এস আর মীর্জা:১৯৭১ সালের মার্চে আমি লক্ষ করলাম, পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। ২ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বিমানবাহিনীর অফিসে গিয়ে আমি জানতে চেষ্টা করি কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে। আমি কথা বলি এ কে খন্দকারের সঙ্গে। তিনি আমার জায়গাতেই বদলি হয়ে এসেছিলেন। আমি তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় আমি লক্ষ করলাম, তিনি খুবই আপসেট। তিনি আমাকে লনে যেতে বললেন। আমি বুঝলাম, তিনি একান্তে আমাকে কিছু বলার জন্য লনে যেতে বলেছেন, যাতে অন্য কেউ শুনতে না পায়। ওখানে গিয়ে তিনি আমাকে কয়েকটি বিষয় অবহিত করলেন। এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ। এক. নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের হাতে পাকিস্তানিরা কোনোক্রমেই ক্ষমতা হস্তান্তর করছে না। দুই. সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১২টি ট্যাংক ঢাকার কুর্মিটোলায় নিয়ে এসেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আওয়ামী লীগের কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতি আছে কি না এবং তা জানার জন্য আমাকে বললেন। যুদ্ধ বলতে ওই বাঁশের লাঠি দিয়ে নয়! অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

তখন আমি আওয়ামী লীগের নেতা পর্যায়ের কাউকে চিনতাম না। আমি আমার এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে যারা এমএনএ, এমপিএ নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজনকে চিনতাম। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা ছিলেন আমার কাজিন। ওই অবস্থায় আমি তাঁকে গিয়ে বললাম আওয়ামী লীগের যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করার জন্য। দুই দিন পরে তিনি আমাকে জানালেন, আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধপ্রস্তুতি নেই। এমনিতেই আন্দোলন চলছে। তখনো ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। আমি রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলাম স্বাভাবিকভাবেই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। তারা সরকার গঠন করবে—এটা সবার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। যেকোনো গণতন্ত্রমনা মানুষের এটা কাম্য। এটা না করে পাকিস্তান সরকার যে পন্থা বেছে নিল, তা সম্পূর্ণ নির্বুদ্ধিতার শামিল। ওরা বুঝতে পারেনি যে সত্যিকার অর্থে অবস্থা কী এবং দেশে কী হতে যাচ্ছে।

এর মধ্যে আমার এক ভাতিজা একদিন ফোন করে আমাকে বলল, ২২ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক লোকদের একটি মার্চপাস্ট অর্থাত্ শোভাযাত্রা হবে বায়তুল মোকাররমে, কর্নেল ওসমানী সেখানে থাকবেন। আমি যেন উপস্থিত থাকি। আমি সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখলাম কর্নেল রব আছেন, জেনারেল মজিদ আছেন। আমরা তিন লাইনে দাঁড়ালাম। আমি একটা লাইনে ছিলাম। কর্নেল ওসমানী এসে আমাকে বললেন, বিমানবাহিনীর মধ্যে আপনি সবচেয়ে সিনিয়র। আপনি বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন। এতে আমি রাজি হলাম। শোভাযাত্রা শেষ করে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের দেখা হলো।

তখন আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে পরিস্থিতি, বিশেষত পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবিলা করার বিষয়ে কথা বললাম। আমি ওসমানীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন। তাঁর কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেল না। আমি তাঁকে বললাম, অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করা যাবে না। তাদের সশস্ত্রভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু এজাতীয় সামরিক পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ছিল কি না এটা ওসমানী সাহেব আমাকে বলতে পারেননি।

আসলে ইতিহাসের অনেক কথাই বলা বা লেখা যায় না। হিস্ট্রি অ্যাজ রিটেন ইজ নট দ্য হিস্ট্রি হ্যাজ হ্যাপেনড, ২২ মার্চের শোভাযাত্রা শেষে আমি আমার কাজিন রবের বাসায় গিয়েছিলাম। সেক্রেটারি রব। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন সাহেবকে খুব ভালোভাবে জানতেন। আমি রব ভাইকে বললাম, আপনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন বা এ বিষয়ে কী ভাবছেন? রব সাহেব বললেন, গান্ধীও ১৯২০ সালের দিকে অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু সেটা ননভায়োলেন্ট থাকেনি। আমি তখন বললাম, আপনি গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক। আমি তখনই বুঝেছিলাম, এখানে পাকিস্তানি বাহিনী একটা ভয়ানক ধ্বংসলীলা চালাবে। এই ধ্বংসলীলা হবে অকল্পনীয়—হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের মতো। তাই গিয়ে দেখুন, শেখ সাহেব কী ধরনের প্রস্তুতির কথা ভাবছেন। রব সাহেব আমাকে পরদিন সন্ধ্যায় আবার তাঁর বাসায় যেতে বললেন।

আমি পরদিন সন্ধ্যায় রব সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। রব সাহেব বললেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এসব আমি জানি।’ সেদিন আমি সোবহানবাগ দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় দেখা হলো এ কে এম মাহবুবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি পাবনার এমপিএ ছিলেন। সাবেক নেভাল কমান্ডার। তিনি আমাকে কাছেই একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ওই বাড়ির দোতলায় উঠে দেখি মনসুর আলী সাহেব বসে আছেন। সঙ্গে আছেন সিরাজগঞ্জের এমপিএ হায়দার সাহেব। আমি তাঁকে বললাম, বঙ্গবন্ধু সব নেতাকে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার কথা বলেছেন, অথচ আপনি এখনো এখানে বসে আছেন! কেননা, আমি জানতাম, যেকোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। আমাদের বসে থাকার সময় নেই। মনসুর আলী সাহেবকে আমার মতামত বললাম। তিনি কিছু বললেন না। আমি চলে এলাম।

বিজ্ঞাপন

মঈদুল হাসান: ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে থেকেই পাকিস্তান তার ট্রুপস বিল্ডআপ শুরু করে। অনেকে মনে করত, একটা বিশাল রক্তপাত হতে চলেছে এখানে। এই সময়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আসাফ-উদ-দৌলার (সিএসপি) বড় ভাই মেজর মসিহ-উদ দৌলা ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার অফিসে জেনারেল স্টাফ ছিলেন। কোর কমান্ডারের জি-২, ইনটেলিজেন্সের দায়িত্বে। ওদের আরেক ভাই আনিস-উদ দৌলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আনোয়ারুল আলম। মার্চের ৩ তারিখে ওদের কাছ থেকে পাকিস্তানি আর্মির প্রস্তুতি সম্পর্কে গোপন নানা তথ্য জানতে পারার পর আনোয়ারুল আলম আমার সঙ্গে দেখা করেন। তথ্যগুলো উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছানো দরকার বলে তথ্য সরবরাহকারীরাই তাঁকে অনুরোধ করেছেন বলে তিনি জানান। পাকিস্তানি আক্রমণের প্রস্তুতি এতটাই এগিয়েছে যে এর মধ্যেই রংপুর থেকে ট্যাংক রেজিমেন্ট নিয়ে আসা হয়েছে এবং তাতে রাবার বেল্ট লাগানো হচ্ছে ঢাকা শহরের পথে অপারেশন চালানোর উপযোগী করে। আনোয়ারুল আলম সেদিন আমাকে সংশ্লিষ্ট মহলে খবরগুলো পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি কেবল আমার দীর্ঘদিনের বন্ধুই ছিলেন না, আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এক ছিল এবং তাঁর সততা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় আমার আস্থা ছিল। কাজেই তাঁর প্রস্তাবে আমি রাজি হই। তবে বলি, এসব খবর হয়তো অন্যভাবেও পৌঁছে যাবে, বরং আপনার সূত্রকে জিজ্ঞাসা করুন, পাকিস্তানের আসন্ন হামলা ঠেকানোর মতো কোনো উপায় আছে কি না।

আলম পরের দুই দিন ওই কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বিরাট ঝুঁকি নিয়ে ওদিকে যোগাযোগ করেন অন্তত দুবার, আবার এদিকে কথা হয় অনেকবার আমার সঙ্গেও। ৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমার জিজ্ঞাসার পুরো উত্তর পাওয়া যায়। তিনি জানালেন, পাকিস্তানি আক্রমণ প্রস্তুতি বন্ধ করা যেতে পারে কেবল সামরিক পথেই। এখনো এই প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) বাঙালি সৈন্যের সংখ্যা অবাঙালি সৈন্যদের থেকে বেশি। তা দিয়ে গোদনাইল জ্বালানি তেলের ডিপো ধ্বংস করা, ঢাকা বিমানবন্দর অকেজো করে ফেলা এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দখল করা—এই তিনটি কাজ একযোগে করা সম্ভব। এগুলো হলেই পাকিস্তানিরা খুব অসুবিধায় পড়বে। এই কাজগুলো করার জন্য বাঙালি ফোর্স পাওয়া যাবে কি এবং কীভাবে পাওয়া যাবে, তাই ছিল আমার প্রশ্ন। সেই উত্তরও আলম নিয়ে আসেন। ফোর্স আছে, তবে আর্মির লোকদের মুভ করাতে হলে একটা অর্ডার লাগে, ওপরের লেজিটেমেট অর্ডার ছাড়া তারা মুভ করতে পারে না। সেই লেজিটিমেসি শেখ মুজিবের এখনো নেই, তবু বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার ফলে তিনি একটা মরাল অথরিটি পেয়েছেন। তার ভিত্তিতে তিনি যদি অর্ডার দেন ক্লিয়ারকাট, তবে বাঙালি ফোর্সরা অস্ত্র ধরতে রাজি হবে, যেমন সিভিল সার্ভিসের সবাই তাঁকে মেনে নিয়েছেন। একই সূত্র থেকে গোটা প্রদেশের একটা সামগ্রিক অবস্থা আমার জানা ছিল। উভয় পক্ষের তুলনামূলক সৈন্যসংখ্যা জানার জন্য একটা ম্যাপ বা নকশা আমি চেয়েছিলাম। সেটাও পাঠানো হবে বলা হয়েছিল। আলমের সঙ্গে তারপর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মেজর মসিহ-উদ দৌলা সেই ম্যাপ বানিয়ে তাঁর বোন প্রখ্যাত গায়িকা ফিরোজা বেগমের হাতে ৭ মার্চ সকালে সরাসরি শেখ মুজিবের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে অনেক বছর বাদে প্রেরকের কাছেই আমি জানতে পারি। কিন্তু সেটার তখন আর প্রয়োজন পড়েনি।

আমি ওই দিনই অর্থাত্ ৫ মার্চ রাত সাড়ে নয়টায় গেলাম শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে আমার ১০-১১ বছরের পুরোনো পরিচয়। ১৯৬২ সালে আমি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে সাড়ে চার মাস জেলে ছিলাম, একই ২৬ সেলে। তারপর আমাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। ৫ মার্চ রাতে যখন তাঁর কাছে গেলাম, তখন আওয়ামী লীগের নেতারা সদলবলে বেরিয়ে আসছেন। আবদুল মোমেন এগিয়ে এলেন আমাকে ভেতরে নিয়ে যেতে। তাঁকে বললাম, আমি একা দেখা করতে চাই। কারণ এখানে একজন সার্ভিং অফিসারের (মসিহ-উদ দৌলা) নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। তিনি গেলেন না। কিন্তু রেহমান সোবহান এসব কিছু না শুনেই সোত্সাহে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তবে সে সময়ে রেহমান সোবহান বাংলা ভাষাটা ভালো বুঝতেন না। সেটাই আমার ভরসার কথা।

আমি শেখ মুজিবকে মেজর দৌলার দেওয়া তথ্য, পাকিস্তানের আক্রমণ প্রস্তুতি, ট্যাংক বহরকে ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করার সংবাদ, এমনকি তথ্যদাতার পারিবারিক পরিচয়ও প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলাম। আমি যা অনুমান করেছিলাম, তিনি শুনে বললেন, আমি সব জানি! আমি তাঁকে বললাম, আরও একটা সংবাদ আছে দেওয়ার। আর্মির ওই সূত্রকে আমি জিজ্ঞাসা করেছি, কী করে পাকিস্তানিদের ঠেকানো যায়? উত্তরে জানিয়েছে, তিনটি স্পেসিফিক অপারেশন করতে হবে—গোদনাইল পিওএল ডিপো অকেজো করা, ঢাকা এয়ারপোর্ট ব্যবহারের অনুপযোগী করা আর চট্টগ্রাম পোর্ট দখল করা। এগুলো করার মতো বাঙালি ফোর্সও আছে, তাদের পাওয়াও যাবে বলে শুনেছি, তবে তার জন্য আপনাকে পরিষ্কার নির্দেশ দিতে হবে। এর ফলে অন্যান্য জায়গাতেও পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়বে তাড়াতাড়িই—ভারত ওভারফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এবং ঢাকা এয়ারপোর্ট ও চট্টগ্রাম পোর্ট বন্ধ করে দেওয়ার পর রি-ইনফোর্সমেন্ট পাকিস্তানের জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আমার সব কথা শুনে একটু চুপ থেকে শেখ মুজিব জিজ্ঞেস করলেন, তাজউদ্দীন জানে ব্যাপারটা? বললাম, না কেবল আপনিই জানতে পারলেন, সেটাই ছিল তাদের অনুরোধ। তাহলে আপনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে আলাপ করে নেন, শেখ মুজিব এই কথা বলে আলোচনা শেষ করলেন।

আমি সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বেরিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়িতে যাই। তাঁকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। তার পরও অনেক প্রশ্ন করে আরও বিষয় তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন। সবশেষে জিজ্ঞাসা করলেন, মুজিব ভাইয়ের কথা শুনে আপনার কী মনে হলো? তিনি কেন আপনাকে আমার কাছে পাঠালেন? আমি বললাম, তিনি হয়তো এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না। আবার খবরটা অগ্রাহ্যও করতে পারলেন না। তাই আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, দায়দায়িত্ব এখন আপনার। তাজউদ্দীন হেসে বললেন, এই তো আপনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুঝে গেছেন! এমনিভাবে ওই রকম একটি উদ্যোগের সম্ভাবনা তখন বাদ পড়ে।

আরও অনেক জানা ও অজানা ঘটনা আজও স্বাধীনতার এত বছর পরও, পক্ষপাতহীনভাবে এবং সমগ্র ঘটনার অংশ হিসেবে দেখা হয় না। ৭ মার্চ শেখ মুজিবের ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই বহুল প্রচারিত উক্তির কথাই ধরা যাক। মার্চের প্রথম পাঁচ দিনে পূর্ববাংলার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের তীব্রতা দেখে ইয়াহিয়া অপ্রত্যাশিতভাবেই আবার ঘোষণা করেন, ২৫ মার্চ থেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। এটা তাচ্ছিল্য করার বিষয় ছিল না। কাজেই ৭ মার্চের জনসভায় শেখ মুজিব জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার শর্ত হিসেবে তিনটি দাবি তোলেন—কারফিউ তুলে নিতে হবে, মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যা ও নির্যাতনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিনি এ-ও জানতেন, এ দেশের অনেক মানুষ স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে জনসভায় এসেছে। কিন্তু পরিস্থিতি সেই ঘোষণার অনুকূলে ছিল না। পর্যাপ্ত সামরিক প্রস্তুতি না নিয়ে এ ধরনের ঘোষণা বিরাট বিপদ ডেকে আনতে পারত। এই নাজুক অবস্থায় মানুষকে সংগ্রামমুখী করে রাখার উদ্দেশে এবারের সংগ্রামের চরিত্র উদ্দীপ্তভাবেই তিনি তুলে ধরেন। সেই ঘোষণাকে সে সময় যেভাবেই গ্রহণ করা হয়ে থাকুক, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা শুরু হওয়ার পর মানুষ এই আলোচনার ফলাফলের দিকেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পরে—শেখ মুজিবের কণ্ঠে স্পেসিফিকভাবে কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা না থাকায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ৭ মার্চের ঘোষণাকে প্রত্যহ কয়েকবার করে বাজানো হয়েছে। তারও অনেক বছর পরে উত্তরসূরিদের রাজনীতি আবার সেই কথা দুটি সামনে এনে তা স্বাধীনতা ঘোষণার সমার্থক প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যে পটভূমিতে, যে বাস্তবতা বোধ থেকে এবং যেভাবে ওই বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল, তার যথার্থতা ভাবাবেগবর্জিতভাবে এ দেশে কমই আলোচিত হয়েছে। ওটা তাঁর অনুসারীরাও করেননি, বিরুদ্ধবাদীরাও না।

১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। ছাত্রলীগের ছেলেরা আপসহীনভাবে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম জোরদার করে তুলেছিল নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়িয়ে। অন্যদিকে নির্বাচিত এমএনএগণ পার্লামেন্টে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, মোটামুটিভাবে সম্মানজনক আপস প্রস্তাবের ভিত্তিতে। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনে নিজে অত বড় একটা মেজরিটি পাওয়ার পর, ছয় দফাকে কমিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা গ্রহণ করলে, তা তাঁর জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার নামান্তর হবে বলে তিনি (শেখ মুজিব) মনে করতেন। অন্যদিকে ইয়াহিয়া ছয় দফার সমর্থক সদস্যদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকার বিনষ্ট করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তা প্রতিরোধ করার জন্য সত্যিই একমাত্র উপায় ছিল, মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যা ও সামর্থ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যুত্থান ঘটানোর ব্যবস্থা করা। যে পথ শেখ মুজিব গ্রহণ করেননি। একটা অহিংস অসহযোগ আন্দোলন নিরস্ত্র দেশবাসীকে যত দূর নিয়ে যাওয়ার, তা নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কেবল সে পথে যে ক্ষমতার হস্তান্তর সম্ভব নয়, তা এখন আর অস্পষ্ট নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কিসের ভরসায় মুজিব ১৫ মার্চ থেকে ঢাকায় ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসতে সম্মত হলেন? কারা তাঁকে আস্থা জুগিয়েছিল, সেই সামরিক জান্তা এক দিনের জন্যও সৈন্য ও সমর-সম্ভার নিয়ে আসা থেকে বিরত হয়নি, তারা তাঁকে কনফেডারেশন দেবে?

