default-image

মুজিবনগর সরকার সৃষ্টির আগে থেকেই আমরা কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করা শুরু করি। আমি তখন হবিগঞ্জের এসডিও। ২৬ মার্চ সকাল থেকে কার্যত হবিগঞ্জ অঞ্চল মুক্ত-স্বাধীন হয়ে পড়ে। তখনো মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, অথচ মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার জন্য প্রশাসনিক সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। উপরন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শরণার্থীদের সহায়তা প্রদান ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান—এসব বিষয়ে আমরা গঠনোন্মুখ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আদেশ প্রদান করি। মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পরও প্রায় তিন সপ্তাহ হবিগঞ্জে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন চালু ছিল। এরপর যখন হানাদার বাহিনী এই অঞ্চল দখল করে নেয়, তখন আমি ও আমার সহকর্মী কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ (তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও ও বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার) আমরা একসঙ্গে তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় যোগ দিই। এরপর জুলাই-আগস্টের দিকে আমি কলকাতায় মুজিবনগর সরকারে যোগ দিই।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ভারতের হস্তক্ষেপে পাকিস্তানি বাহিনীকে বর্ষাকালে সহজেই হটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখা গেল ভিন্ন। বর্ষাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জেঁকে বসল চারদিক। সাধারণ মানুষ না জানলেও আমরা জানতাম, মুক্তিযোদ্ধারা ও ভারতীয় বাহিনী উভয়েই ভেতরে ভেতরে এ সময় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নভেম্বর মাসে ভারত-চীন সীমান্তে যখন ঠান্ডা পড়ার ফলে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তখন থেকেই বেড়ে চলল ভারতীয় বাহিনীর তৎপরতা। নভেম্বরের শেষ দিকে আমাকে মুজিবনগর সরকার থেকে জানানো হয়, শিলং অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশি শরণার্থী ও ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতি প্রয়োজন। সে অনুযায়ী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি শিলং যেতে প্রস্তুতি নিই। ৪ ডিসেম্বর আমার শিলং যাওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই ৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানিদের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে আমার আর শিলং যাওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের সময় আমাদের অফিস ছিল কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে। এ সময় আমরা অফিসে যেতাম বটে, কিন্তু বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতাম যুদ্ধের সংবাদ শোনার জন্য। যুদ্ধের প্রথম থেকেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর আগের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল, তারা লড়াই করবে। তবে বাস্তবে যখন যুদ্ধ শুরু হলো, পাকিস্তানিরা তখন পালাতে শুরু করল। অপ্রত্যাশিতভাবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যশোর সেনানিবাস যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এল। মুজিবনগর সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আমাদের সহকর্মী ওয়ালিউল ইসলামকে (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সচিব) যশোরের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে পদস্থ করেন। তখনো সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে চলছে যুদ্ধ। ওয়ালিউল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের প্রথম ডেপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যখনই কোনো ভূখণ্ড শত্রুমুক্ত হচ্ছিল, তখনই সরকার ডেপুটি কমিশনার পাঠাচ্ছিল। আমরা মুজিবনগরে একসঙ্গে মিলেমিশে বন্ধুবান্ধবেরা কাজ করছিলাম। দেখা গেল, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব নিয়ে অনেককে চলে যেতে হচ্ছে।

সময় যতই এগোতে থাকে, ততই বিজয়ের সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক সংবাদও আসতে থাকে। পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানিরা নির্মমভাবে নিরীহ বুদ্ধিজীবী ও সরকারি কর্মচারীদের হত্যা করা শুরু করে। প্রথমে খবর আসে মফস্বল থেকে যে এ ধরনের নিধন চলছে। কিন্তু এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে আমাদের সময় লেগেছে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর আলবদর বাহিনীর নৃশংস ক্রিয়াকলাপ আমরা জানতে পারি।

যুদ্ধের সময় আমাদের শঙ্কা ছিল আরও দুটি। একটি শঙ্কা ছিল, পাকিস্তানের ‘মুরব্বি’রা কেউ হস্তক্ষেপ করে কি না। এক মুরব্বি ছিল চীন। চীন যদিও হইচই করছিল, কিন্তু শীতকালে তার সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা ছিল সীমিত। মূল চিন্তার কারণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিক্সনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে। এরা যে কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল তা-ই নয়, সামরিক পেশিশক্তিও প্রদর্শন করছিল। শেষ মুহূর্তে মার্কিন নৌবহর বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজও পাঠিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে আমরা শুধু যুদ্ধের সংবাদ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম না, একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন ছিলাম পাকিস্তানি মুরব্বিদের ক্রিয়াকলাপ নিয়েও।

দ্বিতীয় শঙ্কার কারণ ছিল ঢাকা দখল নিয়ে। যুদ্ধের আগে পাকিস্তানি বাহিনী ছড়িয়ে ছিল সারা দেশে। অনুমান করা হচ্ছিল, সর্বত্র এরা যৌথ বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করবে। যুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি বাহিনী এ কৌশল পরিবর্তন করে। অল্প কয়েকটি অবস্থান ছাড়া এরা সম্মুখভাগ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে তাদের নিয়ে আসে ঢাকার দিকে। এতে অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ঢাকা শহরে পাকিস্তানি বাহিনী কেন্দ্রীভূত করে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ধরনের বিশ্লেষণে আমরা সবাই ঘাবড়ে যাই। কারণ, আমাদের অনেকের আত্মীয়স্বজনই তখন ঢাকায় অবস্থান করছিল। তাই সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হলে পাকিস্তানি বাহিনী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতো, এর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো ঢাকায় অবস্থানরত আমাদের স্বজনেরা। আমাদের পরম সৌভাগ্য, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের পক্ষে ঢাকা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। একসময় যারা হুংকার ছেড়েছিল, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’, তারা প্রায় সমগ্র দেশই ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো বিনা যুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো কাঙ্ক্ষিত বিজয়। মুজিবনগর সরকার যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল, সাধিত হলো সেই উদ্দেশ্য। তখন আমরা সবাই ব্যগ্র ঘরে ফেরার জন্য। হ্যাঁ, ঘরে আমরা ফিরে এলাম ঠিকই; কিন্তু যে দেশে ফিরে এলাম, সে দেশের চারদিকে ধ্বংসলীলার স্তূপ। বর্বর বাহিনীর পৈশাচিক হামলায় হারিয়ে গেছে অনেক আত্মীয়-পরিজন। কাজেই আমাদের সামনে তখন যে চ্যালেঞ্জ, সেটা মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও বড়। সেই চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা।

আকবর আলি খান: মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা; সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা