default-image

পি এন হাকসারের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ ঘটে ১৯৭১ সালের ৩০ মে, দিল্লির ৯ নম্বর রেসকোর্স রোডে তাঁর বাসভবনে। দিনটি ছিল রোববার। বাংলাদেশ সমের্ক ভারতের পলিসি কী তা জানার চেষ্টায় আমার দিল্লি পৌঁছার পাঁচ দিন পর।

কেন আমি দিল্লি অবধি গিয়েছিলাম সে সম্বন্ধে সম্ভবত কিছু পটভূমি জানানো প্রয়োজন। মে মাসের তিন তারিখ পর্যন্ত আমি ঢাকায় ছিলাম, প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনে সহায়তা করার জন্য ছোট্ট একটা গ্রুপের সঙ্গে কাজ করছিলাম। এপ্রিলের শেষ নাগাদ দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়লে আমাদের গ্রুপের কাজকর্মের জন্য একটা অর্থবহ লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রবাসী সরকারের বয়স তখন মাত্র দুই সপ্তাহ। সে সরকার দেশের ভেতর সশস্ত্র প্রতিরোধের অধোগতি রোধ করতে পারবে কি না, স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুকূলে বহির্বিশ্বের যথেষ্ট সাহায্য ও সমর্থন জোগাড় করতে সক্ষম হবে কি না এবং আমাদের গ্রুপের কাছ থেকে সরকারের নির্দিষ্ট কোনো সহায়তার প্রয়োজন হবে কি না-এ বিষয়গুলো জানা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই উদ্দেশে আমি আগরতলা পৌঁছাই এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করে কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকায় ফেরার আশা নিয়ে কলকাতা যাই। ১২ মে তারিখে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়। তিনি তখন দ্বিতীয়বারের মতো দিল্লি সফর শেষে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে কলকাতা ফিরেছেন। সেদিন ও তার পরদিন তার সঙ্গে আমার আলোচনা হয় দীর্ঘ সময় ধরে; তিনি ঢাকার পরিস্থিতি খুঁটিনাটিসহ জানতে চান। ঢাকায় এবং দেশের অন্যত্র কোথায় কী ঘটেছে, পরিস্থিতির মূল্যায়ন কোন মহলে কীভাবে করা হচ্ছে এবং ঘটনা প্রবাহ কোনো দিকে মোড় নিতে পারে তা জানতে চান। প্রসঙ্গত, আমাকে তিনিও জানালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে তিনি কতটা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাজের অগ্রগতি কতখানি ঘটেছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অন্তর্দলীয় বিভেদসহ কয়েকটি পীড়াদায়ক সমস্যার কথাও তিনি সর্ঙ্শ করে যান, যেগুলো যুদ্ধ প্রস্তুতিকে ব্যাহত করছিল। তবে সামগ্রিক বিচারে পরিস্থিতি অগ্রগতির দিকেই এগোচ্ছে বলে তিনি বলেন। বিশদ কিছু না বলে তিনি জানান, দেশের ভেতর সশস্ত্র তত্পরতার এক নতুন পর্যায় শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। এতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তিনি তা জানতে চান।

বিজ্ঞাপন

১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হওয়ার পর থেকে ঢাকার পাকিস্তানি মহলে এমন ধারণা গড়ে উঠছিল যে, পরবর্তী পর্যায়ে ভারতের সহযোগিতাপুষ্ট বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি পাকিস্তানে বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে ওঠে, তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করেই পাকিস্তানকে সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের যতটা মিত্রতা ছিল, ভারতের সে রকম কোনো মিত্র ছিল না। উত্তর-পূর্বে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্তগুলো ছিল নাজুক। একই সঙ্গে তিনটি ফ্রন্টে অর্থাত্ পূর্ব ও পশ্চিমে পাকিস্তানের সঙ্গে আর উত্তর-পূর্বে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করার সামরিক সামর্থ্য ভারতের ছিল বলে মনে করা হতো না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করতে গিয়ে পাকিস্তানের সহ্যসীমা অতিক্রম করে ভারত কি নিজের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এত বড় ঝুঁকি নিতে যাবে? আমার এই প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন স্বীকার করেন এ রকম একটা সমস্যা রয়েছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে ভারত কি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাস্তব সহায়তা লাভ করতে পারবে, যাদের বিশাল বাহিনী মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে চীনের বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধাবস্থায় মোতায়েন ছিল কয়েক বছর ধরেই? এ বিষয়ে তাজউদ্দীনের বলার কিছু ছিল না। নাকি বাংলাদেশে থেকে দলে দলে শরণার্থীরা যেভাবে ভারতে প্রবেশ করছিল, যা সে সময় নাগাদ ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, সেটা ভারত আরো বাড়তে দেবে এবং শেষ অবধি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সঙ্গে একটা আপসরফা মেনে নিতে বাধ্য হবে? অবশেষে তাজউদ্দীন আমাকে বলেন, ‘আপনি দিল্লি যান, এই সব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করুন।’

