default-image

ভারতীয় গার্ডস রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ৩১১তম মাউন্টেন ব্রিগেড কলামটি নরসিংদী-ডেমরা-তারাব সড়ক ধরে ঢাকার দিকে রওনা হয়। আমার ‘এস’ ফোর্স ও ৩ নম্বর সেক্টরের বাহিনীসহ নরসিংদী-ভুলতা-মুড়াপাড়ার পথ ধরে রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থান নিই৷

১৩ ডিসেম্বর রাতেই আমরা মুড়াপাড়ায় এবং সেই দিনই অগ্রবর্তী সেনাদল শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ অতিক্রম করে ঢাকার পাঁচ-ছয় মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়।

আমার সেক্টরের সৈন্যরা বাসাবো এলাকায় শত্রুসৈন্যদের মুখোমুখি হয় এবং ১৪ ডিসেম্বর রাতে ভয়ংকর যুদ্ধ চলে। পাকিস্তানি বাহিনী বেপরোয়া হয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু ওরা ঢাকা থেকে নতুন সংযোজন প্রেরিত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অবস্থান চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়।

সম্মিলিত বাহিনীর দূরপাল্লার কামানগুলো ঢাকার ওপরে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে চলেছে। অন্যদিকে লে. জেনারেল নিয়াজির যাবতীয় কামান রয়েছে বহুদূরে সীমান্ত এলাকায়। তাঁর কাছে যথেষ্ট সৈন্য রয়েছে। নেই শুধু আমাদের এগিয়ে চলার পথকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উপযোগী দূরপাল্লার অস্ত্রশস্ত্র। আমাদের প্রতিহত করার প্রশ্ন তো এ ক্ষেত্রে একেবারেই অবান্তর।

আমি ভালো করেই উপলব্ধি করছি, জেনারেল নিয়াজি দূরপাল্লার অস্ত্রশস্ত্র না থাকার ফলে উদ্ভূত বর্তমান পরিস্থিতিতে কী ধরনের দুর্দশায় রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা ঠিক একই ধরনের অবস্থার শিকার হয়েছিলাম। এই যে ভুল, এই ত্রুটি এবং এই যে অদূরদর্শিতা—এর জন্য জেনারেল নিয়াজি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে তিনি দোষারোপ করতে কিংবা অপবাদ দিতে পারেন না। পারেন শুধু নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিতে।

বিজ্ঞাপন

ধাবিত করার যেকোনো অপারেশন বা তৎপরতায়—বিশেষত, আমরা যে পরিস্থিতিতে রয়েছি—সর্বোচ্চ বিবেচনার বিষয় হচ্ছে সময় এবং ব্যাপ্তি-স্থান। ঢাকায় উপনীত হওয়ার দৌড় ঊর্ধ্বশ্বাসে, তথা তীব্রতম গতিতে—এমনকি বঙ্গোপসাগরের দিকে অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে ছুটে আসা মার্কিন রণতরি ‘এন্টারপ্রাইজ’-এর চেয়েও গতিসম্পন্ন করা সমীচীন ছিল। এ-ও হচ্ছে গতিবেগ-সম্পর্কিত রণকৌশল গৃহীত হওয়ার অন্যতম কারণ।

যখন ঢাকার চারদিকে পরিবেষ্টিত ফাঁস নজিরবিহীন গতিতে ঘড়ির কাঁটার মতো নিখুঁতভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে, তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এ এম মানেকশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের উদ্দেশে প্রচারিত এক রেডিও বার্তায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবশ্যম্ভাবী আত্মসমর্পণের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন। এর ফলে পাকিস্তানি বহু কমান্ডার ও সৈন্যের মনে ব্যাপকভাবে ভীতির সঞ্চার হয়। একটি মাত্র ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় রাজধানী ঢাকায়, যেখানে লে. জেনারেল নিয়াজি অহমিকার সঙ্গে বললেন, ‘আমার মৃতদেহের ওপরই কেবল ঢাকার পতন হতে পারে।’ এ ঘোষণা পাকিস্তানিদের নিজেদের বাসভূমে প্রচারণা অভিযানের মূল্য বহন করে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হচ্ছেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরাপদ অপসারণের ব্যবস্থা করার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানান। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান তা বাতিল করে দেন। লে. জেনারেল নিয়াজি হচ্ছেন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ বা প্রেসিডেন্টের প্রতিভূ মাত্র। তিনি শুধু জেনারেল ইয়াহিয়ারই প্রতিধ্বনি করেন। তাঁর আশপাশে কিংবা বাংলাদেশের সর্বত্র যা ঘটে চলেছে, সে সম্পর্কে তিনি নির্বিকার।

১৬ ডিসেম্বর সূর্য উদিত হয় দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রসঙ্গ নিয়ে। ১৫ ডিসেম্বর, মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ করার জন্য লে. জেনারেল নিয়াজি স্বাক্ষরিত প্রস্তাবের সময়সীমা হচ্ছে ১৬ ডিসেম্বর, সকাল নয়টা পর্যন্ত। তদানুযায়ী একটি রেডিও-তরঙ্গ ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লে. জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করা বা না করা সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত ওই ব্যান্ডের প্রচার করার শর্তারোপ করা হয়। অবরুদ্ধ পাকিস্তান পূর্বাঞ্চল কমান্ড চূড়ান্ত সময়সীমা আরও ছয় ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলে জেনারেল মানেকশ তাঁর সম্মতি সকাল ১০টার সময় বেতারযোগে অবহিত করেন।

পরিস্থিতি দ্রুত মোড় নেয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের প্রধান স্টাফ অফিসার মেজার জেনারেল জ্যাকব বেলা ঠিক একটার সময় আত্মসমর্পণের শর্তাবলিসম্পর্কিত দলিল নিয়ে হেলিকপ্টারে ঢাকায় পৌঁছান।

লে. জেনারেল নিয়াজি শর্তাবলিতে দুইটা ৪৫ মিনিটে অনুস্বাক্ষর করলে আত্মসমর্পণ দলিলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের সময়সূচি নির্ধারিত হয় চারটা ৩০ মিনিট।

বেলা একটা ৪৫ মিনিটে ডেমরায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা আমার এস ফোর্সের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বেলা দুইটায় ডেল্টা সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং আমাকে জানান, মিত্রবাহিনীর ৫৭তম মাউন্টেন ডিভিশন থেকে তাঁর কাছে বার্তা এসেছে বেলা তিনটা ৩০ মিনিটে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে স্বাগত জানানোসহ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। ৩১১তম মাউন্টেন ব্রিগেডিয়ার কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মিস্রাও অনুরূপ সংবাদ আমাকে পৌঁছান। তাই মেজর মঈনকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আমি রওনা হই। ডেমরা-ঢাকা সড়ক তখনো নিরাপদ নয়।

পরাজিত শত্রুবাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত, নার্ভাস হয়ে, আবার কখনো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে, ট্রিগারের ওপরে আঙুল রেখে বসে আছে। তার সৈন্যদের মাঝ দিয়ে আমার সহযাত্রী হিসেবে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি ডেমরা এলাকার পাকিস্তানি ১২ এফ এফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল খিলজীকে সঙ্গে নিলাম। প্রায় আড়াইটায় লে. কর্নেল খিলজীর গাড়িতে করে পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্য দিয়ে রওনা হই৷ মাতুয়াইল কোনাপাড়া এলাকা থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে বাধাপ্রাপ্ত হই। লে. কর্নেল খিলজীর সহায়তায় সেই বাধা অতিক্রম করে বেলা তিনটা ৩০ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। ঢাকা বিমানবন্দর যুদ্ধবিধ্বস্ত মাঠের আকার ধারণ করেছে। তবু বিজয় দিবসে এর মধ্যে স্বাগতসূচক মৃদু হাসির ঝলক যেন ফুটে উঠেছে।

সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল অরোরাকে যাঁরা সাদর সম্ভাষণ জানাতে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে লে. জেনারেল নিয়াজি হচ্ছেন সব দৃষ্টির কেন্দ্র। বিষণ্ন ও অবদমিত তাঁর মুখাবয়ব। পরাজিত একজন সেনাপতিকে প্রত্যক্ষ করার মতো এ হচ্ছে এক অভিজ্ঞতা—এমন এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা—যিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই শুধু পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করেননি, যাঁর রয়েছে আরও এক লজ্জাকর গণহত্যার সদ্য অতীত ইতিহাসও।

তাঁর পরাজয় শুধু পরাজয়ই নয়—পরাজয়েও একধরনের দীপ্তি আছে—লে. জেনারেল নিয়াজির তাও ছিল না। আমি যখন তাঁর দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তখন তাঁর পুরো অস্তিত্ব অবিন্যস্ত এবং সম্পূর্ণ কালিমালিপ্ত আকারে আমার দৃষ্টিতে

ভেসে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের তেমন অপেক্ষা করতে হলো না। আকাশে দেখা গেল একটি হেলিকপ্টারবহর। টারমাকে অবতরণ করলেন সদলবলে জেনারেল অরোরা। তাঁর দলে রয়েছেন বাংলাদেশি বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ (অপারেশন) গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার। বিমানবন্দরের অনুষ্ঠানপর্ব শেষে আমরা রমনা রেসকোর্সের উদ্দেশে রওনা হলাম (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেখানে পৌছে দেখি, বর্তমান পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পূর্ব পাশের বটগাছের নিচে একটি টেবিল ও দুইটি চেয়ার পাতা আছে৷

রেসকোর্সে সমবেত বিশাল জনতার জয়ধ্বনি-জয় বাংলা-ধ্বনির মধ্যে আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, লে. জেনারেল, মার্শাল ল প্রশাসক, জোন বি এবং কমান্ডার, ইস্টার্ন কমান্ড (পাকিস্তান) এবং জগজিৎ সিং অরোরা, লে. জেনারেল. অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, ইন্ডিয়ান অ্যান্ড বাংলাদেশ ফোর্সেস ইন দি ইস্টার্ন থিয়েটার। তারিখ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এ হচ্ছে উৎসবের দিন। এ হচ্ছে আনন্দের দিন। এ হচ্ছে বিধাতার উদ্দেশে শুকরিয়া জ্ঞাপনের দিন। এ হচ্ছে এক সমুদ্র রক্ত থেকে উত্থিত বাংলাদেশের বিজয় দিবস।

আত্মসমর্পণ দলিলে সই করার অনুষ্ঠানপর্ব চলাকালে ঐতিহাসিক দৃশ্য তাকিয়ে দেখলাম। এ হচ্ছে সহসা আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান। আমার সহযোদ্ধা সৈনিকদের নিয়ে যেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি, সেদিন থেকে নয় মাস সমরে, শিবিরে, রণাঙ্গনে প্রতিমুহূর্তে উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা, আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, মৃত্যুভয় এবং সহযাত্রী বহু সৈনিকের মাতৃভূমির জন্য অকাতরে জীবন দেওয়ার করুণ দৃশ্যজনিত ভয়াল মুহূর্তে ছিলাম। কখনো এতটুকু বিশ্রাম গ্রহণ করিনি—নিদ্রাহীনতা, ক্ষুধা, ক্লান্তির কাছে মাথা নত করিনি—মনে হচ্ছে, জাতির নিশাবসান শেষে আজ আমি ধন্য হলাম—সদ্য স্বাধীন হওয়ার লগ্নে উপস্থিত হতে পেরে, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার বিরল সম্মান পেয়ে অভিভূত হলাম।

মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম: মুক্তিযুদ্ধকালে এস ফোর্সের অধিনায়ক; সাবেক সেনাপ্রধান