default-image

ভিআইপি রোডে রিকশা ঢুকে পড়লে টায়ার ফুটো করে রিকশা উল্টে দেওয়ার নিয়ম। মাঝেমধ্যে ফুটপাতে সারি সারি উল্টো রিকশা দেখতে দেখতে ভাবি, দেশটা আসলে কাদের হওয়ার কথা ছিল? ‘ভিআইপি’দের?

লেখাটি যখন লিখছি, ১১ দফা দাবিতে মিলগেটে অনশন করছেন খুলনার শত শত পাটকলশ্রমিক। ১১ দফা যেন কী ছিল? ১৯৬৯ সালে? পাটকলশ্রমিকদের কথা কী যেন লেখা ছিল সেখানে!

এ বছর ধানের উৎপাদন খরচ ৭৫০ টাকা, কৃষক ধান বেচেন ৫৫০ টাকায়। উল্টো রাজার দেশে এটাই নিয়ম। কৃষক বুক চাপড়ান, নিদারুণ অভিমানে খেতের আলু, ফুলকপি রাস্তায় ফেলে দেন। কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে কেউ হয়তো গলায় দড়ি দেন আর পুলিশ কারও পেটে দড়ি বাঁধে। তবু পরের বছর আবারও তীব্র মমতায় বীজতলা বানান কৃষক। ধান বোনেন, ঘাম ঝরান। আর ভর্তুকি দিয়ে একটা বিকারহীন জাতিকে যুগ যুগ ধরে খাওয়ান। মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছরের মাথায় মহাকাশে স্যাটেলাইট গেছে, ১৮তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের তালিকায় আমরাও আছি সামনের সারিতে। কিন্তু আমাদের খাওয়াতে খাওয়াতে উন্নয়নের এক্সপ্রেস হাইওয়েতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছেন ভাতের জোগান দেওয়া কৃষক।

বিজ্ঞাপন

সাদা–কালো ছবিতে দেখেছি, কাঁছা বেঁধে মেশিনগান ঝুলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন কৃষক। সেই একই কৃষক ধানের দাম না পেয়ে কালো প্যান্টে নীল শার্ট গুঁজে রাজধানীর সিকিউরিটি গার্ড হন, ফুটপাতে কাপড় বেচেন, রিকশা চালান। ২৯টি কয়লা প্ল্যান্ট আর ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের বদলে আজীবনের বসতভিটা আর হেমন্তের ধানখেত হারিয়ে পোকামাকড়ের মতো নিখোঁজ হয়ে গেছেন লাখো চাষি। শিরোনাম বরাদ্দ হয়নি।

তো এই হলো আপনাদের ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’? ডিজিটাল বাংলাদেশ, উন্নয়নের মহাসড়ক, সোনার বাংলা, আর কী কী যেন বলেন আপনারা? এই হলো তার নমুনা।

বারো মাসে এক হাজারের বেশি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এ দেশে। বিচার হয়নি।

এখানে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর গলা টিপে মেরে ফেলা সব স্বাভাবিক। আর বিচার না হওয়াটা আরও স্বাভাবিক। এই রাষ্ট্র দ্রুত বিচার আইনেও ৯৭ ভাগ ধর্ষণের বিচার করতে পারে না। এই রাষ্ট্র ঘুষ খেয়ে ভিকটিমের মামলা ঘুরিয়ে দেয়। এই রাষ্ট্র কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় খুব এগিয়ে যাচ্ছে! কী অদ্ভুত! এ দেশে ১৯৭১–এর গণহত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ডিজিটাল বাংলাদেশে ন্যায়বিচার আর কোথায়?

আসলে এভাবে হয় না। লাল–সবুজ ব্যান্ডানা বেঁধে জাতীয় সংগীত গাইলাম, আর গিনেস বুকে নাম ওঠালাম, এটাই কি হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? রহিম–করিমের রেমিট্যান্সের জোরে টিকে আছে লুটপাটের ধাক্কায় নড়বড়ে অর্থনীতি। মরুর দেশের তীব্র তাপে খেটে খেটে শেষ হয়ে গেছেন এই মানুষগুলো। দূতাবাস, সরকার, রাষ্ট্র—কেউ তাঁদের পাশে থাকেনি। তবু গুনে গুনে পাঠিয়ে গেছেন ডলার।

বছরে এক লাখ কোটি টাকা রেমিট্যান্স! ভাবা যায়? নইলে বাঁচত এই দেনাগ্রস্ত ফ্লাইওভারের দেশ? বড় কষ্টে পাঠানো এসব ঘামে ভেজা নোট দিয়ে আমরা চীন থেকে সাবমেরিন কিনেছি, রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান কিনেছি। আধপেটাদের শহরে শয়ে শয়ে বিএমডব্লিউ আমদানি করেছি। আর বাকিটা পাচার করে দিয়েছি বিদেশে। এত দুর্নীতি, এত অসততা, এত বৈষম্য, এত জুলুম। তারপরও এই দেশকে আহ্লাদ করে সোনার বাংলা ডাকতে হবে? হ্যালো বাংলাদেশ, হ্যালো? পারভীনের ছেঁকা খাওয়া বুক, রোকসানার ভাঙা হাত–পা, সালমা বেগমের ধর্ষিত শরীর, আর ১৩ বছরে দেশে ফেরত আসা ৩৩ হাজার তরুণ–তরুণীর কফিনের ওপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তোমার উন্নয়ন। রানা প্লাজা আর তাজরীনের কঙ্কালগুলোরও আঙুল ছিল। ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পৃথিবীর সর্বনিম্ন মজুরিতে সেলাই করে বিদেশি ডলার কামাই করে এনেছিলেন তাঁরা। দিনের পর দিন কুঁজো হয়ে বসে ওভারটাইম করা এসব মেয়ের মেরুদণ্ডের তীব্র ব্যথার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে তোমার ৮ পার্সেন্ট জিডিপি। কোথায় বিবেক আমাদের? কোথায় লজ্জা? কীসের এত অহংকার? কীসের উন্নয়ন?

একদিন বড় বেশি রক্তে ভেসেছিল এই দেশ। এত এত মানুষের লাশ, এত এত ধর্ষিত মেয়ে, এত এত শরণার্থীর দীর্ঘ পথ হাঁটা, এত অবর্ণনীয় দুঃখ–কষ্ট আর অসম্ভব দাম দিয়ে কেনা একটু টুকরো স্বাধীন ভূখণ্ড, সেটাকে বেচতে বেচতে ও লুটতে লুটতে এক অদ্ভুত ইটপাটকেলের গ্যাসচেম্বার বানিয়েছি আমরা। এখানে নোট আছে, কংক্রিট আছে, ফ্লাইওভার আছে; শুধু কোথাও কোনো সততা নেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

নৈরাশ্যবাদী লেখা লিখতে চাইনি, কিন্তু দেশ ভালো নেই। ভেঙেচুরে গেছে সবকিছু। আমাদের সংবাদমাধ্যম, আমাদের নদী, আমাদের বাতাস, আমাদের বনভূমি, আমাদের রাজধানী। আমাদের প্রজন্ম, আমাদের চাপা ক্ষোভ, আমাদের মেরুদণ্ড। ভালো নেই, কেউ ভালো নেই। যাদের কিছু দেওয়ার ছিল, তাদের ভাঙা মেরুদণ্ড, তাদের সীমাহীন দৈন্য দেখি।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের ১১ দফা, আর মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতা, কোনো কিছুরই প্রতিফলন নেই ডিসেম্বরের দিনগুলোয়। দেখি বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাওয়া ডিসেম্বর। কথা ছিল, জুলুমের দিনগুলোতে আমরা তীব্র ক্ষোভে ও রাগে ফেটে পড়ব। কথা ছিল, রাজনীতি আমাদের হবে। কথা ছিল, ‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বণ্টন।’

হয়নি। কেউ কথা রাখেনি।

মাহা মির্জা গবেষক ও লেখক