সে কাজের জন্য বেশ কয়েকটি বৈঠকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং তার ফলে আমার ঢাকা ফেরার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হয়। সে মুহূর্তে মাত্র একটি বিকল্পই আমাদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল, সেটা ছিল পাকিস্তানকে সহযোগিতা প্রদান থেকে চীনকে বিরত রাখার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের একটা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা। কিন্তু ভারত কি জোটনিরপেক্ষতার আদর্শ ছেড়ে রাজি হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে? আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গ্রহণযোগ্যতা কি কিছু বাড়াতে পারি, এমনকি যদি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনদানকারী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করে? আলোচনার এ পর্যায়ে তাজউদ্দীন বলেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি এন হাকসারের সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ করা উচিত। এ মর্মে তিনি দিল্লিতে হাকসারকে একটা বার্তা পাঠাতে চান। আমি জানতে চাই, কেন নির্দিষ্ট করে হাকসারের সঙ্গেই সাক্ষাত্ করা প্রয়োজন। আমি প্রশ্ন করি এ জন্য যে, শুনেছিলাম তার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমাদের মন্ত্রিসভার সদস্যদের এক বৈঠকে মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে পি এন হাকসার তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। আমার প্রশ্নের উত্তরে তাজউদ্দীন বলেন যে, ভারত সরকার বাংলাদেশ প্রশ্নে অত্যন্ত জটিল কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছেন, যেগুলো বুঝে ওঠারও কোনো চেষ্টা আমাদের মধ্যে নেই; আর তা ছাড়া বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোনো প্রস্তাব নিয়ে সামনে এগোনোর আগে ভারতীয় মহলে সর্বপ্রথম যাকে বোঝানো ও স্বপক্ষে আনা প্রয়োজন সেই প্রধান সমন্বয়কারী ব্যক্তিটি হচ্ছেন পি এন হাকসার। আমি তাজউদ্দীনকে বলি যে, হাসকারের সঙ্গে সাক্ষাত্ নিশ্চয়ই করব, কিন্তু কিছু পরে, তার আগে আমার নিজেরই সবিস্তারে জেনে ওঠা প্রয়োজন বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় সরকারের অনুসৃত পলিসি কী, আর কী ধরনের চাপের মধ্যে তারা রয়েছেন।

২৪ মে সকালে দিল্লিগামী উড়োজাহাজে আমার পাশের আসনে ছিলেন অধ্যাপক ড্যানিয়েল থর্নার; তিনি ১৯৭১ সালে ফোর্ড স্কলার হিসেবে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন এবং দুঃসময়ে তার সহায়ক ভূমিকার জন্য তিনি আমার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র কদিন আগে তিনি ঢাকা থেকে করাচি ও ব্যাংকক হয়ে কলকাতা এসে পৌঁছান। আমার দিল্লি যাওয়ার উদ্দেশ্য সমের্ক কিছু না জেনেও থর্নার নিজে থেকেই আমাকে কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলেন যে, বিকাশমান পরিস্থিতির প্রতি ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা কীভাবে সাড়া দিচ্ছেন তা জানতে হলে আমার ওইসব ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করা প্রয়োজন। তিনি যখন ওই ব্যক্তিদের মধ্যে পি এন হাকসারের নাম বলেন তখন আমি জানতে চাই তিনি তাকে যথেষ্ট জানেন কি না। নিশ্চয়ই, থর্নার বলেন, ভালোভাবেই তিনি হাকসারকে জানেন, সেই ১৯৩৯ সাল থেকে, যখন তারা দুজন এবং কৃষ্ণ মেনন ও শেলভাঙ্কর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগোয়া গাওয়ার স্ট্রিটে ঘুরে বেড়াতেন আর ইউরোপে ফ্যাসিবাদের ঘনায়মান মেঘের পটভূমিতে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন। সেইসব স্বপ্নের স্মৃতি থেকে বর্তমানে ফিরে এসে থর্নার বলেন, আমি যদি হাকসারের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে চাই তাহলে শিগগিরই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা সম্ভব। সেই সকালে ড্যানিয়েলের সবচেয়ে উদার প্রস্তাবটি ছিল নয়াদিল্লিতে তিনি যেখানে আতিথ্য গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, সেখানে তার সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণ। আধঘণ্টা পর দিল্লি বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সংগ্রহের জায়গায় থর্নার আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর আমন্ত্রণকর্তা ড. অশোক মিত্রের সঙ্গে, যিনি তখন ভারতের অর্থমন্ত্রকের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। ডক্টর মিত্র ছিলেন জ্ঞানী ও নীতিনিষ্ঠ, অচিরেই দিল্লির ক্ষমতাকেন্দ্রের বিভিন্ন মহলে আমার পথ অন্বেষণে যার মতামতকে আমি গুরুত্ব দিতে শুরু করি এবং যার লোধি এস্টেটের বাড়ির দরজা সব সময় আমার জন্য খোলা থাকত।

নয়াদিল্লির রাজনৈতিক উত্তাপ আঁচ করার জন্য সেই সকালে আমি হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা অফিসে যাওয়া মনস্থ করি। ড্যানিয়েল থর্নারও স্বেচ্ছায় আমার সঙ্গ নিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমরা সেখানে সমঙ্াদক বি জি ভার্গিজকে পেয়ে যাই। তার সঙ্গে আমার বা থর্নারের আগে কখনো দেখা হয়নি। শুরুতেই তাকে আলোচনায় প্ররোচিত করার জন্য প্রশ্ন করি : বাংলাদেশ নিয়ে উচ্ছ্বাস তো নিঃশেষিত প্রায়, এরপর কী? ভার্গিজও জবাব দিলেন খোলামেলাভাবে। ভারতের সামনে অনুসরণ করার মতো আর যেসব বিকল্প পলিসি ছিল তা নিয়ে এক প্রস্থ অমীমাংসিত আলোচনার পর ভার্গিজ পরদিন এক নৈশ্যভোজে আমাদের নিমন্ত্রণ করেন, যেখানে বাংলাদেশ সমের্ক ভারতীয় পলিসি বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ হবে।

পরদিন সকালে পূর্বনির্ধারিত এক কর্মসূচি অনুযায়ী আমি সিপিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে যাই। সেখানে চলমান পরিস্থিতি সমের্ক কমরেড ভূপেশ গুপ্ত ও আন্তর্জাতিক সমর্ঙ্কবিষয়ক সমঙ্াদক কমরেড কৃষ্ণাণ-এই দুই সিনিয়র নেতার অভিমত শুনি। তারা মনে করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষে অনুসৃত ভারতীয় নীতির বিরুদ্ধে সমঙ্রতি এক হুমকি সৃষ্টি হতে শুরু করেছে; ভারত সরকারের মধ্যকার ‘মার্কিনপন্থি লবি’ আমেরিকার মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সঙ্গে একটা রাজনৈতিক আপসরফার জন্য ভারত সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। আমি তাদের মতামত গ্রহণ করি বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে জানতে চাই, ‘রাজনৈতিক আপসরফার’ পক্ষের লবিটি যদি নয়াদিল্লির নীতি পরিবর্তনে ব্যর্থ হয় তাহলে কী হবে? তখন কি পরবর্তী বিকল্প হিসেবে পাকিস্তান সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পথভ্রষ্ট করার প্রয়াস নেবে না? এবং সেজন্য ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চীনকে সামরিক সংঘাতে নামানোর চেষ্টা করবে না? চীন যদি সেরকম ভূমিকায় নামতে প্ররোচিত হয়, তাহলে চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তজুড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে বিশাল সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে তা দিয়ে চীনকে বিরত করার উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টিতে মস্কো সম্মত হবে কি? সিপিআইয়ের দুই প্রধান নেতা জানালেন বিষয়টি তখনো ততদূর গড়ায়নি, যদি ততদূর গড়ায় তাহলে ভারতকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে যথাযথ সহযোগিতা চাইতে হবে। এসব কথাবার্তা থেকে আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তখনো ভারত সে রকম কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

সেদিন সন্ধ্যায় সমঙ্াদক ভার্গিজ টাইমস অব ইন্ডিয়া-র আবাসিক সমঙ্াদক গিরিলাল জেন-এর বাড়িতে বিভিন্ন অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গির কিছু ব্যক্তির কথা শোনার বিরল সুযোগ করে দেন। গিরিলালের সঙ্ষ্ট ও প্রাঞ্জল বক্তব্য থেকে আমি বুঝতে সক্ষম হই যে, ভারতের পরিবর্তমান জনমত অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাহায্য করা নয়, বরং কীভাবে ক্রমবর্ধমান শরণার্থীদের চাপ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সেটাই তখনকার প্রধান সমস্যা। বামসমর্থক দৈনিক পত্রিকা দি প্যাট্রিয়ট-এর সমঙ্াদক নারায়ণনের অভিমত বরং ছিল আমার কাছে অনেক স্বস্তিদায়ক, কিন্তু বিদ্যমান সরকারি নীতি ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংকট যে ভারত সরকার যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা তার বক্তব্যেও ছিল না। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যানালিসিসের ডিরেক্টর কে সুব্রামনিয়াম তার পেশাগত বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে শরণার্থীদের অব্যাহত আগমনে সৃষ্ট ভারতের অদৃষ্টপূর্ব নিরাপত্তাসংকট বিশ্লেষণ করেন। পলিসি বিষয়ে ওই আসরের সম্ভবত সর্বাধিক ওয়াকিবহাল ব্যক্তি ছিলেন জি পার্থসারথি, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা। অনেক প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসবের মধ্যে ছিল পাকিস্তানের স্বসৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সামর্থ্য পাকিস্তানের রয়েছে কি না, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানি কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমান ও জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আপসরফা সম্ভব কি না এবং নিকট ভবিষ্যতে কী উপায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম জোরদার করা সম্ভব? বিদায়ের সময় পার্থসারথি জনান্তিকে আমাকে পরদিন সন্ধ্যায় তার বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ করেন।

পরদিন সন্ধ্যায় পার্থসারথির বাড়িতে আরেকটি ছোট্ট গ্রুপের সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়; গৃহকর্তা ছাড়া ছিলেন আর মাত্র দুজন, যারা ভারতের ক্ষমতাকেন্দ্রের খুবই কাছের লোক : পরিকল্পনা মন্ত্রী সি সুব্রামনিয়াম এবং পররাষ্ট্র সচিব টি এন কল। ভারতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এমন নেতাদের কাছ থেকে নিরেট তথ্য লাভের ব্যাপারে আমি প্রত্যাশা সীমিত রাখি এবং তাদের জিজ্ঞাসার জবাবে নিজের অনুমান ও কল্পনার ক্ষেত্রগুলো যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। সংক্ষেপে, আগের সন্ধ্যার মতো সেদিন আর কোনো আলোচনার ঝড় ওঠেনি। কিন্তু লক্ষ করলাম, আগের সন্ধ্যায় উত্থাপিত কিছু প্রশ্ন পার্থসারথি সেদিন আবারও তুললেন। সম্ভবত তিনি আমার কাছে একই উত্তর শুনতে চাইছিলেন তার দুই অতিথির উপস্থিতিতে। এ সমুদয় আলাপ-আলোচনা থেকে আমার মনে হয় যে, ভারতের উচ্চতর নীতিনির্ধারক পর্যায়েও বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত সরকার অনুসৃত পলিসির যথার্থতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরদিন মধ্যাহ্নের পর যখন আমি অশোক মিত্রর বাড়ি ফিরে যাই, সেখানে দেখা পাই আমার কাছে আসা এক অপ্রত্যাশিত দর্শণার্থীর। তার নিজের পরিচয় জানা গেল, তিনি মেজর জেনারেল বি এন সরকার, ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল মানেক শ-এর সামরিক সচিব। বাংলাদেশের ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র তত্পরতাকে সাহায্য করার জন্য কীভাবে রাজনৈতিক অবকাঠামো সৃষ্টি করা যায় তা জানার ব্যাপারেই তার আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হতে দেখি। তিনি পূর্ব পকিস্তানের পুরনো সার্ভে ম্যাপ ঝেড়ে-মুছে মেলে ধরেন। আমাদের সশস্ত্র অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যস্থল, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য ও আশ্রয়ের জন্য সেগুলোর আশপাশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঘাঁটি, সীমান্ত থেকে ওইসব লক্ষ্যস্থল ও রাজনৈতিক ঘাঁটির দূরত্ব, সেগুলোর যোগাযোগের পথ ইত্যাদি সমের্ক জানতে চান। তার দুদিন পর তার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাত্ থেকে আমার মনে হয় যে সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য কিছু স্টাফ ওয়ার্ক শুরু হয়েছে; সবকিছুই একেবারে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে নেই। ওইদিন সন্ধ্যায় ড্যানিয়েল আমাকে বলেন যে, পি এন হাকসার পরদিন বেলা ১১টায় আমাদের ‘কফি খেতে ডেকেছেন’। আমি ধরে নিই প্রকৃত আলোচনার সময় ততটা লম্বা নাও হতে পারে, কাজেই তাজউদ্দীন যে বিষয়গুলো জানতে চেয়েছিলেন সেগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা ফলপ্রসূ হবে তা আমি নোট করে নিই, তবে আগের কয়েক দিনে যেসব তথ্য সংগৃহীত হয়েছে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেই।

পুরনো বন্ধু ড্যানিয়েলকে পেয়ে পি এন হাকসার অত্যন্ত আনন্দিত হন, আমার প্রতি সমাদরেও কোনো ঘাটতি রাখেন না। সেদিন ছিল তাঁর সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তার পত্নী, দুই কিশোরী কন্যা আর ড্যানিয়েলের উপস্থিতিতে পারিবারিক প্রসঙ্গ প্রথম এসে পড়ে। একটু পরে হাকসার অক্লেশে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে, আমি কথা বলায় স্বচ্ছন্দবোধ করি। আমি আমার কথা শুরু করি এপ্রিলে ঢাকার চালচিত্র থেকে শুরু করে কলকাতায় দু সপ্তাহের অভিজ্ঞতা এবং অবশেষে দিল্লি আসার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে। বলি, এই যাত্রার সময় জুড়ে কীভাবে স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিপ্রেক্ষিত-বোধ বিবর্তিত হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে আমাদের করণীয় সমের্ক আমার ধারণাও কীভাবে বদলাতে থাকে। কোনো প্রশ্ন না করেই হাকসার আমার কথা শুনে গেলেন, তবে একটা আগ্রহের আভাস যেন তার অভিব্যক্তিতে আমি দেখতে পাই। ফলে তার কাছে আমি আমার চিন্তাভাবনাগুলোর সবকিছু একসঙ্গে ব্যক্ত করে ফেলি এভাবে :

সামনে এগোনোর কোনো পথই পরিষ্কার নয়। শরণার্থীর বিরামহীন প্রবাহ ভারত সরকারের জন্য এক অদৃষ্টপূর্ব রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের খণ্ড খণ্ড লড়াইয়ে ভারতের সাহায্য মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত সাফল্য আনবে না, বরং তার ফলে পাকিস্তানি পাল্টা আঘাত আরো তীব্র হতে পারে, শরণার্থীর স্রোতও আরো বেড়ে যেতে পারে। যারাই চেষ্টা করুক না কেন কোনো ‘রাজনৈতিক সমাধান’ও কোনো কাজে আসবে না। শরণার্থীরা যেমন পাকিস্থানি সৈন্য সমঙ্ূর্ণভাবে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত স্বদেশে ফিরতে আস্থা পাবে না তেমনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তাও আরো বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সৈন্য প্রত্যাহার করতে আগ্রহী হবে না। শরণার্থীরা ফিরে যাবে কেবল মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশেই আর তা মুক্ত করতে হলে সুপরিকল্পিত রণকৌশল অনুযায়ী এক বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যুদ্ধে লাগাতে হবে। কিন্তু পাকিস্তান মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারে চীনের যোগসাজশে আগাম যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে, যখন চীন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে কৌশলী আক্রমণ চালাতে পারে; চীনকে নিরস্ত করার ও ভারতের নিরাপত্তা-ঘাটতি পূরণের কার্যকর উপায় একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নেরই আছে, চীনের সীমান্তে তাদের বিশাল সৈন্যবাহিনী মোতায়েন থাকার কারণে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রহের অভাব দূর করার ক্ষেত্রে যদি সহায়ক হয় তবে আওয়ামী লীগ এবং মস্কোপন্থি দুই দল সিপিবি ও ন্যাপের সমন্বয়ে একটি জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠন করে একটি আদর্শগত কাঠামো দাঁড় করানো যেতে পারে। এ ধরনের ঐক্য দেশের অভ্যন্তরে যে রাজনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তুলবে তা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক হবে। বাংলাদেশের শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপ কবে নিতে হবে তা স্থির করার দায়িত্ব ভারতেরই।

এক জটিল ক্লান্তিকর উপস্থাপনা, বেশ সময়ও লেগে যায় কিছু কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। কিন্তু পি এন হাকসার মনোযোগের সঙ্গে আগাগোড়া আমার কথা শুনে যান। তারপর তিনি উঠে গিয়ে কোনো একজনকে ফোন করে বলেন, ‘প্রফেসর সাহাব, আপনার হাতে যদি সময় থাকে, আমাদের এখানে আসুন না, দুপুরে যা-ই আছে একসঙ্গে খাওয়া যাবে। বাংলাদেশ থেকে আসা একজন এখানে আছেন।’ তার কিছু সময় পরই আমাদের সঙ্গে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা পি এন ধর। তবে তিনি এসে পৌঁছার আগেই পি এন হাকসার আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। তিনি জানতে চান, আওয়ামী লীগ কি ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য গড়তে রাজি হবে? আমি বলি, আওয়ামী লীগ আগাগোড়াই অন্যান্য দলের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধী। বিশেষত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রায় সব আসনে জয়ী হওয়ার পর তাদের এই অবস্থান সঙ্গত কারণেই আরো দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, তাই তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন ঘটছে; বস্তুত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একটা অংশের মধ্যে সিপিবি ও ন্যাপসহ মুক্তিযুদ্ধসমর্থক সকল দলের সঙ্গে ন্যূনতম কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্য গড়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। গেরিলা তত্পরতায় সহায়তা জোগাতে দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ ঘাঁটি গড়ে তোলার প্রয়োজনে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিই এই নতুন চিন্তাভাবনার ভিত্তি। সিপিবি ও ন্যাপের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে তাদের অনেকেই মনে করেন।

পি এন হাকসার জানতে চান, আওয়ামী লীগের সেই অংশটির নেতা কে? আমি তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ করি এবং সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও তাকে জানাই যে, কিছুক্ষণ আগে আমি তাকে যেসব কথা বলেছি, সেগুলো নিয়ে তাজউদ্দীনের সঙ্গে আগেই আমার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং এটা তারই ইচ্ছা যে, মুক্তিসংগ্রামের এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দিকগুলো সমের্ক আমাদের চিন্তাভাবনা আপনার গোচরে আনা প্রয়োজন। এই উদ্দেশে আপনার সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন তিনিই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মাঝখানে ড্যানিয়েলের প্রবল উত্সাহে সে পরিকল্পনা খানিকটা পাল্টে যায় এবং আমার বরং সুবিধাই হয়েছে প্রথমে ভাবনাগুলো তার নিজস্ব যুক্তিতে হাজির করার এবং পরে এই ভাবনার সূত্র প্রতিষ্ঠা করার। হাকসারের অসাধারণ আমেরিকান পণ্ডিত বন্ধু ড্যানিয়েল থর্নার আমাদের পাশে বসে নিঃশব্দে সকল কথাবার্তা শুনছিলেন। এ পর্যায়ে তিনি আনন্দ আর ধরে রাখতে পারেননি। ফিরে আসার আগে হাকসার আমাকে বলেন, আমি যদি কলকাতা ফেরা একদিন পিছিয়ে দিয়ে মঙ্গলবার সাউথ ব্লকে তার দপ্তরে তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করি তাহলে ভালো হয়।

১ জুন মঙ্গলবার আমি দিল্লির সাউথ ব্লকে পি এন হাকসারের সঙ্গে আবার মিলিত হই। তিনি আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং ঘনিষ্ঠজনের মতো সহজভাবে কথাবার্তা বলেন। তার কথাবার্তার ধরন থেকেই আমার মনে হয় যে, আগের দিন আমি তাঁকে যেসব কথা জানিয়েছি সেগুলোর সত্যাসত্য তিনি এর মধ্যেই যাচাই করে দেখেছেন। এ বৈঠকে তিনি বাংলাদেশে একটি বহুদলীয় মোর্চা গঠনের সম্ভাব্যতা সমের্ক আরো বিস্তারিতভাবে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মোর্চা গঠনের জন্য কী কী প্রাথমিক করণীয় হবে সে বিষয়ে জানতে চান এবং বলেন যে, এ বিষয়ে কী অগ্রগতি ঘটে তা জানার জন্য সাগ্রহে তিনি অপেক্ষা করবেন। তারপর তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো একজনের উচিত হবে দিল্লিস্থ সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত বা সেই দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা এবং নিয়মিত মতবিনিময়ের লক্ষ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো সমঝোতা বা সহযোগিতা চুক্তি সাধন সমের্ক তিনি একটি কথাও বললেন না। অপর দিকে বৃহত্তর যুদ্ধ বাধিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাত্ করতে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্ভাব্য যোগসাজশ সমের্ক আমাদের ধারণাটিও তিনি উড়িয়ে দিলেন না। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে তার আগ্রহ এবং দিল্লিস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ শুনে আমার মনে হয়, আমাদের পলিসি প্রস্তাব ও দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কাছে বিবেচনার যোগ্য বলে মনে হয়েছে।

কলকাতা ফিরে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ পলিসি নিয়ে দিল্লির সরকারি মহলের নানা বিপরীতমুখী চিন্তাভাবনা সমের্ক অবহিত করি। পি এন হাকসারের সঙ্গে একটা সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছা গেছে সেকথাও তাকে জানাই। তাজউদ্দীন বলেন যে, জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠনের কাজ তিনি শিগগিরই শুরু করতে পারবেন।

আমার দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার সপ্তাহখানেকের মধ্যে দি প্যাট্রিয়ট পত্রিকার প্রকাশক অরুণা আসফ আলী কলকাতা আসেন এবং আমাকে জানান যে, পি এন হাকসারের অনুরোধক্রমে তিনি সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারের কর্মকর্তা ভি আই গুর্গিয়ানোভের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন। কলকাতার উড স্ট্রিটে সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারে ভিআই গুর্গিয়ানোভ আমাদের সুবিধামতো যেকোনো সময় আমাদের সঙ্গে মিলিত হতে রাজি আছেন। তাজউদ্দীন আহমদ চাইছিলেন আমি আলোচনা চালিয়ে যাই।

প্রথম বৈঠকেই গুর্গিয়ানোভ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা, এক দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনায় আমাদের নেতাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার মতো ভারতের সামর্থ্য সমের্ক সংশয় প্রকাশ করেন অকপটে। প্রথম বৈঠকে গুর্গিয়ানোভের অমন কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও আমাদের আলোচনা অব্যাহত থাকে, সপ্তাহে একবার করে পরবর্তী আরো তিন সপ্তাহ। সেসব বৈঠকে পলিসি বিষয়ের চাইতে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা হয় বেশি। ক্রমশ তিনি মেনে নিতে শুরু করেন যে নতুন একটা কিছুর উদ্ভব হচ্ছে এবং অবশেষে আমরা উভয়ের জন্য গ্রহণযোগ্য কিছু আলোচনার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে সক্ষম হই।

দিল্লি থেকে ফেরার পর পাঁচ সপ্তাহে এমন কিছুই ঘটেনি, যাতে বলা যায় ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যাশিত পথে এগোচ্ছে। এ সময় ভারতের সর্বস্তরে প্রত্যাশা বাড়তে থাকে যাতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উদ্ভূত সমস্যার একটা ‘রাজনৈতিক সমাধান’ ঘটে। অবশ্য জুনের তৃতীয় সপ্তাহে যখন ফাঁস হয়ে পড়ে যে যুদ্ধাস্ত ও সামরিক সরবরাহ নিয়ে কয়েকটি মার্কিন জাহাজ পাকিস্তানের পথে যাত্রা করেছে, তখন এই প্রত্যাশা খানিকটা টলে যায়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার দিল্লি সফরে এলে মার্কিন মধ্যস্থতায় ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ প্রত্যাশা নিয়ে প্রচারণা তুঙ্গে ওঠে। ওই সময়েই আমি হাকসারের কাছ থেকে অন্য রকমের বার্তা পাই। সে বার্তায় তিনি বাংলাদেশে জাতীয় ফ্রন্ট গঠনে সাধিত অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চান। এক মাসের বেশি সময়ের মধ্যে ওটাই ছিল প্রথম ইঙ্গিত যে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ চলা সত্ত্বেও আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের এ সময়ের মধ্যে তেমন কিছু করতে সক্ষম হননি। শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলনের (৫ ও ৬ জুলাই, ১৯৭১) কিছু আগে থেকেই আওয়ামী লীগের এক শক্তিশালী উপদলের তীব্র প্রচারণা নিষ্ক্রিয় করতে তাজউদ্দিনকে বেশ বেগ পেতে হয়। সেই সম্মেলনেও তারা প্রকাশ্যে এমন দাবি করেছিল যে, ভারত যেহেতু প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে তাদের হতাশ করেছে, সেজন্য তাদের উচিত দেশে ফিরে গিয়ে হয় যুদ্ধ করা, নয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে মিটমাট করে ফেলার চেষ্টা করা।

কিসিঞ্জারের গোপনে চীন সফরের খবর প্রকাশ পাওয়ার অল্প পরেই আমি নয়াদিল্লি যাই। খবরটি সব মহলেই উত্তেজনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে, আর যারা সে সময় পর্যন্ত মার্কিন মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে বলে আসছিলেন তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে হতাশা। ১৯ জুলাই রাতে পি এন হাকসার অশোক মিত্রের বাড়ি আসেন এবং আমাকে জানান যে, আমাদের সামঙ্রতিক আলোচনার পথ ধরে শিগগিরই বেশ ইতিবাচক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাথা নেড়ে সমর্থন জানান। পরদিনই আমি কলকাতা ফিরে আসি। তাজউদ্দীন আহমদ বহুদলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু করেন, তবে স্থির হলো সেটা তিনি কার্যকর করবেন কেবল ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই।

বিজ্ঞাপন

৯ আগস্টে নয়াদিল্লিতে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিসিঞ্জার পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিকথায় এ চুক্তিকে আকস্মিক বোমার আঘাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওই চুক্তিতে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মর্মে একমত হয় যে, তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে কোনো হুমকি সৃষ্টি হলে এই দুই দেশ যৌথভাবে আলোচনা করবে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে। এ চুক্তির ফলে পরবর্তী ঘটনাবলির গতিপথ চূড়ান্তভাবে পরিবর্তিত হয়। ওই সময়ের ঘটনাবলির ইতিহাসের যে পুনর্গঠন সামঙ্রতিককালে চলছে তাতে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের যোগসাজশের বিষয় আমরা যেভাবে দেখেছিলাম তা এড়িয়ে গিয়ে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থে চীনের সঙ্গে সমর্ঙ্ক গড়ে তোলার জন্যই পাকিস্তানকে ব্যবহার করছিল মাত্র। সেটা সম্ভব। কিন্তু তার সঙ্গে এ কথাও ঠিক যে, এর আরো একটা অন্ধকার দিকও ছিল, যেটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তার স্মৃতিকথায় বলেছেন : ‘এই সময় চীনারা অত্যন্ত সাবধানে চলছিল। তারা তাদের সৈন্য ভারতীয় সীমান্তে জড়ো করেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য ভারত আক্রমণের ঝুঁকি নিতে সাহস পায়নি। কেননা তারা বুঝতে পেরেছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অজুহাতে চীন আক্রমণ করবে।’ (পৃষ্ঠা ৫৩০)

এবং এই স্ট্র্যাটেজিক চুক্তিটি বাস্তবায়ন করার জন্য হাকসার কী করেছিলেন? আমি ভারতের কোনো সরকারি নথিপত্র দেখিনি। কিন্তু ওই ঘটনার দু বছর বাদে ডি পি ধর আমাকে যা বলেছিলেন তা উল্লেখ করতে পারি। ১৯৬৯ সালে ব্রেঝনেভ ডকট্রিনের সেই উচ্চাশার সময়ে মৈত্রী ও সহযোগিতার একটা খসড়া চুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তাব করেছিল ভারতের কাছে। ডি পি ধর তখন মস্কোতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে সেই খসড়া চুক্তি নিয়ে ছয় মাস ধরে আলোচনা করেন। প্রতি সপ্তাহে বুধবার ও শনিবার তিনি সোভিয়েত পররাষ্ট্র বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই খসড়াটি মনোপুত হিসেবে তৈরি করতে পারেনি।

১৯৭১ সালের জুন মাসে ডি পি ধরকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়। হাকসার তাকে ভারত সরকারের এই নির্দেশ জানান যে, তিনি যেন তাড়াতাড়ি সেই চুক্তিটি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে গ্রহণযোগ্য সংশোধনীসহ পুনরুজ্জীবিত করেন, যাতে ভারতের সীমান্তের নিরাপত্তার প্রতি যে হুমকি দেখা দিয়েছে তার প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করা যায়। হাকসার এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টির খুঁটিনাটি সবকিছুর তদারক করেন একদম শেষ পর্যন্ত, যখন তা মন্ত্রিসভার ‘রাজনৈতিক কমিটি’তে উপস্থাপন করা হয়। সে বৈঠকে পি এন হাকসার, পি এন ধর ও ডি পি ধর-তিনজনই উপস্থিত ছিলেন, পাছে তাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়!