বিজ্ঞাপন

এখনো এসব বিষয়ে যথেষ্ট আলোকপাত হয়নি। সম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১৯৭১ সালের যেসব গোপন দলিলপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেছে, তার মধ্যে কিছু সূত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। সম্ভব ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার আস্থাভাজন পাকিস্তানি আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমি আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তাঁরাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন।’ এরপর এই অঞ্চল নিয়ে আমেরিকার তত্পরতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাদের তত্পরতার বিভিন্ন দিক—কলকাতায় প্রবাসী সরকারের মধ্যে আন্তর্জাতিক তত্পরতা থেকে শুরু করে যুদ্ধের শেষ অবধি সামুদ্রিক তত্পরতার অনেক কথাই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ২৬ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের দুই দিন আগে পর্যন্ত কনফেডারেশনের আইন তৈরির মায়াময় জগত্ সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা আজও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে পলিটিক্যাল লিডারশিপ কেন একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি, সেটা ভাবাবেগমুক্তভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে আর একটি ছোট ঘটনার কথা বলি। সে দিন ২২ মার্চ। সন্ধ্যায় ন্যাপপ্রধান আবদুল ওয়ালি খান, গাউস বক্স বেজেঞ্জো, ওদিকের এবং এদিকের আরও কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার বাসায় নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। স্থানীয় নিমন্ত্রিতদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে জীবিত ব্যক্তি হিসেবে একমাত্র বদরুদ্দীন উমরের কথাই মনে করতে পারছি। ওয়ালি খান এসেই বললেন, আমি আজ সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি, কী তোমার সর্বশেষ অবস্থা? ইয়াহিয়া বললেন, আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেছি, সেখান থেকে বেরুতে হলে, আই হ্যাভ টু শ্যুট মাই ওয়ে থ্রু। আমি খবরটা শেখ মুজিবকে দেওয়া দরকার মনে করে গেলাম তাঁর কাছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, জানেন, ইয়াহিয়া কী করতে পারে? এ কথা বলতেই শেখ সাহেব বললেন, হি উইল হ্যাভ টু শ্যুট হিজ ওয়ে থ্রু। ওয়ালি বললেন, ইয়াহিয়া খানের কথা হুবহু শেখ মুজিবের মুখে শুনে থ বনে গেলাম। তিনি আরও বললেন, তাহলে ওদের দুজনার মধ্যে আগেই এ কথা হয়েছে।

অন্যদিকে আমেরিকানরাও জানত। প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ১০ মার্চ ঢাকায় আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড শেখ মুজিবের এক গোপন প্রতিনিধি আলমগীর রহমানকে প্রথম খবরটা জানান যে ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া ঢাকায় আসছেন মুজিবের সঙ্গে আলোচনার জন্য। ইয়াহিয়া ও মুজিবের বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য তাঁর একটা পরিকল্পনাও আছে, আর্চার ব্লাড সে কথাও স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই গোপন পরিকল্পনা আজও অবমুক্ত হয়নি। বস্তুত ১০ মার্চের পর থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ দিনের কোনো দলিলই এ পর্যন্ত প্রকাশিত না হওয়ায় ওই দুঃসময়ে তাদের ভূমিকা কী ছিল, কীভাবে ও কাদের তারা প্রভাবিত করেছিল, সে ইতিহাস আপাতত অজ্ঞাত।

দৃশ্যত ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুজিব তাঁর সহকর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন, আত্মগোপন করার কথা বলেন, কিন্তু তিনি নিজে কী করবেন বা কোথায় যাবেন—সে কথা কাউকে বলেননি। তিনি এটাও কাউকে বলে যাননি যে তাঁর অনুপস্থিতিতে কে বা কারা এই সংগ্রামের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটা বিষয় আমি দেখে এসেছি। যৌথ নেতৃত্ব বলে কার্যকর কিছু ছিল না। সাংগঠনিক কাজকর্মে চেইন অব কমান্ড বলে কিছুতে তারা বিশ্বাস করে না। যিনি নেতা, তিনি সমস্ত ক্ষমতার এবং সকল মূল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। অন্য যাঁরা নেতা থাকেন, প্রধান নেতা তাঁদের সঙ্গে বাইলেটারলি ডিল করেন। এর সুবিধা-অসুবিধা দুই-ই থাকে। অসুবিধা হলো, যখন প্রধান নেতা থাকেন না, তখন অন্য নেতারা সবাই সবার সমকক্ষ মনে করেন, ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। শেখ সাহেব ধরা পড়লেন, এখানে বিশাল আক্রমণে নিরীহ লোক মরতে শুরু করল, যে আক্রমণের পূর্বাভাস এক দিন আগেও কেউ দেয়নি। আওয়ামী লীগের সবাই পালিয়ে গেল, দেখাদেখি অন্য দলের লোকেরাও। তারপর আক্রান্ত উপদ্রুত সাধারণ মানুষ নরঘাতক পাকিস্তানি আর্মির আক্রমণে ক্রমে সবার আশ্রয় হলো এক অজানা পরিবেশে। বাঙালি সৈন্যরা প্রতিরোধের লড়াইয়ে নামল, প্রবাসে সরকারও গঠিত হলো তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতা ও একাগ্রতার ফলে। ভারত উত্তরোত্তর অধিকতর রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিযুক্ত করল। সবই হলো। যেটা হলো না, সেটা সেই নেতৃত্ব সমস্যার সমাধান। নেতৃত্বের দায়িত্ব তো শেখ মুজিব কাউকে দিয়ে যাননি, তাহলে তাজউদ্দীন কেন? সবাই ভেবেছে, আমিও হতে পারি শাসনক্ষমতার প্রধানতম ব্যক্তি। এই ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন অবধি চলে।

পলিটিক্যাল লিডারশিপের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা প্রভাবিত করে বাংলাদেশ আর্মির লিডারশিপ স্ট্রাকচারকেও। যদি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর শৃঙ্খলা বজায় থাকত, তাহলে তাজউদ্দীন পারতেন বাংলাদেশ ফোর্সেসকে অনেক সক্রিয় ও সংহত করে তুলতে, মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগ বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলতে। তিনি সঠিক মনোভাবই প্রকাশ করতে পারতেন, যখন জুলাই মাসে সেক্টর কমান্ডারদের বৈঠকে ওসমানীকে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি উঠেছিল প্রায় সর্বসম্মতভাবে, একজন সেক্টর কমান্ডার ছাড়া। এঁদের যুক্তি ছিল—ওসমানী অত্যন্ত বয়স্ক, গেরিলাযুদ্ধের রীতিনীতির সঙ্গে অনভ্যস্ত এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের ব্যাপারে অত্যন্ত রিজিড। তাঁকে বরং দেশরক্ষামন্ত্রীর মতো একটা সম্মানজনক পদে বসিয়ে দেওয়া যাক। যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হোক সমস্ত সেক্টর কমান্ডার কর্তৃক গঠিতব্য ওয়ার কাউন্সিলের হাতে। বাংলাদেশ ফোর্সেসে কর্মরত সিনিয়র মোস্ট অফিসার গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে এই কাউন্সিলে প্রধান করার প্রস্তাব হয়। মেজর জিয়া এই প্রস্তাব নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করেও তুলেছিলেন এবং ওসমানী তা জানামাত্র পদত্যাগ করে যুগপত্ ইমোশনাল ও পলিটিক্যাল সমস্যা সৃষ্টি করেন।

তাজউদ্দীনের পেছনে যদি মন্ত্রিসভার সমর্থন থাকত, তাহলে এই প্রস্তাবকে তিনি যুক্তিসংগত বলেই মেনে নিতেন। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। তিনি জানতেন যে ওসমানী সম্পর্কে যদি কিছু বলা হয়, তাহলে সেটা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চলবে। এই প্রচারে একদিকে তাঁর কেবিনেট সহকর্মীরা, অন্যদিকে সবচেয়ে ব্যাপক প্রচারে অংশ নেবেন মুজিব বাহিনীর নেতারা।

এ কে খন্দকার: মঈদুল হাসান সাহেব একটা কথা বললেন যে, প্রথম দিকেই যখন পাকিস্তানিরা আর্মস বিল্ডআপ করতে আরম্ভ করল, সেই সময় আমি মোস্ট সিনিয়র অফিসার ছিলাম ঢাকায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অর্থাত্ পূর্ণ কর্নেল, যা বেশ বড় পদ ছিল সে সময়। সে কারণে যেকোনো স্থানেই আমি যেতে পারতাম। আমি মার্চে নয়, ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেখছি এই বিল্ডআপ চলছে এবং এই বিল্ডআপের কথা আমি উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজাকে জানাই এবং তাঁদের বলি, এই সংবাদ যেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে জানানো হয়। আমি তাঁদের বলেছি, কীভাবে প্রতিদিন ট্রুপস আসছে, কীভাবে কমান্ডো আসছে, কীভাবে আর্মস অ্যামুনেশন আসছে—এসব কথাই বলার জন্য তাঁদের বলেছিলাম। তাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে আমি জানি। মঈদুল হাসান সাহেব বললেন গোদনাইলের কথা। আমার স্ত্রীর বড় বোন সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তিনি খুবই উত্সাহী ছিলেন রাজনীতির বিষয়ে। তাঁর মাধ্যমে আমি বলে পাঠিয়েছিলাম যে গোদনাইলের তেল ডিপোতে কিছু করা যায় কি না। আমি এস আর মীর্জাকেও বলেছিলাম বিষয়টি।

এস আর মীর্জা: এ কে খন্দকার সাহেব আমাকেও বলেছিলেন গোদনাইলে সরকারি তেল ডিপোতে একটা কিছু করার জন্য। আমি এ সংবাদ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। ওরা করল কি! ছোট ট্রেঞ্চ খুঁড়েছিল পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য, এর বেশি কিছু তারা করতে পারেনি।

এ কে খন্দকার: আমি এস আর মীর্জাকে বলেছিলাম গোদনাইল থেকে আসার রাস্তাটা এমনভাবে কেটে বন্ধ করতে, যাতে পাকসেনারা সেখান থেকে জ্বালানি তেল না আনতে পারে। তখন ইন্ডিয়া পিআইএকে অনুমতি দিচ্ছিল না সরাসরি ভারতের ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসার। ফলে শ্রীলঙ্কা হয়ে আসতে হতো পাকিস্তানি প্লেনকে। যে কারণে পাকিস্তানিদের জ্বালানি তেলের প্রয়োজন বেশি ছিল। সে জন্য আমরা জ্বালানি তেল আনাটাকে যদি বাধাগ্রস্ত করতে পারি—অবশ্য একটা রাস্তা কাটলে সেটাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করা যাবে, তবে একটা ঠিক করলে পুনরায় আর একটা জায়গায় কাটা সম্ভব ছিল—এভাবে হ্যারাস করা গেলে পাকিস্তানিদের কিছুটা হলেও অসুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব হতো।

আমি এখানে আরেকটি কথা না বলে পারছি না, যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা ঠিক করেছিলাম যে বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স যখন অপারেট করবে, তখন তাদের প্রধান টার্গেট হবে গোদনাইলের জ্বালানি তেল ডিপো এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গা জ্বালানি তেল ডিপো। এই দুটোকে ধ্বংস করা গেলে আর্মি মুভমেন্ট প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, জ্বালানি তেল ছাড়া তাদের মুভ করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ওই দুটো জ্বালানি তেল ডিপো আমাদের নবগঠিত বিমানবাহিনী এমনভাবে ধ্বংস করেছিল যে পতেঙ্গার লোক যারা সেদিন সেই ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিল, তাদের জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, কী ভয়াবহ ছিল সেদিনের সেই বিমান আক্রমণ। এত বড় আগুন তারা জীবনে দেখেনি।

মঈদুল হাসান: মার্চের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি ফোর্সেস যা ছিল, তা দিয়ে সেই সময় কী এমন আক্রমণ করা যেত বলে আপনি মনে করেন?

এ কে খন্দকার: এ সম্পর্কে অবশ্য যথাযথ উত্তর দেওয়া মুশকিল। তবে এ জাতীয় আক্রমণ অনেক জিনিসের ওপর নির্ভর করে। আমার মনে হয়, মার্চের প্রথম দিকে যখন পাকিস্তানিদের ট্রুপস তেমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি, তখন যদি প্রিয়েমটিভ অ্যাটাকের কথা চিন্তা করা হতো, তাহলে এখানে যাঁরা বাঙালি অফিসার ছিলেন, তাঁদের সবাই এগিয়ে আসতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম, তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন ডিপলি কমিটেড ফর বাংলাদেশ। আমি তাঁদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছিলাম। সেই সময় আমাদের অর্থাত্ বিমানবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে পাকিস্তান বা অন্য কিছু ভাবনার মধ্যেই ছিল না বাংলাদেশ ছাড়া। তখন যদি উদ্যোগ নেওয়া যেত, তাহলে আমাদের একটা সুযোগ ছিল—টু রিভ্যালুয়েট দ্য সিচুয়েশন ইন টার্মস অব দেয়ার স্ট্রেংথ, ইন টার্মস অব আওয়ার স্ট্রেংথ, ইন টার্মস অব আওয়ার টোটাল পপুলার সাপোর্ট। এসব দিক থেকে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম যে প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইকটা কীভাবে করব বা করা যায় কি না, করলে আমাদের সম্ভাবনা কতটুকু। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে আমি বলব, প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইক করার সম্ভাবনা প্রচুর ছিল এবং এই আঘাতে আমাদের বিজয়ের সম্ভাবনাই ছিল বেশি।

এস আর মীর্জা: আমার তো সন্দেহ হয় এই জন্য যে এটা করতে হলে প্রথমে বিষয় সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে—যেখানে যেখানে বাঙালিরা আছে। এ কাজটি যদি সফলভাবে করা সম্ভব হতো এবং তারা যদি সবাই একত্রে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারত, তাহলেই কেবল এটা সম্ভব ছিল।

এ প্রসঙ্গে আমি আর একটি কথা বলতে চাই। লে. হাফিজ, যিনি প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন, তিনি এবং তাঁর বাহিনী ২৫ মার্চে যখন পাকসেনাদের হাতে আক্রান্ত হয়, তখন লে. হাফিজ কোনো রকমে আত্মরক্ষা করে যশোর সেনানিবাস থেকে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। কিন্তু তাঁর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিল পাকিস্তান পক্ষকেই সমর্থন দেন, মুক্তিযুদ্ধে যাননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার বহু বছর পর আমি রেজাউল জলিলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না। তিনি জানালেন, ২৫ মার্চের কয়েক দিন আগে কর্নেল ডা. হাই ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁকে কর্নেল জলিল বলেছিলেন, অনুগ্রহ করে আপনি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, ‘আমাদের কী করা উচিত।’ কর্নেল ডা. হাই যখন ফিরে গেলেন যশোরে, তখন নাকি লে. কর্নেল জলিল কর্নেল হাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কর্নেল ওসমানী প্রসঙ্গে। কর্নেল ডা. হাই তখন ওসমানীর ভাষ্য জানালেন এভাবে: টেল জলিল, নট টু প্রিসিপিটেট (Precipitate) ম্যাটার এনি ফারদার—এর অর্থ কী দাঁড়াল? অর্থাত্ কর্নেল ওসমানীর কোনো ধারণাই ছিল না কী হতে যাচ্ছে। অথবা কর্নেল ওসমানী এমন ধারণাও করতে পারেন যে একটা রাজনৈতিক সমাধান হতে যাচ্ছে।

এ কে খন্দকার: প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইক হলে কী হতো? আমি কিছু কথা বলেছি এ বিষয়ে, আরও কিছু কথা যোগ করতে চাই। আঘাত করলে কী হতো, আর কী হতে পারত—সবই তো আমরা ধারণা করছি মাত্র। তবে এটাও একটা সম্ভাবনা ছিল, যেমন চট্টগ্রামে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ছিলেন, লে. কর্নেল মাসুদ ছিলেন দ্বিতীয় বেঙ্গলে, যশোরে লে. কর্নেল রেজাউল জলিল ছিলেন—এমন অনেক বাঙালি অফিসার, সেনা, স্টাফ ছিলেন। তাঁরা যদি একটা রাজনৈতিক নির্দেশ পেতেন যে আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে, তাহলে আমাদের লোকবল যে কত বেড়ে যেত, তা আজ ভাবতেও বিস্ময় জাগে। আবার এ কথাও আমি বলব যে আমরা যদি প্রথম পর্যায়েই সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালি অফিসার-সেনাদের একত্রে পেতাম, তাহলে আমাদের যে অপ্রস্তুত অবস্থা, বিশৃঙ্খল-বিচ্ছিন্ন অবস্থা, সেটা থাকত না এবং আমরা আরও ভালো করতে পারতাম।

মঈদুল হাসান: আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ দিতেন, তবে তার ফল সিভিল অফিসারদের মতোই হতো বলে আমার ধারণা হয়েছিল। অ্যাটলিস্ট দ্যাট ওয়াজ মাই আরগুমেন্ট টু তাজউদ্দীন আহমদ, যাঁর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় ৯ অথবা ১০ মার্চে। তিনি সেদিন আমার বাসায় এসেছিলেন রাতের বেলায় কিছু খবর নেওয়ার জন্য। সেই সুযোগে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আগের দিন যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, তার কোনো অগ্রগতি আছে কি না। তিনি বললেন, না নেই, শুধু একবার মুজিব ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন যে আমি দেখা করেছি কি না, আর কিছু নয়। আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম, আপনারা অযথা কালক্ষেপণ করছেন। আপনাদের সিভিল অফিসাররা যেমন আপনাদের কথা মানছেন, বাঙালি আর্মি অফিসাররাও তেমনি আপনাদের কথা শুনবেন। ভারত তার দেশের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে—এই সুযোগের দ্রুত সদ্ব্যবহার আপনাদের করা উচিত। অবশ্য এসব কথা এখন বলে লাভ নেই। কারণ, সবই ছিল ধারণাগত বিষয়, যা তখন যাচাই করা উচিত ছিল।

এ কে খন্দকার: ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু তারও আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে আরও জোরদার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জোর তত্পরতা—এ দুটি বিষয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সদস্যরা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আন্দোলন জোরদার হওয়ার পটভূমিতে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক যুদ্ধতত্পরতার মুখে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়েন এবং তাঁরা দেশের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে বুঝতে পারেন। তাঁরা মনে করতে থাকেন যে তাঁদের প্রস্তুতি দরকার। এ জন্য তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তাঁদের প্রতি কোনো নির্দেশ বা কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না। আমি খুবই গভীরভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর তত্পরতা লক্ষ করতাম এবং এই খবরগুলো উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা এবং অন্যদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মহলে পৌঁছে দিতাম। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্য ও হতাশার বিষয় হলো, এ বিষয়ে আমাদের আওয়ামী লীগের তরফ থেকে কেউ কিছু জানায়নি। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পথে। কিন্তু আমাদের করণীয় কী—এ প্রসঙ্গে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। কোনো নির্দেশ আমরা পাইনি। এ থেকে আমাদের অর্থাত্ কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল আসলে আওয়ামী লীগের দিক থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধপ্রস্তুতি নেই। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো চিন্তাভাবনাও তাদের ছিল বলে মনে হয়নি।

ফলে ২৫ মার্চে ঢাকাসহ সারা দেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন এটা প্রতিরোধের জন্য বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এটা একটা বাস্তব সত্য। তবু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সেনাসদস্যরা যে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন—এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। বিনা প্রস্তুতিতে সীমিত অস্ত্রপাতি নিয়ে তাঁরা যে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন, এটা একটা উল্লেখযোগ্য দিক। ফলে আমাদের ভীষণ ক্ষতি হয়েছিল। এই ক্ষতি হতো না, যদি বাঙালি সেনাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চমহল থেকে পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে অবহিত করা হতো। এর পরে সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহী কর্মকর্তারা প্রথম যেখানে একত্র হন, সেটা হলো তেলিয়াপাড়া চা-বাগান। এটা হলো ৪ এপ্রিল। এখানে ওসমানী সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনিও গিয়েছিলেন হঠাত্ অবস্থার মুখে পড়ে, কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই। ওই সভায় বাংলাদেশের সীমান্তকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দায়িত্বের পেছনে কোনো প্রকার আর্থিক, সাংগঠনিক বা সামরিক সমর্থন বা সামর্থ্য ছিল না।

এ পর্যায়ে অর্থাত্ এপ্রিলের প্রথম দিকে যুদ্ধ আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে সীমান্তের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা যেমন নিহত বা আহত হয়েছিলেন, তেমনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছিল। এর পরেই বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়, বিভিন্ন সেক্টর গঠিত হয় ইত্যাদি।

মঈদুল হাসান: এর সঙ্গে আমি একটা কথা যোগ করতে চাচ্ছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চের আগে থেকে কিছু বাঙালি ইউনিট নিরস্ত্র করতে শুরু করে, সেনাবাহিনী ও ইপিআরের কোনো কোনো ইউনিট। ২৫ মার্চের পর যখন কতকগুলো সেনা ও ইপিআর ইউনিট বিদ্রোহ ঘোষণা করল, তখন পাকিস্তানি বাহিনী তাদের হত্যা করতে শুরু করল। অনেক লোক মারা গেছে। পরে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো তথ্য সংগৃহীত হয়েছে কি না আমি জানি না। আরেকটি বিষয়, অনেক জায়গায় সেনাদের চাপে পড়ে অনেক অফিসার স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে এলেন। বিদ্রোহ করার পর তাঁদের কিন্তু ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা রইল না। ফিরে গেলেই কোর্ট মার্শাল—এটা তাঁরা খুব ভালো করে জানতেন। সেই বোধ থেকেই তেলিয়াপাড়ায় যে সভা হয়েছিল, সেখানে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটা সরকার গঠন প্রয়োজন। এই সরকার স্বাধীনতা ঘোষণা করবে এবং সরকারের অধীনেই যুদ্ধ পরিচালিত হবে—এ বিষয়ের ওপর তাঁরা জোর দেন। এটা ছিল একটা মনুমেন্টাল সিদ্ধান্ত। বস্তুত, মুক্তিযুদ্ধ চালানোর পক্ষে এবং স্বাধীন সরকার গঠনের পক্ষে একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শক্তি তৈরি হয়ে গেল। নয় মাসের যুদ্ধকালে আপস-মীমাংসার কথা বারবার উঠেছে। হয়তো রাজনৈতিক নেতারা আপস-মীমাংসায় যেতে পারতেন। কিন্তু এই বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাদের পক্ষে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খোলা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের এটা ছিল একটা শক্তিশালী অবলম্বন।

এ কে খন্দকার: এখানে আমি দুটি বিষয় তুলে ধরছি। একদিকে ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় সেনা কমান্ডারদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ৩ এপ্রিল তাজউদ্দীন সাহেব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এই মর্মে তাঁকে আভাস দেন যে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। তাজউদ্দীন নিজেই এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। তত্কালীন বিএসএফের প্রধান এ ব্যাপারে তাজউদ্দীনকে সহায়তা করেছিলেন। সুতরাং এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছিল। একটি স্বাধীন সরকারের প্রধান বলে পরিচয় দেওয়ার কারণে তাজউদ্দীনের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়।

মঈদুল হাসান: আসলে এখানে একটু তথ্যের অস্পষ্টতা আছে। তাজউদ্দীন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথমবার দেখা হতেই বলেন, আমরা একটা সরকার গঠন করে ফেলেছি। ভারতীয় সূত্রে অন্য ভারসনও আমি শুনেছি। ভারতীয় পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে তোমরা একটা সরকার গঠন করলেই কেবল আমরা সাহায্য করতে পারি। ইন্দিরা গান্ধীর সচিব ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের দেখা হওয়ার আগে সরকার গঠনের ব্যাপারে এই ইঙ্গিত রেখেছিলেন। এখন ইঙ্গিতই হোক, তাজউদ্দীনের উপস্থিত বুদ্ধির জোরেই হোক, আর সীমান্তে বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর পেয়েই হোক, সম্ভবত সবকিছু বিবেচনা করে দ্রুত সরকার গঠনের পক্ষে তাজউদ্দীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এ কে খন্দকার: তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ বা তাজউদ্দীনের সরকার গঠনের কথা ছাড়াও এর আগের আরেকটি বিষয় আছে। এটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। ২৫ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে বাঙালি সেনা ইউনিটগুলো প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ করলে তাদের কোর্ট মার্শাল হবেই। এটা জেনেই তারা বিদ্রোহ করেছে। অনেকে হয়তো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেকে আছেন, যাঁরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। এ সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্য ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক। ভারত সরকারের বাংলাদেশকে এই সাহায্য করতে এগিয়ে আসার কারণ হলো, ২৫ মার্চের পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, এটা ভারত সরকারের অজানা ছিল না। এই যুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ অংশ নেয়। এ বিষয়গুলো ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনদানের ইতিবাচক পটভূমি তৈরি করেছিল। তাই এই প্রতিরোধ যুদ্ধের গুরুত্বকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখা যায় না।

মঈদুল হাসান: বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর ইউনিটগুলো যুদ্ধ করে এই কারণে যে, পাকিস্তানি বাহিনীই ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর একযোগে আক্রমণ করে। এ অবস্থায় ইপিআর, পুলিশ বাহিনী ওয়্যারলেসে এসওএস জানাল যে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আক্রান্ত। ফলে বাংলাদেশের সর্বত্র অবস্থানরত সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট একযোগে বিদ্রোহ করে; যদিও পরবর্তীকালে এটা বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বানে তারা বিদ্রোহ করে যুদ্ধে নেমেছে, এটা অসত্য। আসল ঘটনা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের আক্রমণ করেছে, আক্রান্ত হওয়ার পর এবং তারা বিদ্রোহ করেছে।

এ কে খন্দকার: মঈদুল হাসান সাহেব যা বললেন, এর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তবে একটু যোগ করতে চাই। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে যে ঘটনা ঘটল, তার খবর সারা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষত পাবনা, যশোর, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের আক্রমণ করে। পাবনায় পুলিশ, ইপিআর পাকিস্তানিদের আক্রমণ করে পরাজিত করে। কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক ক্ষতি হয়। তাদের অনেকে নিহত, অনেকে আহত এবং অনেককে আটক করা হয়। এখানে কয়েকটি দিক আমাদের দেখতে হবে। প্রথমত, এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কোনো প্রকার রাজনৈতিক নির্দেশ ছাড়াই। এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ শুরু হতো, তাহলে এই যুদ্ধে আমরা অনেক বেশি ভালো করতে পারতাম। এর চেয়ে বড় সত্য উপলব্ধি আর হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানিদের আক্রমণের প্রথম দিকটি ছিল রক্ষণাত্মক যুদ্ধ। এই খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হন। এভাবেই যুদ্ধের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল।

মঈদুল হাসান: এর ফলে আবার আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল। এটা আমরা এপ্রিলের পরবর্তী দিনগুলোতে লক্ষ করেছি। সামরিক বাহিনীর লোকদের মুখে শুনেছি। তাঁরা মনে করতেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তো আমাদের যুদ্ধে ডাক দেয়নি। কী করতে হবে বলেনি। কাজেই আমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম বলেই লড়াই শুরু করেছি। অস্ত্র তুলে নিয়েছি। তাই লড়াই আমাদের করতেই হবে। এখান থেকে আমরা কতকগুলো উপাদান পাই। গোটা মার্চ মাসে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সুস্পষ্ট কোনো অবস্থানে আসতে পারেনি। তারা কখনো বলত স্বায়ত্তশাসনের কথা, কখনো ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার কথা, কখনো বা কনফেডারেশনের কথা ইত্যাদি। তাই পাকিস্তানিদের আক্রমণের পরিকল্পনা পুরোপুরিভাবে সফল হয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। নেতৃত্ব পুরো পরিস্থিতি অর্থাত্ পাকিস্তানিদের তত্পরতা বুঝে উঠতে পারেনি। এটা তাদের ব্যর্থতা, সফলতার দিক নয়। শেষ পর্যন্ত সেই কারণে এই যে সিদ্ধান্তটা তারা দিতে পারেনি, তারা ঠিক করতে পারেনি—যদি পাকিস্তানিদের আক্রমণ নেমে আসে, তাহলে কে নেতৃত্ব দেবে, কোনো কমিটি নেতৃত্ব দেবে কি না, স্বাধীনতা ঘোষণা করবে কি করবে না, তারা কি দেশের ভেতরে থাকবে, নাকি অন্য কোনো অঞ্চলে গিয়ে কাজ করবে—এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করে। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বোধটা স্বাধীনতার পরে সত্তরের দশকে কাজ করেছে। আশির দশকেও কাজ করেছে। বিশেষত এ জন্যই তারা রাজনীতিতে এসেছে। তাই সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বুঝতে হবে। সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তারা, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা মনে করতেন যে তাঁরা রাজনৈতিক নেতাদের চেয়েও অত্যন্ত জোরালো এবং শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের গৌরবময় ভূমিকার জন্যই তাঁরা এটা মনে করতেন। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে সত্তর ও আশির দশকে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মনস্তাত্ত্বিক জোর, শক্তিটা কোথা থেকে এল—এটা আমরা বুঝতে চেষ্টা করিনি। এ বিষয়টা আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝে উঠতে পারেনি।

এ কে খন্দকার: এটা ঠিক যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। মঈদুল হাসান সাহেব বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালানর একটা মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। এটা আংশিক সত্য। তবে এটা গোটা সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটাও সত্য যে সামরিক বাহিনীর বিশাল অংশ এই সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে প্রতিষ্ঠিত সামরিক সরকারের অধীনে তারা কাজ করেছে। একটা সুশৃঙ্খল বাহিনী বলেই তারা এটা করেছে। গোটা সামরিক বাহিনী এই অভ্যুত্থানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বেধে যেত। যখন সামরিক বাহিনী দেখেছে যে সাংবিধানিক বা অসাংবিধানিকভাবে যে-ই ক্ষমতায় এসেছে, শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা তা মেনে নিয়েছে। হয়তো তাদের স্বার্থ বা ক্ষোভ জড়িত ছিল, কিন্তু এগুলোর তারা বিরোধিতা করেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে বলতে গেলে আমার যেটুকু জানা কেবল সেটুকুই বলতে পারি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাক আর্মির সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ নিল না যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেই নেতৃত্ব যুদ্ধ পরিচালনা করবে কীভাবে? যুদ্ধ সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না, ইনক্লুডিং তাজউদ্দীন আহমদ। তাঁদের কারও ধারণা ছিল না এ সম্পর্কে। প্রথম থেকে প্রায় শেষের কাছাকাছি পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একজনের ওপর নির্ভর করে ছিল, তিনি হচ্ছেন কর্নেল ওসমানী। সত্যি কথা বলতে কি, কর্নেল ওসমানী হেডকোয়ার্টার থেকে যুদ্ধের জন্য বস্তুত কিছুই করেননি।

মার্চের গোড়া থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা ধারণা ছিল যে কর্নেল ওসমানী আছেন, তিনিই বিষয়টি দেখবেন। হি ইজ দ্য টাইগার ফিগার। কিন্তু সেখানেও আমরা অত্যন্ত হতাশ হয়েছি। যাঁরা অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন—উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা সাহেব এখানে আছেন, তিনি তো নিজেই বলেছেন যে ২২ মার্চ তাঁরা যখন কর্নেল ওসমানীর কাছে গেলেন, তখন তিনি বললেন, ‘ওল্ড বয়, দিস ননভায়োলেন্ট অ্যান্ড নন-কো-অপারেশন মুভমেন্ট উইল স্টপ দ্য ট্যাংকস অন ইটস প্যাক্টস অ্যান্ড দেয়ার মে বি ফরেন ইন্টারভেনশন। কর্নেল ওসমানীর মতো মানুষও যখন এমন কথা বলতে পারলেন পাকিস্তানিদের সব ধরনের প্রস্তুতি দেখেও, তখন আর কিছুই বলার থাকে না। আপনার প্রশ্নের উত্তরে শুধু এইটুকু বলব, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে কী করা হবে, আর কী করা হবে না।

মঈদুল হাসান: এটা ঠিক যে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এ রকম একটা যুদ্ধ—সে সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। তারা কেউ কর্নেল ওসমানীকে ডিসটার্ব করেনি। ওসমানী যে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, সেটাও তারা জানত। কিন্তু ওসমানী অনেক ননকোয়ানটিটি পরিচিত অংশ। তারপর যেসব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তাঁদের কাউকেই তারা চিনত না। সেই অর্থে তাঁরা যে খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন না তাদের কাছে, তা নয়। এমএনএ কর্নেল রব, যিনি চিফ অব স্টাফ ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হেডকোয়ার্টার্সের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যাঁর সঙ্গে তিনি আগরতলায় থাকতেন, তাঁরও কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁরা জানতেন অর্থাত্ রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু এসব বিশ্বাস করত না। সেটা নিয়েই তাঁদের আক্ষেপ ছিল। তাঁরা জানতেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে যতই আমরা মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করি, আর যা-ই করি, আলটিমেটলি ইন্ডিয়ান ফোর্স দরকার। ইন্ডিয়া কেন যুদ্ধ করছে না, ইন্ডিয়া কেন আমাদের স্বীকৃতি দিচ্ছে না—প্রথম দিন থেকেই এসব বলে আসছিল আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কাজেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কিছু জানত না, এ কথা আমি বলব না। আমি জানি, তারা খুব জানত, এই যে কমান্ড স্ট্রাকচার, আর্মি ফোর্সেস—এসব দিয়ে বিশেষ কিছু হবে না। এটা তারা এপ্রিলের শেষ নাগাদই বুঝে গেছে, যখন আমাদের আর্মি ফোর্সেস সব ফেলে ভারতে গিয়ে উঠেছে। তারা জানত, একমাত্র ভারতকেই করতে হবে। ভারত যখন করতে পারত না, তখন তারা সেটা বুঝতে পারত যে কেন ইন্ডিয়া পারছে না।

এ কে খন্দকার: ১৯৭১ সালে প্রধানত আমাকে দুটি দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল—এক. মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এবং দুই. অপারেশনস। ট্রেনিংয়ের বিষয় সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমে যে কথা বলা প্রয়োজন তা হলো, ট্রেনিং কতজনকে দেওয়া হবে, কখন থেকে দেওয়া হবে, সেটা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক নেতৃত্বই এ সিদ্ধান্ত দিত।

বস্তুত, মে মাসেই ভারত সরকার আমাদের ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে সম্মতি জানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীই আমাদের ছেলেদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যত দূর মনে পড়ে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ট্রেনিং নেওয়ার কাজটি শুরু হয়। এই পর্যায়ে দুই হাজার করে রিক্রুটস করার সিদ্ধান্ত হয়। এই রিক্রুট হতো আমাদের বিভিন্ন ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে। এমপি, এমএনএরা কাজটি করত। ট্রেনিংয়ের জন্য সিলেবাস যেটা করা হয়েছিল, সেটা ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। সময়ের কথা ভেবেই এই সংক্ষিপ্তকরণ। সময়কাল ছিল মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহ। অথচ একজন গেরিলাকে যথাযথ ট্রেনিং দিতে হলে এর চেয়ে বেশি, অন্তত তিন মাস সময়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ট্রেনিংয়ের দিক থেকে কিছুটা ঘাটতি থেকেই যায়। তবে এসব যুবকের অধিকাংশই যেহেতু আন্তরিকভাবে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল, সেহেতু ট্রেনিংয়ের বিষয়টি তখন খুব বড় হয়ে দেখা দেয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ট্রেনিং শেষে এসব ছেলেকে সরাসরি বাংলাদেশের সেক্টরগুলোতে পাঠানো হবে। আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব গেরিলার দায়িত্ব নেয়। গেরিলাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ, টার্গেট নির্দিষ্টকরণ, অস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ও স্থির করবেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সেক্টর কমান্ডাররা। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ কাজ বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার থেকে কেন করা হলো না? আসলে গেরিলাযুদ্ধের জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন হয়। কারণ কোনো এক গভীর জঙ্গলে অথবা প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে টার্গেট ঠিক করা বা প্রকৃত অবস্থা জানা হেডকোয়ার্টার থেকে বা কেন্দ্রীয়ভাবে করা সম্ভব ছিল না। তাই গেরিলাযুদ্ধের অধিকতর ও সন্তোষজনক ফল লাভের জন্য আঞ্চলিক কমান্ডারদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম থেকেই এ বিষয়টি হয়ে ওঠেনি, আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা সেভাবে দায়িত্ব পাননি বা দেওয়া হয়নি। এ কাজটি পুরোপুরিই করত ভারতীয় সেনাবাহিনী। প্রথম দিকে আমাদের গেরিলাদের কাছ থেকে তেমনভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব হয়নি। এই না পাওয়ার প্রাথমিক কারণ—সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং প্রশিক্ষণ, দ্বিতীয়ত ভারতীয় পক্ষ থেকে অস্ত্রশস্ত্র না পাওয়া। বিশেষত আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের কাছে প্রথমদিকে কোনো অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হয়নি। ভারতীয়রা সরাসরি আমাদের গেরিলাদের ১০ জনের একেকটি গ্রুপে ভাগ করে প্রতি গ্রুপে একটি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেড দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে, পরিকল্পনাহীনভাবে দেশের অভ্যন্তরে পঠিয়ে দিতেন। এভাবে গেরিলাদের পাঠানোর ফল বেশ খারাপ হয়েছিল। কারণ গেরিলাদের সঙ্গে যে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তা দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা প্রায় অসম্ভব ছিল। আমরা জেনেছি, দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো এসব গেরিলার অনেকেই ভয়ে তার গ্রেনেডটি যেখানে-সেখানে মেরেছে বা ফেলে দিয়েছে। আবার ১০ জনের কোনো একটি গ্রুপ শত্রুর টার্গেটে সামান্য একটি গ্রেনেড নিয়ে আঘাত হানতে গিয়ে ১০ জনের আটজনই শত্রুর গুলিতে প্রাণ দিয়েছে। ১০ জনের আটজনকেই প্রাণ দেওয়ার সংবাদে আমরা তখন ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। একদিকে গেরিলাদের এই সামান্য অস্ত্রের কারণে পাকিস্তানিদের হাতে গেরিলাদের জীবন দান, অন্যদিকে যেখানে-সেখানে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী ওই সব এলাকা বা গ্রামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নির্মম অত্যাচার আর হত্যাকাণ্ডের ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো গেরিলা গ্রুপ সামান্য গ্রেনেড হাতে গ্রামে প্রবেশ করলেই তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে গ্রামবাসীর কাছ থেকে। ওদিকে গ্রামবাসী উত্সাহিত হওয়ার পরিবর্তে নিরুত্সাহিত হয়ে পড়ে গেরিলাদের কার্যকলাপে।

জুন-জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে গেরিলা তত্পরতা পর্যালোচনা করে আমরা বুঝতে পারলাম যে গেরিলাদের কাছ থেকে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, সেই প্রত্যাশা তারা পূরণ করতে পারছে না। ফলে, এই সময়কালে দেশের অভ্যন্তরে এবং সেক্টরগুলোতে হতাশার ভাব লক্ষ করা গেল। আমাদের নিজস্ব উত্স এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছাতে লাগল।

আমরা উপলব্ধি করলাম যে এই অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না বা চলা উচিত নয়। তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গেরিলাদের ট্রেনিং এবং দেশের অভ্যন্তরে তাদের অপারেশন, অস্ত্রের স্বল্পতা, ব্যাপক হারে গেরিলার মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় বেশ জোরের সঙ্গেই উত্থাপন করা হয়। আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রাখা, তাদের নিজস্ব পরিকল্পনামাফিক গেরিলাদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা যে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, সে কথাও তাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন জোনের প্রধান লে. জেনালে জগজিত্ সিং অরোরার কাছেও একাধিকবার বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়। তিনি বেশ কয়েকবার আমাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, কর্নেল ওসমানী, আমিসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলাম। সেসব সভায়ও আনুষ্ঠানিকভাবে গেরিলাযুদ্ধ ও যুদ্ধবিষয়ক সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। আমি নিজে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে একাধিকবার গেরিলা তত্পরতা সমস্যাগুলোর আশু সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছি।

এস আর মীর্জা: জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি হাকিমপুরে গিয়েছিলাম। ওখানে পশ্চিম দিনাজপুরের সাব-সেক্টর ছিল। ওখানে গিয়ে আমি ক্যাপ্টেন গিয়াসের দেখা পাই। মেজর শাফায়েত জামিলও ওই এলাকায় ছিলেন। তিনি সেই মুহূর্তে চলে গিয়েছিলেন জেড ফোর্সে কাজ করার জন্য। হাকিমপুরে গিয়ে শুনলাম এক কাহিনী। এক ইন্ডিয়ান সিনিয়র আর্মি অফিসার আমাদের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে, যাদের ভালো ট্রেনিংও ছিল না তাদের কেবল হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে বগুড়ায় পাঠিয়েছেন অপারেশনের জন্য। ক্যাপ্টেন গিয়াস আমাকে বললেন, ওই ৩০ জনের মধ্যে ২৮ জনই ধরা পড়েছে এবং তাদের পাকিস্তানিরা হত্যা করে। শুধু দুজন পালিয়ে আসতে পেরেছে। এরপর আমি লালপুর, বহরমপুর হয়ে কলকাতায় ফিরি। বহরমপুর থেকে মেজর সফিউল্লাহ আমার সঙ্গী হয়েছিলেন কলকাতায় আসার জন্য।

কলকাতায় এসেই আমি এ কে খন্দকার এবং প্রফেসর ইউসুফ আলীকে ঘটনাটি বলি। প্রফেসর ইউসুফ আলী ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সেই সময় আমি ইয়ুথ ক্যাম্পের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দিই। আমরা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলাম আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, তাদের ট্রেনিং, অস্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। আমি বলেছিলাম, ১. নো গেরিলা ফাইটার শ্যুড বি সেন্ট ইনসাইড উইদাউট ট্রেনিং, ২. অল গেরিলা অপারেশন মাস্ট বি ডান আন্ডার দ্য লিডারশিপ অব আওয়ার ওন পিপল অ্যান্ড নট ইন্ডিয়ান আর্মি। আমার এই পরামর্শ এ কে খন্দকার গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেটি কার্যকরও হয়েছিল বলে আমি জানি।

মঈদুল হাসান: ইয়ুথ ক্যাম্প শুরু হয়েছিল আগরতলায়। আপনি এটা কী অবস্থায় পেয়েছিলেন?

এস আর মীর্জা: প্রথম দিকে কীভাবে হলো এটা আমি জানি না। আমি যখন যোগ দিই তখন মাহবুবুল আলম চাষী, নূরুল কাদের খান এঁরা ছিলেন। জুনের মাঝামাঝি থেকে আমি এই দায়িত্বে যোগ দিই।

মঈদুল হাসান: কোনো ট্রান্সপোর্ট ছাড়াই আপনি এক হাজার ৪০০ মাইল সীমান্তজুড়ে স্থাপিত যুবশিবিরগুলো দেখাশোনা করতেন। তারপর ইয়ুথ ক্যাম্পে সবাইকে রাখা যাবে না বলে যুব অভ্যর্থনা শিবির করা হলো। যুবশিবিরের সংখ্যা ছিল ৩০০, অভ্যর্থনা শিবিরের সংখ্যা ছিল ৪০০। এর কোনোটিতেই যাওয়ার মতো একটা ট্রান্সপোর্ট আপনাকে দেওয়া হয়নি। তাই আপনি কাজ করতেন এমপিএ এবং এমএনএদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে। তারাই এর দায়িত্বে ছিল। তারা যখন কলকাতায় আসত তখন আপনি তাদের কাছে খবর পেতেন। এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মতো ন্যূনতম সাপোর্ট আপনাকে দেওয়া হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার দিকটি। মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করার আগে মেইন সেন্টার ইয়ুথ ক্যাম্পের ওপরও তারা কতটা গুরুত্ব দিতে পেরেছিল। কতটা অসংগঠিত ছিল এই যুবশিবিরগুলো।

এ কে খন্দকার: ক্যাম্পে এমপিএ, এমএনএদের মূলত কোনো কাজ ছিল না। যুবকদের সঙ্গে মেলামেশা করাই ছিল তাঁদের মূল কাজ। প্রত্যেক এমএনএ, এমপিএরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন হলে ছেলেদের মধ্য থেকে তাঁরাই বাছাই করে দিতেন। আর হেডকোয়ার্টার্সে এসে তাঁদের জন্য টাকা-পয়সা নিতেন। এর বাইরে তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এসব এমপি সবাই যে যুব ক্যাম্পে থাকতেন তা নয়। কিছু কিছু এমপি থাকতেন। যাঁরা থাকতেন তাঁদের প্রধান কাজ ছিল নিজ নিজ এলাকার ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের আশ্বাস দেওয়া যে মুক্তিযুদ্ধ ভালোভাবে চলছে, এটা সফল হবে। উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়টির ওপর সবচেয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা ছিল নাম মাত্র। এ বিষয়ে দু-একটি বক্তব্য দেওয়া হলেও তা ছিল খুবই দুর্বল। এটা তেমন কার্যকর ছিল না।

এস আর মীর্জা: মুক্তিযুদ্ধের নীতি ও কৌশল নামের একটি পুস্তিকা বিতরণ করা হয়েছিল। তাতে একটা গাইডলাইন ছিল।

এ কে খন্দকার: ইয়ুথ ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মূল কাজ ছিল ছেলেপেলেদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো দেখা, তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো ছেলেগুলো বাছাই করা, তাদের নিয়ে দৈনিক একটা প্রোগ্রাম করা—এসব কাগজে লেখা ছিল। কিন্তু আমি যেসব ক্যাম্পে গিয়েছি, সেগুলোর দু-একটাতে এসব করা হতো, কিন্তু বেশির ভাগ ক্যাম্পে করা হতো না।

ক্যাম্পগুলো পরিচালনা বা তাদের কীভাবে পরিচালনা করা হবে এই সম্পর্কে একটা নির্দেশনা ছিল। কিন্তু আমি বলছি বাস্তবতার কথা। বাস্তবে কিছু কিছু ক্যাম্পে কয়েকজন এমপি এই বিষয়ে উদ্যোগী ছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্যাম্পে এগুলোর কিছুই হতো না। মাসের পর মাস এসব ছেলেকে উজ্জীবিত রাখা ছিল একটা পূর্ণকালীন কাজ। এটা বড় একটা কাজ। মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের একটা অংশ এসেছিল আত্মরক্ষার তাগিদে। কিন্তু বড় অংশটিই এসেছিল যুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য। এটা আমার অভিজ্ঞতা। আমি ছোট একটি উদাহরণ দিচ্ছি। একদিন রাত ১২টা কি সাড়ে ১২টার দিকে একটি ক্যাম্পে পৌঁছালাম। সময়টা ঠিক মনে নেই। এই সময় অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। একটা খোলা মাঠ। এক স্থানে একটা তাঁবু টানানো। সারা মাঠ কাদা। ওখানে ৩০০-৩৫০ জন মানুষ। ছাত্র, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কৃষক, শ্রমিক—সব পেশার মানুষই আছে। আমি যখন গেলাম তখন তারা খাচ্ছে। সবাই খাচ্ছে ঠান্ডা ভাত আর ঠান্ডা ডাল। সবাই খাচ্ছে মাটির পটে করে। কাদায় বসতে পারছে না। দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। এই অবস্থায় একটি ছেলে আমার কাছে জানতে চাইল, কবে নাগাদ সে ট্রেনিংয়ে যেতে পারবে। ওই অবস্থায়ও কারও কাছ থেকে কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। সুতরাং এমপিরা কী করেছেন না-করেছেন সেটা আলাদা। কিন্তু সাধারণ ছেলেরা এটাকে বড় করে দেখেনি। তারা যুদ্ধ করতে গিয়েছিল।

মঈদুল হাসান: এখানে আমি একটু বলি। এপ্রিলেই আগরতলায় যখন অনেক তরুণ এল বিশেষ করে ছাত্রলীগের ছেলেরা, তখন তারা কোথায় যাবে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে পারবে কি পারবে না—এই প্রশ্নগুলো ওঠে। এরই আলোকে প্রথমেই আগরতলাতে যে উদ্যোগটি নেওয়া হয় সেটা হলো একটা যুবশিবির করতে হবে। এর জন্য কতগুলো নিয়মনীতি বা ম্যানুয়াল তৈরি করেন মাহবুব আলম চাষী। আমি তাঁর হাতে লেখা কাগজগুলো দেখেছিলাম। তাঁর সঙ্গে আবদুল কুদ্দুস মাখন ও অন্য কয়েকজন তরুণ ছিল। তারা একত্রে কাজ করেছে। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে যেসব তরুণ সীমান্ত অতিক্রম করে এসেছে এবং তারা একটা টগবগে ধারণা নিয়ে এসে বলছে, এক্ষুণি আমাদের অস্ত্র দাও। আমরা যুদ্ধ করব। অস্ত্র তো কেউ নিয়ে বসে ছিল না। এরা ধরে নিয়েছিল ভারত সরকার অস্ত্র দেবে। ভারত সরকারের সঙ্গে তখনো এই জাতীয় কোনো কথা হয়নি। এই অবস্থায় তরুণদের মাঝে একটা হতাশা শুরু হয়। তখন ঠিক হয়, এটা জুন মাসের দিকে—যে এই ছেলেদের কিছুসংখ্যক হোল্ডিং ক্যাম্পে রাখতে হবে, হোল্ডিং পজিশনে রাখতে হবে। এটাই হলো যুবশিবিরের প্রথম ধারণাটা। তখন তার কাঠামোটা ঠিক করা হয়। পুরো জিনিসটিই করা হয় উপস্থিত বুদ্ধির ওপর ভরসা করে। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশি ছিল না। দুই থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত। কিন্তু নয় আগস্ট ভারত-সোভিয়েট মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের পর ভারত যখন তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষ করে চীনের সামরিক হামলা মোকাবিলার বিষয়ে সুনিশ্চিত হলো, কেবল তখনই ভারত ভাবল যে এখন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক হারে ট্রেনিং এবং অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া যেতে পারে। বস্তুত এই চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার করে মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা নেয় ভারত।

আসলে কোনো রাষ্ট্রই তার নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে অন্যের জন্য ভাবতে চায় না। ভারত তার নিরাপত্তার বিষয়টি এভাবে দেখত, মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা ট্রেনড-আপ করছি, তাতে পাকিস্তান হয়তো একটা সময় ভারত আক্রমণ করতে পারে এবং এই আক্রমণে তারা চীনের সমর্থন পাবে। চীনাদের নেফা বর্ডার যদি চলাচলের উপযোগী থাকে, তাহলে ভারতকে দুটি বা তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হতে পারে। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর—এই তিন দিকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় তাদের নিরাপত্তা ভাবনার মধ্যে রাখে। আবার মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের বিষয়টিও তারা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতে পারেনি। তাদের নিজেদের প্রবল এক জনমত ছিল মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার পক্ষে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের ওপর ছিল নিরন্তর চাপ। তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের পুরোপুরি সমরাস্ত্র দাও, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দাও, দ্রুত যুদ্ধ ঘোষণা করো—এসব চাপ ছিল ভারত সরকারের ওপর।

সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে ৯ আগস্ট ভারত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করে চীনকে রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। এর পরই ভারত শরণার্থীদের বিপুল চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং প্রোগ্রাম সম্প্রসারণ করে।

এ কে খন্দকার: জুন-জুলাই মাসের দিকে আমাদের একটা হতাশার ভাব এসেছিল। এই সময় আমরা কিন্তু অন্য একটা দিকে অপারেশন করতে পেরেছিলাম, ফলে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি চলে যায়, আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেই অপারেশন ছিল আমাদের নৌ-কমান্ডোদের অপারেশন। মে মাসে ভাগীরথীর তীরে আমাদের এই নৌ-কমান্ডোদের ট্রেনিং শুরু হয়। ট্রেনিংয়ের ক্যাম্পপ্রধান, প্রশিক্ষক—এঁরা সবাই ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনী। যদিও বিষয়টি কর্নেল ওসমানী জানতেন, আমি জানতাম এবং অন্য দু-চারজন জানতেন কী উদ্দেশ্যে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ডাইরেক্ট কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ছিল ভারতীয়দের হাতে। যদিও দে ওয়্যার আন্ডার আস, দে ওয়্যার আন্ডার বাংলাদেশ হেডকোয়ার্টার্স। কিন্তু প্রতিদিন অন দ্য পয়েন্ট, যে প্ল্যানিং, প্রোগ্রাম হতো তার সবটাই ছিল ভারতীয়দের হাতে। ১৫ আগস্ট যে অপারেশন আমাদের নৌ-কমান্ডোরা চট্টগ্রাম-চালনা-মংলায় করল, যার ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যে হতাশা বিরাজ করছিল, সেটা অনেকটা কাটতে শুরু করে। এরপর অক্টোবর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যে তত্পরতা শুরু হলো, এটাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের তত্পরতা কতটা জোরদার ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পাকিস্তানিদের তত্পরতা ও কর্মকাণ্ডের খবর শুনে। পাকিস্তানি এয়ারফোর্স পাকিস্তানিদের যত নিহত সেনা ছিল তাদের পাকিস্তানে নিয়ে যেত। আর্ম ফোর্সেসের একটা নিয়ম আছে যে ডেড বডি যে করেই হোক ফ্যামিলির কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং এটা তাদের কর্তব্য ছিল। কিন্তু পরে বিশেষত অক্টোবর থেকে পাকিস্তানিদের নিহতের সংখ্যা এমন পর্যায়ে গেল যে এত ডেড বাডি তাদের পক্ষে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। এর আরেকটা অ্যাফেক্ট পাকিস্তানে পড়ছিল। তারা ডেড বডি বাংলাদেশ থেকে লাহোর কিংবা করাচি অথবা অন্য কোনো স্থানে নিয়ে যেত। এতে সেখানে প্রবল জনরোষের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। জনতা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেত—সবকিছু যদি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে এত মৃতদেহ কেন? এসব কারণে পরবর্তী সময়ে নিহত পাকিস্তানিদের পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তত্পরতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

অক্টোবরের শেষের দিকে এবং নভেম্বরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলাদের তত্পরতা প্রচণ্ড রকমের বেড়ে যায় এবং যার ইতিবাচক ফল ফলতে শুরু করে। এ সময় পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি স্থানেই প্রচণ্ড রকমের মার খায় এবং প্রচণ্ড হতাহতের শিকার হয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের এ সময়টাকে আমি বলব সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়।

মঈদুল হাসান: আমি এ কে খন্দকার সাহেবের কথাটাকে একটু সংশোধন করতে চাই এভাবে, এফ এফ বাহিনী যে পরিমাণ পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতি করেছে, এগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। ধরতে গেলে জুলাই থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোতে এসবের প্রচার ছিল। প্রকৃতপক্ষে অক্টোবরের আগে, আমাদের জন্য দ্য পিকচার ওয়াজ প্যাথেটিক। এফএফদের দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বড় কোনো ক্যাজুয়ালটি করা যাচ্ছিল না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গতি নিচের দিকে যাচ্ছে। একমাত্র নৌ-কমান্ডোদের তত্পরতা ছাড়া আমাদের তেমন কোনো সাফল্য নেই। আমি বলব, আমাদের জন্য ছিল বেশ ডিমরালাইজিং।

আরেকটি বিষয়, সেক্টর কমান্ডাররা যে সবাই মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে পারতেন—আমার পারসেপশন তা ছিল না। কারণ তাদের কতগুলো নির্দিষ্ট টার্গেট দেওয়া হতো বটে, কিন্তু অপারেশনগুলো তারাও করতেন না। আমাদের হেডকোয়ার্টার্স থেকেও কখনো যেত না। টার্গেট তালিকা তৈরি হতো ফোর্ট উইলিয়ামের অপারেশন ডিরেক্টর জেনারেল সরকারের অফিস থেকে। সেপ্টেম্বর থেকে তিনি আগ্রহভরে প্রত্যেক মাসে একটা করে টার্গেট লিস্ট করতেন। এই তালিকা নিয়ে তিনি কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করতেন। তিনি কথা বলতেন এ কে খন্দকারের সঙ্গে এবং আলাদাভাবে আমার সঙ্গে। তিনি সপ্তাহে অন্তত একবার করে দেখা করতেন। আমার সঙ্গে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ অবধি এই যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। কোন টার্গেট কখন হবে, কোনটা আগে কোনটা পরে অথবা আদৌ তার দরকার আছে কি না—এসব বিষয় আলোচনায় আসত। এই টার্গেট লিস্ট চূড়ান্ত করে একটা পাঠানো হতো বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্সে সরাসরি ওসমানী সাহেবের কাছে, আর একটা কপি পাঠানো হতো বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারদের কাছে, তাদের ফরমেশন কমান্ডারদের মাধ্যমে। কাজেই সেক্টর কমান্ডারদের ওপর চাপ ছিল টার্গেটগুলো বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ টার্গেট দিলেই তো চলবে না, তার অলস পরিকল্পনাও করতে হবে এবং বাস্তবায়িত করার দায়িত্বও নিতে হবে সেক্টর কমান্ডারকে। তা ছাড়া যখনই তাঁরা ব্রিগেড গঠন করতে শুরু করলেন তখনই তত্পরতাটায় স্থবিরতা দেখা দিল। ব্রিগেড গঠনে একজন অফিসারের যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন তা আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের কারও ছিল না। ব্রিগেড দূরের কথা, একটা ব্যাটালিয়ন চালানোর মতো অভিজ্ঞতাও তাঁদের ছিল না। কারণ, তাঁরা ছিলেন সবাই মেজর পদের অফিসার। অফিসার তৈরি করা, ট্রেনিং দেওয়া, অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়, অপারেশন পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি তার বাস্তবায়ন—এসব ছিল অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। তার পরও তাঁরা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চেষ্টা করেছেন কার ব্রিগেডটা কত বড় হবে। আমার জানা মতে, ওসমানী সাহেব তাঁর একটা নতুন অপারেশন প্ল্যানের মধ্যে ব্রিগেড গঠনের বিষয়টি রেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনার কোনো মূল্য ছিল না। এটা ছিল তাঁর মনগড়া। একটা প্রপার আর্মিতে যেভাবে রিসোর্স প্ল্যানিং হয়, সে জন্য না ছিল তাঁর অর্থবল, না ছিল লোকবল, না ছিল তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, না ছিল তাঁর কারও সঙ্গে আলাপ করার মনোবৃত্তি। যিনি অপারেশনসের চার্জে অর্থাত্ ডেপুটি চিফ অব স্টাফ, তাঁর সঙ্গে তিনি কখনোই অপারেশনস পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করতেন না। ওই অবস্থায় ওসমানী জুলাই মাসে ঘোষণা করলেন যে একটি ব্রিগেড গঠন করবেন। আগস্ট মাসে তিনি ঠিক করলেন আরও দুটো ব্রিগেড গঠন করবেন। অক্টোবর মাসে এসে তিনি আবার ব্রিগেড ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। কার্যক্ষেত্রে কিন্তু তুরা ব্রিগেড অর্থাত্ জেড ফোর্স ঠিকই থেকে গেল। জিয়াউর রহমান ওসমানীর নির্দেশ মানলেন না এবং তাঁর সঙ্গে সঙ্গে খালেদ মোশাররফও কিন্তু তাঁর নতুন ব্রিগেড গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করলেন। আর যিনি একটু ধীরেসুস্থে করতে গিয়ে ঠিকভাবে পারলেন না, তিনি হচ্ছেন কে এম সফিউল্লাহ। এ জন্য তিনি খানিকটা নির্ভর করেছিলেন কর্নেল ওসমানীর ওপর। কারণ তিনি (ওসমানী) তাঁকে বলেছিলেন, ‘ডোন্ট ওরি, আই উইল প্রোভাইড ইউ ম্যান পাওয়ার ফ্রম সিলেট’, কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। অবশ্য সবশেষে তাঁকে সিলেট থেকে দেওয়া হলো কিছু আনাড়ি লোক। তুরাতে কিন্তু জিয়াউর রহমানের ব্রিগেড তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। অপারেশনের যে দায়িত্ব সেটা পালন করার সময় না থাকলেও প্রেসারটা তো থাকত। প্রেসারটা আবার জেনারেটেড হতো ভারতীয়দের ফরমেশন কমান্ডারের মাধ্যমে। এ সময় ভারতীয়রা চাপ দিত এই কারণে যে তারা ভেবেছিল পরবর্তী যুদ্ধে তাদের অংশ নেওয়ার ভিত্তিটা মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েই করিয়ে নিতে হবে। আর শরণার্থীদের তো পাকিস্তানিদের পরাজিত করেই ফেরত পাঠাতে হবে। ভারতীয় কমান্ডারদের এই প্রেসার নিয়ে তখন তিক্ততারও সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে যুগ্ম কমান্ড গঠিত হলে তিক্ততার অবসান ঘটে।

আসলে অতিরিক্ত কাজ আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের করতে হতো একই সময়ে। যেমন অপারেশন চালানোর একটা চাপ থাকত, দুই. ব্রিগেড গঠনের মতো দুঃসাধ্য প্রাণান্ত কাজ ছিল এফএফদের প্রপারলি ইনডাক্ট করার চলমান কাজ। যদি আমরা ধরে নিই, ২০ হাজার করেই প্রতি মাসে ট্রেনড ছেলে আসছে এবং তা থেকে যদি অন্তত ৭৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইনডাক্ট করতে হয়, তাহলে যে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৫ হাজারে। আগে যারা গিয়েছিল এবং আবার যারা যেতে চায়—সেই রি-সাইক্লিংয়ের ব্যাপারও তো ছিল। এত মুক্তিযোদ্ধাকে সুনির্দিষ্ট টার্গেট দিয়ে, মোটামুটি পরিকল্পনা দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী সেক্টর কমান্ডারদেরই মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দেওয়ার কাজটি করতে হতো। এটাও একটা অতিরিক্ত কাজ ছিল।

এ কে খন্দকার: মঈদুল হাসান সাহেব যেসব কথা বললেন, তার অনেকটাই যথার্থ। তবে তাঁর কথার কিছু সংশোধনী আনব। ব্রিগেড আসলে ভেঙে দেওয়া হয়নি। কর্নেল ওসমানী মুখে বলেছিলেন ব্রিগেড ভেঙে দাও এবং সেটাতে তিনি স্ট্যান্ডও করেছিলেন। এখানে আর একটি মনে রাখার মতো বিষয় তা হলো—হেডকোয়ার্টার যখন বলছে তোমাদের ব্রিগেড নেই, ব্রিগেড ভেঙে দাও—তখন সে ব্রিগেডের আর কোনো অপারেশন থাকে না। বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার ব্রিগেডের অস্তিত্বকে স্বীকার না করলে তার আর ব্রিগেড হিসেবে কাজ করার কোনো সুযোগ থাকল না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথাও বলেছি।

তবে এ কথা সত্য যে ব্রিগেডের অফিসাররা কাজ করেছেন, যোদ্ধাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন, তাদের টার্গেট ঠিক করে দিতেন—বলা যায় তাঁদের (অফিসারদের) বেশ খানিকটা অবদান ছিল এ বিষয়ে। তবে কতটা অবদান ছিল সেটা অবশ্য বলা মুশকিল। এই অবস্থায় ব্রিগেড সমস্যাটা এমন দাঁড়াল যে সত্যিকার অর্থে না একটা ব্রিগেড হলো, না থাকল, না ভাঙল। এক অদ্ভুত অবস্থায় এগুলো থাকল। তিনটি ব্রিগেডই কিন্তু কিছু না কিছু অপারেশন করেছে। আমি একটি অপারেশনের কথা বলতে পারি, যেটায় জিয়ার ব্রিগেড অংশ নিয়েছিল। সেটা ছিল কামালপুরে। ৩১ জুলাই থেকে ১ আগস্টের এ অপারেশনে একজন অফিসারসহ ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়। অন্যদিকে দুজন অফিসারসহ ৬৬ জন আহত হয়। যখন জেনারেল ওসমানী এ খবর জানলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে বললেন, ‘স্যাক হিম’। বস্তুত তিনি মেজর জিয়াকেই স্যাক করার কথা বলেছিলেন। আমি জানি না, তবে তখন মনে করেছিলাম যে একটা অপারেশনের বিস্তারিত না জেনে—যাঁর জন্য এটা ব্যর্থ হলো, সেটা একটা বিষয়। আর একটা কথা, সেই সময় প্রথম ব্রিগেড কমান্ডারকে স্যাক করার ব্যাপারটি আমাদের মনোবলের জন্য খুব একটা ভালো হবে না বলে মনে হয়েছে। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়ে, জেনারেল ওসমানীকে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, স্যার এ কাজ করবেন না। দিজ ইজ নট দ্য টাইম টু ডু ইট। এ সম্পর্কে আর কোনো তদন্ত করা হয়নি, যে কার জন্য, কার দোষে এত মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। এটা সত্য, যে টার্গেটটা তারা নিয়েছিল সেই টার্গেটটি ছিল অসম্ভব রকমের শক্তিশালী। তার পরও যথাযথ পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি ছাড়াই জেড ফোর্স কমান্ডার জিয়াউর রহমান অনেকটা বাধ্য করেছিলেন প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে এই অপারেশনে যেতে। জিয়াউর রহমান নিজে কখনো যুদ্ধে নামেননি, এমনকি ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে কখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যাননি—কামালপুর অপারেশনের সময় তিনি ভারতের মাটিতে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেছিলেন—এ কথা তাঁর (জিয়া) ব্রিগেডের অনেক ছেলেই সে সময় বলেছিল। আসলে জিয়াউর রহমান বরাবরই ভারতের মাটিতে অবস্থান করেছেন।

মঈদুল হাসান: যে কথা বলা হচ্ছিল। এফএফদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমি কিছু কথা বলেছিলাম। এত এত এফএফ গিয়ে কাজ করেছিল এবং সেক্টর কমান্ডাররা তাঁদের যথাসাধ্য করেছেন। আমার কথা ছিল যে ওদের নিজেদের ওপরে এত সব লোড থাকত যে এফএফদের ঠিকভাবে ইনডাক্ট করে পাঠানো, কী কাজ হলো তার ফিডব্যাক সংগ্রহ করা, তাদের কীভাবে রি-ইনফোর্সমেন্ট দরকার তা দেখা—এসব কাজ মেথোডিক্যালি করা হয়নি। ফলে পুরো ব্যাপারটিই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।

এ কে খন্দকার: মেথোডিক্যাল বলতে আমি যেটুকু বুঝি—সত্যিকার অর্থে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ধরে সব ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু তার পরও বলব, যেহেতু এতগুলো এনসিও, একটা ব্রিগেড ফরমেশনে ওয়ান থার্ড স্ট্রেন্থ হলেও বেশ কিছু এনসিও ছিল—সিনিয়র সার্জেন্ট, হাবিলদার, সুবেদার এরা সংখ্যায় অনেক ছিল। জুনিয়র অফিসার কিছু ছিল—লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন। বিশেষ করে নন-কমিশন অফিসারদের মধ্য থেকে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে লিডারশিপ নিয়েছিল। তারা নিজেরা গেরিলাদের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে গেছে, সিনসিয়ারলি কাজ করেছে।

এ কথা আমি বলতে পারি যে অক্টোবর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বৃদ্ধি, অধিক পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র প্রদান, সে সঙ্গে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রী চুক্তির ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তত্পরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সব পর্যায়ে উত্সাহ-উদ্দীপনাও দেখা যায়। বিশেষ করে নন-কমিশন অফিসারদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, আর তাঁরা দৃঢ়প্রত্যয়ী হওয়ায় গেরিলারা বিশেষভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এর ফল পেতে শুরু করলাম আমরা। দেশের অভ্যন্তরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা এমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে লাগল যে পাকিস্তানি সেনারা—মিলিটারিতে একটা কথা আছে, ‘মিলিটারি ব্লাইন্ডনেস’ অর্থাত্ আমি যদি ওই ঘরে না যেতে পারি, তাহলে আমি জানব না যে এই করিডরে কী আছে। অর্থাত্ ইনটেলিজেন্স জানার যে অক্ষমতা—এনট্রান্স কিংবা বর্ডার পোস্ট কিংবা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরোতে যেখানে ১০ জন সেনার দরকার, সেখানে তারা ২০ জন নিয়ে বের হতো এবং ক্রমান্বয়ে যুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল, তখন তারা বাইরে বেরোতে পারত না। কারণ তাদের সব সময় ভয় ছিল—এই বোধহয় কোথাও মুক্তিবাহিনী অ্যামবুশ করে ওত পেতে রয়েছে। এই যে তারা বেরোতে পারল না, ইনটেলিজেন্স জোগাড় করতে পারল না তাদের অবস্থানের বাইরে, এর ফলে তারা যুদ্ধ না করে পালানো শুরু করল। যশোরের দিকে ভারতীয় বাহিনী শুধু মার্চ করেছে, যুদ্ধ করতে হয়নি। পাকিস্তানিরা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে গেল। শুধু কয়েকটি জায়গায় বড় রকমের যুদ্ধ হয়েছে—যেমন হিলি, সিলেট, ভৈরব। কিছু কিছু জায়গায় যুদ্ধ হয়েছে। তারা বেশির ভাগ পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে।

বাংলাদেশে টার্গেট নিয়ে আমার সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের নিয়মিত আলাপ-আলোচনা হতো এবং এসব টার্গেট অবশ্যই বড় ছিল। আবার মিলিটারির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এমন টার্গেটও বেছে নেওয়া হতো। বড় বলতে, যেমন আদমজী জুট মিল। এটাকে ধ্বংস করা হবে নাকি হবে না এমন ক্ষেত্রে আমি তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করতাম, সিদ্ধান্ত চাইতাম। কারণ ইকোনমিক্যালি স্ট্রাটেজিক্যালি ইমপরটেন্ট টার্গেট ধ্বংস করতে হলে কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় বা ক্লিয়ারেন্স লাগে। একজন জেনারেল নিজেই ঠিক করতে পারেন না, আনলেস এমন অবস্থা হয় যে কোনো উপায় নেই। শুধু এমন ক্ষেত্রে সেনানায়কেরা সিদ্ধান্ত নেন তাত্ক্ষণিকভাবে। এভাবে আলাপ-আলোচনা করেই আমরা এগোতাম। অপারেশনাল প্ল্যান বলতে যেটা বোঝায়, সেটা আমাদের ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার থেকে সেভাবে কখনো করা হয়নি, এটা সত্য কথা।

মঈদুল হাসান: ভারতের স্টেক ছিল, ৯০ লাখ শরণার্থীকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার। শরণার্থীদের বোঝা সাসটেইন করা সম্ভব নয় এবং এটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই করতে হবে। উইন্টারের সময় ভারতের উত্তর সীমান্ত বন্ধ হয় বরফে। তখন চীনাদের পক্ষে আক্রমণ করা সম্ভব নয়। সেই সময় বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত সময়। সেটাকে মনে রেখেই তারা (ভারত) কিন্তু তাদের একটা টোটাল অপারেশনস প্ল্যান করেছিল। তাদের এই স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ীই তারা কাজ করে গেছে। সেই স্ট্র্যাটেজির কতগুলো প্রধান ধাপ ছিল। একটা ছিল চীনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন। দ্বিতীয় ধাপে ভারত যে আরও অনেক দূর যেতে পারে—সেপ্টেম্বরের শেষে মস্কোতে সোভিয়েট নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মিসেস গান্ধী মুক্তির জন্য বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা ও তার আশু বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের সম্মতি আদায় করেন। তারপর ভারত আমাদের ফোর্সেসকে সাহায্য বাড়িয়ে দিয়ে ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার পরও যখন দেখল তাদের নিজেদের অপারেশন পরিকল্পনার অনুপাতে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না, তখন তারা নিজেরাই অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বর্ডার ওয়ার ফেয়ার শুরু করে দেয়। বর্ডারের বিভিন্ন পয়েন্টে তারা এনগেজ করে সরাসরি পাকিস্তানকে। এ জন্য তারা আমাদের ফোর্সেসকেও সঙ্গে নিয়েছে, যেসব জায়গায় তারা পেরেছে। যেমন—বেলুনিয়া, সালদা অপারেশনে। এখানে ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে লড়াই করেছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। বেশ বড় ধরনের লড়াই হয় এসব জায়গায়। আবার কতগুলো জায়গায় যুদ্ধ হয়নি। যেমন, তুরা অঞ্চলে যুদ্ধ হয়নি, যেখানে জিয়াউর রহমান থাকতেন।

জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কমপ্লেইন আমি পেয়েছি। জেনারেল সরকার নিজে আমাকে কমপ্লেইনটা করেছিলেন। জেনারেল সরকারকে তাজউদ্দীন সেপ্টেম্বরে বলে দিয়েছিলেন যে আমি যেহেতু অত্যন্ত ব্যস্ত থাকি, সে জন্য খুব জরুরি না হলে আপনি মঈদুল হাসানের কাছে রুটিন রিপোর্ট করবেন। যুগ্ম কমান্ড গঠনের পর সেক্টর কমান্ডারদের রেডিও দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডার এবং ভারতীয় ফরমেশন কমান্ডারদের মধ্যে খবরাখবর আদান-প্রদানের জন্যই রেডিওগুলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দু-একটি স্থানে এই সেটের সুইচ অফ রাখা হতো। জিয়াউর রহমানকে যে সেট দেওয়া হয়েছিল, সেটির সুইচ প্রায়ই অফ রাখা হতো। ফলে, ভারতীয় ফরমেশন কমান্ডাররা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছিলেন না। আবার মেজর গাফফারের সঙ্গে এই যোগাযোগটা ভালোভাবেই রাখা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে আমাদের যোদ্ধারাও খুব ভালো লড়াই করেছিল। উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ভালো সম্পর্কের কারণেই যুদ্ধক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। যোগাযোগ, ট্রেনিং, অস্ত্র—সব ক্ষেত্রেই এ সময় উন্নতি ঘটেছিল। অলস পরিকল্পনা প্রণয়নেও।

অক্টোবর থেকে ভারতীয় আর্মি বর্ডারে অপারেশন শুরু করে। তার পেছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল। পাকিস্তানের আর্মি যে কতকগুলো ক্যান্টনমেন্টকে অবলম্বন করে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে গড়ে তুলেছিল, তাদের বর্ডার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং বিশাল অর্থাত্ এক হাজার ৪০০ মাইল বিস্তৃত বর্ডারে পাকিস্তানিদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। পাকিস্তানিরা এই ফাঁদে পা দিল। পাকিস্তানিরা তখন আর সংঘবদ্ধ থাকতে পারল না। ছোট্ট ছোট্ট দলে পরিণত হলো। তাদের কোনো সংঘবদ্ধ জোর ছিল না। এটা ভারতীয়দের অত্যন্ত ওয়েল থট আউট, ওয়েল ডিজাইনড পরিকল্পনা ছিল। পাকিস্তানিরা সীমান্ত অবধি এগিয়ে যাওয়ার দরুন দেশের অভ্যন্তরে শূন্যতার সৃষ্টি হলো। এই সুযোগে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপকভাবেই দেশের ভেতর ঢুকে এবং তাদের বেপরোয়া তত্পরতার মাধ্যমে পাকিস্তানিদের অনিশ্চয়তা বোধকে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলে। আবার এক বর্ডার থেকে আরেক বর্ডারে যাওয়ার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। খন্দকার সাহেব যেটা বলেছেন, ব্লাইন্ডিং এফেক্ট হলো। পাকিস্তানের তখন চিন্তা ছিল পূর্বাঞ্চলের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় কাশ্মীরের একটা অংশ তারা দখল করে নেবে। সে জন্য পশ্চিম পাকিস্তানেও তাদের ট্রুপস রাখতে হয়েছিল। তারপর যেটুকু স্পেয়ার করার ছিল—সেটা দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ক্যান্টনমেন্ট এবং সীমান্তগুলোতে একত্রে সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষভাবে নভেম্বর মাসে বলা যায়, অক্টোবরের শেষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যে লড়াইটা ভালোভাবে শুরু হলো পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, তখনই তাদের আত্মবিশ্বাস দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তত্পরতার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটনাক্রমে ঘটেনি। ইট ওয়াজ ভেরি ভেরি ওয়েল থট আউট ইন্ডিয়ান অপারেশন প্ল্যান—যেটা তারা কার্যকর করে।

ওদের আরেকটা জিনিস তখন আমার চোখে পড়েছিল। যখন কোনো প্ল্যান এক্সিকিউটেড হতো না, তখন তারা আবার সেটা থেকে আইডিয়াজ ডেভেলপ করে। যেমন তারা হিলির যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তারা ভাবল যে তারা সব জায়গায় পেনিট্রেড করতে পারবে না। তখন ডি পি ধর নভেম্বর মাসে আমাকে বলেন, আমরা এখন ট্যাকটিকস পরিবর্তন করেছি, পাকিস্তানিদের স্ট্রং হোল্ডগুলো এরপর বাইপাস করে এগিয়ে যাব ঢাকার দিকে। এটা ছিল তাদের একটা বড় ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত—যা তাদের দ্রুত সাফল্য এনে দিয়েছিল। তারা ফাস্ট মুভ করতে পেরেছিল ঢাকার দিকে। তাদেরও অপারেশনে নানা রকম গণ্ডগোল হয়েছিল এভাবে মুভ করতে গিয়ে। যেমন যশোর দিয়ে ঢোকার পর। তারা তো ফাস্ট মুভ করে আসছিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে। কিন্তু তাদের আরেকটা কলামকে কেন ঝিনাইদহ হয়ে খুলনার দিকে যেতে হবে তা ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। খুলনা এবং চালনা তাদের স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য ছিল না। তাদের স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য ছিল ঢাকা। একইভাবে ঢাকাই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে যে পথে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি ঢাকা আসতে পারা গেল সেটা কেন শুধু একটা ব্রিগেড ছিল। কামালপুরের মধ্য দিয়ে অর্থাত্ ময়মনসিংহের উত্তর দিক দিয়ে যেটা জেনারেল নাগরার ফোর্স, অত্যন্ত তাড়াতাড়ি ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। এটা ছিল শুধু একটা ব্রিগেড। সুতরাং তাদেরও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছিল। কিন্তু ওদের একটা সুচিন্তিত অপারেশন প্ল্যান ছিল এবং সেই অপারেশন প্ল্যানকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ফিল্ডের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে তারা প্ল্যানকে আপডেট করত, সংশোধন করত।

অন্যদিকে আমাদের বাংলাদেশ ফোর্সেসের দিক থেকে তেমন কোনো ওভারঅল প্ল্যান ছিল না, কাজেই আপডেট করার কথাও ছিল না, আমাদের অফিসার্সদের যে দায়িত্ব বহনের উপযুক্ত তারা, তার থেকে দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সেক্টর কমান্ডাররাও ওভারলোডেড হয়েছে অসংখ্য কাজ চাপিয়ে দেওয়ায়। একই সঙ্গে ট্রেনিং, প্ল্যানিং, অপারেশন, ইনডাক্ট, অস্ত্র মনিটরিং—সব মিলিয়ে আমাদের কমান্ডাররা সত্যিই ওভারলোডেড ছিলেন। আসলে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের কাছ থেকে আমাদের চাওয়াটা এমনই ছিল যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটা কখন হয় যখন সেন্ট্রাল লিডারশিপ অব দ্য আর্মি দুর্বল থাকে। আমি যেটা দেখি, ইট ওয়াজ রিয়েলি এ ফেইলিউর অব আওয়ার সেন্ট্রাল লিডারশিপ অব আওয়ার আর্মি।

আমাদের আর্মি স্ট্রাকচারের মধ্যে যিনি আমাদের দেশের অত্যন্ত নন্দিত মানুষ—জেনারেল ওসমানী, তাঁর কোনো জায়গাতেই একক কাজের ফিল্ড অভিজ্ঞতা ছিল না। তা ছাড়া তিনি ছিলেন বয়স্ক মানুষ। গেরিলাযুদ্ধ সম্পর্কেও তাঁর কোনো থিওরিক্যাল ধারণা ছিল না।

এস আর মীর্জা: আসলে হেডকোয়ার্টারের ওয়ার পরিকল্পনা বলতে তেমন কিছু ছিল না। বরং কর্নেল ওসমানীর ছিল খামখেয়ালিপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি উদাহরণ দিই। বিষয়টি আমার আজও মনে আছে। গেরিলা উইল হ্যাব টু বি ইনডাকটেড অ্যাট ফরিদপুর। দে আর ফ্রম ফরিদপুর। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত পথেই পাঠাতে হবে। অর্থাত্ যশোর সীমান্ত দিয়েই তাদের বাংলাদেশের ফরিদপুরের উদ্দেশে পাঠানোটাই ছিল স্বাভাবিক। তা না পাঠিয়ে কর্নেল ওসমানীর অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন খালেদ মোশাররফ। তাঁর যে সেক্টর এলাকা আগরতলা, সেই আগরতলা দিয়েই গেরিলাদের পাঠানোর জন্য উনি চাপ দিলেন। মেজর খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে এই কাজটি করতে হবে সে কথাও বললেন। সমস্যা যেটা দাঁড়াল সেটা হলো, ওই এলাকা থেকে ফরিদপুরে আসতে হলে তাদের অনেকটা পথ ঘুরে নদীপথে আসতে হবে। গেরিলারা নির্দেশ মেনে খালেদ মোশাররফের এলাকা থেকে নদীপথে রওনা হয়। এদিকে পাক আর্মি নদীপথে ওই সময় পেট্রোল করছিল। পাক আর্মি তাদের চ্যালেঞ্জ করে এবং গুলিতে গেরিলাদের সবাই নিহত হয়। অন্যদিকে ভারতীয়দের ওয়ার পরিকল্পনা ছিল সুচিন্তিত, পরিকল্পিত। তাদের এই পরিকল্পনাকে সমর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইট ওয়াজ ওয়ান অব দ্য বেস্ট ক্যাম্পেইন অব ওয়ার ইন দ্য হিস্ট্রি অব ওয়ার্ল্ড।

এ কে খন্দকার: ভারতীয়দের দিক থেকে তো যুদ্ধ পরিকল্পনা একটা নিশ্চয়ই ছিল। বর্ডার পোস্টগুলোকে তারা ধ্বংস করা শুরু করল একপর্যায়ে। ফলে পাকিস্তানিরা সীমান্তে জড়ো হতে বাধ্য হলো। এই সুযোগে আমাদের গেরিলারা ব্যাপক সংখ্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে।

ভারতীয়দের পক্ষে আরও একটা সুবিধা ছিল, তাদের জানাও ছিল যে ঢাকায় পাকিস্তানিদের একটিমাত্র বিমান স্কোয়াড্রন আছে। এয়ার পাওয়ার ছাড়া আজকালকার যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, সে যে যত বড়ই জেনারেল হোক না কেন। এয়ার পাওয়ার হচ্ছে মোবাইল ফায়ার পাওয়ার। ফিল্ডগান আছে। কিন্তু এর মবিলিটি খুব অল্প, যেমন কাদা থাকলে বা নদী থাকলে ফিল্ডগান বা ট্যাঙ্ক চলতে পারবে না। কিন্তু মোবাইল ফায়ার পাওয়ার যদি বলতে হয়, তাহলে এয়ার পাওয়ারকেই বলতে হবে। এই পাওয়ার যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময় যেতে পারবে অতি অল্প সময়ের মধ্যে। ডিসেম্বরে যখন ঢাকা রানওয়ে দুই দিনের মধ্যে একদম অকেজো হয়ে গেল, তখন পাকিস্তান আর্মির যুদ্ধ করার মতো সত্যি আর কিছু ছিল না। এয়ার সাপোর্ট না হলে যুদ্ধ করা যায় না। এই সুযোগ পুরোপুরি ইন্ডিয়ান ফোর্সেস ব্যবহার করেছিল।

সুতরাং দুটি কারণ—একটি হচ্ছে যে তাদের একটি প্রপার প্ল্যানিং ছিল, খুবই স্বাভাবিক যে তারা (ভারতীয় বাহিনী) একটা ওয়েল অরগানাইজড ফোর্স ছিল। যে প্ল্যানিংটার মধ্যে সত্যি কথা বলতে কি পাকিস্তান আর্মিও ধরা দিয়েছিল। পাক আর্মির শেষ পর্যন্ত একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে এরা একটা লজমেন্ট করবে। ভারতীয়রা মুক্তিবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও না কোথাও একটা খালি জায়গা করে সেখানে বাংলাদেশের রাজধানী করে পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। যে ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা সীমান্ত পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিল। যাতে করে মুক্তিযোদ্ধারা বা ভারতীয়রা মুক্ত এলাকা গড়ে তুলতে না পারে। আমরা এমন একটা ধারণা প্রথম দিকে করলেও পরবর্তী সময়ে এই ধারণা বাতিল করা হয়েছিল। ইন্ডিয়ান প্ল্যানিংয়ে এই জায়গাটায় পাকিস্তানিরা ধরা দিয়েছিল। তারপর যখন টাঙ্গাইল হয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভারতীয় বাহিনী ঢাকার কাছাকাছি চলে এল তখন ৯ বা ১০ ডিসেম্বর থেকে যে আলোচনা শুরু হলো, সেটা ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সফল সমাপ্ত হয়। সুতরাং যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন যে আমাদের পরিকল্পনা ছিল কি না—পরিকল্পনা ছিল এবং সেটা হচ্ছে গেরিলাযুদ্ধ। এই পরিকল্পনাটা যদি আমরা বরাবর চালিয়ে যেতাম, তাহলে আমরা আরও বেশি সফলতা লাভ করতে পারতাম বলে আমার বিশ্বাস।

আমি এখন যৌথ কমান্ডের কথায় আসি। আমরা ভারতে থেকে যুদ্ধ করছি, অপারেশন চালাচ্ছি, ভারতের সাহায্য নিয়ে, তাদের গোলাবারুদ নিয়ে এবং বর্ডারে ভারতীয় বিএসএফের সাহায্য নিয়ে। তাই সামগ্রিক অপারেশন পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে একটি সমন্বয়ের জরুরি প্রয়োজন ছিল। প্রথমে এই সমন্বয়ে কাজটি হয়নি। যুদ্ধের প্রথম দিকে এই ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে ওপরের নির্দেশের অপেক্ষায় কিছুটা অনীহা ছিল। আমাদের দিক থেকে কর্নেল ওসমানীর এই ব্যাপারে কোনো ধরনের উত্সাহ ছিল না। আর সেক্টর পর্যায়ে এই সমন্বয়ের কাজটি হয়ে ওঠেনি। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে এই বিভেদ ও দূরত্ব ছিল অক্টোবর মাস পর্যন্ত।

অক্টোবর মাস থেকে ইন্ডিয়ান আর্মি বিভিন্ন সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে ফিল্ড আর্টিলারির কাভার দিতে শুরু করে। আমাদের দিক থেকে কোনো অপারেশনে যাওয়ার সময় বা তার আগে ভারতীয় বাহিনী আর্টিলারি কাভার দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলত বা এলোমেলো করে দিত। তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা গিয়ে সেই অপারেশন পরিচালনা করত বা টার্গেট পূরণ করত। পরে যখন ক্রমাগত অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল, তখন ভারতীয় পক্ষ থেকে এই সমন্বয়ের বিষয়টি আসে। একটা যৌথ কমান্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এটা প্রয়োজন এই জন্য যে মুক্তিযোদ্ধারা একদিকে অপারেশন করবে, অন্যদিকে ভারতীয় বাহিনী অপারেশন করবে। সমন্বয় না থাকলে অনেক সময় আত্মঘাতী ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এতে করে ভুলবোঝাবুঝি হবে।

যৌথ কমান্ড গঠনের বিষয়টি প্রথমেই ওঠে রাজনৈতিক পর্যায়ে, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে। তিনি এই বিষয়টির দায়িত্ব দেন কর্নেল ওসমানীকে। কর্নেল ওসমানী এই যৌথ কমান্ড গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন। ওসমানী ভারত বাংলাদেশ একটি যৌথ কমান্ড হোক এটা চাননি। ওসমানীর মনোভাব ছিল আমাদের অপারেশন আমরা করব, মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড হবে না। শেষে যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে রাজনৈতিক পর্যায়ে এই যৌথ কমান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সময় কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ করেন। তার আগে তিনি বহুবার পদত্যাগ করেছেন মৌখিকভাবে। যুদ্ধের এই চূড়ান্ত ও সংকটজনক পর্যায়ে মৌখিকভাবে পদত্যাগের কথা বলার পর তাজউদ্দীন আহমদ ওসমানী সাহেবকে লিখিতভাবে পদত্যাগ করতে বলেন। তখন তিনি আর লিখিত পদত্যাগপত্র দেননি। তারপর থেকে তিনি নিষ্ক্রিয় থাকতেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো উত্সাহ দেখাতেন না। ফলে তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে ডেকে পাঠাতেন। এই ব্যাপারে আমাকে একবার দিল্লি যেতে হয়েছিল। ডি পি ধর আমাকে বললেন, আপনাকে দিল্লি যেতে হবে। কর্নেল ওসমানীর এই ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না দেখে আমি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবকে জিজ্ঞেস করি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং করণীয় সম্পন্ন করার কথা বলেন। এরপর আমি দিল্লি যাই। দিল্লিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তাদের সঙ্গে এই আলাপ থেকে আমি বুঝতে পারি যে যুদ্ধ প্রায় আসন্ন।

ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে আমার কথা হয় নেভির ব্যাপারে। বিশেষত বড় বড় বন্দরসহ বিস্তৃত অঞ্চলের নদীবন্দরে কাজ করতে হবে, এটা নিয়ে আলোচনা হয়। নেভির ব্যাপারে কথা বলি ক্যাপ্টেন সামন্ত সিংয়ের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অত্যন্ত গভীর ছিল। তিনি প্রথম দিকে কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও পরের দিকে আর করেননি। আমার সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ হতো। এমনকি ১৫ আগস্ট তারিখে নৌ-কমান্ডোদের যে অপারেশন হয় সেটা মনিটরিং করতে আমি আর ক্যাপ্টেন সামন্ত সিং আগরতলা গিয়েছিলাম। এরপর থেকে বাংলাদেশের নদীপথে বিভিন্ন অপারেশন নিয়ে সামন্তের সঙ্গে আমার আলোচনা হতো।

এই সময়ে আলোচনা হয় যদি বিমানবাহিনী যুদ্ধে নামে, তাহলে আমরা কী টার্গেট করব। এর আগেও এই নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার প্রথম আলাপ হয় এয়ার মার্শাল লালের সঙ্গে কলকাতায়। তিনি আমাকে চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর স্ত্রীরও উপস্থিত ছিলেন। মার্শাল লালের স্ত্রী ছিলেন বাঙালি। সেখানে প্রথম আলোচনা হয় আমরা কী টার্গেটে আক্রমণ করতে পারি। আমরা দুজন একমত হই যে আমাদের এই ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে কোনো বড় টার্গেটে আক্রমণ করা সম্ভব না। বিশেষ করে বড় বড় রাস্তা, স্থাপনা, রেললাইন আক্রমণ করতে পারব না। কিন্তু যদি তেলের ডিপোর মতো স্থাপনা ধ্বংস করতে পারি, সেটা হবে বড় অর্জন। এটা পাকিস্তানিদের জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করবে। পরে যখন নভেম্বর মাসে দিল্লিতে পুনরায় তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়। তখনে এয়ার ফোর্সের আক্রমণ পরিকল্পনায় এই কৌশল বহাল থাকে। সুতরাং বিমান ও নৌবাহিনী ছিল সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল, উচ্চমানের ট্রেনিং-সমৃদ্ধ এবং তাদের আক্রমণ টার্গেট ছিল স্বল্প ও স্থির। এ জন্য আক্রমণ পরিকল্পনায় এই দুই বাহিনী সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিল। বিমানবাহিনীর আক্রমণ পরিকল্পনা ডিমাপুরে যৌথভাবে করা হয়। কোথা থেকে কোথায় ফ্লাই করবে, কোন কোন টার্গেটে আক্রমণ করবে ইত্যাদি।

বিস্তৃত এবং চূড়ান্ত পরিকল্পনায় তেল ডিপোকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও তাই। ট্রেনিংয়ের সময় বলা হয়েছিল কোথায় কোথায় আক্রমণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর আক্রমণ করার কথা ছিল। তবে একটা টার্গেট পরিকল্পনা করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে বাস্তব কারণে এটা বাতিল হতে পারে। নেভাল কমান্ডোদের আক্রমণ করার কথা ছিল ১৪ আগস্ট। পাকিস্তানিরা স্বাধীনতা দিবস নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আবার তারা স্বাধীনতা দিবসে সজাগ থাকবে, এ জন্য আক্রমণ পিছিয়ে ১৫ আগস্ট তারিখে করা হয় পাকিস্তানিদের তাক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। যারা আগরতলা বা চট্টগ্রামের গিয়ে পৌঁছেছে তারা কী করে আক্রমণের সময় জানবে? তাদের গানের মাধ্যমে এই সময় জানানো হয়েছিল। সামান্য অস্ত্রপাতি নিয়ে নৌ ও বিমানবাহিনীতে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল, এর প্রধান কারণ হলো এই দুই বাহিনী ছিল খুবই সুশৃঙ্খল। পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত চমত্কার এবং লক্ষ্যবস্তু ছিল স্থির।

মঈদুল হাসান: বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন নিয়ে। যখনই সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হলো তখনই অন্যান্য বিষয় সামনে চলে আসে। ভারত যে সীমান্ত যুদ্ধ শুরু করেছে, এটা যদি পাকিস্তান মোকাবিলা করতে চায়, তাহলে বিষয়টি একটা পাক-ভারত যুদ্ধের দিকে যাবে।

পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর ভারতে শরণার্থীর স্রোত দ্রুত বেড়ে চলে। তখন থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা শুরু করে দেয়। সব দেশের সেনাবাহিনীই আসন্ন ও কল্পিত বিপদ মোকাবিলার জন্য প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। উদ্ভূত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী এ কাজটি শুরু করে দিয়েছিল মে মাস থেকে। ভারতের যুদ্ধ পরিকল্পনা যে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে আমরা কিছু আভাস পেলেও বিশেষ জানতাম না।

তারা এই সিদ্ধান্তে আসে যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানিদের হাত মুক্ত করেই শুধু ওখানে ওই বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ফেরত পাঠানো সম্ভব। এই বিষয় আমরা আঁচ করতে পারলেও তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা জানতাম না। আমি এবং আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ—আমরা মনে করতাম যে আমাদের এফএফদের অপারেশন দ্রুত বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি সেক্টর পর্যায়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা একান্ত প্রয়োজন। সেক্টর পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু করার জন্যই জুলাই মাসে কিছু কিছু দায়িত্ব অর্পণ করা হয় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিংয়ে। এটা কার্যকর করার জন্য আগস্ট মাস থেকে তাদের জন্য অস্ত্র বরাদ্দ বাড়তে থাকে। কিন্তু দেখা গেল কোনো সেক্টরই কাজ করছে না। তাদের কাজ না করার কারণগুলো আপনি (এ কে খন্দকার) বলেছেন। শুধু এফএফরা কাজ করছে। কিন্তু ভালো ফিডব্যাক না থাকায় বাইরে থেকে আমরা এফএফদের কাজের প্রভাবটা বুঝতে পারছিলাম না কত বড় বা কোন পর্যায়ে কাজ হচ্ছে। কারণ এটা তো আর পুশ বাটন নয় যে আমরা ১০ হাজার লোক পাঠালে পরদিন থেকে এই ১০ হাজার লোক কাজ শুরু করবে। এটা সময়ের দরকার। এই গেরিলা যোদ্ধাদের কেউ অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কেউ ধরা পড়েছে, আবার কেউ কাজ করছে। আর যারা কাজ করছে তাদের কৌশল ও দক্ষতা আস্তে আস্তে বাড়ছে। তাই তাদের ভারত থেকে দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো শুরু হয়েছে জুনের শেষ সপ্তাহ এবং জুলাই থেকে। তাদের যুদ্ধে এবং কৌশলে একটা দক্ষতা আসতে প্রায় তিন-চার মাস লেগেছে। সে জন্য অক্টোবর মাসের আগে এর পুরো ইমপ্যাক্ট আমরা বুঝতে পারিনি।

আগস্টের পর ভারতের পক্ষ থেকে আরও কিছু অস্ত্র ও রসদ দিয়ে সেক্টর ফোর্সেসকে সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চলে কিছু টার্গেট ঠিক করে দেওয়া হয়। যেখানে পাকিস্তানিদের বাংকার, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা পাকিস্তানিদের যোগাযোগব্যবস্থা ইত্যাদি আছে, সেগুলো ধ্বংস করতে বলা হয়। এই মাসিক টার্গেট ঠিক করার কাজটা শুরু হয় জেনারেল সরকারের অফিস থেকে। আমার মনে আছে মাসিক টার্গেট পরিকল্পনার প্রথম সভাটি হয় ফোর্ট উইলিয়ামে। জেনারেল বি এন সরকার এই সভায় ডেকেছিলেন এ কে খন্দকার সাহেব, মেজর মনজুর ও আমাকে। আলোচনার পর দেখা গেল, আমাদের নিজেদের মধ্যেই বিষয়টির সামগ্রিক দিক পরিষ্কার নয়। জেনারেল সরকার যে প্রশ্নটি তোলেন, আমার মনে হয় খন্দকার সাহেবও এটা মনে করতে পারেন। তা ছিল, এই যে অপারেশনগুলো করা হচ্ছে—একটা লাইন উড়িয়ে দেওয়া, একটা ইলেকট্রিকের খুঁটি নষ্ট করে দেওয়া, একটা ট্রান্সফরমার বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া—এগুলো পাকিস্তানি বাহিনী একদিনের মধ্যে রিপেয়ার করে ফেলছে। কাজের মধ্যে যেটা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা যেখানে আক্রমণ চালাচ্ছে, পাকিস্তান আর্মি সেখানে গিয়ে আশপাশের দু-দশটা গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে। ফলে ওই এলাকার শত শত মানুষ শরণার্থী হিসেবে বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। শরণার্থী আগমনের গ্রাফ চিত্রটি দেখলে লক্ষ করা যায় যে আগস্ট-সেপ্টেম্বর—এই দুই মাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় শরণার্থী এসেছে। তাই জেনারেল বি এন সরকার প্রশ্ন তুললেন যে আক্রমণ বা অপারেশন আর বাড়ানো যায় কি না। তাঁর বোধহয় কিছু পরিকল্পনা ছিল। এই পরিকল্পনা ছিল আমি যেভাবে বুঝেছি, খন্দকার সাহেবও মনে করতে পারেন, বাংলাদেশে যেসব পাওয়ার স্টেশন এবং জুট মিলস আছে, তখন পাকিস্তান সরকার কিন্তু কিছু পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি শুরু করছে।

এই পাওয়ার হাউস এবং জুট মিলগুলো আক্রমণ করা। এফএফরা গিয়ে বোমা মেরে এগুলো অকেজো করে দেবে। আমার যে রকম নন-মিলিটারি বুদ্ধি, আমি সেখানে বলে বসলাম—ভিয়েতনামে এত বড় যুদ্ধ চলছে, সেখানে ভিয়েতকং তাদের অপারেশনে কোনো শিল্প-কারখানা আক্রমণ করে নষ্ট করছে না। তাদের যুক্তি একটাই—দেশ যখন স্বাধীন হবে, তখন এসব শিল্প-কারখানা তো আমাদেরই হবে। মেজর মনজুর সাহেব এটা ভীষণভাবে বিরোধিতা করে বললেন, এগুলো অত্যন্ত অসামরিক কথা। এগুলো আঘাত করে ভাঙতে হবে। পরে আমিও শক্ত যুক্তি দিলাম। পরদিন আমার কানে এল যে মুক্তিবাহিনীর সামরিক কর্মকাণ্ডে অসামরিক হস্তক্ষেপ বেড়ে গেছে। ফলে আমি তাজউদ্দীন সাহেব ও জেনারেল বি এন সরকারকে জানাই যে আমার বোধহয় এরূপ সভায় উপস্থিত থাকা ঠিক নয়। বিষয়টায় কিছুটা স্পর্শকাতরতা আছে। এসব বিষয়ে আমরা আলাদাভাবে নিজেরা আলাপ করব।

এ কে খন্দকার: এ সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। মঈদুল হাসান সাহেব বলায় বিষয়টি আমার মনে পড়ছে। এ রকম আপত্তি মেজর মনজুর করেছিল। আমি আগেও বলেছি, যদি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা কৌশলগত যোগাযোগকেন্দ্র, যেমন—হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভৈরব ব্রিজ, সেগুলো আক্রমণ করতে হলে রাজনৈতিক ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। এ বিষয়টি সভায় উল্লেখ করছিলাম। যেসব স্থাপনার অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে, সেখানে রাজনৈতিক অনুমোদন থাকা প্রয়োজন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত এসব জুট মিলে আক্রমণ করা হয়নি। এমন কিছু জায়গায় টার্গেট করা হয়েছিল, যেখানে যাওয়ার মতো তাদের (এফএফদের) সামর্থ্য আছে।

মঈদুল হাসান: সেপ্টেম্বর থেকে সেক্টর বাহিনীর টার্গেট নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হলো। আর প্রস্তাব হলো, সেক্টরের জন্য টার্গেট করে দেওয়া হবে। এগুলো প্রথমে বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হবে। এগুলো জেনারেল বি এন সরকারের অফিসে বসে ঠিক করা হতো। এর একটা কপি যেত বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারের কাছে, আরেকটি যেত ভারতের ফরমেশন কমান্ডারদের কাছে। পাশাপাশি ভারতের ফরমেশন কমান্ড ছিল। এসব ফরমেশনে সেনাসংখ্যা মিনিমাম ব্যাটেলিয়ন প্লাস রাখা হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল ব্রিগেড। তো আমাদের ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার ছাড়াও সেক্টর কমান্ডার এবং ভারতের ফরমেশন কমান্ডারদের কাছে মাসিক টার্গেট যেত, যাতে কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো ফিল্ড পর্যায়ে ভারতের ফরমেশন কমান্ড ও আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা করতে পারেন। আমাদের সেক্টর যদি মনে করত যে হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে আলোচনা করবে, তারও সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি যে মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করার সমস্যাও ছিল। আমার মনে হতো, সমস্যাগুলো জেনুইন ছিল। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি। কামালপুরে একটা শক্তিশালী বাংকার ছিল। সেখানে তিনবার আক্রমণ করা হয় এবং তিনবারই আমাদের বিপুল ক্ষতি হয়। ভারতীয়রা মনে করত, ভবিষ্যতে তাদের ফোর্সেস ওই পথে যাবে। তাই পথটাকে পরিষ্কার করার জন্য এবং নিরাপদ রাখার জন্য আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের লাগানো হতো। প্রথম মেজর জিয়াউদ্দিন কামালপুর আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। দ্বিতীয়বার তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানান। তখন ভারতীয় বাহিনী ব্যাটালিয়ন প্লাস লেভেলে আক্রমণ করায় তারাও ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়ে। তাদের অনেক সেনা নিহত হয়। তৃতীয়বারে ভারতীয় বাহিনী ব্রিগেড প্লাস লেভেলে যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেয়।

আবার কতগুলো জায়গায় সেক্টর ফোর্স বা এফএফদের বলা হতো, অমুক জায়গায় একটা ব্রিজ আছে, এটা ধ্বংস করে এসো। যে পথটা দিয়ে যেতে বলা হতো, সেটা হয়তো দেখা গেল সাত-আট মাইল ঘুরে যেতে হবে। সেপ্টেম্বর মাসের কথা বলছি। তখনো বর্ষা চলছে, বৃষ্টি হচ্ছে, পথঘাট কাদা, রাতের বেলা তাদের হেঁটে যেতে হতো। সাধারণত তারা এতটা পথ ঘুরে যেতে চাইত না। তাই তারা নিজেরা টার্গেট শিফট করে কাছাকাছি একটা জায়গায় টার্গেট করত। ভারতীয়রা চাইত না তারা টার্গেট শিফট করুক। তারা জানে, পাকিস্তানিরা আর্টিলারি দিয়েই এর পাল্টা জবাব দেবে। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের মতো করে যেখানে যেত, সেটার কাছেই হয়তো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানে ভারতীয়রা আর্টিলারি কাভার দিত না। তখন বলত, ‘আমরা তো ইন্ডিয়ানদের বলেছি, আমরা অমুক জায়গায় যেতে পারব না। কারণ আমরা সেখান থেকে সকাল হওয়ার আগেই ফিরতে পারব না।’ মুক্তিযোদ্ধারা আমরা তাদের (ইন্ডিয়ান আর্মি) ২৪ ঘণ্টা আগে বলেছি। তারা আমাদের কাভার দেয়নি। এদিকে এক দিনের মধ্যে আর্টিলারি ইউনিট সরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না বা ইউনিট মোতায়েন করত না ঘনবসতির জন্য। আর তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও হতো বড়। ভারতীয় এলাকার লোকেরা যদি গুলি খায়, তাহলে বলত যথেষ্ট বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কেননা ভারতীয়রা আমাদের রাজনীতিকদের স্বভাব, চরিত্র, আমাদের যুদ্ধে করার ক্ষমতা, আমাদের লুটের টাকা ইত্যাদি দেখে তারা এমনিতেই বিরক্ত ছিল। জুন মাসের দিকে যখন কলকাতায় চোখ উঠল ব্যাপকভাবে, এটা শরণার্থী ক্যাম্প থেকে হয়েছিল, তখন এর নাম মুখে মুখে হয়ে গেল ‘জয় বাংলা’। আমাদের কর্মকাণ্ড দেখে ওখানকার মানুষের সহ্যসীমা তত দিনে যথেষ্ট নিচে নেমে গেছে।

এই স্পর্শকাতর ও জটিল সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব ছিল আমাদের হেডকোয়ার্টার্সের। হেডকোয়ার্টার্সের করতে হলে তার সেই রকম লোকবল থাকতে হবে। হেডকোয়ার্টার্সের লোকবল ছিল মাত্র চার-পাঁচজন কর্মকর্তা। খন্দকার সাহেব, তিনি অপারেশন এবং ট্রেনিংয়ের চার্জে ছিলেন। অপারেশনের সুবিধার্থে অন্তত তিনটি রিজিওনাল কমান্ড সেটআপ করতে হতো সেক্টর কমান্ডগুলোকে সুপারভাইজ করার জন্য। একটি পশ্চিমে, একটি উত্তরে, একটি ময়মনসিংহ অঞ্চল নিয়ে এবং অন্যটি আগরতলায়। এতে ফিল্ড লেভেলের এই সমস্যা হয়তো সুরাহা হতো।

সেপ্টেম্বরে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ফিরে এসে ভারতীয় বাহিনীকে তাদের সীমান্ত তত্পরতার ব্যাপারে বাধা-নিষেধ তুলে দেন। ইতিপূর্বে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সেনাদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল। তারা যাতে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম না করে, এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তিনি সেনাবাহিনীকে সুস্পষ্টভাবে বলে দেন, যদি ঘটনার চাপে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়, তাহলে করতে পারবে।

এরপর অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজেরাই যুদ্ধে নেমে পড়ে। আমাদের সেক্টর ফোর্সেসকে যে দায়িত্ব দেওয়া হতো, তারা অনেক ক্ষেত্রেই পালন করতে পারত না। তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সেই দায়িত্ব পালনেরও নির্দেশ দেওয়া হলো। কাজেই দুটি পাশাপাশি কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হলো। একটা ভারতের ফরমেশন কমান্ড এবং আমাদের একটা সেক্টর কমান্ড। কিন্তু যুদ্ধ একটাই। একই থিয়েটারে দুটি আলাদা কমান্ড থাকতে পারে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে পৃথিবীর সব যুদ্ধেই এই ব্যবস্থা চলে এসেছে—কমান্ড ব্যবহার আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে।

যৌথ কমান্ড গঠন করার পর দেখা গেল যেহেতু তাদের ফরমেশন কমান্ডাররা অনেক সিনিয়র, তাঁরা কেউ ব্রিগেডিয়ারের নিচে নন বা সিনিয়র কর্নেলের নিচে নন, তাই স্বাভাবিকভাবে কমান্ডের দায়িত্ব ইন্ডিয়ান অফিসাররা পেলেন, এটা নিয়ে আমাদের মাঝে একটু উষ্মা সৃষ্টি হয়েছিল।

অক্টোবরে জেনারেল বি এন সরকার এসে বললেন, একটা সমস্যা হচ্ছে। ফরমেশন এবং সেক্টর কমান্ডের মধ্যে কমিউনিকেট করার জন্য ওয়্যারলেস লিংক ছিল, যাতে করে তাঁরা সর্বদাই কথা বলতে পারেন। জেনারেল সরকার বললেন, ‘আমরা দু-একটা ক্ষেত্রে সেক্টর কমান্ডারদের পাচ্ছি না।’ আমি যেহেতু তাজউদ্দীনের পক্ষ থেকে এগুলো নিয়ে কথা বলার জন্য নিয়োজিত ছিলাম, তাই জানতে চাইলাম কোনো বিশেষ জায়গায় সেক্টর কমান্ডারদের পাওয়া যাচ্ছে না। তখন জেনারেল সরকার বললেন যে তুরাতে সমস্যা হচ্ছে। তুরাতে তখন ব্রিগেড কমান্ডার জিয়াউর রহমান। ভারতের দিকে ছিলেন মেজর জেনারেল গুরু বক্স সিং গিল। জেনারেল সিং জরুরিভাবে কমিউনিকেট করতে চাইছিলেন, কিন্তু জিয়াউর রহমানকে পাওয়া যায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম খবরটি কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো যেত না। জেনারেল সিং বললেন, ‘আমি কুরিয়ার পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা নেওয়ার মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। তারপর সরকার বিষয়টি পরিষ্কার করেই বললেন। এরপর আমাদের লোক দিয়ে খবর নিয়ে জেনেছি জিয়াউর রহমান ভেতরেই রয়েছেন, কিন্তু ভারতীয় ফরমেশন কমান্ড থেকে কোনো উপদেশ গ্রহণ করেননি। তাঁর কথাটা বললাম এই জন্য যে এ ঘটনাটা আমি নিজে জানি। অনেক ক্ষেত্রেই এটা হয়েছে। এখানে আরও একটা কথা বলি, অনেকেরই জানা যৌথ কমান্ড গঠন করার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি করেছিলেন আমাদের কমান্ডার ইন চিফ কর্নেল ওসমানী। তিনি বললেন, ‘এটা কখনোই হতে পারে না। আমরা করব না।’

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘যৌথ কমান্ড ছাড়া আমাদের যুদ্ধ তো আটকে গেছে। বাংলাদেশের সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীকে যদি নড়বড়ে করে ফেলা না যায়, তাহলে ইন্ডিয়ান আর্মিকে ভেতরে পাঠানোর ঝুঁকি তারা নেবে না। এটা যুদ্ধ পরিকল্পনার অন্তর্গত—রণক্ষেত্রে কমান্ডের পূর্ণ সমন্বয় করা অপরিহার্য।

ওসমানী বললেন, যদি এটা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন। তখন তাজউদ্দীন শক্ত অবস্থান নিয়ে বললেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি চান যে যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হোক। এর পরও ওসমানী বললেন, তিনি তাহলে পদত্যাগ করবেন। তখন তাজউদ্দীন বললেন, তিনি যেন লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। তাজউদ্দীন প্রতিজ্ঞা করে বলেন, তিনি এটা গ্রহণ করবেন। ওসমানী সাহেব সেই পদত্যাগপত্র আর লিখিতভাবে দেননি। তাঁকে বাদ দিয়েই যৌথ কমান্ড গঠিত হয়।

অক্টোবর মাসের শেষদিকে যৌথ কমান্ডের তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড়ায়। বাস্তবে এই সময় আমাদের এক হ-য-ব-র-ল অবস্থা। আমরা তিনটি ব্রিগেড গঠন করেছি। এদিকে ওসমানী সাহেব যিনি তিনটি ব্রিগেড সৃষ্টির জন্য ভারত সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, তিনিই তার অক্টোবরে লেখা ‘অপস্ প্ল্যানে’ ব্রিগেডগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করে সিলেটের চা-বাগানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন গেরিলাযুদ্ধ চালানোর জন্য। ফলে আমাদের দিক থেকে বিভ্রান্তি কম ছিল না।

অক্টোবরে ইন্দিরা গান্ধীর সীমান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর নভেম্বরের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্ত যুদ্ধে নেমে পড়ে। কামালপুর যুদ্ধে তারা বিশাল ক্ষতি স্বীকার করে। চৌগাছায় যুদ্ধ করে। এটা গোটা সীমান্ত ধরে শুরু হয়। একমাত্র সালদা নদী অঞ্চলে যুদ্ধ সম্পর্কে জেনারেল বি এন সরকার বেশ গর্বের সঙ্গে ক্যাপ্টেন গাফফারের প্রশংসা করতেন। জেনারেল সরকার বলতেন, এখানে একটা কাজ হচ্ছে। এগুলো শুনতে ভালো লাগত। সঠিক কমান্ড পেলে আমাদের যোদ্ধারা—বিশেষত নন-কমিশন অফিসাররা আরও অনেক ভালো করতে পারত। তাঁদের ট্রেনিং ভালো, কৌশল ভালো, ভারতীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। অসাধারণ ছিল তাঁদের পারফরম্যান্স। এ সত্ত্বেও দেখা গেল আমাদের ফোর্সেস সীমান্ত অঞ্চলে খুব একটা এগোয়নি। নভেম্বর মাসের মধ্যে আমরা অধিকাংশ জায়গায় এগুলো শুরু করিনি। এই সময়ে সীমান্তে যে ফোর্সেস বিল্ডআপ হচ্ছিল, দেশের ভেতরে সে সময়ে আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা, দেশের ভেতরে সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে ফেলে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনী তখনই অপারগ হয়ে পড়েছিল।

এ কে খন্দকার: এটা ছিল আমাদের যুদ্ধ। বাংলাদেশের যদি একা সামর্থ্য থাকত, তাহলে তো যুদ্ধটা করতে ভারতের প্রয়োজনই ছিল না। আমাদের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না বলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি বিষয়ে ভারতীয়দের সহযোগিতা আমাদের অপরিহার্য ছিল। এমনকি টোটাল প্ল্যানিং আমাদের প্রথম থেকেই করা উচিত ছিল যুগ্মভাবে; কিন্তু সেটা করা হয়নি। যদি যুগ্ম কমান্ড যেটা তাজউদ্দীন আহমদ করলেন, যদি না করা হতো, তাহলে ভারতীয় ফোর্স এককভাবেই সব কৃতিত্ব নিতে পারত। আত্মসমর্পণের যে দলিল, সেই দলিলে কেবল ভারতীয়দের কথাই থাকত। এটাকে ভারতীয়দের বিজয় হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হতো। আমি জানি, ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয়দের পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযোদ্ধারাও একই সঙ্গে এগিয়ে গেছে। আমাদের গেরিলা, সেক্টর ট্রুপস, ব্রিগেডগুলো সমান তালেই যুদ্ধ করে দক্ষতা আর সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছে। বাংলাদেশ, এই যুদ্ধের সমান অংশীদার। কিন্তু জয়েন্ট কমান্ড-সংক্রান্ত লিখিত চুক্তি যদি না হতো, তাহলে আমরা যে এই যুদ্ধজয়ের অংশীদার, দাবিদার—এ কথা প্রমাণ করতে পারতাম না, বলতেও পারতাম না। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জয়েন্ট কমান্ড বিষয়ে ফাইনালি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কর্নেল ওসমানী এটা চাচ্ছেন না, আপনি কী বলেন। আমি পরিষ্কারভাবেই তাঁকে বলেছিলাম যে এটা বাস্তবসম্মত এবং করা উচিত। তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘আমিও মনস্থির করে ফেলেছি, আমি এটা করব।’

জয়েন্ট কমান্ড হলেই যে একজন আরেকজনের সহায়তা নিতেই হবে এমন কোনো কথা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও জয়েন্ট কমান্ড হয়েছিল, যেখানে অন্য সব ফোর্সেসই ছিল আমেরিকান ফোর্সেস কমান্ডের আওতায়। সুতরাং এটা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটা প্রয়োজনের তাগিদে, আমাদের স্বাধীনতার স্বার্থে করতে হয়েছিল। এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে করার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে ধন্যবাদ জানাই। বস্তুত তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। জয়েন্ট কমান্ড হওয়ার ফলেই কিন্তু যে সব কনফিউশন, শুধু কনফিউশন নয়—অনেক জায়গায় ব্যক্তিগত যে সমস্যা, সেটারও অবসান হয় এই জয়েন্ট কমান্ড হওয়ার ফলে। জয়েন্ট কমান্ড বলতে কিন্তু জয়েন্ট প্ল্যানিং, জয়েন্ট অপারেশনকে বোঝায়—যেটা যুদ্ধের শুরুতেই হওয়া উচিত ছিল এবং সেটা আমাদের উদ্যোগেই করা উচিত ছিল। যদি যুদ্ধের শুরুতেই আমরা এটা করতে পারতাম, তাহলে যুদ্ধের ফল আরও ইতিবাচক হতো। ইট বিকামস মাচ মোর এফেক্টিভ। পুরো মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হলে জয়েন্ট কমান্ডের অধীনে সব ফোর্স যাবে বা থাকবে, এটা পৃথিবীর সব যুদ্ধের ইতিহাসেই রয়েছে। এটা আলাদা কোনো বিষয় নয়। কেবল আমাদের বেলায় এটা নতুন একটা কিছু, তাও নয়। এদিক থেকে আমি মনে করি, আমাদের মুজিবনগর সরকার সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছিল। ফলে আত্মসমর্পণটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে নয়, পাকিস্তানিরা আত্মসর্পণ করেছিল ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট কমান্ডের কাছে।

মঈদুল হাসান: একটা কথা আমি যোগ করতে চাই। প্রথম জয়েন্ট কমান্ডের যে সিদ্ধান্ত, সেটা কেবিনেটের কাছে প্লেস করা হয়নি। কারণ, তখন কেবিনেট আর একটা টারময়েলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। অধিকাংশ কেবিনেট সদস্য তখন তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে একটা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে এসে তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্বের আসন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থেকে সরানোর জন্য উদ্যোগ নেন, সেটা সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে। এমন অবস্থায় জয়েন্ট কমান্ড বিষয়টি আর মন্ত্রিসভায় উত্থাপন তিনি করেননি। এখানে ভারতীয়রা কিছুটা সাহায্য করে। অক্টোবরে তাজউদ্দীন জানতেন যে জয়েন্ট কমান্ড বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে কর্নেল ওসমানী এটার ঘোর আপত্তি করবেন। তাই অক্টোবরে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর একক সিদ্ধান্ত দেন জয়েন্ট কমান্ড বিষয়ে। দুই, জয়েন্ট কমান্ড বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত যেটা হয়, সেটা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সম্ভবত ৪ বা ৫ ডিসেম্বর। বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয় এবং মন্ত্রিসভা বিষয়টিতে অনুমোদন দেয়।

সুতরাং এ বিষয়ে একটা পপুলার ধারণার মধ্যেই অসংগতি রয়ে গেছে। প্রথম সিদ্ধান্তটি ছিল অনানুষ্ঠানিক। জয়েন্ট কমান্ড ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশনাল সাপোর্ট এবং দ্বিতীয়টি ফরমাল জয়েন্ট কমান্ড বিটুইন টু আর্মিস অব দ্য কান্ট্রিস।

এ কে খন্দকার: এ বিষয়ে আমি একটি কথা বলতে চাই। জয়েন্ট কমান্ড হ্যাড টু বি অ্যাপ্রোভড বাই বি কেবিনেট। এটা অন্য কোনো রকম অর্থেই হওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বলতে পারতেন তাঁর নিজের ক্ষমতাবলে; কিন্তু এটা করা হয় না। এটা করা হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে উইথ দ্য ডিসিশন অব দ্য কেবিনেট।

গ্রন্থনা: তারা রহমান