default-image

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের স্বপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে দেশে দেশে বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা, অধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠন তত্পর হয়ে ওঠে। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর ২২ এপ্রিল ভারতের গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ কলকাতায় এসে প্রবাসী সরকারের নেতাদের সঙ্গে দেখা করে জানান যে তিনি বাংলাদেশের সমর্থনে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করবেন। পরে ফিরে এসে বাংলাদেশের স্বপক্ষে দিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করবেন। ২৮ এপ্রিলের ভারতের যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় যে ভারতের গান্ধীবাদী সংস্থাগুলো যথাশিগগির বাংলাদেশ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করবে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে জয়প্রকাশ ১৬ মে থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ৪৩ দিন বিশ্বের ১৭টি বড় শহরে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে সভা করেন।

জয়প্রকাশ নারায়ণ ভারতে ফিরে এসে বাংলাদেশ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণা দেন। ভারতের গান্ধীবাদী সংস্থাগুলো এ সম্মেলন সফল করার জন্য জয়প্রকাশের পাশে এসে দাঁড়ায়। ভারত সরকার নেপথ্যে থেকে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্যোগকে সমর্থন করে। বাংলাদেশ সরকারও এ উদ্যোগে অংশ নিতে রাজি হয়। সম্মেলন সফল করার জন্য জয়প্রকাশকে সভাপতি এবং জর্জ ফার্নান্দেজ, রাধাকৃষ্ণ মেনন ও এ সি সেনকে সদস্য করে একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। রাধাকৃষ্ণ মেনন প্রস্তুতি কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের তারিখ ১৪ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সম্মেলনের নাম দেওয়া হয় ‘ওয়ার্ল্ভ্র মিট অন বাংলাদেশ’। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা কলকাতার বাংলাদেশ মিশনকে সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জুলাই মাসের প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজকদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক এবং মিশনের প্রথম সচিব আর আই চৌধুরীর আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ড. মল্লিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের তালিকা এবং তাহেরউদ্দীন ঠাকুর ও মওদুদ আহমদ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করবেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে ২০ জুলাই কলকাতা মিশনে দ্বিতীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, খান সারওয়ার মুরশিদ, আনিসুজ্জামান, মতিলাল পাল, বেলায়েত হোসেন, আলী আনোয়ার, মওদুদ আহমদ ও আর আই চৌধুরী। সভার কার্যবিবরণী থেকে ধারণা করা যায়, আয়োজকেরা বাংলাদেশ থেকে ২৫ জন প্রতিনিধির নাম প্রেরণের অনুরোধ করেছিল। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ড. মল্লিক ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম প্রস্তাব করেন। নির্বাচন করা হয় ১০ জনকে—এ আর মল্লিক, সৈয়দ আলী আহসান, খান সারওয়ার মুরশিদ, মতিলাল পাল, স্বদেশ বসু, এ এ জিয়াউদ্দীন আহমদ, ওসমান জামিল, সাদেক খান, আলমগীর কবির ও মওদুদ আহমদ। সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য সভার পক্ষ থেকে আবদুল মুনতাকীন চৌধুরী, আমিরুল ইসলাম, এম এ সুলতান, এম এ খায়ের ও তাহেরউদ্দীন ঠাকুর এবং সমর দাস, সন্জীদা খাতুন, কল্যাণী ঘোষ, আবদুল জব্বার ও আপেল মাহমুদের নাম প্রস্তাব করা হয়। বাকি পাঁচজন প্রতিনিধি পরে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নয়টি বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রতিটি বিষয় প্রস্তুত করার জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সম্মেলনের প্রস্তুতির ও বিবিধ কারণে আয়োজকেরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন আগস্ট মাস থেকে পিছিয়ে ১৮-২০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেন। ভারত সরকার প্রথম দিকে বাংলাদেশ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সম্মত থাকলেও ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর এর সরাসরি বিরোধিতা করে। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস ও সিপিআইও সম্মেলন থেকে সরে দাঁড়ায়। ভারত সরকারের বিরোধিতার ফলে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার এবং বিদেশি বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও সম্মেলন নিয়ে কিছুটা দ্বিধার সৃষ্টি হয়। জয়প্রকাশ নারায়ণ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেও আন্তর্জাতিক সম্মেলন বিষয়ে তার সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। এখানে সম্মেলনটি তাজউদ্দীন আহমদের উদ্বোধন করার কথা ছিল।

জয়প্রকাশ নারায়ণ ব্যক্তিগতভাবে কলকাতায় এসে তাজউদ্দীন আহমদ ও খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে দেখা করে সম্মেলনে তাঁদের অংশ নিতে অনুরোধ করেন। তাঁরা এ প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও বেসরকারিভাবে সম্মেলনে অংশ নিতে রাজি হন। ড. মল্লিককে প্রধান করে ১০ জনের একটি দলকে সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠনোর জন্য নির্বাচন করা হয়। দলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, খান সারওয়ার মুরশিদ, এ জেড আহমেদ, স্বদেশ বসু, মতিলাল পাল, ওসমান জামাল, সাদেক খান, মওদুদ আহমদ ও আলমগীর কবির।

১৮ সেপ্টেম্বর দিল্লির সপ্রু হাউসে ‘ওয়ার্ল্ভ্র মিট অন বাংলাদেশ’ শুরু হয়। তাজউদ্দীন আহমদের অনুপস্থিতিতে জয়প্রকাশ নারায়ণ সম্মেলনটির উদ্বোধন ও সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে মোট ২৪টি দেশের ১৫০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। এতে ভারত ছাড়া ২৩টি দেশ থেকে প্রায় ৬৫ জন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। কংগ্রেস ও সিপিআই ছাড়া ভারতের সব রাজনৈতিক দল সম্মেলনে অংশ নেয়। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কংগ্রেস ও সিপিআইয়ের কিছু নেতা পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ভারতের বাইরে থেকে উপস্থিত ছিলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বি পি কৈরালা, যুক্তরাজ্যের সাংসদ উইলিয়াম মলি ও ফ্রেড ইভান্স, স্যার জর্জ ক্যাটলিন (যুক্তরাজ্য), টয়েসি নারা (জাপান), নেলসন (ডেনমার্ক), কিউ হারদাদ (আফগানিস্তান), স্যার সিনারত গুণবর্ধনে (শ্রীলঙ্কা), দানিয়েল ময়ার (ফ্রান্স), মুহাম্মদ রয়েম (ইন্দোনেশিয়া), স্ট্যানলি প্লাসট্রিক (আমেরিকা), গানি ফেহিনমি (নাইজেরিয়া), ক্লভিস মকসুদ (মিসর), বায়ার্ড বাসটিন (আমেরিকা), এম সুবিয়ান (মালয়েশিয়া), ভি ডেভিড (মালয়েশিয়া), পাভেল সারমোভিক (যুগোস্লাভিয়া), সিগ্রিড হানিসদাল, (নরওয়ে), জন ড্যানহাম (অস্ট্রেলিয়া) প্রমুখ। ভারতীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন কে সুব্রামানিয়াম, শেখ আবদুল্লাহ্, সাদিক আলী, আচার্য জে বি কৃপালনী, সুচেতা কৃপালনী, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, শাহনেওয়াজ খান, কমলা দেবী চট্টোপাধ্যায়, এম সি চাগলা, এম বাসাভপুন্নিয়া, রাজ নারায়ণ, এম এল সন্ধি, দাউজি গুপ্তা প্রমুখ।

সম্মেলন শুরু হয় সচিব রাধাকৃষ্ণ মেননের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন দুই মিনিটের নীরবতা পালন করে। এর পর সম্মেলনে অংশ নিতে না পারা কিছু বিশ্বনেতার শুভেচ্ছাবাণী ও বাংলাদেশের প্রতি সংহতিবার্তা পড়ে শোনানো হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরী, কানাডার প্রধানমন্ত্রী লেস্টার পিয়ারসন, ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেন্দেস, ফরাসি দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবী অঁদ্রে মালরো, আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, সংগীতজ্ঞ ইহুদি মেনুহিন প্রমুখ। এ ছাড়া ভারতের অনেক নেতা ও বুদ্ধিজীবীও এতে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন।

বিশ্বনেতাদের বক্তব্য পাঠ শেষে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয় জয়প্রকাশ নারায়ণের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। সভাপতির ভাষণের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ আর মল্লিক বক্তব্য দেন। তিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পৈশাচিক বর্বরতার কাহিনি ও মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেন। এর পর বিদেশি বক্তারা বক্তব্য দেন।

এ অধিবেশনের পর আলোচনার জন্য তিনটি মূল বিষয়ে আলাদা আলাদা তিনটি কমিশন গঠন করা হয়: ১. বাংলাদেশ পরিস্থিতি, ২. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সরকারকে সাহায্য, এবং ৩. আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা। তিন দিনের এ সম্মেলনে এসব বিষয় ছাড়া আরও অনেক বিষয়েই আলোচনা হয়। অঁদ্রে মালরো তাঁর প্রেরিত বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিষয়টি সম্মেলনে বেশ সাড়া জাগায়। জয়প্রকাশ নারায়ণ ও বি পি কৈরালা এতে সমর্থনও দেন। অনেক আলোচক গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল করে অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে প্রবেশেরও প্রস্তাব করেন।

বিজ্ঞাপন

সম্মেলন শেষে আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যসহ একটি বিস্তারিত কার্যবিবরণী প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়: ক. আন্তর্জাতিক সম্মেলন পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রামকে সর্বতোভাবে সমর্থন করে। খ. বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সদস্য, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘুদের ওপর পরিচালিত সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ বা গণহত্যায় সম্মেলন গভীরভাবে বিক্ষুব্ধ। গ. সম্মেলন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে। ঘ. সম্মেলন শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি জানায়। ঙ. সম্মেলন আন্তর্জাতিক রেডক্রসকে আবেদন করে যেন তারা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। চ. সকল রাষ্ট্রকে সম্মেলনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, যেন তারা পাকিস্তানকে সব ধরনের সামরিক সাহায্য বন্ধ করে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রায় ৩৫ জন বিদেশি প্রতিনিধি ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এসে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁরা সল্ট লেকে অবস্থিত শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের বর্বরতা ও ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের মানবিক সমস্যার কথা সম্মেলনে আগত ২৪টি দেশের প্রতিনিধির মাধ্যমে তাঁদের নিজ নিজ দেশে জোরালো প্রচার পায়। এটাই ছিল ওয়ার্ল্ড মিট অন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আগত প্রতিনিধিরা তাঁদের তথ্য মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে তাঁদের নাগরিকদের বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানিয়ে দেন। এটি বিশ্বজনমতকে বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

রেহানা পারভীন