default-image

‘আমার প্রাণের গান আমি গাইতে পারিনি অকুণ্ঠিত চিত্তে, নির্ভয়ে—আমার ভাষা—আমার পোশাক সম্বন্ধে শুনেছি নিরন্তর আপত্তি। আমার মতো করে আমি চলতে পারিনি—বলতে পারিনি—প্রাণ খুলতে পারিনি। আমার দুর্জয় ভাইয়েরা—আমার প্রাণকে তোমরা মুক্তি দাও—জীবন দাও আমাকে। সমস্ত বাঙালির প্রাণঢালা আশীর্বাদ ঝরবে তোমাদের ওপর।’ কথাগুলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে উচ্চারণ করেছিলেন দেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী, শিক্ষাবিদ ড. সন্জীদা খাতুন।

আজ স্বাধীনতার ৩৫ বছরে দাঁড়িয়ে সন্জীদা খাতুনের উচ্চারিত বাক্যের প্রায় প্রতিটি শব্দই আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আজকে, এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে অকুণ্ঠিত চিত্তে, নির্ভয়ে আমি কি আমার প্রাণের গান গাইতে পারব? আমি কি পারব আমার মতো করে চলতে, বলতে অথবা নিজের ইচ্ছেমতো পোশাকটি পরতে? লাশ আর বারুদের গন্ধে ভরা আজকের বাংলাদেশ কি সে কথা বলে? অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ—যেমনটি হয়েছিল ’৭১-এ, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। আমাদের এখন বন্দিদশা। ফরমান জারি হয়েছে—মুক্তিযুদ্ধের কথা নাকি বলা যাবে না, বলা যাবে না শহীদদের আত্মদানের কথা, বলা যাবে না জাতীয় বীরদের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা। তবে কি আমরা থেমে যাব? নিশ্চুপ থাকব? কিন্তু আমরা যারা প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, লড়াই করেছিলাম—তারা তো থামতে শিখিনি। আমাকে তো বলতেই হবে মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, শহীদদের কথা। আমি বলব, আমৃত্যু বলব তাদের কথা।

বিজ্ঞাপন

১.

শহীদ ইফিতখার উদ্দিন আহমদ। টাঙ্গাইলে ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি জন্মেছিলেন তিনি। বাবা ইলিয়াস উদ্দিন আহমদ। মা বেগম শিরীন আহমদ। বিএসসি পাস করেছিলেন ইফিতখার। ১৯৭১ সালে জনতা জুট মিলস লিমিটেড কোম্পানিতে টাইমকিপার হিসেবে কর্তব্যরত ছিলেন। উচ্চ শিক্ষার্থে সেপ্টেম্বর মাসে তার বিদেশ যাওয়ারও কথা ছিল। মানসিকভাবে তিনি তৈরিও ছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু হলে তিনি আর চুপ করে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। ঊষালগ্নে লড়াইরত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাদানে এগিয়ে এলেন।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী একই সঙ্গে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস হেডকোয়ার্টার পিলখানা, পুলিশ হেডকোয়ার্টার রাজারবাগ, পুলিশের থানাগুলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, স্টাফ কোয়ার্টার এবং শাঁখারীবাজারসহ অন্যান্য এলাকায় আক্রমণ করে। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে নিয়ে পুলিশ বাহিনীও রুখে দাঁড়াল। ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিল, গড়ে তুলল প্রতিরোধ, এগিয়ে এল ছাত্র-জনতাও। তারা সড়কে সড়কে গড়ে তুলল ব্যারিকেড। বন্দুক আর বোমা নিয়ে পাকসেনাদের ওপর আচমকা হামলাও চালাল।

কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা এসব প্রতিরোধ বেশি দিন টিকে থাকেনি। পাকিস্তানিদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের এমন একটি বিচ্ছিন্ন দল, যাদের প্রায় সব সদস্যই ছিল ইপিআর, এসে উপস্থিত হলো ঘোড়াশালে। জনতা জুট মিলের অসংখ্য কর্মী তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটিকে আশ্রয়, আহার এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করে।

আর এসব কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিলেন জনতা জুট মিলের ইফিতখার উদ্দিন আহমদ এবং তার রুমমেট মোরশেদ। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটি ঘোড়াশাল ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু ইফিতখার-মোরশেদ মিল ক্যাম্পাস ত্যাগ করলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করবেন। মিল এলাকায় থেকেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চললেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরের গেরিলা যোদ্ধাদের তিনি নিয়মিত অর্থ সাহায্য, তাদের থাকার ব্যবস্থা, খবরাখবর আনা-নেওয়ার কাজগুলো অব্যাহত রাখলেন।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর। মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০ জনের মতো একটি দল রাতের অন্ধকারে পলাশ থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট এলাকায় অবস্থানরত পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা চালাল। পাকিস্তানি ক্যাম্পে তখন ২৫ জন ইপিসিএএফ অবস্থান করছিল। উভয়পক্ষে গুলি বিনিময় হলো বেশ কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে পাকবাহিনীর এই দলটি সেই রাতেই পলাশ থেকে ঘোড়াশাল রেল স্টেশনের দিকে পালিয়ে যায়। সেখানে তাদের আরো ৫০ জন ইপিসিএএফ অবস্থান করছিল। মুক্তিযোদ্ধারা পলাশ থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটি পরদিনই ঘোড়াশাল পাক অবস্থানে আক্রমণ করতে চাইল। কিন্তু সে সময় পাকিস্তানিদের আধুনিক অস্ত্র এবং জনবলের কথা বিবেচনা করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আরো গ্রুপ এবং অস্ত্র পাওয়ার অপেক্ষায় থাকল। মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিল জনতা জুট মিলে।

বিজ্ঞাপন
default-image

এ সময় ইফিতখার ও মোরশেদ মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হলো। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০ জনের এই দলটির থাকা-খাওয়া ও গরম কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা করলেন। ইফিতখার উদ্দিনের রুমটি হয়ে উঠল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আলোচনাস্থল। তাদের প্রস্তুতি চলল পুরোদমে।

মুক্তিবাহিনী যখন পাকবাহিনীকে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক এ সময়ই ১ ডিসেম্বর, সকাল ৯টায় আকস্মিকভাবেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক বিরাট দল জনতা জুট মিল এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা অবস্থানে আক্রমণ করে বসে। মুক্তিযোদ্ধারা জানত, তাদের যে শক্তি আছে তা দিয়ে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করার অর্থ হলো আত্মহত্যারই শামিল। তারা দ্রুত পিছু হটতে শুরু করল। ইফিতখার এবং মোরশেদের সাহায্যে তারা সবাই নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের না পেলেও পাকিস্তানিরা কিন্তু ইফিতখার উদ্দিনকে আটক করল। এ দেশী কিছু দালালের নির্দেশে পাকবাহিনী ইফিতখার ও মোরশেদকে আটক করে মুক্তিযোদ্ধারা কোথায়, অস্ত্রশস্ত্র কোথায় ইত্যাদি নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তোলে। দুজনের কেউই শত অত্যাচারেও মুখ খোলেননি। কোনো কথা বের করতে না পেরে ১ ডিসেম্বর সকাল ৯-৩০টায় প্রথমে বেয়নেট এবং পরে গুলি চালালে ইফিতখার উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। মোরশেদও গুলিবিদ্ধ হলেন। তিনিও পরে মৃত্যুবরণ করলেন। দুই বন্ধু একত্রেই দেশের মুক্তির লড়াইয়ে নেমেছিলেন। আবার প্রাণও দিলেন একত্রে। আমরা কি এদের কথা মনে রেখেছি?

২.

শহীদ মোহাম্মদ আবদুল মমিন। ১৯৫০ সালের অক্টোবরে জন্ম। বাবা মৌলভী নজরুল ইসলাম। আবদুল মমিন ১৯৭১ সালে ছিলেন ২১ বছরের তরতাজা এক যুবক। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী। গ্রামের বাড়ি রোকনপুর, লক্ষ্মীপুর থানার অন্তর্গত। আর জেলা তখন তো নোয়াখালী। আবদুল মমিন ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী। কোনো অন্যায়-অনাচার সহ্য করতে পারেন না। সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার প্রতিবাদ করতেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবদুল মমিনও প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে এগিয়ে গেলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে গণহত্যা শুরু করলে আবদুল মমিন স্থির থাকতে পারেননি। উপায় খুঁজতে লাগলেন কিছু একটা করার। তাত্ক্ষণিকভাবে দেশের ভেতরেই ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন তিনি। তখন কয়েকটি বন্দুক আর লাঠিই ছিল তাদের সম্বল। কয়েক মাস চলল এভাবেই। কিন্তু আবদুল মমিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না, এই অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আর তা ছাড়া তাদের তো অস্ত্রেরও প্রশিক্ষণ নেই। তাই আর দেরি না করে আবদুল মমিন ভারতে পাড়ি জমালেন। ভারতে গেলে যে তিনি ট্রেনিং গ্রহণ করতে পারবেন, অস্ত্র পাবেন সে বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছিলেন।

অক্টোবরের শেষ দিকে মোহাম্মদ আবদুল মমিন ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশে রওনা দিলেন সাথীদের নিয়ে। রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তারা যখন বেগমগঞ্জ থানার আমিশাপাড়ার সন্নিকটে পৌঁছান ঠিক তখনই ঘটল বিপর্যয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের আসার খবর কেমন করে জানি জেনে যায়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অপেক্ষায় ওঁত্ পেতে থাকে। আবদুল মমিন সহযোদ্ধাদের নিয়ে যখন আমিশাপাড়ার কাছে পৌঁছান—আর ঠিক তখনই হানাদার পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার বাহিনী একযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানিদের আকস্মিক এই আক্রমণে হতচকিত হয়ে যায়। তাত্ক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে তারা। আবদুল মমিন ফায়ার অব্যাহত রেখে সাথীদের পেছনে সরে যেতে বলে। অন্যরা নিরাপদে পিছু সরতে পারলেও আবদুল মমিনের পিছু সরা হলো না। ঘাতকের বুলেট তার বুক ঝাঁঝরা করে দিল। তাত্ক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি। সেদিন ছিল ১ নভেম্বর। দেশের জন্য শহীদ হলেন মোহাম্মদ আবদুল মমিন। কাউকে কিছু না বলেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কেবল মাকে ছোট্ট একটি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাতে লিখেছিলেন—‘মা, শেষবারের মতো তোমাকে ডেকে গেলাম। দেশের স্বাধিকার আদায়ের প্রশ্নে সুখের পরিবেশ ছেড়ে সংগ্রামের পথে পা বাড়ালাম। দোয়া করো যাতে তোমার ছেলে বীরপুরুষ হয়ে শহীদ হতে পারে।’

আবদুল মমিন কি সেদিন জানতেন, তার সেই চিঠিই একদিন রূঢ় সত্যে পরিণত হবে? তাকে শহীদ হতে হবে?

৩.

আর এক শহীদের কথা বলি। শ্রীপতি রায়চৌধুরী টুলু। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ২২ বছরের যুবক। যুদ্ধে শ্রীপতি শহীদ হলেন। পাকসেনাবাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শহীদ শ্রীপতি রায়চৌধুরীর বড় ভাই শ্রীপ্রণতি কুমার রায়চৌধুরী বাংলা ২২ পৌষ ১৩৭৮-এ আমাদের কাছে তার আপন ভাই শ্রীপতি রায়চৌধুরী সম্পর্কে ছোট্ট একটি চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন। আমি সেই চিঠিটিই হুবহু এখানে তুলে ধরছি। প্রণতি কুমার রায়চৌধুরী লিখলেন :

‘টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানার অন্তর্গত হামিদপুর গ্রামের ২২ বত্সরের যুবক আমার স্নেহের ছোট ভাই। গ্রামবাসী হিন্দু-মুসলমানের সকলের প্রিয়পাত্র শ্রীপতি ওরফে টুলু আজ আর আমাদের মাঝে নেই। মাত্র কয়েক মাস আগেও যাকে নিয়ে আমরা একত্র বসবাস করেছি, সকল কাজকর্মে যার সাহায্য পেয়েছি, সেই স্নেহের ভাইটি আমাদের সবাইকে শোকাভিভূত করে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে।

১৯৭০ সনের ইলেকশনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতি ভোটকেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে গ্রামের লোকদের আনা-নেওয়ার ভার গ্রহণ করা থেকে আরম্ভ করে ইলেকশনে জয়লাভের পর যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বাংলার নয়নমণির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আরম্ভ হলো এবং পরে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পুনঃমার্শাল ল জারি করে অসংখ্য নিরপরাধ বাঙালিকে হত্যা করা হলো, বহু বন্ধু-বান্ধব-পরিচিতজনদের আটক করা হলো, দলে দলে বাঙালি সৈন্যরা পশ্চিমাদের পক্ষ ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল তখন আমার এই ভাইটিও গ্রামের প্রতিরোধ বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছে।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী যুদ্ধের সময় শ্রীপতি সৈন্যদের আহারের যোগানসহ নানা কাজে সাহায্য করছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, পাক ফৌজের প্রবল আক্রমণে এরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর যখন পাক ফৌজ সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে লুটতরাজ আরম্ভ করল তখন অন্যান্যের সাথে শ্রীপতিও আত্মগোপন করে। কিন্তু আত্মগোপন অবস্থা থেকেই সে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখল। তাদের থাকার নিরাপদ স্থান, আহার এবং যাতায়াতে সাহায্য করে চলে। সে মিশেছিল কালিহাতী-হামিদপুরের জনগণের মাঝে। আর তাই তো সে সকলের অতি প্রিয় ছিল।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু শ্রীপতির জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল কালবৈশাখের শেষ দিনটি, অর্থাত্ ৩০ শে বৈশাখ, শুক্রবার। সকালে খাবার পর তার ডিউটি ছিল পাক ফৌজদের গতিবিধি লক্ষ করা এবং গ্রামবাসীকে সময়ে সতর্ক করা। এই কাজে ব্রতী হয়েই সেদিন সে সড়কের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস—দুদিক থেকে পাকফৌজের গাড়ি এসে হামিদপুর গ্রামটিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সড়কের মাঝপথে শ্রীপতিকে এক পাকফৌজ ধরে ফেলে। কিন্তু শ্রীপতি তার মনোবল আর নিজের স্বাস্থ্যের ওপর ভর করে পাকসেনার সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। এর মধ্যে আরো কজন পাকফৌজ সেখানে হাজির হয়ে শ্রীপতিকে ঘিরে ফেলল। তারপর! পরপর দুটি গুলি শ্রীপতির জীবনদীপকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল। সেদিন ছিল ১৪ মে ১৯৭১। বৃদ্ধা মা আজ ছেলের জন্য পাগলপ্রায়।’

শেষে প্রণতি রায় লিখলেন—‘আমার একান্ত অনুরোধ, যদি পারেন—তবে আমার এই ছোট ভাইটির করুণ ইতিহাসটুকু পত্র-পত্রিকায় ছাপালে বাধিত হব।’ তিনি আরো জানালেন, ‘সবার কাছেই প্রার্থনা, আমার এই ছোট ভাইটির আত্মার শান্তির জন্য করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা জানাবেন।’ না, পারিনি। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে প্রণতি রায়চৌধুরীর অনুরোধ রাখতে পারিনি। আজ এত বছর পর তার লেখাটিই যখন ছাপা হতে যাচ্ছে—তখন জানি না তিনি বা তার মা আজও বেঁচে আছেন কি না। কেউ কি বলবেন তাদের ঠিকানা?

৪.

আর এক শহীদের নাম মোহাম্মদ সরোজ আলী সরকার। পিতা মওলানা আসমত আলী সরকার। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার পূর্বধলা থানার গিরিয়াশা গ্রামে সরোজ আলীর জন্ম।

১৯৭১ সালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ২২ বছর। বিএসসি পাস সরোজ আলী এ সময় একটি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক। এ সময় তিনি ঘাগড়া পল্লী উন্নয়ন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্টও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই সমিতির সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ কাজে সরোজ আলী নিলেন অগ্রণী ভূমিকা। না, তিনি ভারতে গেলেন না। বাংলাদেশে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ স্থাপিত হলো। প্রাথমিকভাবে সংবাদ আদান-প্রদান, পথঘাটের অবস্থা, শত্রুদের গতিবিধি—এসব তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দিতে লাগলেন। কিন্তু তার এই কাজকর্মের খবর পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছতে সময় লাগল না। এ দেশীয় দালাল-রাজাকাররা শিক্ষক সরোজ আলী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক এবং সে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করছে—এ সংবাদ বিরিশিরি (দুর্গাপুর) ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে দিল।

একদিন সরোজ আলী পূর্বধলা রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষা করছিলেন। আর সেখান থেকেই পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে গেল। বিরিশিরি ক্যান্টনমেন্টে তার ওপর চলল অমানুষিক নির্যাতন। পাকিস্তানিরা বারবার তার কাছ থেকে জানতে চাইল মুক্তিযোদ্ধাদের খবরাখবর। কিন্তু তিনি নির্বাক। শেষ পর্যন্ত তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে না পেরে বিরিশিরি ক্যান্টনমেন্টেই তাকে গুলি করে হত্যা করল। জনপ্রিয় এক শিক্ষকের জীবনদীপ নিভে গেল। সেদিন ছিল সোমবার, ২৩ আগস্ট। শহীদ শিক্ষক মোহাম্মদ সরোজ আলী সরকারের বড় ভাই মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী সরকার বিএ বিএড পাস করে শিক্ষা বিভাগেই চাকরি করতেন। তিনি তখন থানা শিক্ষা অফিসার। ছোট ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুকাহিনী ১৯৭২ সালেই আমাদের লিখে জানিয়েছিলেন। আজ এই শহীদ শিক্ষকের কথা কেউ কি মনে রেখেছেন?

৫.

শহীদ মোহাম্মদ সোলেমান ফকির মুক্তিযুদ্ধের এক নির্ভীক সৈনিক ছিলেন। তিনি ছিলেন আনসার সদস্য। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ট্রাক ও বেবিট্যাক্সির মালিক ছিলেন তিনি। সচ্ছল পরিবার। আর সবার মতো তিনিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আনসারদের একত্র করলেন। তারপর তার গাড়িতে করে প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য বিভিন্ন স্থানে খাবার ও অন্যান্যসামগ্রী পৌঁছতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের এক ডিফেন্স থেকে আরেক ডিফেন্সে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও নিলেন তিনি। সারা দিনে নাওয়া-খাওয়ার সময় পর্যন্ত ছিল না। দিন-রাত গাড়ি নিয়ে ঘুরেছেন তিনি।

কিন্তু প্রতিরোধ সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল জামালপুরে পৌঁছে গেল। মোহাম্মদ সোলেমান তখনো আনসারদের জন্য খাবার এবং অস্ত্র যোগাড়ে ব্যস্ত। ২৩ এপ্রিল ছিল শুক্রবার। এ দিন পাক-আর্মি জামালপুর শহর, মিউনিসিপ্যালিটি এলাকা এবং শহরকেন্দ্রিক গ্রামগুলোতে ভোর ছয়টা থেকে সান্ধ্য আইন জারি করে। কেউ ঘর থেকে বেরোলে তাকে চরম শাস্তি পেতে হবে—সে কথা জানাতেও ভুলল না তারা। এ সময় শহীদ মোহাম্মদ সোলেমান নিজ গ্রাম পাথালিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। ২৩ এপ্রিল দুপুর ১টা বেজে ৩০ মিনিট। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাভর্তি ২০-২৫টি জিপ পাথালিয়া গ্রামে প্রবেশ করে। এ গ্রামেই ছিল আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল হাকিম আকন্দের বাড়ি। সবাই ভেবেছিল পাকবাহিনী তার বাড়িতেই যাচ্ছে। কিন্তু না, তারা সরাসরি এসে সোলেমানের বাড়ির চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলল। তারা বাড়িতে ঢুকেই লুটতরাজ শুরু করল। সোলেমানকেও ধরে ফেলল। তারপর তার ওপর চাললো অমানুষিক অত্যাচার। এক পর্যায়ে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেই নিরস্ত হলো না, পেট্রল ঢেলে তার বাড়িতে আগুনও জ্বালিয়ে দিল। কেবল সোলেমানের বাড়িই নয়, মাত্র এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে পাকহায়েনার দল পাথালিয়া-গুয়াবাড়িয়া পাশাপাশি দুটি গ্রামই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। পাকবাহিনী সেদিনই শহরে ফিরে আসে। ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি আর্মি জামালপুর শহরে বেছে বেছে সমস্ত হিন্দু বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আগুন ধরিয়ে দিল।

মোহাম্মদ সোলেমান ফকির এ দেশের মুক্তির জন্য জীবন দিলেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। বাবা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন ফকির কি জানতেন তার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে মোহাম্মদ সোলেমানকে স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই এভাবে জীবন দিতে হবে?

৬.

মোঃ আবু তাহের একজন কৃষক ছিলেন। কুমিল্লা জেলার (বর্তমানে চাঁদপুর) হাজীগঞ্জ থানার সুবিদপুর গ্রামে ১৯৫৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তার জন্ম। বাবা মোঃ আবদুল কাদের মিয়ার জীবিকাও ছিল কৃষিকাজ। লেখাপড়া তেমন করতে পারেননি। ছেলে আবু তাহেরকেও পড়িয়েছিলেন ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। তারপর আর্থিক কারণে তিনি আর এগোতে পারেননি। এরপর থেকেই বাবার সঙ্গে তিনি কৃষিকাজে নেমে যান। তারপর তো এলো বাংলা মায়ের ডাক, স্বাধীনতার ডাক। আবু তাহেরের বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। কী-ইবা বোঝেন দেশ, সমাজ সম্পর্কে। কিন্তু পাকিস্তানিদের নির্মম অত্যাচার তাকে বিচলিত করে। আবু তাহের ঘর ছাড়েন, পাড়ি জমান ভারত। কৃষক আবু তাহের ভারতে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং গ্রহণ করে আবার বাংলাদেশে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। এদিকে আবু তাহের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় তার পুরো পরিবারের ওপরই নেমে আসে অত্যাচারের স্টিম রোলার। না, তাদের পরিবার গ্রামে থাকতে পারল না। শেষ পর্যন্ত আবু তাহেরের মা, বাবা, চার ভাই আর এক বোন নিজ গ্রাম ছাড়লেন। তারা পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে।

এদিকে এফ এফ আবু তাহের এলাকায় ফিরে এসে সহযোদ্ধাদের নিয়ে একের পর এক অপারেশন চালিয়ে যেতে লাগলেন। তার অপারেশনগুলোর মধ্যে হাজীগঞ্জ, বাকিলা ও রামচন্দ্রপুরের যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ। উদ্যোগী, সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের পরাজয় মানেননি। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশকে শত্রুমুক্ত করা। বাবা-মায়ের পালিয়ে বেড়ানোর সংবাদ তিনি জানতেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বেদনাহত আবু তাহের ছোট্ট এক টুকরো কাগজে বাবা-মাকে লিখলেন: ‘আপনার এক ছেলে মরিয়া যদি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নির্যাতিত মানুষের সুখ ও শান্তি ফিরিয়া আসে—সেটাই হবে আপনাদের গৌরবের বিষয়।’

তারপর তো সেই মর্মান্তিক দিন। স্বাধীনতার দোর-গোড়ায় দাঁড়িয়ে আবু তাহেরকে জীবন দিতে হলো। সেদিন ছিল শুত্রুবার, ১০ ডিসেম্বর। হাজীগঞ্জ থানার মুকন্দসার (বর্তমানে মকিমাবাদ) গ্রামে পাকবাহিনীর মুখোমুখি হলো মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধারাও মরিয়া, পাকিস্তানিদের নির্মূল তাদের করতেই হবে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বুলেট এসে আবু তাহেরকে আঘাত হানল। কিন্তু তারপরও সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরপর আর একঝাঁক বুলেট এসে আবু তাহেরের হূদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দিল। আবু তাহের সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। দেশের জন্য প্রাণ দিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের। শহীদ হলেন তিনি।

ইফিতখার, আবদুল মমিন, শ্রীপতি, সরোজ আলীরা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। নেই সোলেমান, আবু তাহেররাও। শুধু কি এরাই? না, আরো আছে। শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ আছে, যাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। আরো আছে, লক্ষ লক্ষ নারী। স্বাধীনতা নামক লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে যাদের হারাতে হয়েছিল সম্ভ্রম, নারীত্ব। স্বাধীনতার জন্য এ দেশের মানুষকে বড্ড চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। কারো দয়ার দানে পাওয়া নয় আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু তারপরও আজকে যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই—তখন ভাবি, এই আমরাই কি একাত্তরে লড়াই করেছিলাম? রক্ত ঝরিয়েছিলাম? সম্ভ্রম হারিয়েছিলাম? কে দেবেন আমার জিজ্ঞাসার উত্তর?