default-image

২৫ মার্চ, ১৯৭১। যেমন ধারণা করেছিলাম রাতের পরিস্থিতি তেমনই রূপ নিল। আগে থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে পাকিস্তানিরা সামরিক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। এ নিয়ে উত্তেজনাও ছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে যারা আলোচনা চালাচ্ছিলেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আমার। সেই সময় এ গুজবও রটে গেল যে জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা ভেঙে গেছে। অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কি না দেখতে শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়ার জন্য বেরোলাম। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসতে হলো। চারদিকে ঝড়ের আগের সেই গুমোট, দমবন্ধ করা পরিস্থিতি।

আমার বাসার পাশেই থাকতেন মার্কিন কনস্যুলেটের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারি। ওই রাতে তার বাসায় দারুণ হৈচৈ, যেন বিরাট লোকজন নিয়ে পার্টি চলছিল। এদিকে মাঝরাতে নিউমার্কেটের দিকে গুড়গুড় শব্দে ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ এগিয়ে যেতে লাগল পাক বাহিনী। ধানমন্ডিতে আমার পাশের বাসার ছাদ থেকে সবকিছু সঙ্ষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এত রাতে কী ঘটছে জানার জন্য টেলিফোন করতে গিয়ে দেখি সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় আমার প্রতিবেশী, ওই মার্কিন ফার্স্ট সেক্রেটারির বাসায় গেলাম। দেখি তার ফোনেরও একই অবস্থা। তখন তার কাছেই জানতে চাইলাম কী উপলক্ষে তার বাসায় এত লোক। অনেক মার্কিনি সপরিবারে উপস্থিত। উনি বললেন, তার এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি ছিল, মাঝরাত পর্যন্ত হৈচৈ হয়েছে, তাই ওরা রাতটা এখানে থেকে গেছেন। কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম এই ভেবে যে, একজন মাঝবয়সী লোকের জন্মদিনে বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাকাচ্চা থেকে শুরু করে কোলের শিশু পর্যন্ত আসবে কেন?

সব দেখেশুনে মনে হচ্ছিল, এই কঠোর সামরিক ব্যবস্থার ব্যাপারে পাকিস্তানিরা আগেই মার্কিনিদের সতর্ক করে দিয়েছিল। যে কারণে তারা সবাই একটা নিরাপদ বাসায় আশ্রয় নিতে পেরেছিল।

পরের দিন আমার এক ছাত্র এল। সে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে আমার আত্মগোপন করা উচিত। শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার বহুদিনের ঘনিষ্ঠতা, গণঅভ্যুত্থানের সময় আমার সক্রিয় সহযোগিতার কথা আর্মির লোকরা ভালোমতোই জানে। সুতরাং তারা যে আমাকে খুঁজতে আসবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম।

সে কারণে পরামর্শ পাওয়ার পর ওইদিনই আত্মগোপন করলাম।

বিজ্ঞাপন

আমার নির্বাসনের শুরু

দেশের মধ্যে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর আমি ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারত অভিমুখে উদ্বাস্তু স্রোত চলতে শুরু করেছে। আমার ওই ছাত্রই পালানোর সব ব্যবস্থা করেছিল। এ সময় আমার সঙ্গী ছিলেন একজন হিন্দু চিত্রকর ও একজন মুসলমান ব্যবসায়ী। আর আমাদের গাইড ছিলেন স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক। রাস্তাঘাট সবই তার নখদর্পণে। তবে পালানোর শেষ পর্যায়ে আমাদের গাইড ছিলেন একজন পেশাদার চোরাচালানি। সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলার মতো সব পথই তার জানা ছিল।

এই পালানোর সময়কার তিনটি ঘটনা আমার মনে গেঁথে আছে। প্রথম, গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা গ্রামবাসীর দারুণ আতিথেয়তা পেয়েছি। পেয়েছি সাহায্যও। দ্বিতীয় ঘটনার কথা মনে হলে বুঝতে পারি আমাদের যাত্রা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় টহলরত পাক সৈন্য ও তাদের দোসরদের হাতে আমরা ধরা পড়তে পারতাম, খুন হতে পারতাম। বিশেষ করে নরসিংদীতে।

নরসিংদীতে ইপিআরের একটা চৌকি ছিল। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদস্যরা আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। সে কারণে পাকিস্তান বিমানবাহিনী তাদের ওপর বোমা ফেলছিল, আমরা এটা ঠিক ধরতে পারিনি। আসলে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে আমরা একরকম বিধ্বস্ত ছিলাম। সে কারণে যথাসময়ে নদীর ঘাটে পৌঁছনোর জন্য আমরা বাস ধরলাম। মাত্র কয়েক মাইল পথ। কিন্তু কিছুদূর যেতেই বাসের তেল শেষ। অগত্যা রিকশায় চড়ে বসলাম। কিছুদূর এগোতেই দেখলাম কয়েকটা প্লেন নদীর ঘাটের দিক থেকে ফিরে আসছে। তখনও আমরা চিন্তা করতে পারছি না যে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে ছিল। কথা ছিল, নদীর ঘাটে এক গুদামের কাছে আমরা জড়ো হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করব। পৌঁছে দেখলাম, পাকিস্তানি প্লেন দোকান ও গুদামগুলোর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। আমাদের যে গুদামের কাছে জড়ো হওয়ার কথা ছিল সেটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এখানে গুদাম বলে কিছু ছিল। মারাও গেছে অনেকে। ভাগ্যিস নদীর ঘাটে পৌঁছতে আমাদের দেরি হয়েছিল, তা না হলে ওই হতভাগ্যদের দলে আমরাও থাকতে পারতাম।

তিন নম্বর ঘটনাটা ঘটল যাত্রার একেবারে শেষ পর্যায়ে। সীমান্ত পার হওয়ার আগের রাতটা আমরা এক গ্রাম্য মাতব্বরের বাড়িতে ছিলাম। তিনি যেমন ধনবান তেমন প্রভাবশালী। তার বাড়ির চারদিকে ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র ভর্তি, যার কারণে আমার মনের শান্তি উধাও হয়ে গিয়েছিল। তবে গৃহস্থ হিসেবে তিনি খুবই ভালো। চমত্কার আতিথেয়তা, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার। প্রাণের ভয়ে আমরা ভারতে যাচ্ছি এ কারণে আমাদের প্রতি তার একটা সহানুভূতি ছিল। শান্তিকামী মানুষ হিসেবে তিনি এসব গোলমাল, সহিংসতায় ভীষণ অশান্তিতে ছিলেন। এসবের জন্য তার চাষবাস, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভীষণ ক্ষতি হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তার ছেলেটাও। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তিনি তার ছেলেকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, রাজনীতি থেকে নিজেকে বিরত না রাখলে তাকে বাড়ি থেকে দূর করে দেবেন। কারণ তার ধারণা, রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানিদের নজর পড়বে। এতে করে তার পুরো পরিবার গভীর বিপদে পড়ে যাবে। এর পাশাপাশি তিনি এও জানতে উত্সুক ছিলেন যে, ১৯৪৭-এ দেশত্যাগী হিন্দুদের আমরা স্বাধীন দেশে ফিরে আসতে দেব কি না। বিশেষ করে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতায় যখন স্বাধীনতা আসবে। তখন আমরা তাকে এই বলে আশ্বস্ত করলাম, এমন কোনো চিন্তা আমাদের মনে ঠাঁই পায়নি।

পরে আমাদের গাইড জানাল, আমাদের গৃহকর্তার বেশির ভাগ সমিত্তর মালিক ছিল দেশত্যাগী হিন্দুরা। দেশ ভাগের সময় বিনা পয়সায় এসব দখল করেছেন তিনি। এখন তিনি এই ভয়ে ভীত যে, ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্য নিয়ে প্রকৃত মালিকরা যদি ফিরে এসে তাদের সমিত্তর দাবি করে তাহলে তো ছেড়ে দিতেই হবে। আমাদের বেশ মজা লাগল এই ভেবে যে, আগামী একটা দিন কীভাবে বাঁচব এ নিয়ে আমরা চিন্তিত, আর এ রকম সময়ে একটা লোক স্বাধীন দেশে নিজের ব্যক্তিগত সহায়-সমিত্ত কীভাবে আক্রান্ত হতে পারে তার কথা ভাবছে।

সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের পর ত্রিপুরার রাজ্যের রাজধানী আগরতলার উদ্দেশে যাওয়ার আগে আমাদের বিএসএফ সদস্যদের কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হলো।

সময়টা ১৯৭১-এর এপ্রিলের প্রথম দিক। আগরতলায় আগে এসে পৌঁছনো আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের সহযোগীদের ত্রিপুরার এমএলএ হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের নেতা এম আর সিদ্দিকী, পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের অফিসার মাহবুবুল আলম চাষী। এরা দুজনই আমার পূর্ব পরিচিত। এমএলএ হোস্টেলে আমি জায়গা পেলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতার সহযোগিতায় আমি ও আমার সহযাত্রীরা ত্রিপুরার এক আইনজীবীর বাসায় আশ্রয় পেলাম। আমাদের সঙ্গে একই বাসায় ছিলেন তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। অন্যদের এড়িয়ে চলতেন। দেখে মনে হতো অন্যদের চেয়ে বেশ আরামেই আছেন। এই কষ্টের মধ্যে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য তার প্রতি আমরা ঈর্ষান্বিত ছিলাম। সাধারণভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়, তবে কেউ এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয়।

কলকাতাগামী প্লেনের বেশির ভাগ সিট বরাদ্দ ছিল দেশত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য। অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও একটা সিট না পাওয়ায় ত্রিপুরার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দ্বারস্থ হলাম। আমার পরিচয় পেয়ে তিনি বললেন, আগরতলায় চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে দিল্লি/বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমি আরো অনেক কিছু করতে পারি।

কলকাতায় আমি একজন মুসলমান ব্যারিস্টারের বাসায় উঠলাম। তিনি আমাকে বললেন, কলকাতার মুসলমানরা সাধারণভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। ভারতীয় মুসলমানরা পাকিস্তান সৃষ্টির যৌক্তিকতায় বিশ্বাস করে। তারা মনে করে, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে একটা ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টর। তারা মনে করে, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের উচিত পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব সমস্যা মিটিয়ে নেওয়া।

তবে ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমঙ্রদায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। সাংস্কৃতিক নৈকট্য ও একই ভাষাভাষী হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গে তাদের মধ্যে একটা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ভারতের বাদবাকি অংশেও আমাদের দাবির সপক্ষে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছিল। বিশেষ করে ১৯৭০-এর প্রথম দিকে বাংলাদেশের ঘটনাবলি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়দের একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণায় বিশ্বাসী করে তুলেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মুসলমানদের যুদ্ধ ঘোষণাই প্রমাণ করেছিল যে তারাই সঠিক। আর তারা শুধু আমাদের দুঃখ-দুর্দশা, যন্ত্রণার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না, আমাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে সাহায্য করতেও আগ্রহী ছিল।

বিজ্ঞাপন

ভারতের সাধারণ মানুষের অভিমত এ ধরনের থাকলেও ভারত সরকার ছিল অত্যন্ত সতর্ক। বাংলাদেশকে সরাসরি সমর্থন করার আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা দিক বিবেচনা করতে হয়েছিল সরকারকে। তবে কৌশল নির্ধারণের বিষয়টিও চলছিল গোপনে।

কলকাতা থেকে অমর্ত্য সেনের সঙ্গী হয়ে দিল্লি গেলাম। সেখানে পৌঁছে আমি অশোক মিত্রর বাসায় গেলাম। অশোক মিত্র তখন ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষুদ্র পরামর্শদাতা গোষ্ঠীরও সদস্য। এই গোষ্ঠীর অন্য সদস্যরা ছিলেন ডি পি ধর, পি এন হাকসার, পি এন ধর ও এস চক্রবর্তী। এই সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও ভবিষ্যত্ সমের্ক তাদের ব্রিফিং করার জরুরি দরকার ছিল। তাজউদ্দীন ও তার সহকর্মীরা বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ও মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত ছিলেন। আমিও এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেলাম।

১৯৭১-এর এপ্রিল মাসের প্রথম দিনগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের গভীরতা ও তীব্রতা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক চলছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারত যে সমর্থন জানাবে এমন কোনো আশ্বাস তখনো মেলেনি। প্রথমত, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কত দূর তুলে ধরতে পারবে তা নিয়ে আশঙ্কা ছিলই। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের সাহায্য দিলে তা ভারতের মতো গরিব দেশের অর্থনীতিতে কি চাপ সৃষ্টি করবে সেটি নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। বোঝাই যায়, অগ্রপশ্চাত্ বিবেচনা না করে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে ভারত শঙ্কিত ছিল। তৃতীয়ত, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানত যে অন্য দেশের বিভাজনে উত্সাহ যোগানো বা অংশ নেওয়াটা কখনই আন্তর্জাতিক সমঙ্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, চতুর্থত, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেই একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও এলাকা আছে যারা স্বাধীনতা চায়। কারণ তারা নিজেদের অসুখী ও অত্যাচারিত বলে মনে করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এ রকম একাধিক গোষ্ঠী আছে। প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায়ও তামিলদের মধ্যে এ ধরনের ক্ষোভ আছে। সে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাদের জন্য নজির সৃষ্টি করতে পারে। পারে এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে। পঞ্চমত, যদিও চিরশত্রু পাকিস্তানকে ভারত দুর্বল করে দিতে পারবে, তারপরও যুদ্ধের পরিনাম সব সময়ই অনিশ্চিত। সব সময় এর মধ্যে অজানা অনেক ঝুঁকি থেকে যায়। এমনকি ভারতের সাহায্যে বাংলাদেশ যদি এই যুদ্ধে জিতেও যায় তারপরও এ নিশ্চয়তা নেই যে স্বাধীন বাংলাদেশ দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত হবে না বা ভারতের প্রতি অবন্ধুসুলভ হবে না। ষষ্ঠত, নির্বাসিত বাংলাদেশ নেতৃত্বের প্রতি সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ সমর্থন দিলে পরাশক্তিরা বিষয়টিকে কীভাবে নেবে তা নিয়ে ভারত সরকার উদ্বিগ্ন ছিল। এ ধরনের কোনো সাহায্য বা ভারতের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র বা চীন যে ভালোভাবে নেবে না তা জানা কথা। আর বাদবাকি বিশ্বও বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটের ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। তাদের অনেকেই পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে যাওয়ার পক্ষে ওকালতি করছিল।

আমি মূলত আলোচনা করতাম অশোক মিত্র ও পি এন ধরের সঙ্গে। ধরকে আমি হার্ভার্ড থেকে চিনতাম। তা ছাড়া সচিব হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পি এন ধরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। যথেষ্ট আস্থাভাজনও ছিলেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি, ভারতের ভূমিকা-এসব ছাড়াও তিনি আমার কাছে জানতে চাইতেন, আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীন বা সিদ্দিকীর অবস্থান কী? আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবের প্রতিনিধি হিসেবে কি তাদের গ্রহণ করা উচিত ভারত সরকারের? আমি জানতাম, ভারতের গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্রে তিনি অনেক তথ্য পেয়েছেন। এমনকি আমি কখনো জানতে বা বলতে পারি, এমন তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি কিছু তিনি জানেন। তারপরও এ ধরনের পরিস্থিতিতে এটা খুবই সাধারণ ঘটনা যে তিনি সব সূত্র থেকে যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করছেন। সেগুলো পরীক্ষা করছেন, অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।

দিল্লিতে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আমার সঙ্ষ্ট ধারণা হলো যে পাক সেনার হামলার আগে শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের কোনো দূতের মাধ্যমে। সে কারণে বাংলাদেশকে সাহায্য করার ব্যাপারে ভারতের কোনো তাত্ক্ষণিক পরিকল্পনাও ছিল না। তাজউদ্দীন ও তার সহযোগীরা ভারতে পৌঁছনোর পর দলের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে তারা যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম তাও প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে।

বিদেশে বাংলাদেশের দাবি উত্থাপন

দিল্লিতে উপস্থিত বাংলাদেশী বন্ধু ও সহকর্মীদের এবং ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে বিদেশের মাটিতে আমি আমার পরিচিতদের মাধ্যমে লবিং করব। আর শেখ মুজিব ও গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে এই কাজটি আমি অন্যদের চেয়ে ভালোভাবে করতে পারব। তবে বিদেশে গেলে আমি আমার পরিবার-পরিজনের খবর ঠিকমতো পাব কি না এই ভেবে উত্কণ্ঠিত ছিলাম। এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা ত্যাগের পর তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না আমার।

১৯৭১-এ এপ্রিলের শেষ দিকে আমি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছলাম। সেখানে ইয়েল ইকনোমিক গ্রোথ সেন্টারে কাজ নিলাম। দেখলাম কাজটি গবেষণা সংক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে সমর্থন আদায় ও লবিংয়ের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সময় পাব। বাংলাদেশ যুদ্ধ সমের্ক বিশ্ব সমঙ্রদায়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল যে এটা একটা দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এমনকি বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন বা গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটার পরও। এ ছাড়া ছিল পাকিস্তানের শক্তিশালী প্রচারণা। বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনকে তারা ভারতের প্ররোচনায় পাকিস্তানকে ভাগ করার প্রয়াস বলে প্রচার চালাত। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের মূল লক্ষ্যই হলো, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মানুষকে এ ব্যাপারে সজাগ এবং জনমত গঠন করা, যেন তাদের সরকার জনমতের চাপে কাজ করতে বাধ্য হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা জোর দিয়েছিলাম, সংবাদ মাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের কাছে বাংলাদেশের ঘটনাবলি তুলে ধরতে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ।

আমার প্রথম কাজই হলো নিউইয়র্কের ফোর্ড ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা। সংস্থার সর্বোচ্চ পদাধিকারী দীর্ঘদিন দক্ষিণ এশিয়া ও পিআইডিইর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আর সে সময় পিআইডিইর পরিচালক ছিলাম আমি। তাছাড়া ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ম্যাক জর্জ বান্ডি তখনকার মার্কিন প্রশাসনের একজন অপরিহার্য ব্যক্তি। তিনি প্রেসিডেন্ট কেনেডির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। কাজ করেছেন প্রেসিডেন্ট জনসনের সঙ্গেও। ডেমোক্র্যাট দলের রথী-মহারথী, নিক্সন প্রশাসনের আমলাকুল ও টেকনোক্র্যাটদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমর্ঙ্ক ছিল তার। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পাকিস্তান আবার বিশ্বব্যাংকের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।

default-image

বান্ডির সঙ্গে সাক্ষাত্ করে বুঝলাম, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বশেষ ঘটনাবলি সমের্ক বেশ ভালোই পরিচিত এবং বাংলাদেশের সংকটের কারণ সমের্কও তাকে ভালোভাবে অবহিত করা হয়েছে। শেখ মুজিব ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গণআন্দোলনের সঙ্গে আমার সমঙ্ৃক্ততার কথা তাকে জানানো হয়েছিল। সাক্ষাত্কালে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণাবলি, অভিজ্ঞতা ও কমিটমেন্ট নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব জানতে চাইলেন। পাক সেনাদের বর্বরতার ব্যাপারে তিনি সত্যিই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার মনে হয়েছিল, এইড কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক পাকিস্তানের ব্যাপারে কিছু করতে পারে। কারণ পাকিস্তানের অর্থনীতির নাজুক অবস্থা। সে কারণে আমাকে তিনি দ্রুত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারার সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দিলেন। আমার সামনেই ফোন করলেন ম্যাকনামারাকে।

এরপর দ্রুত আমি ম্যাকনামারার সঙ্গে দেখা করলাম। আমি তার অফিসে গিয়ে দেখি তার হাতে প্রশ্নের এক বিরাট তালিকা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বর্তমান সংকটের কারণ সমির্কত সব প্রশ্ন। রাজনৈতিক ক্ষমতায়, বেসামরিক প্রশাসনে, সামরিক বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ এত সীমিত কেন? পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি কেমন? এর জন্য কোন নীতি দায়ী? আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো কী কী? ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলোচনা কী অবস্থায় ছিল? নির্বাচনের ফলকে সম্মান জানাল না কেন? পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র নেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া আর কী বিকল্প ছিল পাকিস্তানের? এ রকম আরো কত প্রশ্ন!

আমাদের আলোচনা থেকে তিনি ব্যাপক নোট করলেন। আলোচনায় তথ্যের সঙ্গে ছিল পর্যাপ্ত পরিসংখ্যান ও প্রমাণ। সৌভাগ্যক্রমে বিগত কয়েক বছর ধরে আমি অর্থনীতির পরিমাণগত বিশ্লেষণ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমের্কর রাজনৈতিক দিক নিয়ে কাজ করছিলাম। তা ছাড়া কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় যুক্ত থাকার কারণে সব জিনিস আমার মুখস্থ ছিল। তাই তার ক্রমাগত ক্রস একজামিনের সময় আমার বিশেষ অসুবিধা হয়নি। শেষে তিনি আমাকে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বললেন এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলে তাকে জানাতে বললেন। বোধ করি তারই স্বার্থে।

পরের দিনগুলোতে আমি বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার কারগিল, দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক গ্রেগ ভোটাও, ডেস্ক অফিসার মাইকেল ওয়েনসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুললাম। এদের মধ্যে ওয়েন আবার পাকিস্তান ডেস্কের অফিসার হিসেবে বাংলাদেশ দেখতেন। এই সময় বিশ্বব্যাংকে একজন ভারতীয় কর্মকর্তা ছিলেন, নাম ড. এস আর সেন। ইনি আসলে পূর্ববঙ্গেরই লোক। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের সময় পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ম্যাকনামারার সঙ্গে তার খুব ভালো সমর্ঙ্ক ছিল। এ সময় বাংলাদেশ-পাকিস্তান সমস্যায় বিশ্বব্যাংকের ওপর কী প্রভাব পড়ছে সে ব্যাপারে তিনি আমাকে ও আমার সহযোগীদের সব সময় অবগত রাখতেন।

ইউএসএইডের কাজটা ছিল আরো কঠিন। বাংলাদেশের দাবির প্রতি নিক্সন প্রশাসনের মনোভাব বৈরী। এখানকার উচ্চপদস্থ কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তাই ধরলাম, আমার এক সাবেক সহকর্মীকে। যদিও আমি আগেই ভালোমতো জানতাম যে ইউএস এইড উপপ্রশাসক মরিস উইলিয়ামসও সহকারী প্রশাসক আর্নেস্ট স্টার্ন-দুজনেরই পাকিস্তানে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। পরে আরো জানতে পারলাম, পাকিস্তানের মাধ্যমে কিসিঞ্জারের গোপন চীন সফরের সময় উইলিয়ামস তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। আমি তাদের দুজনকেই পাকিস্তানকে দেওয়া সাহায্যের ব্যাপারে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে পূর্ব পাকিস্তানে যে ধরনের বর্বরতা চলছে তাতে বেসামরিক সাহায্যও পেতে পারে না পাকিস্তান।

বিজ্ঞাপন

সব কিছু শুনে উইলিয়ামস বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে নিপীড়নের মাত্রা যাতে কমে সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়ার ওপর প্রভাব খাটাতে পারে। তারপরও অর্থনৈতিক সাহায্যের অর্থই হচ্ছে মানবিক ত্রাণ এবং তা অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। স্টার্ন ব্যক্তিগতভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন বাংলাদেশের প্রতি। তিনি নিজে ইহুদি। হিটলারের গণহত্যার কবল থেকে বেঁচে আসা পরিবারের সদস্য স্টার্ন অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বললেন যে পাকিস্তানকে দেওয়া হচ্ছে মূলত মানবিক সাহায্য। এর মধ্যে আছে খাদ্য ও অবকাঠামো নির্মাণসামগ্রী। এসব জিনিস যাতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করা হয় সেদিকে কড়া নজর রাখা হবে। কিন্তু বাস্তবিকই নজর রাখার কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেই। তিনি এটা মেনে নিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থে যে রকম তাতে কোনো সাহায্য, প্রকল্প নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যে সাহায্যই পাঠানো হোক না কেন তা শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে কাজে লাগানো হবে-আমার এই যৌক্তিক উপসংহার মানতে তিনি আদৌ আগ্রহী ছিলেন না।

ডেমোক্র্যাট দলের ও মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে লবিংয়ের জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ লোককে পেয়ে গেলাম। ইনি হলেন চেস্টার বাউলস, এক সময় ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। নিউ হেভেনে তার বিলাসবহুল বাসভবনে আমি মাঝে মাঝে যেতাম এবং বাংলাদেশ সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতাম। সেসব সংবাদ তিনি আবার তার বন্ধুদের, মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসে তার পরিচিতদের জানাতেন এবং পাকিস্তানের ওপর হোয়াইট হাউস কী প্রভাব খাটাতে পারে সে ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। পার্কিনসন্স রোগ নিয়েও তিনি এসেছিলেন শুধু সদ্যোজাত দেশটিকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে কী সাহায্য করতে পারেন তা দেখার জন্য।

এ ব্যাপারে চেস্টার বাউলস যোগ দিয়েছিলেন হার্ভার্ডের অর্থনীতির বিশিষ্ট অধ্যাপক জন কেনেথ গলব্রেথের সঙ্গে। গলব্রেথ আবার নিক্সন প্রশাসনের পাকিস্তান নীতির কট্টর সমালোচক। বুদ্ধিজীবী মহলে তারা দুজন খুবই সোচ্চার ছিলেন এবং সংবাদ মাধ্যমে নিজেদের অভিমত জোরালো ভাষায় প্রকাশ করতেন। বিশেষ করে গলব্রেথ। সুনাম থাকার কারণে তার অভিমত সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেত। তিনি লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের নৃশংস দমন-পীড়ন এবং সে কারণে লাখ লাখ উদ্বাস্তুর অনুপ্রবেশ-এমতাবস্থায় ভারতের পক্ষে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকাটা একেবারেই অবাস্তব চিন্তা। এসব কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভারতের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন, সহানুভূতি সে দেশের সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এমতাবস্থায় শেখ মুজিবের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর প্রভাব খাটানো উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। আর তা না হলে ভারতের হস্তক্ষেপ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক প্রকার নিশ্চিত।

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঠিক নীতি সমের্ক তাদের বক্তব্য ছিল এই এলাকার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা। পাকিস্তানের বর্তমান গণহত্যার নীতির প্রতি নিক্সনের সমর্থন অদূরদর্শী ও ভুল। তারা ভুল ঘোড়ার ওপর বাজি ধরেছে, এমন একটা অস্থিতিশীল সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে যারা জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদকে পুরোদস্তুর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছে। আর অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যত শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে ভারত তত সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে শুধু এই পাকিস্তানকে মোকাবিলার জন্য। চীনের সঙ্গে সমের্কর নতুন দ্বার খুলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। ফলস্বরূপ একদিকে ভারত-সোভিয়েত অক্ষ যেমন তৈরি হয়েছে তেমনি অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান অক্ষের জন্ম দিয়েছে। মধ্যে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বেড়েছে। আর বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ অবশ্যাম্ভাবী হওয়ায় ভারতের সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আরো অস্ত্র সংগ্রহ করতে হতে পারে। বাউলস-গলব্রেথের বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের দিকে তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গণতান্ত্রিক ভারতকে সমর্থন করা। ভারত সম্ভাবনাময় বিরাট অর্থনৈতিক শক্তি, কোনো পরাশক্তির ঘনিষ্ঠ নয়। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার চেয়ে তার চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সমর্ঙ্ক ঘনিষ্ঠ করা।

গলব্রেথের বক্তব্য ছিল, সামরিক শক্তির নিরিখে না হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশের সপক্ষে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল মার্কিন সংবাদ মাধ্যম। ’৭১ জুড়ে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরসহ সমস্ত মার্কিন বড় পত্রিকায় পাকিস্তানি বর্বরতার খবর বিস্তারিত বেরিয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলোও বর্বরতার সচিত্র প্রমাণ হাজির করেছে দর্শকদের সামনে।

যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষকসমাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষেই সমর্থন জানিয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য আমি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় সফর করলাম। বাংলাদেশের পক্ষে কংগ্রেস সদস্যদের প্রভাবিত করতে তাদের সাহায্য চাইলাম। এ ছাড়া আমি নিয়মিত ইস্টকোস্টের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতাম। সেখানে বাংলাদেশ ছাত্রদের একাধিক গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। আর এই উপমহাদেশে কাটিয়ে গেছেন এমন মার্কিন বুদ্ধিজীবীরা তীক্ষ নজর রাখছিলেন বাংলাদেশের ঘটনাবলির ওপর। তাদের সমর্থন ও সহানুভূতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি। এ ছাড়া স্ট্যানফোর্ড, বার্কলে, ইয়েল ও হার্ভার্ডের মতো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যারা পিআইডিইর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাও এগিয়ে এসেছিলেন। এদের মতামতকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে মার্কিন শিক্ষকসমাজের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ খুব কাজে দিয়েছিল। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপকসহ একাধিক শিক্ষক বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তনের জন্য নিক্সনকে খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। এটা ছিল সেখানকার তত্কালীন বাংলাদেশীদের বড় সাফল্য।

এ ব্যাপারে আরো অনেক ঘটনার কথা উল্লেখ করার মতো। তার মধ্যে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় গ্রুপের বাংলাদেশ বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ও মার্কিন প্রশাসনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই সেমিনারের অংশ নিয়েছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞই এই প্রশ্ন তুললেন যে ঐতিহাসিক নিষেঙ্ষণ ও পাকিস্তানিদের বর্তমান বর্বরতার বিরুদ্ধে আমাদের নীতিহীন কাজকর্ম কি আমাদের পাকিস্তানি উত্তপ্ত কড়াই থেকে ভারতীয় অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবে না? আমরা এই যুক্তির তীব্র প্রতিবাদ করলাম। বললাম, তৃতীয় বিকল্পের কথা, মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা কেন ভাবা হচ্ছে না। ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম ও যুদ্ধের সময় মানুষের আত্মবলিদান প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার জন্য আমরা আরো চড়া মূল্য দিতে রাজি ছিলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে তার অর্থনীতি পরিচালনার মতো দক্ষতা আছে কি না, বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলার মতো ক্ষমতা আছে কি না এসব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আমরা তখন বারবার বলেছি তাদের এ অনুমান ভুল। এসব প্রশ্ন একেবারেই অযৌক্তিক।

এডওয়ার্ড ম্যাসন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির ব্যাপারে মার্কিন সরকার ও বেসরকারি মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শদাতা। তিনি বহুবার পাকিস্তান সফর করেছেন। পাকিস্তানের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সে কারণে পাকিস্তানের সংকট সমের্ক তার একটা সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল। ১৯৭১-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তার সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো। তার ধারণাই ছিল, বাংলাদেশ সম্ভবত স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। ম্যাসন চিন্তিত ছিলেন এই ভেবে যে, আমরা একটা স্বাধীন দেশ চালাতে পারব কি না। আমাদের কি সেই মানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আছে? প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস আছে? তার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিচয় ছিল না। তবে বিশেষ করে শেখ মুজিব ও তার সহযোগীদের প্রশাসনিক ও নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাবের বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। কারণ পাকিস্তানে তাদের এ ধরনের দায়িত্ব পালনের কখনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। জনচিত্তজয়ী নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের বাংলাদেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করা এবং যেকোনো বিপদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মতো তার সাহসকে ম্যাসন সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন। তবে স্বাধীন দেশ পরিচালনায় তার দক্ষতার ব্যাপারে ম্যাসন নিশ্চিত ছিলেন না। পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে তার এ ধরনের ধারণা গড়ে উঠছিল। পাকিস্তানে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ, পাকিস্তানি আমলারা ছিলেন তার তথ্য সরবরাহকারী।

ম্যাসনের তোলা প্রশ্নগুলোর সঙ্গে সহমত পোষণ করলাম আমি। বাস্তবিকই বেশির ভাগ নতুন স্বাধীন দেশকে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। রাজনীতিবিদদের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কাজকর্মের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা সামান্যই থাকে। শেখ মুজিবও এই সমস্যা সমের্ক সচেতন ছিলেন। তিনি যেকোনো কারোর-সরকারের বাইরে বা ভেতরে যা-ই হোক না কেন-দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা মূল্য দিতে ইতস্তত করতেন না। প্রয়োজন পড়লে বিদেশ থেকেও বিশেষজ্ঞের মতামত নিতেন।

আমরা যখন লবিংয়ে ব্যস্ত সে সময় পাকিস্তানও প্রচার চালাতে বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী প্রতিনিধিদল পাঠাল। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল এসব দেশের জনমতকে প্রভাবিত করা। এ রকম এক প্রতিনিধিদলে পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাকিস্তানের দোসর শিক্ষকদের নেওয়া হয়েছিল। বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যে বর্বরতা চালিয়েছে তা ধামাচাপা দিতে ওই দলের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করলেন। ওই দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার কয়েকজন সহকর্মী ছিলেন এবং তারা আমার খুবই পরিচিত। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে গোনা কয়েকজন অধ্যাপককে দাওয়াত দিলেন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানালেন, পাক সেনারা মাত্র জনাকয়েক বুদ্ধিজীবীকে টার্গেট করেছিল। কারণ তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে এর কোনো সমর্ঙ্ক নেই। সবকিছু নিরুপদ্রবে চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে।

মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধু বানানো গেল না। তারা বিভিন্ন সূত্রে বিষয়টি খুব ভালো রকম জানতেন। আরেকটা বিষয়ও রটে গিয়েছিল যে, ঢাকার মার্কিন কন্স্যুলেটের একদল কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসের অন্ধ পাকিস্তান নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। এ জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত এনে ভর্ত্সনা করা হয়েছিল।

পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্যরা তোতাপাখির মতো সরকারের শেখানো বুলি আওড়ে গেছেন। আমার পরিচিত এক মার্কিন অধ্যাপক আমার নাম উল্লেখ করে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, জীবনের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর পর আমি এখন কোন ক্যাটাগরিতে পড়ি? জবাবে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছিলেন, একজন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক হিসেবে আমার জীবনের ওপর আদৌ কোনো বিপদ নেই। আসলে আমি গুজব ও ভারতের মিথ্যা প্রচারে অযথা প্রভাবিত ও ভীত হয়ে পড়েছি। এখন আমার ফিরে না যাওয়ার ও স্বাভাবিক জীবন যাপন না করার কারণ নেই।

এসব কথাবার্তা যখন হচ্ছে, কামাল হোসেন তখন মামলার কাজে পাকিস্তানে। সে সময় সামরিক ট্রাইব্যুনালে ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে যে আমার বাসায় প্রায় প্রতি রাতে যে মিটিং বসত এবং যেখানে তিনিও উপস্থিত থাকতেন সেসব মিটিংয়ে কী আলোচনা হতো? সামরিক বাহিনীর মতে, ওই মিটিংগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা আঁটা হতো। বাস্তবিকই ওই দিনগুলোতে শেখ মুজিবের পরামর্শদাতা হিসেবে আমরা ’৭১-এর মার্চের আইন অমান্য আন্দোলন পরিচালনা করছিলাম। আমার এক শ্যালক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে তখন ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত। আমার সঙ্গে তার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাত্ হতো। ২৫ মার্চের রাতে সামরিক দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর তাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমার দেশদ্রোহী কাজকর্ম এবং তাতে তার যুক্ত থাকার সম্ভাবনা সমের্ক তাকে জেরা করা হলো। তার ওপর অত্যাচার করা হলো।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়োগ ছিল অল্প দিনের। তাই বেশিদিনের জন্য কোথাও যোগ দেওয়া যায় কি না তার সন্ধান করতে লাগলাম। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে বিশ্বব্যাংকে আমার কয়েকবার যাওয়া হয়ে গেছে। সেখানে হোলিস চেনেরির সঙ্গে দেখা। তিনি তখন বিশ্বব্যাংকের ইকনোমিকস ডিপার্টমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ব্যাংকে ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার নামে একটা বিভাগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন তিনি। জানতে চাইলেন, এই বিভাগের পরিচালক হিসেবে আমি কাজ করতে আগ্রহী কি না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে আমার সমঙ্ৃক্ততার কথা তিনি জানতেন। সে জন্য তিনি নিজেই বললেন যে, আমাদের স্বপ্ন যদি পূরণ হয় এবং আমি যদি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই তাহলেও কোনো সমস্যা হবে না।

চূড়ান্ত নিয়োগের আগে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা আমার ইন্টারভিউ নিলেন। এরপর আমি আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র গ্রহণ করলাম। ঠিক হলো, ১৯৭১-এর শেষের দিকে আমি ব্যাংকের কাজে যোগ দেব।

কিন্তু যা অনুমান করেছিলাম তা-ই। ব্যাংকের পাকিস্তানি একজন নির্বাহী পরিচালক আমার নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানালেন। তিনি যুক্তি দেখালেন, আমি একজন পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত। সে কারণে ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু ম্যাকনামারা সঙ্ষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘এ ধরনের পেশাদার লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো একটি সদস্য দেশের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। আর আমি যত দূর জানি, প্রার্থী কোনো অপরাধী কাজের জন্য কখনো দোষী সাব্যস্ত হননি।’ এ সময় পাকিস্তানের অর্থনীতির দৈন্যদশা প্রকট হয়ে উঠেছিল। সে কারণে দেশটি বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পেতে ব্যাকুল ছিল। সেসব মিলিয়ে নিয়োগ নিয়ে ম্যাকনামারার প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা ঠিক হবে না বলেই ওই পাকিস্তানি কর্মকর্তার মনে হয়েছিল। ফলে আমার নিয়োগ নিষ্কণ্টক হয়।

বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের জন্য বিশ্বকে এটা দেখানোর দরকার হয়ে পড়ল যে, বিদেশেও বাংলাদেশী অফিসারদের আনুগত্য হারিয়েছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আমরা কয়েকজন বিভিন্ন দূতাবাসে বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। ১৯৭১-এর এপ্রিলে কলকাতার পাক উপ-দূতাবাসের বাংলাদেশী কর্মকর্তারা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করলেন। বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের পাকিস্তানির পক্ষ ত্যাগের ঘটনাকে বিপুলভাবে স্বাগত জানানো হয়। সেই সঙ্গে ভারতের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়াও শুরু হয়। এর সঙ্গে এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজনৈতিক-সচেতন রাজ্যে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি ও কোটি কোটি উদ্বাস্তুর চাপের কারণে বাংলাদেশের সমর্থনে ভারতকে সামরিক পদক্ষেপ নিতেই হবে। আর এ জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য লাগবে ভারতের। এ সময়ই ভারত-সোভিয়েত বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই পরিস্থিতিতে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠলাম।

১৯৭১-এর জুলাই-আগস্টে মুজিবনগর সরকার ওয়াশিংটনে একটি লিয়াজোঁ অফিস খোলে। এমআর সিদ্দিকী হন এর প্রধান। এদিকে ১৯৭১-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পাকিস্তানের জন্য বার্ষিক ব্যাংক ফান্ড মিটিং হওয়ার কথা ওয়াশিংটনে। সব দাতা দেশের অর্থমন্ত্রীরা মিটিংয়ে যোগ দেবেন। আমরা বাংলাদেশীরা যেকোনোভাবে দাতা দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাব বলে ঠিক করলাম। পাশাপাশি পাকিস্তানকে দেওয়া সাহায্য আটকাতে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাব বলেও ঠিক হলো। ১৯৭১-এর মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংকের মিশন পাকিস্তান কনসোর্টিয়ামে জানিয়ে দেয় যে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করায় সে দেশে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানো অসম্ভব। ফলে পাকিস্তানকে দেওয়া নতুন সাহায্য পুনঃপরীক্ষার কাজ শুরু হলো। আমাদের লক্ষ্য হলো তাদের এটা বোঝানো যে, পুনঃপরীক্ষা ছাড়া এবং পাকিস্তানকে দেওয়া যেকোনো সহায়তা, এমনকি পূর্ব প্রতিশ্রুত কোনো অর্থ দেওয়া হলে পাকিস্তান তা নিপীড়নের কাজে ব্যবহার করবে। আর দাতা দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত বর্বরতা সমের্ক খুব কমই জানতেন। তাদের এ ব্যাপারে জানানো ও আপডেট করার দরকার ছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার এত দিনকার বন্ধু ও সহযোগীদের কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব ছিল। আর বিশ্বব্যাংকের যেসব অফিসারের সঙ্গে এত দিন ধরে আমাদের সমর্ঙ্ক গড়ে উঠেছিল, তারাই দাতা দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের দেখা করিয়ে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দাতা দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও নর্ডিক দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আমাদের প্রতি সহানুভূতি ছিল। কিন্তু দেশগুলো নিজেরা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিতে পারছিল না। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় স্তরে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সমর্ঙ্ক ছিল। কিন্তু জনমতের চাপ থাকার জন্য তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে একসঙ্গে কাজ করতে চাইছিলেন।

জাপান পাকিস্তানের অন্যতম বড় দাতা দেশ। আবার বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। জাপান বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। ১৯৭১-এর গোড়ার দিকে আমি জাপান গিয়েছিলাম। জাপানে আমার বন্ধু সাবারু ওকিতা প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ, জাপানের বৈদেশিক সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাকিস্তানে কী ঘটছে তা আমি তাকে সব জানালাম। জাপান সফরের সময় বামঘেঁষা শিগেতু তসুরুর মতো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তাদের কাছে বাংলাদেশের বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে দেখিয়েছিলাম বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চাপা দিতে কীভাবে বৈদেশিক সাহায্য কাজে লাগানো হচ্ছে। জাপানের প্রভাবশালী দৈনিক আশাহি শিম্বুনে আমার সাক্ষাত্কার ছাপার ব্যবস্থা করেছিলেন তারা।

এদিকে কলকাতা থেকে বহু দূরে থাকা সত্ত্বেও আমি জানতে পেরেছিলাম যে, মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাকের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, তবে তা গুরুতর নয়। এর মধ্যে কিছুদিন পর পর যুক্তরাষ্ট্রে, বিশ্বব্যাংকে, আইএমএফে কী হচ্ছে তা আমি তাজউদ্দীনকে লিখে জানাতাম। সেখানে কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছি, তার প্রভাবই বা কী, তাও তাকে লিখতাম। ব্যক্তিগত এসব চিঠি ছিল শুধু তার দেখার জন্য। আর এটা নিশ্চিত করতে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে তার হাতে পৌঁছে দেওয়া হতো চিঠিগুলো। আমি এগুলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাকের সহযোগী মাহবুবুল আলম চাষীর কাছে পাঠাতাম এবং অনুরোধ করতাম তাজউদ্দীনকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। একই সময়ে আমি চাষীকেও দু-একবার চিঠি লিখেছি। তিনি জবাবও দিয়েছেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে চাষী আমার চিঠিগুলো তাজউদ্দীনকে পৌঁছে দেন। কিন্তু আমি কখনো তাজউদ্দীনের কাছ থেকে জবাব পাইনি। ধরে নিয়েছিলাম তিনি খুবই ব্যস্ত। জবাব দেওয়ার সময় নেই। আর তিনি যদি কিছু বলেন তাহলে মেসেজ হিসেবে বা চাষীর চিঠির মাধ্যমে তা জানতে পারব। প্রবাসী সরকারের ব্যাপারে আমি খোঁজখবর রাখতাম। কলকাতা ঘুরে যেসব বন্ধু-বান্ধব যেতেন তাদের কাছে খবর পেতাম। জানতে পারতাম প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অনৈক্যের কথা। তবে আমি বুঝতে পারিনি চাষী মোশতাক গ্রুপের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, সে আমার সঙ্গে তাজউদ্দীনের যোগাযোগ ছিন্ন করতে পারে।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এ সময় উত্তেজনার পাশাপাশি বাড়ছিল প্রত্যাশাও। জাতিসংঘেও এ নিয়ে বিতর্ক চলছিল। ফলে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে আমরা আঠার মতো লেগে ছিলাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত একের পর এক প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে চলেছে। পূর্ব পাকিস্তান ভারতীয় সৈন্যদের দখলে, পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর বিতর্কের সাক্ষী ছিলাম আমরা। জাতিসংঘ প্রস্তাবের কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ছেড়ে ভুট্টোর সেই ঐতিহাসিক নিষ্ক্রমণেরও সাক্ষী আমরা। তার কন্যা বেনজির সে সময় হার্ভার্ডের স্নাতক স্তরের ছাত্রী। সেও আমাদের সঙ্গে তার বাবার এই নাটুকেপনার সাক্ষী ছিল। পরদিনের পত্রিকায় এ ঘটনা বেশ ফলাও লেখা হয়েছিল। আর বিশ্ব সমঙ্রদায়ের সঙ্গে বাবার এই অভাবিত আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল বেনজির। তিনি তখন মেয়েকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন, মাঝে-মধ্যে এমনও সময় আসে যখন এ ধরনের আচরণ করতে হয়, যা দেখে অন্যরা মনে করতে পারে লোকটা ছিটগ্রস্ত বা নাটক করছে।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর, আত্মসমর্পণ করল পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী। একটি নতুন জাতির অভ্যুদয় ঘটল। যার নেতা তখনো পাকিস্তানে বন্দি। শেষ পর্যন্ত আমাদের অধিকাংশের আশা পূরণ হলো। শেষ হলো রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পরিবেশ গরম থাকতেই আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে স্থান করে নিল বাংলাদেশ। সেই সময়ের যেসব ঘটনার জন্য বিচার ও ট্রাইব্যুনাল হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল, সেগুলো দৃশ্যপটে ছিল না। যা পেয়েছি তাতেই আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম।