default-image

১৯৬১ সালে আমি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হই। ডিসেম্বরের শেষে যোগাযোগ হয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। ১৯৬২ সালের শুরু থেকে অধ্যাপক আবদুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তাঁর পরিচালনায় আমার মার্ক্সবাদ শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ততার শুরু। সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন পরিচালনা পার্টির সেলের সদস্য ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ততার সুযোগে জানুয়ারির শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন ছাত্র আন্দোলনের এই গতিধারা বা পথ সম্পর্কে আমার জানা ও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে যে জানুয়ারির শেষের দিকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে, বিশেষ করে মধুর ক্যানটিনে যাচ্ছি। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে। যদিও আমার তখন জানা ছিল না যে ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ছাত্র আন্দোলন শুরু করার গোপন পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি চলছে। তবে নানা কার্যক্রম দেখে এটা বুঝতে পারছিলাম যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে।

বাষট্টির ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র ধর্মঘট দিয়ে। তার পরের দিন ২ ফেব্রুয়ারি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট। সে মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত এর শক্তি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের আমতলা এবং কার্জন হলের প্রতিদিনের সভা-সমাবেশ ও জমায়েতেই উপস্থিত ছিলাম। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই সেই ব্যাপক ও জঙ্গি ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাগুলো এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

বিজ্ঞাপন

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহজুড়ে ঢাকার পর সারা দেশে ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। আইয়ুব শাহির পতনের আন্দোলনের সূত্রপাত সেই ছাত্র আন্দোলন থেকেই। ষাটের দশকের সেই ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি অনেক প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের—বিশেষ করে ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ, সৃজনী লেখক গোষ্ঠী, ক্রান্তি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী প্রভৃতি—বহুমুখী কার্যক্রম ও আন্দোলন এই ধারাকে বেগবান করেছিল।

আমরা জানি যে ষাটের দশকের শুরু থেকেই ডাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা। এসএম হল ছাড়া প্রায় সব হলেও তাঁদের নেতৃত্ব ছিল। ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ডাকসুর নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে শহীদ দিবস পালন করা হয়েছিল। সে বছর ঢাকাসহ সারা দেশে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হয়েছিল ব্যাপকভাবে। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির চেতনা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। সে বছরের মে মাসে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখের আলোচনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আলোচনায় আসে যে এভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়নের অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই।

এসব ঘটনার পটভূমিতেই ১৯৬১ সালের শেষ ভাগে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সঙ্গে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের বৈঠক হয়। সে বৈঠকে আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দলই একমত হয় যে আইয়ুব খানের সামরিক সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে সামরিক আইন বাতিল, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, রাজবন্দীদের মুক্তি, ছাত্র অধিকারসহ কয়েকটি দাবিতে। দুই দলের নেতৃত্ব একমত হয়েছিল যে ’৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে এবং সেটি হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের মধ্যে যোগাযোগ এবং নেতাদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে ওই রাজনৈতিক বৈঠকের সিদ্ধান্তের পটভূমিতেই।

সে বছরের ৩০ ডিসেম্বর ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে ৩০ জনের মতো ছাত্র, নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে সে সময়ের ছাত্রনেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও রেজা আলী জানিয়েছেন। এর উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ, ছাত্রলীগের নেতা শেখ ফজলুল হক মনি প্রমুখ।

এসব প্রস্তুতির মধ্যেই হঠাৎ ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে গ্রেপ্তার হন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরদিন ৩১ জানুয়ারি ছাত্রদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এই পটভূমিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌথ আন্দোলন গড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি সংগঠনের নেতাদের এক বৈঠক হয় রাতে। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিলেন ছাত্র শক্তি এবং সরকার-সমর্থক এনএসএফের নেতারা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে সে বৈঠক। পরদিন ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘটের ব্যাপারে তাঁরা একমত হতে পারেননি। একপর্যায়ে মোহাম্মদ ফরহাদ এই বৈঠক বাতিল করেন। ছাত্র শক্তি ও এনএসএফের প্রতিনিধিরা চলে গেলে তখনই আবার ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে দ্রুত দ্বিতীয় বৈঠক হয়। সেখানেই ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা সারা রাত জেগে হাতে পোস্টার লিখে ধর্মঘট আহ্বান করেন। পরদিন সকালে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট হয়। সভা হয় আমতলায়। মনে পড়ে, জমায়েত খুব বড় না হলেও উত্তেজনা ছিল। সেই ছাত্র ধর্মঘটের খবর পরদিন কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি।

তারপরও ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয়। আমতলায় ছাত্রসভা শেষে সামরিক আইন ভেঙে ছাত্রদের একটি মিছিল প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। সেই মিছিল ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্যে প্রতিবাদ।

বিজ্ঞাপন

তার পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র বিক্ষোভ অন্যরূপে প্রকাশ পায়। সেদিন আইয়ুব খানের মন্ত্রী মঞ্জুর কাদের একটা নির্ধারিত বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে এসেছিলেন। তিনি বক্তৃতা দিতে উঠতেই ছাত্ররা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও দুই অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে উত্তেজিত প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে তাঁকে হেনস্তা হতে হয়। পরে সেখান থেকে মন্ত্রীকে কোনোমতে বের করে সরিয়ে দেওয়া হলেও বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা মিছিল করেন। সেই মিছিল শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।

৪ ফেব্রুয়ারিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয়। তত দিনে সে আন্দোলন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় আইয়ুব খান ঢাকায় ছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়ার কথা। ছাত্রদের বিক্ষোভের কারণে সেটি বাতিল করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রনেতারা ঘোষণা করেন যে পরদিন ৭ তারিখ সমাবেশ শেষে ছাত্ররা মিছিল করে সামরিক শাসক আইয়ুব খানকে ঘেরাও করবেন। ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভ-আন্দোলনে ভয় পেয়ে সামরিক সরকার পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীকেও রাস্তায় নামায়। পুরোনো হাইকোর্ট ভবন ও কার্জন হলের সামনে সশস্ত্র পাহারা বসানো হয় বলে মনে পড়ে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন বিরাট ছাত্র জমায়েত হয়েছিল কার্জন হলে।

আমার স্পষ্ট মনে পড়ে সেদিনের মিছিলের কথা। পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড ফাঁকি দিয়ে কার্জন হল থেকে বেরিয়ে ক্যানটিনের সামনের গেট দিয়ে বের হয়ে ছাত্রদের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের ভেতর দিয়ে মেডিকেল কলেজ হয়ে বকশীবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড দিয়ে পুরান ঢাকায় যায়। এ সময় বিভিন্ন দোকান থেকে আইয়ুব খানের ছবি নিয়ে রাস্তায় ভাঙচুর করা হয়। সেই জঙ্গি মিছিল জেলখানার সামনে দিয়ে বের হয়ে ইসলামপুর হয়ে সদরঘাটের মোড় পেরিয়ে জনসন রোড, ঢাকা কোর্টের সামনে দিয়ে নবাবপুর রোড, নীলক্ষেত হয়ে শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়েছিল। পুরান ঢাকার মানুষ সবাই সে সময় হাততালি দিয়ে অভিনন্দন ও সমর্থন জানায়।

সেদিন ছাত্র আন্দোলন শক্তিশালী উত্তাল আন্দোলনে রূপ নিলে সরকার ভীত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ছাত্রদের হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পুলিশ পুরো এলাকা ও হলগুলো ঘেরাও করে রাখে। শুরু হয়ে যায় ব্যাপক দমননীতি এবং ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার।

সেদিন পরবর্তী কর্মসূচির জন্য ছাত্রনেতারা ঢাকা হলে বৈঠকে বসেছিলেন। আটকা পড়ে যান তাঁরা। তাঁদের পক্ষে বের হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে এক ফাঁকে কৌশলে হল থেকে তাঁরা বের হয়ে আসেন।

৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আড়াই শতাধিক ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে আন্দোলন ঢাকার বাইরে বরিশাল, কুমিল্লা, সিলেটসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সরকার প্রেসনোটে এই আন্দোলনের জন্য ‘হিন্দু, কমিউনিস্ট ও ভারত’কে দায়ী করে। দশকজুড়েই শাসকগোষ্ঠীর এই প্রচারণা ছিল।

সেই ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রসমাজের বাইরে অন্য পেশাজীবীরা তেমন সংগঠিত ছিলেন না। থাকলেও তাঁরা তেমন সক্রিয় বা উদ্যোগী ছিলেন না। তাই সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজকেই এগিয়ে আসতে হয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ এই আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। তবে আন্দোলনের প্রস্তুতির শুরুর বছর ১৯৬১-৬২, ১৯৬৩-৬৪ ও ১৯৬৭-৬৮-তে ডাকসুতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ প্রাধান্য ছিল ছাত্র ইউনিয়নের। এ ছাড়া অন্য বছরগুলোতেও প্রধান দুটি পদের একটি ছিল ছাত্র ইউনিয়নের কাছে। তবে ১৯৬৮ থেকে ’৭০ সাল পর্যন্ত ডাকসুতে ছিল ছাত্রলীগের প্রাধান্য। ষাটের দশকজুড়েই ডাকসু ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো, ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজগুলোতে ছাত্র ইউনিয়নের প্রাধান্য ছিল।

ইতিমধ্যে আইয়ুব খান নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন ইত্যাদি ঘোষণা করলে এর প্রতিবাদে আবার ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয়। ধর্মঘট আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো ছিল মূলত নতুন সংবিধান বাতিল, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি ও হুলিয়া প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার প্রভৃতি।

সে সময়ের ছাত্র আন্দোলনের প্রভাবে এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতারা উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। তখন সাতজন নেতা একটা বিবৃতি প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এ নির্বাচন বয়কটের কথা ঘোষণা করে। বিরোধিতা সত্ত্বেও আইয়ুব খান ওই নির্বাচন করেন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের কেউ কেউ সে নির্বাচনে অংশও নেন। এই বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খান রাষ্ট্রপতি হন। পূর্ব পাকিস্তানের ৬০ জন সদস্য গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, রাজবন্দীর মুক্তি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবি ইত্যাদি পেশ করেন। ইতিমধ্যে নয় নেতার বিবৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একপর্যায়ে বাষট্টির জুলাইয়ে তিনটি পত্রিকা—ইত্তেফাক, সংবাদ অবজারভারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। সরকারি ও আধা সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ সময়েই ১৯৫৯ সালে গৃহীত শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট কার্যকর করা শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে আন্দোলন শুরু হয় এবং গড়ে ওঠে আন্দোলনকারী ছাত্রদের সংগঠন ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্ট ফোরাম। কিছুটা মতভিন্নতার কারণে শুরুতে আন্দোলনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর যোগাযোগ না থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের যুক্ততা শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

বাষট্টির আগস্ট-সেপ্টেম্বরজুড়ে চলে এই আন্দোলন; ছাত্র ধর্মঘট, সভা-শোভাযাত্রা হতে থাকে। আগস্টের ১৬ তারিখেও সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের ডাক দেওয়া হয়। সেদিনের হরতালের মিছিলে পুলিশ গুলি করলে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। এতে বাবুল ও গোলাম মোস্তফা নামের দুজন মারা যান। আন্দোলন জঙ্গি রূপ নেয়। পুরান ঢাকার রথখোলা-জগন্নাথ কলেজ অঞ্চলজুড়ে আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী তলব করা হয় এবং টিয়ার গ্যাস-গুলিতে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘেরাও করে। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এ ঘটনায় বহুজন আহত ও গ্রেপ্তার হন। প্রতিবাদে তিন দিনের শোক পালন করা হয়। এর ফলে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত হয়।

ডিসেম্বরে এসেও শিক্ষার অধিকার ও রাজনৈতিক দাবি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ধর্মঘট ও আন্দোলন হয়। গ্রেপ্তারও চলে। ১৯ ডিসেম্বর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। পুলিশের বাধা থাকলেও একটি মিছিল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ (তৎকালীন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ), নবাবপুর রোড, বাহাদুর শাহ পার্ক, সদরঘাট, ইসলামপুর, নাজিমুদ্দিন রোড হয়ে শেষ হয় শহীদ মিনারে এসে। ধর্মঘট করেন বেসরকারি শিক্ষকেরাও।

২৭ ডিসেম্বর ঢাকা কলেজে শিক্ষা সপ্তাহ উদ্বোধন করতে গেলে গভর্নর মোনায়েম খানকে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা কালো পতাকা প্রদর্শন করেন। পুলিশের সঙ্গে আবার ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। মনে পড়ে, এই আন্দোলনে যুক্ত আমাদের কয়েকজন বন্ধুকে ঢাকা কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনার প্রতিবাদে আমতলায় বিশাল ছাত্রসভা হয়।

default-image

এভাবে তিনটি পর্বের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ’৬২-র আন্দোলনের বছর। বাষট্টির এই ছাত্র আন্দোলন শাসকগোষ্ঠীকে ভীত করে তোলে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ছাত্র ও সাধারণ মানুষ আইয়ুব খানের সামরিক সরকার এবং শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে রাজি নয়।

আসলে ’৬১ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যে পরিকল্পনা ছিল, ’৬২ সালে তা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়। এটা সম্ভব হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সমঝোতা আর ঐক্যের ফলে। এবং এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন যদি ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালিত হয়, সঠিক নেতৃত্ব থাকে সামনে এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন থাকে, তাহলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সফল হওয়া সম্ভব। এই অভিজ্ঞতা থেকে ’৬২-র এই আন্দোলনের পর থেকে ’৬৩, ’৬৪ ও ’৬৫-পরবর্তী ছাত্র আন্দোলন এবং ’৬৬-তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা দেন। এরপর ’৬৭ ও ’৬৮-তে দেশব্যাপী ব্যাপক গণ-আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের যাত্রা শুরু হয়।

মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো