default-image

ভালুকায় শেষ শহীদ হয়েছে আমার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজিম উদ্দিন। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ভালুকা পাকিস্তানি সেনামুক্ত হয়। পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইলের কালিহাতীর দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও হয়ে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার সময় আফসার বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ সময় ১৪ ডিসেম্বর ‘পাড়াগাঁও জঙ্গল’-এর যুদ্ধে নাজিম উদ্দিনের গলায় একটি গুলি লেগে ফুটো হয়ে বেরিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে পার্শ্ববর্তী ঢাকুরিয়া গ্রামের কুতুব মাস্টারের বাড়িতে আনা হয়। সেখানে আমি আমার সন্তানের সঙ্গে শেষ কথা বলার চেষ্টা করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক তিন দিন পর কলকাতায় সে মারা যায়। আরও অনেক মায়ের মতো আমারও বুক সেদিন খালি হয়ে যায়। সে যুদ্ধে আমার ছেলের সঙ্গে উপজেলার আউলিয়ারচালা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুন্নেছ আলী শহীদ হন। আর ১১০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন ভালুকাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় ছোট-বড় দেড় শতাধিক যুদ্ধে ‘আফসার বাহিনী’র আরও ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

বিজ্ঞাপন

উপজেলার ভাওয়ালিয়াবাজুতে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ২৫ জুন সম্মুখ যুদ্ধে ভালুকায় প্রথম শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আ. মান্নান। একাত্তরের ১৭ এপ্রিল মাত্র কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও কেবল একটি বন্দুক পুঁজি করে মেজর আফসার উদ্দিন আহাম্মেদ গড়ে তুলেছিলেন ‘আফসার বাহিনী’। ২১ মে ভালুকা থানা লুট করে ১৬টি বন্দুক ও বিপুল পরিমাণ গুলি-বেয়োনেট নিয়ে এ বাহিনী বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বাহিনীর সদস্য সে সময় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজারে। আফসার বাহিনীর প্রধান আফসার উদ্দিন আহাম্মেদকে মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘মেজর’ উপাধি দিয়ে প্রধান করা হয়।

ছেলের মৃত্যুতে আমার চোখে এতটা বছর ধরে অনেক পানি ঝরলেও সে শহীদ হয়েছে দেশকে ভালোবেসে, দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে—এটি মনে হলেই আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। গর্বে আমার বুক ভরে যায়। আমি কেবল একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা নই, আমি মুক্তিযুদ্ধের সফল সংগঠক ‘আফসার বাহিনী’র প্রধান মেজর আফসার উদ্দিন আহাম্মেদের স্ত্রীও। আফসার বাহিনীর হয়ে আমি, আমার তিন ছেলে মো. খলিলুর রহমান, মো. খোরশেদ আলম ও শহীদ মো. নাজিম উদ্দিন এবং বড় মেয়ে মোসাম্মত্ ফাতেমা খাতুন মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অংশ করেছিলাম। যুদ্ধের সময় পালিয়ে থাকার সময় আমার স্বামী আমাকে বন্দুক চালানো শিখিয়েছিলেন।

নাজিম উদ্দিন প্রায়ই বলত, ‘মা, দেশ কবে স্বাধীন হবে। আমাদের কষ্ট কমবে। পালিয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না।’ ১৬ ডিসেম্বর দেশ ঠিকই স্বাধীন হয়, কিন্তু আমার ছেলে তা দেখে যেতে পারেনি।

জীবনের শেষ প্রান্তে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। কেবল ভাবি, এমন একটি সুন্দর দেশের মাটিতে ৭৯ বছর আমি হেসে-খেলে কাটিয়েছি। এটা কম কিসে।

অনুলিখন: মো. কামরুজ্জামান, ময়মনসিংহ

বিজ্ঞাপন