default-image

গত অক্টোবরের ১৫ তারিখে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের চত্বরে নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। জানা গেছে, ধর্মব্যবসায়ী সাম্প্রদায়িক সংগঠনের তত্পরতায় ও চাপে এ কাজ করা হয়, যদিও পরে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিল জানান, তাঁরা যে নকশা অনুমোদন করেছিলেন সে নকশা মোতাবেক কাজ না হওয়ায় স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয়।

এ বিষয়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদ অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে আরও একটি ভাস্কর্য, বাংলাদেশ বিমান দপ্তরের সামনে বহুকাল অবস্থানরত ‘বলাকা’ ধর্মের নামে ভাঙার চেষ্টা হয়। এর ফলে ধর্ম ও ভাস্কর্য, রাজনীতি ও ভাস্কর্য এবং গণমাধ্যম হিসেবে ভাস্কর্যের বিভিন্ন দিক প্রভৃতি বিষয়ে নানামুখী আলোচনায় মুখর হয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় দাঁড়িয়েছে, ধর্মব্যবসায়ী সাম্প্রদায়িক শক্তির অপতত্পরতা প্রতিরোধ ও দেশে সুস্থ সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চার পরিবেশ তৈরি করা। এ কথাও পরিষ্কার যে দুর্বল রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর কারণে এই গোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে এবং সরকারের দুর্নীতির কারণে সাধারণ জনগণ অপরাপর সব অধিকারের মতো সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের দেশে ধর্মব্যবসায়ী সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই অংশ। নব্য-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই শক্তিকে পুষ্ট করা হয়। এই গোষ্ঠী একটা ভাড়াটে শক্তি।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রয়োজনে এই শক্তি নাম-ভোল পাল্টিয়ে ফেলে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশার্থে। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এরা বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট একটি অপশক্তি। জঙ্গি ও পশ্চাত্পদ চিন্তায় আচ্ছন্ন। এদের সৃষ্টি করা হয়েছে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে এবং সুস্থ সমাজ বিকাশের ধারা ব্যাহত করার জন্য। ফ্রানকেনস্টাইনের মতো এই শক্তি এর সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যায় কখনো। বিশ্বব্যাপী একদিকে ভোগবাদিতার জয়জয়কার, অপর দিকে নতুন করে ভোগবাদিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় রীতি পালনের আতিশয্য। এই বস্তুবাদী সমাজের মাঝে আধ্যাত্মিকতাকে খুঁজে একদল মানুষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে আর বিত্তবান গোষ্ঠী ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে নিজেদের ভোগবাদিতাকে যৌক্তিকতা দেয়, যেন ইহজাগতিক ভোগবাদিতা পরকালের চিরন্তন সুখের দুয়ার রুদ্ধ না করে। এই বাস্তবতার কারণে সমাজে মৌলবাদী ও জঙ্গি ধ্যান-ধারণার প্রসারের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কেন এবং কিসের ভিত্তিতে জনগণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন করছে এবং যদি সুপরিকল্পিতভাবে এ কাজ হয়ে থাকে তবে কেনই বা সেগুলো রক্ষা করতে পারছে না? জানা গেছে, সরকারি জায়গায়, প্রকারান্তরে জনগণের জায়গায়, ভাস্কর্য নির্মাণের যে প্রক্রিয়া এখন চলছে, তা শুরু হয় সার্ক সম্মেলন কেন্দ্র করে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে তখন একটি ‘বিউটিফিকেশন সেল’ ছিল। সেটাতে সরকারি আমলা ছাড়াও ছিলেন নকশাবিদ, উদ্যানবিদ ও বৃক্ষ বিশারদেরা। সার্ক সম্মেলনের পর সে কমিটি অকার্যকর হয়ে যায়। বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ‘বিউটিফিকেশন সেল’ এই কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

default-image

এর কোনো নীতিমালা নেই এবং পর্যালোচনা কমিটিতে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি বা ব্যক্তি চিহ্নিত কোনো স্থানে ভাস্কর্য বা স্থাপনা নির্মাণের জন্য এই সেলের কাছে প্রস্তাব পাঠায় এবং ডিসিসির কর্মকর্তাদের দ্বারা গঠিত একটি পর্যালোচনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীর সুপারিশে মেয়র ভাস্কর্য নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ভাবনা চলেই আসে গণমাধ্যম (public media) হিসেবে ভাস্কর্যের ভূমিকা, ভাস্কর্যের সংজ্ঞা ও ভাস্কর্যের ব্যাপ্তি নিয়ে। ভাস্কর্য একটি ত্রিমাত্রিক শিল্পমাধ্যম। ভাস্কর্য কঠিন বা নরম উপকরণকে আকার দিয়ে, সমন্বয় করে, কোনো উপকরণ দিয়ে নির্মাণ করে বা তৈরি উপাদান সাজিয়ে গড়া হয়ে থাকে। ভাস্কর্যে উপকরণ ও মাধ্যমের আছে অসীম বৈচিত্র্য। বিশেষ ধরনের কাজের জন্য বিশেষ ধরনের উপকরণ ব্যবহূত হয়। যখন ভাস্কর্য উন্মুক্ত স্থানে স্থাপিত হয় তখন সেটাকে গণশিল্প (public art) বলা হয়। শিল্প জগতে এই কথাটির একটি বিশেষ অর্থ আছে। এ কথা দিয়ে বোঝানো হয় একটি বিশেষ ধারার শিল্পকে। সেটার সঙ্গে যুক্ত হয় একটি সুনির্দিষ্ট স্থান (site specificity), গোষ্ঠীগত সংশ্লিষ্টতা এবং সহযোগিতা। এর সঙ্গে ‘টেকসই’ (sustainability) ধারণাটিও উত্থাপিত হয় নগরের পরিবেশীয় অপূর্ণতার কথা মাথায় রেখে। ‘টেকসই’ ধারণাটির সঙ্গে যুক্ত আছে পরিবেশীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনাসমূহ।

বিজ্ঞাপন
default-image

গণশিল্প হিসেবে নির্মিত ভাস্কর্য সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় যেন প্রাকৃতিক শক্তি ও ধ্বংসকারীদের ক্ষতিকর প্রভাব এগুলোতে কম পড়ে। গণশিল্প মাঝেমধ্যে বিতর্কিত হয়ে থাকে দর্শকের বৈচিত্র্য এবং তাদের মধ্যে শিল্প ও শিল্পের ব্যাকরণ সম্পর্কে পরিচয়ের মাত্রা সমানভাবে থাকে না বলে, জনগণের সম্পদ, অর্থ ও স্থানের সঠিক ব্যবহার এবং জনগণের নিরাপত্তা ও পৌর অবহেলা সম্পর্কিত প্রশ্নের কারণে। অর্থাত্ উন্মুক্ত স্থানে ভাস্কর্য অনুমোদনের জন্য নগর পরিকল্পনাবিদ, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকা বাঞ্ছনীয়। সঠিক স্থান, পরিবেশ, আনুপাতিক মাপ, অর্থ বরাদ্দ এবং সর্বোপরি সঠিক ভাস্কর্যের নকশা অনুমোদন করার কাজটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগরে ভাস্কর্য স্থাপনের একটা প্রধান দিক নাগরিকদের জীবনে রুচিবোধ, নান্দনিকতা ও স্বস্তি আনা, যাতে তারা উন্নততর জীবনবোধ নিয়ে আরও সুন্দর ও কর্মক্ষম জীবন ধারণ করতে পারে এবং জীবনের নিগূঢ় অর্থ সন্ধান করতে পারে শহরের যান্ত্রিকতার মাঝে।

ভাস্কর্যের গণমাধ্যম হিসেবে এবং শিক্ষাদানের উত্কৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে যে গুরুত্ব আছে, তার কারণেই অনাদিকাল থেকে ভাস্কর্য ধর্মীয় এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ওতপ্রোতরূপে জড়িত রাজনীতির কাজে ব্যবহূত হয়ে এসেছে। তাই সব প্রাচীন সভ্যতায় ভাস্কর্য অপরাপর শিল্পমাধ্যমের মতোই, ধর্মের দাস ছিল। ভাস্কর্য পবিত্রতার আধার হয়ে প্রার্থনার বস্তুও হচ্ছে। এর নানাবিধ ব্যবহার দেখা যায়, যেমন কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিকে স্মরণীয় করে রাখা, নাগরিক বা জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে অথবা কেবল আলংকরণ হিসেবেই বৃহদাকারে স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা গৃহাভ্যন্তরে ক্ষুদ্র আকারে।

তবে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ভাস্কর্য এসব ঐতিহ্যিক ভূমিকা পালন করে গেলেও এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে গেছে। এর কারণ ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে শিল্প আর ধর্মের দাস নেই, শিল্প নিজের অস্তিত্ব নিয়েই স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভাস্কর্য আজকাল কদাচিত্ শিল্পবস্তুর বাইরের কোনো অর্থ বোঝাতে চায়, কখনো কোনো বিশেষ আবেগকে ধরে রাখতে চায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর ভাস্কর্য নিজ অস্তিত্বের মাঝেই সফল, এর নির্মাণ প্রক্রিয়া বা কোনো বিশেষ স্থানে (space) একটা শিল্পবস্তুর ক্রিয়াশীলতা অথবা শুধু শিল্পের ধারণাবিষয়ক কোনো মন্তব্য করে থাকে।

অর্থাত্ ধর্মের সঙ্গে ভাস্কর্যের যে সম্পর্ক অতীতে ছিল, তা ছাড়িয়ে ভাস্কর্য বর্তমানকালে স্বাধীন।

এতদসত্ত্বেও ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্যের কারণেই গণমাধ্যম হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব আছে। বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যের সূচনা হয় ১৯৫৬ সালে নভেরা আহমেদের কর্মকাণ্ড দিয়ে। ষাটের দশকে ভাস্কর্যের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও এতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম বিজয়ের পর। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ভাস্কর্যের প্রয়োজন পড়ে। ১৯৭১-এর মুক্তি সংগ্রামে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অনুপ্রেরণা ও সমর্থন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজতান্ত্রিক দেশসমূহের ভাস্কর্যের দ্বারা বিপ্লব, বিদ্রোহের গৌরবগাথা চিত্রণ এ দেশের দেশপ্রেমিক শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে, ফলে সদ্য স্বাধীন স্বদেশের গৌরব এমন ভাস্কর্য দিয়ে তুলে ধরার ইচ্ছা জেগে ওঠে। তা ছাড়া সে যুগ ছিল প্রগতিশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদের যুগ। সমাজতন্ত্রের শক্তিমান অবস্থান দিয়েছিল বিশ্বকে শক্তির ভারসাম্য।

নভেরার ১৯৫৮ সালে তৈরি প্রথম প্রাঙ্গণ ভাস্কর্যের পর আবার ১৯৭২-১৯৭৩ সালে জয়েদবপুর চৌরাস্তায় দেখা গেল আব্দুর রাজ্জাকের নির্মিত ভাস্কর্য ‘মুক্তিযোদ্ধা’। বলাই বাহুল্য, গড়ার ইচ্ছা আর সম্পাদন প্রক্রিয়ার মাঝে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। পাশ্চাত্য শিল্পের নব্য-ধ্রুপদী বা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার রীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে চেয়েছে শিল্পীরা কিন্তু স্বদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে এই ধারার ভাস্কর্যের দূরত্ব, ভাস্কর্যের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজে ভাস্কর্য শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, ভাস্কর্যের ভাষা ও উপাদান সম্পর্কীয় জ্ঞানের অভাব অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য এবং ফলাফলের বাস্তবতার মধ্যে এনেছে ব্যবধান। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এতদসত্ত্বেও জাতীয় ঐক্য ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করেছে। যেমন আব্দুল্লাহ খালিদের ‘অপরাজেয় বাংলা’। বাংলাদেশের বহু স্থানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরভাস্বর রাখার উদ্দেশ্যে। সবই যে শিল্পী বা স্থপতি দ্বারা নির্মিত হয়েছে তা নয় এবং সবগুলোতে সমান শিল্পমান বজায় থেকেছে তা-ও নয়। সাধারণ জনগণ প্রকাশ রেখেছে তাদের অনুভূতিকে তাদের মতো করেই। সব ভাস্কর্যই মানবমূর্তি সংবলিতও নয়। নানা প্রতীক দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের গৌরব আর নানান তথ্য রূপায়িত করা হয়েছে। অনস্বীকার্য যে অতীতের ভালোমন্দ মিলিয়েই তৈরি হয়েছে আজকের বাস্তবতা। ভবিষ্যেক শুভ, সুন্দর ও সত্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বর্তমানের ওপর। চলমান গণশিল্পের ধারা যেন অর্থবহ হয়, তার জন্য জনগণ ও রাষ্ট্রের এখনই সচেতন হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন