default-image

এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে গণহত্যার তুলনামূলক গবেষণায় বাংলাদেশের গণহত্যা বেশ স্বল্পই পরিচিত। ব্যাপারটা আমিসহ আরও বেশ কয়েকজন আমাদের মতো করে প্রতিবিধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশ্বের প্রেক্ষাপটে সে সময়ে বাংলাদেশের যে অবস্থান, এই পুরো ব্যাপারটাই আসলে এ দেশটির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও অন্যান্য হস্তক্ষেপের কারণে তা ঘটে থাকতে পারে।

এত কিছুর পরও তুলনামূলক বিচারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা বিশ শতকের অন্যতম ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক গণহত্যাগুলোর একটি। ৩০ লাখ মানুষ সেই গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। কল্যাণ চৌধুরীর জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই পড়ে আমার ধারণা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বাঙালি নিধনের সঙ্গে আধুনিক সময়ের বেশ কিছু নৃশংসতার মিল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অটোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টান নিধন, চীনে জাপানি হত্যাযজ্ঞ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ব ইউরোপে নাৎসিদের হত্যাযজ্ঞ। ১৯৭১ সালে গণহত্যার মাত্রা ও হত্যাযজ্ঞের পদ্ধতিগত চরিত্র ও ধ্বংসযজ্ঞ যেকোনো বিচারেই শ্বাসরুদ্ধকর।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের অন্যান্য গণহত্যার পেছনে যে ধরনের জাতি, গোত্র ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ইন্ধন জুগিয়েছে, ঠিক তেমনি কারণেই একইভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের হত্যা করা হয়েছিল। আমরা যদি এই গণহত্যার শিকড়ের সন্ধান করি, তাহলে এর কিছু আদর্শগত ভিত্তি পরিষ্কারভাবেই আমাদের চোখে পড়বে। পাকিস্তানি জেনারেলরা চিরদিনই বাঙালিদের নিচু চোখে দেখত। এমনকি তাদের দৃষ্টিতে বাঙালিরা ছিল মনুষ্যত্বের জাতি। পাকিস্তানি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিই বাঙালিদের ‘নিচু ভূমির নিচু জাতের মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

তবে আদর্শগত বা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের বিষয়টি দিয়ে গণহত্যার বিস্তার অনেক সময় বোঝানো যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেও গণহত্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। যে তরফ থেকে গণহত্যা সংঘটিত হয়, সেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও পরিস্থিতিকে যারা হুমকি মনে করে, বিশেষ করে তারা এর শিকার হয়। বাংলাদেশের গণহত্যার ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি পুরোপুরি দৃশ্যমান। বাংলাদেশে মানুষের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডের প্রত্যাশাকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হয়েছিল। একই সঙ্গে বাঙালিদের উত্থানকে সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানি ‘এলিট’ শ্রেণিও হুমকির চোখে দেখেছিল।

যেকোনো গণহত্যাকে সবার মধ্যে একধরনের বিচারবুদ্ধিহীন ব্যাপার হিসেবে চিত্রিত করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা ছিল পুরোপুরি ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে করা। সে পরিকল্পনার জন্ম পশ্চিম পাকিস্তানি এলিট ও তাদের পূর্ব পাকিস্তানি দোসরদের মাথা থেকে, যারা ক্ষমতার বলয়ে নিজেদের কর্তৃত্বের ভিত মজবুত করতে চেয়েছিল। তারা নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় মুছে ফেলে।

১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের কতটুকু পূর্বপরিকল্পিত ছিল, এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে এই হত্যাযজ্ঞে যে ধরনের ভয়ানক ভীতির সঞ্চার করা হয়েছে, হত্যাযজ্ঞের কারণে যে পরিমাণ মানুষকে ভিটেছাড়া করা হয়েছে, তাতে বাঙালি প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা খুবই স্পষ্ট।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা সংঘটনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এগিয়েছিল একটি বিশেষ কৌশল নিয়ে। এই গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল তিন ধরনের শ্রেণিকে ১. বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও এলিট শ্রেণি, ২. বাঙালি রাজনৈতিক নেতারা এবং ৩. পুরুষ শ্রেণি।

বিজ্ঞাপন

বাঙালি জাতির শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যাঁরা মননে ও চিন্তায় বাঙালি জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, পাকিস্তানি জান্তা সংগত কারণেই তাঁদের হত্যার পরিকল্পনা করে। কেবল বুদ্ধিজীবী শ্রেণিই নন, পাকিস্তানি জান্তার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক, এমনকি ক্রীড়াবিদেরাও। মোট কথা, যাঁরাই ভাবনা ও চিন্তায় বাঙালি পরিচয় ও সংস্কৃতির ধারক ছিলেন, তাঁদেরই পাইকারি হারে হত্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী ও বাঙালিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদেরও হত্যার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল। কেবল আওয়ামী লীগেরই নয়, বাঙালিদের অধিকারের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থনকারী যেকোনো রাজনৈতিক কর্মীই ছিলেন ১৯৭১ সালে সামরিক জান্তার লক্ষ্যবস্তু।

বেছে বেছে বাঙালি পুরুষ ও বালকদের হত্যা করার পেছনেও পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানিদের। যেহেতু বাঙালি এলিট শ্রেণি, সামরিক সদস্য ও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবেই বেশি, তাই নির্দিষ্ট করে আলাদা আলাদাভাবে কাউকে লক্ষ্য না বানিয়ে পাইকারি হারে পুরুষদের হত্যা করার মধ্য দিয়েই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিল।

বিভিন্ন সাহিত্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আরও একটি লিঙ্গভিত্তিক কৌশলের ব্যাপার উঠে এসেছে। সেটা হলো বাঙালি নারীদের ধর্ষণের বিষয়টি। ধর্ষণের পর নারীকে হত্যাও লিঙ্গভিত্তিক ঘৃণা ও ধর্ষণের অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। ধর্ষণের উদ্দেশ্য কেবল একজন নারীকে শারীরিকভাবে আঘাত করাই নয়, এটা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বন্ধনের ভিত্তিমূলেও চরম আঘাত। এই আঘাতটা মূলত করা হয় ধর্ষণের জন্য নারীকে আলাদা করেই। পুরুষকেও এর মধ্য দিয়ে অপমান করার একটা প্রবণতা থাকে। একটি গোষ্ঠীর নারীকুলকে ধর্ষণের মধ্য দিয়ে সেই গোষ্ঠীর পুরুষদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে তারা ‘তাদের’ সমাজের মেয়েদের অবমাননার হাত থেকে বাঁচাতে কতটাই না অপারগ। সে কারণে অজস্র ধর্ষিতা নারী এবং নিঃস্ব ও রিক্ত বিধবারা গণহত্যা-পরবর্তী বাংলাদেশের বিশেষ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। যেকোনো গণহত্যার ক্ষেত্রেই একে দুঃসহ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রবার্ট পেইন তাঁর ম্যাসাকার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা তরুণ সেনাসদস্যদের রক্ত বা মাথা গরম করা ব্যাপারস্যাপার ছিল না। এটি ছিল একেবারে উচ্চপর্যায় থেকে পরিকল্পিত ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কেতাদুরস্ত কর্মকর্তারা, যাঁরা ১৯৭১ সালের নয় মাস কোনো না কোনো সময় বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই এই গণহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তাঁরা প্রত্যেকেই জানতেন, তাঁরা আসলে কী করছেন। অশিক্ষিত সৈনিক, অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত জেসিও ও এনসিওদের ওই অফিসাররাই ব্রিফ করতেন যে এখানে তাঁরা যা কিছু করবেন (হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ) তা সবই পাকিস্তানের জন্য।

আগেই বলা হয়েছে যে এই নিধনযজ্ঞ উৎসারিত হয়েছে মূলত বাঙালি-বিদ্বেষ থেকে। জেনারেল নিয়াজি জুনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকে বাঙালিদের অভিহিত করতেন ‘ইঁদুর’ ও ‘মুরগি’ হিসেবে। একজন শিক্ষিত ও এলিট ব্যক্তির মুখে এ ধরনের জাতি-বিদ্বেষমূলক মন্তব্য থেকে জুনিয়ররা বাঙালি মারার উদ্দীপনা খুঁজে নিত।

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম জোনসের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ দেওয়া বক্তৃতার অংশবিশেষ অনুবাদ করেছেন নাইর ইকবাল

বিজ্ঞাপন