ্গীকার’ নেই। তার একপেশে নীতি কার্যকর করতে গিয়ে কিসিঞ্জার সোভিয়েতদের সঙ্গে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক বাতিলের যে যে হুমকি দিয়েছিলেন, তাও সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ছিল বলে তিনি উল্লেখ করলেন।

প্রায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন ডেনিস্ক কক্স, একাত্তরে যিনি কিসিঞ্জারের অন্যতম সহকারী ছিলেন। তার কথায়, কিসিঞ্জার তার নীতির বিজয় হয়েছে বলে যতই চেঁচান না কেন, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ১৯৭১-এ মার্কিন কূটনীতির ভরাডুবি হয়েছিল। এর জন্য দায়ী হোয়াইট হাউস। ভারতের উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়ে তারা একটি আঞ্চলিক সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করতেও দ্বিধা করেনি।

কিসিঞ্জার তার হোয়াইট হাউস ইয়ার্স গ্রন্থে ১৯৭১-এ বাংলাদেশ সমস্যা আলোচনা করার জন্য প্রায় ৮০ পাতা নষ্ট করেছেন। এর অধিকাংশ নিজের অনুসৃত নীতির সাফাই গাওয়া ছাড়া অন্য যে কারণে ব্যয় করেন তা হলো স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতি বিষোদগার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সের প্রতি তার ক্ষোভের কথাও তিনি গোপন রাখেননি। তার প্রস্তাবিত নীতি আরো কঠোরভাবে অনুসৃত হয়নি স্টেট ডিপার্টমেন্টের কারণে, এ কথা উল্লেখ করে কিসিঞ্জার লিখেছেন, কে ঠিক ছিল সেটা বড় কথা নয়। তার নির্দেশিত নীতি প্রশাসন (বিনা তর্কে) মেনে নেবে ও সম্পাদন করবে, একজন প্রেসিডেন্ট এমন প্রত্যাশাই করে থাকেন। কিন্তু নিক্সনের বেলায় তা ঘটেনি। সে জন্য অবশ্য কিসিঞ্জার দায়ী করেছেন প্রেডিসেন্ট নিক্সনকেই। তার কথায়, নিজের নীতি বাস্তবায়নের জন্য যে ইচ্ছাশক্তি চাই, যে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা চাই, নিক্সনের তা ছিল না।

কিসিঞ্জার ১৯৭১-এ নিক্সন ও তার অনুসৃত নীতিকে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ বলতে চেয়েছেন। সামরিক লাভের বদলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই তাদের সে দিন প্রণোদিত করেছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, ১৯৭২ সালে তার দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে নিক্সন জয়লাভের একটি সহজ পথ খুঁজছিলেন। চীনের সঙ্গে আঁতাত ছিল সেই সহজ পথ। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধ করতে নিক্সন এবং কিসিঞ্জার মিত্যাচার ও চাতুরী অবলম্বন ছাড়াও এক নির্মম সামরিক জান্তা আগলে রাখতে দ্বিধা করেননি। সেইমোর হার্স মন্তব্য করেছেন, নীতিকথা আওড়িয়ে নিক্সন পার পাবেন না, কারণ শুধু তার রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই নিক্সন সে দিন এক ভয়াবহ গণহত্যা দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। এই সাধারণ সত্য থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

এই নিষ্ঠুর ও অনৈতিকতার পাশে সে দিন যদি নৈতিক সুস্থতার পরিচয় কেউ দিয়ে থাকেন তা হলো নিক্সন প্রশাসনের পররাষ্ট্র বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সদ্য প্রয়াত আর্চার ব্লাড তাদের একজন। বিলম্বে হলেও ব্লাড ও তার সহকর্মীদের জন্যই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।