default-image

একাত্তরের পুরো সময় আমি ঢাকা শহরে ছিলাম। দেখেছি বাঙালির অগ্রযাত্রার চিত্রাবলি। দেখেছি ডিসেম্বর মাসের বিজয়ের দিন। ২০১৮ সালের বিজয়ের মাসে বলতে চাই একাত্তরের দিকে তাকিয়ে বাঙালির কণ্ঠ থেকে সমবেতভাবে উচ্চারিত হোক স্বাধীনতার পঙ্‌ক্তিমালা। একাত্তরের দিকে তাকিয়ে আবার দেশপ্রেমে ঐক্যবদ্ধ হোক বাঙালি। বিজয় দিবসের গৌরবগাথা ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে। হ্যাঁ, এই সব ভাবনার সঙ্গে অবশ্যই মিশে যায় সময়ের স্মৃতি।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শুনতে পাই নিয়াজির উদ্দেশে জেনারেল অরোরার আত্মসমর্পণের আহ্বান। বুঝে যাই আর দেরি নয়, স্বাধীনতা খুব কাছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দিন ঘনিয়েছে। তখন খবর পাওয়ার সূত্র ছিল আকাশবাণী আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। সেখান থেকে অনবরত প্রচারিত হতো বিভিন্ন খবর। ঘরের মধ্য বসে রেডিওতে ভেসে আসা নানা কথায় সাহসী চিন্তা সক্রিয় হয়ে উঠত মাথার ভেতরে, সেই স্মৃতিগুলো যে কী মধুর!

বিজ্ঞাপন

রেডিওতে আত্মসমর্পণের কথা শুনে ভাবি, রমনা রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান দেখতে যাব। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে রেসকোর্সে (এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গিয়েছিলাম ৭ মার্চে। বিজয়ের খুশিতে ভাবলাম, এখন ১৬ ডিসেম্বরের বিকেলে সেই একই ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান দেখে ‘সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ বলে চিৎকার করব। কিন্তু না, বিকেলে আর রেসকোর্সে যাওয়া হলো না। দুপুরের পর বাসায় এলেন খালাতো ভাই আবু ইউসুফ। তিনি কর্নেল তাহেরের বড় ভাই। তাঁর একমুখ দাড়ি, পিঠে রাইফেল। যে সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সঙ্গে প্রথমে ঢাকা শহরে ঢোকেন, সেই ১১নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন তিনি।

কর্নেল তাহের ছিলেন এই সেক্টরের কমান্ডার। ইউসুফ ভাইকে দেখে বিজয়ের আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠি। জিজ্ঞেস করি, তাহের ভাই কোথায়? ইউসুফ ভাই চুপ করে থেকে বললেন, ও ভারতের হাসপাতালে। তার মানে? কী হয়েছে? চেঁচিয়ে বলি। ইউসুফ ভাই বললেন, শত্রুর গোলার আঘাতে তাহেরের বাঁ পা উড়ে গেছে। অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে আমার মুখ থেকে। আমার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে ইউসুফ ভাই বলেন, জানো, তাহের না প্রচণ্ড সাহসী। গোলার আঘাতে ওর বাঁ পা যখন ঊরুর থেকে আলাদা হয়ে যায় তখনো ওর নিজের দিকে খেয়াল নেই। পায়ের নিচের অংশ চামড়ার সঙ্গে ঝুলছিল, তবুও ও আমাদের কমান্ড দিয়ে যাচ্ছে। ওর চেহারায় যন্ত্রণার চিহ্নটুকু ছিল না। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি ইউসুফ ভাইয়ের মুখের দিকে। তিনি আরও বলেন, আমি এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে যাচ্ছি। তোমাদের খোঁজ নিতে এসেছি। সবাই ভালো আছ জেনে ভালো লাগল।

default-image

পরদিন ১৬ ডিসেম্বর। ভোরের সূর্য আলো ছড়িয়েছে চারপাশ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। তখনো বুঝিনি আজই আত্মসমর্পণে পদানত হবে পাকিস্তানের ঘাতক বাহিনী। বেলা বাড়ে। ততক্ষণে মিত্রবাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছেছে।

আমাদের ঢাকার বাসায় সেদিন অনেক লোক। রাজশাহীতে আমাদের বাড়ি বিহারিরা লুট করার পর আমার আব্বা-আম্মা ও ছোট ভাইবোন তিন মাস গ্রামে পালিয়ে থেকে ঢাকায় আসেন আমার কাছে। ছিলেন আরও কয়েকজন আত্মীয়ও। নাশতার টেবিলে কল্পনা-জল্পনার শেষ নেই। কী হতে যাচ্ছে কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছে না। আকাশে বিমানের শব্দ নেই, নিচে বোমা ফাটার শব্দ নেই। মনে হয় হঠাৎ করে চারদিক নীরব হয়ে গেছে।

১০ কি ১১টার দিকে শুনতে পাই রাস্তায় হইচই, না কোনো ভীতসন্ত্রস্ত্র কণ্ঠ নয়, চারদিকে যেন উল্লাসধ্বনি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি। অল্প সময়ের মধ্যেই কলোনির ছেলেরা হইহই করে ছুটে যায় রাস্তার দিকে। চিৎকার করে বলে, ‘দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। জয় বাংলা।’

স্বাধীন হয়ে গেছে? প্রবল উত্তেজনায় ঘরের সবার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। বাবাকে বলি, আজ থেকে আমরা স্বাধীন। বাবার চোখে পানি গড়ায়। স্বাধীন হয়ে গেছে, স্বাধীন হয়ে গেছে! যেন জীবনের চারদিকে প্রবল উৎসব। কে কোথায় আছো, ছুটে আসো, আনন্দ করি। পরক্ষণে বুক মুচড়ে ওঠে। পঁচিশের রাতের কথা মনে হয়। তারপর ৯ মাস ধরে কত মৃত্যু। কেমন আছে স্বজনহারানো পরিবার? ২৭ মার্চ কারফিউ ভাঙলে দেখতে গিয়েছিলাম ইকবাল হল (এখন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। সেদিন ইকবাল হলের গেটের সামনে দেখা হয়েছিল শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে। বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে জিপে করে ঘুরছিলেন। ওঁদেরকে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি দেখাচ্ছিলেন। ক্ষণিকের জন্য গাড়ি থামিয়ে ধমকের সুরে আমাকে বলেছিলেন, এ সময় কেউ বের হয়? যান, বাড়ি যান। মুহূর্তে মনে হয় কেমন আছেন শহীদুল্লা কায়সার? কোথায় আছেন এখন?

বিজ্ঞাপন

আমি তখন কাঁদছি। তিনি আমার মাথার ওপর হাত রেখে বললেন, খবরদার কাঁদবে না। স্বাধীনতার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। আমি যাচ্ছি। তিনি চলে গেলেন। বাড়ির সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কারও মুখে কথা নেই। আর কিছুক্ষণ পর এলেন আমার কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল হাফিজ। তিনি বললেন, আমিও ১১ নম্বর সেক্টর থেকে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ঢাকায় ঢুকেছি। তোমরা কেমন আছ জানতে এলাম।

স্যারকে সালাম করলে তিনি বললেন, যুদ্ধের ৯ মাস আমি বিভিন্ন সেক্টরে সাংবাদিকতা করেছি। ছোট্ট করে তোমাকে একটি ঘটনার কথা বলে যাই। তুমি গল্প লেখো।

আমি অস্ফুট স্বরে বলি, স্যার গল্প? স্যার বললেন, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে আমাদের সাহিত্য তৈরি হবে। শোনো, ঘটনাটি যশোরের একটি গ্রামের। একজন মা দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রতিবন্ধী ছেলেটিকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওরা ছেলেটিকে পেয়ে ‘মুকুত মিল গিয়া’ বলে উঠোনে টেনে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে। সেই মা মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের ধানের গোলার আড়াল থেকে বের করে বলেছিল, যাও যুদ্ধ করো। স্বাধীনতা চাই। তোমাকে পরে আরও বলব। এখন যাই।

স্যার চলে গেলে বিজয় দিবস আমার সামনে এক অসাধারণ মহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। তারপরও বাড়ির সবার সঙ্গে এক হয়ে তাহের ভাইয়ের জন্য কান্না ফুরোয় না। সেই সঙ্গে একজন অসাধারণ নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্বাধীনতার পতাকা হয়ে আমার সামনে ওড়ে। একবার মনে হয়েছিল, পতাকা নিয়ে মিছিলে যাই। যেতে পারিনি। বেদনার ঘনঘটা দমিয়ে রেখেছিল।

এখনো আমার স্মৃতিতে বিজয় দিবস একজন মুক্তিযোদ্ধার রক্তাক্ত লাল ঊরু এবং একটি বিচ্ছিন্ন বাঁ পা। আসলে এ কোনো স্মৃতি নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে একটি ভিন্ন চোখ দিয়ে দেখা, যে দেখা স্মৃতির মতো উজ্জ্বল, চোখ বুজলে সেই না দেখা দৃশ্য ছবি হয়ে ফুটে ওঠে। ২০ বছর পরে ১১ নম্বর সেক্টরসহ আরও নানা ঘটনা নিয়ে যে উপন্যাসটি লিখি তার নাম যুদ্ধ। আর সেই অসাধারণ মাকে নিয়ে লিখি হাঙর নদী গ্রেনেড। এভাবে বিজয় দিবস আমার স্মৃতির ঊর্ধ্বে মুক্তিযুদ্ধের অম্লান বিজয়গাথা। সেখানে তাকিয়ে দেখি কথা কয় ইতিহাস।

সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক।