default-image

তেজগাঁও বিমানবন্দর (ঢাকা), ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা। প্রায় ফাঁকা এয়ারপোর্ট। আজ এয়ারপোর্টের গেটে ভারতীয় সৈন্যরা বসেছে। যাকে-তাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার সুলতানের সঙ্গে দেখা। গোটা বিমানবন্দর বুঝে নিচ্ছেন তাঁর লোকজনসহ।

একটু পরেই এলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিং। ভারতীয় কোর কমান্ডার। এখন বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান। জেনারেল সগত বললেন, একটু পরেই আমরা কুমিল্লা, সিলেট প্রভৃতি এলাকায় যাব। সঙ্গে আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি, এয়ার ভাইস মার্শাল এনামুল হক এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল ইনামও যাবেন। আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি ফৌজের সব ঘাঁটি আমি ঘুরে দেখতে চাই। ওদেরও সঙ্গে যেতে বলেছি।

আজ সকালে এখানে একটি বাংলা খবরের কাগজ বেরিয়েছে। জেনারেল সিং কাগজটি দেখতে চাইলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় শেখ সাহেবের ছবি। তাঁরই পাশে শ্রীমতী গান্ধীর ছবি। নিচে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের ছবি। জেনারেল ছবিগুলো দেখে বললেন, ভালোই তো কাগজ মনে হচ্ছে, কী লিখছে? আমরা পড়ে পড়ে সব শোনালাম। জেনারেলকে দেখালাম তাঁরও ছবি রয়েছে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে। জেনারেল কাগজটি আমাদের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন।

বিজ্ঞাপন

আধা ঘণ্টার মধ্যে আর একটি গাড়িতে এলেন নিয়াজি, ইনামুল হক ও ইনাম। তাঁরা নেমেই জেনারেল সগত সিংকে স্যালুট করলেন। জেনারেল সিং সবার সঙ্গে করমর্দন করলেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকও এসে হাজির হয়েছেন। তাঁরা কলকাতা ফিরে যেতে চান।

জেনারেল সিং জানালেন, ‘আশা করি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতার সঙ্গে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তখন আপনাদের যাতায়াতে অসুবিধা হবে না।’

আমরা জেনারেল নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এখন বক্তব্য কী?

জেনারেল নিয়াজি বললেন, কী আর বলব বলুন।

একজন বিদেশি সাংবাদিক জানতে চাইলেন, কবে পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছেন?

নিয়াজি করুণ হাসি হেসে বললেন, এখন তো আর আমার হাতে নয়!

জেনারেল নিয়াজি আমাদের কাছে জানতে চাইলেন, আপনারা কোন ভারতীয় সংবাদপত্রের লোক?

বললাম।

জানতে চাইলেন, কবে এসেছেন এবং কীভাবে?

বললাম, আপনার আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের আগে।

একজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার জেনারেল নিয়াজিকে দিয়ে পাঁচ টাকার পাকিস্তানি নোটে সই করিয়ে নিলেন। আমার কাছে বাতিল পাকিস্তানি একটি ১০০ টাকার নোট ছিল। নিয়াজিকে বললাম, সই করে দেবেন?

জেনারেল বললেন, কিন্তু এ তো ১০০ টাকার নোট।

আমি বললাম, হ্যাঁ। তবে বাতিল ১০০ টাকার নোট। আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছে।

নিয়াজি হেসে বললেন, আমিও তো বাতিল হয়ে গিয়েছি।

অন্য সঙ্গী তখন একটু দূরে সরে গিয়েছে। আমি নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বলেছিলেন কিছুতেই আত্মসমর্পণ করবেন না। করলেন কেন শেষ পর্যন্ত?

নিয়াজি বলতে যাচ্ছিলেন, দেখ, ভাইসব হাম তো জরুর ও বাত বোল থা। যে কিনা...।

হঠাৎ জেনারেল সগত সিং এগিয়ে এসে নিয়াজিকে বললেন, ইউ সি লাস্ট ওয়ার্নিং। আই মেট লায়লা।

নিয়াজি এগিয়ে গেলেন বললেন, রিয়েলি! কোথায়? আমার প্রশ্নের জবাব আর পেলাম না। দুই জেনারেল অন্য আলোচনায় চলে গেলেন।

ইনামকে প্রশ্ন এবং ইনাম সেই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ইউ সি। তোমাদের সেনাবাহিনী অনেক বড় ছিল। তোমাদের বিমানবাহিনীও। এই লড়াইয়ে জয় সম্ভব নয়!

ইনামুল হককে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এয়ারফোর্স এত চট করে খতম হয়ে গেল কেন?

এয়ার ভাইস মার্শাল বললেন, তোমাদের বাহিনী অনেক বড়। তার সঙ্গে আমার দুই স্কোয়াড্রন পারবে কেন?

বিজ্ঞাপন

রিয়ার অ্যাডমিরাল বললেন, তার চেয়েও বড় অসুবিধা কার্যত আমাদের একটিমাত্র বিমানবন্দর থেকে অপারেট করতে হয়েছে। এভাবে বিমানযুদ্ধ চালানো যায় না। তোমাদের এয়ারফোর্স দক্ষ এবং অনেক বড়। তা ছাড়া ওদের বাহিনী অনেক বড়।

হঠাৎ বিমানবন্দরের পেছন দিক থেকে মেশিনগানের গুলির আওয়াজ এল। একসঙ্গে অনেকগুলো। একটু থামল। আবার একঝাঁক গুলি। আমরা সবাই শেল্টার নিলাম। কিছু গুলি ছুটে এল বিমানবন্দরের টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের ভেতরে। আমাদের জওয়ানেরাও জিপে করে এবং দৌড়ে ছুটে গেল। মেশিনগান রাইফেলসহ। যেদিক থেকে গুলি আসছিল সেদিকে।

আমি নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার সৈন্যরা আত্মসমর্পণের পরও গুলি চালাচ্ছে কেন?

নিয়াজি বললেন, এরা ঠিক আমার ফোর্স বলে মনে হয় না। তবে কিছু লোক এখনো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। তারা খবরই জানে না। তারা এসব করতে পারে। কী করব বলুন।

একটু পরেই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ডাকোটা এসে নামল। এলেন ভারতীয় বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কিছু লোক। বিমানবন্দরে তখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীরও কিছু লোক এসেছেন।

সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে নামলেন। ভারতীয় বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন সিংকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তিনজন পাইলট তুলে ধরে কিছুক্ষণ সোল্লাসে ঘোরালেন। সবাই একসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিলেন।

জেনারেল সিং এখন নিয়াজি, ইনামুল হক ও ইনামকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জেনারেলদের নিয়ে যাওয়ার হেলিকপ্টার তখনো আসেনি।

একটু দূরেই হাজার খানেক বাঙালি জড়ো হয়েছেন। তাঁরা চিৎকার করলেন, নিয়াজি খুনি। নিয়াজিকে খুন করো। নিয়াজিকে পালাতে দিয়ো না।

জেনারেল সগত সিং ওদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের জওয়ানেরা উত্তেজিত জনতাকে ঠেলে রাখার চেষ্টা করছে। এখন সকাল সোয়া ১০টা।

আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১