default-image

থানা থেকে বেরিয়েই সে সামনে পড়ে গেল আবদুর রাজ্জাকের। আবদুর রাজ্জাক পুলিশের সোর্স-সে কারণে চেহারায় তার একটা আলাদা ভাব ধরে রাখে, যা কোনো ক্ষেত্রে ক্রোধ, কোনো ক্ষেত্রে সমীহ, কিন্তু ক্বচিত্ সমীহ উত্পাদন করে। তার নাকটা স্বাভাবিকের চাইতে একটু বেশি উঁচা মনে হয়। রাজ্জাকের এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে একটা ফাইল। কিসের ফাইল কে জানে। রাজ্জাক অবশ্য ফাইলকে বলে ‘পাইল’। কোথায় তার বাড়ি, ঠাহর হয় না, হয়তো লাক্সমিপুর। রাজ্জাকের পেছনে কানা ইলিয়াস, পাশে কনস্টেবল মতি মিয়া। এই ত্রয়ীকে দেখে সে, অর্থাত্ ফজলু, একটু ভড়কে যায়। ভাবে, এড়িয়ে যাওয়া উচিত। এরাই সকালে তাকে ধরে এনেছে বাড়ি থেকে। যদিও আনার কোনো কারণ ছিল না, যেহেতু কাল রাতে বাড়ি আর ছাপাখানা রেইড করে পুলিশ আপত্তিজনক কিছু পায়নি। তবে উকিল সাহেব জানেন এবং সে কথা ফজলুকে তিনি বলেওছেন-তার হাত খানিকটা মোচড় দিয়ে কিছু পয়সা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। উকিল সাহেব রফা করেছেন কুড়ি হাজারে-আপাতত। পরে লাগলে আরো দিতে হবে। ফজলু এই ‘পরের’ কথা ভেবে শঙ্কিত। একটা গুরুভার অস্বস্তি তাকে পীড়া দিচ্ছে। উকিল সাহেব থানায় এসেছেন খবর পেয়েই-খবরটা তাকে দিয়েছে জয়নবের মা, ফজলুর দ্বিতীয় স্ত্রী, যার এখনো প্রবেশাধিকার মেলেনি ফজলুর বাড়িতে, চার বছর বিবাহিত জীবনের পরও। হেতু, ফজলুর প্রথম স্ত্রী নূরুন্নাহার ওরফে রুদ্রচণ্ডী। সমের্ক আবদুর রাজ্জাকের ফুফাতো বোন। অতি উগ্র মেজাজি। রাজ্জাকের সঙ্গে সদ্ভাব নেই। রাজ্জাক বদলোক, বদলোকের সবকিছুই বদ হয়। বোনের সঙ্গে সমর্ঙ্কটাও বদ-হানাহানি, রক্তারক্তির।

বিজ্ঞাপন

উকিল সাহেব আসার আগেই একপ্রস্থ প্রহার জুটেছে ফজলুর ভাগ্যে। এসআই মনির তাকে নয়টা ঘুষি ও থাপ্পড় মেরেছে। ফজলু গুনে দেখেছে, কিন্তু কোনো ওজর-আপত্তি করেনি, মাপ-টাপও চায়নি। কান্নাকাটি তার এমনিতেই আসে না। এসব কারণে মারে সুখ পায়নি মনির। তবে আরো হয়তো মারত মনির, যদি না ভট ভট করে মোটরসাইকেল চালিয়ে দুই ক্যাডার এসে উপস্থিত হতো। ক্যাডার দুজন এসেছে কাল মধ্যরাতে হাজতে পুরা ইয়াসমিন নামের এক সন্দেহভাজন কলেজপড়ূয়া তরুণীকে ছাড়িয়ে নিতে। উকিল সাহেব বলেছেন, কলেজপড়ূয়া না ছাই, কলগার্ল।

ইয়াসমিনকে নিয়ে ক্যাডাররা চলে যেতে দারোগা মনোযোগী হয়েছে দামদস্তুরে। উকিল সাহেব দশ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। বাকিটা বলেছেন কাল দেবেন। তাতে কাজ হয়েছে। দারোগা তাকে বলেছে, ‘একটা অঙ্কের মাস্টার ঠিক করে দেন তো, উকিল সাহেব। সামনে ছেলেটার এসএসসি পরীক্ষা।’ তারপর খবরের কাগজের একটা টুকরো ছিঁড়ে সরু করে কানে ঢুকিয়ে কান চুলকাতে লেগে গেছে।

বারান্দায় বেরিয়ে উকিল সাহেব বলেছেন, ‘ভালোই হলো, ছেলেটা বিএসসি পাস করে ঘরে বসেছিল। কিছুদিনের জন্য একটা হিল্লে হবে।’

জগতের কত বিচিত্র সব যোগাযোগ!

আবদুর রাজ্জাক উকিল সাহেবকে দেখে এগিয়ে এল। ফজলুকে দেখেও দেখল না। এমন একটা ভাব, যেন ফজলু অস্তিত্বহীন অথবা তার শরীর সূক্ষ্ম। ‘উকিল সাব, আঁন্নের মক্কেলরে একটু সাবধানে থাকতে কইয়েন।’

উকিল সাহেব রাজ্জাকের দিকে অগুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।

‘এই বেলা বাইচ্যা গেল। আঁর বার নাও বাইচতে ফারে।’

উকিল সাহেব দেখলেন, ফজলু ঘোলাটে চোখে দেখছে রাজ্জাককে। ফজলুর এই দৃষ্টি সকাল থেকে প্রথম চোখে পড়ছে তার। হয়তো অসুস্থ লোকটা। পাশ কেটে যেতে যেতে রাজ্জাক বলল, ফজলুকেই উদ্দেশ্য করে, যদিও চোখ তার উকিল সাহেবের দিকে, ‘রাইতে বলক রেইড দিবে। হুঁইশ্যার।’

ঘোলাটে চোখা ফজলু মৃদু হাসল। হাসিটা ক্লান্ত, এবং রক্তিম, যেহেতু মনিরের ঘুষিতে ঠোঁট ও নাকে রক্ত ঝরেছে।

ফজলুকে খুব ঘাঘু মানুষ বলে কখনো মনে হয়নি উকিল সাহেবের। যদিও তিনি জানেন, এমনি এমনি পুলিশ ধরে আনেনি তাকে। যাত্রাবাড়িতে একটা ছাপাখানা আছে লোকটার। সেখানে বিড়ির ব্যান্ডরোল ছাপায় সে, অবৈধভাবে। নানান সার্টিফিকেটও ছাপায়, জাল। পুলিশ অবশ্য বমাল ধরতে পারেনি, আগেই এসব সরিয়ে ফেলেছিল। সোর্স আবদুর রাজ্জাকের সেজন্য দুকথা শুনতেও হয়েছে দারোগা থেকে। এখন তাই তার কথায় বিরক্তি আর উষ্মা ধরা পড়ছে।

উকিল সাহেব কিছু বললেন না রাজ্জাককে। বাজে মানুষের হাত বড়ই নোংরা এবং লম্বা, তিনি দেখেছেন। তারও কোনো ক্ষতিসাধন করা তারপক্ষে অসম্ভব নয়, বিশেষত তার মক্কেলরাও একটু অন্ধকার জগতের মানুষ যেহেতু। উকিল সাহেব রাস্তায় উঠে কাচারির পথ ধরলেন। আর ফজলুকে বললেন, টাকাটার ব্যবস্থা করো, আর কিছুদিন একটু চুপচাপ, মানে নিচু হয়ে থেকো।

২.

বাড়িতে গিয়ে গোসল করে খেয়ে একটা ঘুম দিল ফজলু। বিকেলে যখন উঠল, তার সারা গায়ে ব্যথা। একটু জ্বরও।

নূরুন্নাহার তাকে বলল, ‘রাজ্জাক্যা কুত্তার বাইচ্চারে আমি জ্যান্ত পুতমু একদিন।’

ফজলু স্ত্রীর দিকে নিসঙ্ৃহভাবে তাকাতে গিয়ে অনুভব করল, তার চোখে একটা ছায়া পড়েছে। স্ত্রীকে কিছুটা অসঙ্ষ্ট দেখছে সে।

নূরুন্নাহার বলল, ‘এই হালার লগে মাখামাখি করতা গেছলা ক্যান? এই যে পেদানি খাইলা-এর কুনু দরকার ছিল?’

দরকার কেন থাকবে, ফজলু মনে মনে ভাবে। কিন্তু ভাবতে ভাবতে সে দেখে, রাজ্জাকের ব্যাপারটা তার মন থেকে প্রায় চলে গেছে। রাজ্জাকের জায়গায় জয়নবের মার ছবিটা বসে গেছে। তার ছবিটা অতটা অসঙ্ষ্ট না। জয়নবের মা শাড়ির খুঁট থেকে তার এক জীবনের সঞ্চয় দশ হাজার টাকা তুলে দিচ্ছে উকিল সাহেবের হাতে। অসঙ্ষ্ট নূরুন্নাহার এবার তাগিদ দিল, ‘বইসা বইসা ধ্যান মারতাছ ক্যান? কামে যাও। প্রেস থাইক্যা হারুন পোলাটা আইছিল। পোবলেম হইতাছে’।

ফজলু খুশিই হলো। ঘরে আর ভালো লাগছে না। প্রেসের প্রবলেমটা কী, সে জানে। একটা মেশিনের পার্টস বদলাতে হবে। পার্টসটা আজ ডেলিভারি পাওয়ার কথা। ফজলু ভাবল, যাওয়ার পথে জয়নবের মাকে একটু দেখে যাবে।

বিজ্ঞাপন

৩.

পার্টসটা লাগাতে লাগাতে রাত হয়ে গেল। অপারেটর লালু মিয়া বলল, ‘মিয়া ভাই, অনেক খাটাখাটি হইল, অহন একটু বিরিয়ানি আনান।’ চারজনের জন্য বিরিয়ানি এল। রাত ১২টায় তারা বিরিয়ানি খেতে বসল। সুস্বাদু বিরিয়ানি। কিন্তু খেতে খেতে ফজলুর মনে হয়, বিরিয়ানির লোকমা সে ঠিকমতো দেখতে পারছে না। বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে সে চোখ কচলালো। নাহ। ছবিটা পরিষ্কার হলো না। আবার চোখ কচলালো।

‘মাইরটা কি চক্ষে পড়েছিল, মিয়া ভাই?’ লালু মিয়া জিজ্ঞেস করল।

‘না।’

‘চক্ষু দুইটা ঘুলা ঘুলা লাগতাছে।’

‘হ।’

হাত ধুতে হয়, ধুলে যদি সঙ্ষ্ট হয়। কিন্তু কলের ট্যাপ খোলার আগেই ভীষণ জোরে পুলিশের বাঁশি বেজে উঠল। চিত্কার। কর্কশ আদেশ-নির্দেশ, কথাবার্তা। বুটের আওয়াজ। এক ডজন পুলিশ যেন দৌড় শুরু করেছে দিগ্বিদিক। একটা জিপ জোরে কাশল গলির মোড়ে। ভয় পেয়ে পাড়ার কুকুরগুলো হঠাত্ ঘেউ ঘেউ শুরু করল।

জলহীন কলের নিচে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকল ফজলু। তার স্নায়ুগুলো হঠাত্ শীতল হয়ে গেল। যেন ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে যাচ্ছে সকল স্নায়ুতন্ত্রী দিয়ে। লালু মিয়া তটস্থ হয়ে পড়ল। ‘ও মিয়া ভাই, কী হইতাছে? কী হইতাছে মনে করেন?’ দুই মেকানিক ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে পড়ল মেঝেতে।

ব্লক রেইড। রাজ্জাক ভুল বলেনি।

কিছুক্ষণের মধ্যে দরজায় লাথি পড়ল ছাপাখানার। ‘মায়ের দোয়া প্রেস’। আজ বিকেলে জয়নবের মা বলেছিল, ‘একটু অফিস-আদালতে যান, ব্যবসা আনেন। ঘরে বসে থাকলে ব্যবসা কি নিজে নিজে আসবে?’

জয়নবের মার বানানো নতুন চালের ফিরনি খেতে খেতে ফজলুর অস্বস্তি হচ্ছিল কথাগুলো শুনে। জয়নবের মা জানে না, ফজলু ঘরে বসে থাকলেও ব্যবসার কমতি হবে না। কমিশনার আইয়ুব আজমির শরিফ গেছে। সেজন্য সাময়িক আলস্য যাচ্ছে। ও ফিরলেই কাজ। সাত দিন প্রেসটা চালালে তার লাভ এক লাখ।

জলহীন কলের নিচে হাত রেখে ফজলুর মনে হলো কোথাও যেন একটা ছন্দপতন হয়েছে। গুরুতর ছন্দপতন। অথবা কিছু একটা ভেঙে পড়ছে, আর তার নিচে চাপা পড়ছে তার নশ্বর দেহ।

দরজা যে খুলবে, সে সাহস লালু মিয়ার নেই, দুই মেকানিকের তো কথাই ওঠে না। কাজেই কিছুক্ষণ চিত্কার-গালাগালির পর দরজা ভেঙে ফেলল কুপিত পুলিশ। ভেতরে ঢোকার যেন তাদের তর সইছিল না। পিল পিল করেই ঢুকল তারা। ফজলুর মনে হলো, যেন পুরো রাজারবাগ ঢুকে গেছে তার ছাপাখানায়।

লালু মিয়ার শরীর ঢ্যাঙ্গা। শক্তিও কম। তার ঘাড়ে বিরাট একটা বাড়ি পড়তে কঁকিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে গেল সে। বেচারা। একটু আগে বড় তৃপ্তি নিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছে। দুই মেকানিককে বুট দিয়ে লাথি দিতে থাকল আরো তিন পুলিশ। আর ফজলুকে ধরল এসআই মনির। কিন্তু সকালের ওই নয় নিরানন্দ ঘুষি-থাপ্পড় মেরে হয়তো তার মার দেওয়ার ইচ্ছাটা চলে গেছে। তাকে একটা চড়ও মারল না সে। বরং বেশ যেন দুঃখিত গলাতেই বলল, ‘কী মিয়া ভাই, রাইতে একটু ঘুমাইতেও পারব না আপনাগো জ্বালায়।’

‘আমি কী করছি?’ ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ফজলু।

‘কী করেন নাই, সেইটা কন’-এবার বিরক্ত গলায় বলল এসআই মনির এবং ফজলুর দু হাত পেছনে নিয়ে কড়া পরিয়ে দিল।

ফজলু ভেবে পেল না, কী ঘটছে অথবা ঘটতে যাচ্ছে। যে ক্রেটে করে সেঙ্য়ার পার্টস এসেছে দুপুর বেলা, যেটি খালিই ছিল, সেটি উল্টে মেঝেতে ফেলল দারোগা আবু তাহের, সকালে যে উকিল সাহেবকে একজন অঙ্কের মাস্টার দেখতে বলেছে। উল্টানো ক্রেট থেকে কিছু প্যাকিং কাগজ বেরোলো। আর বেরোলো চকচকে কিছু রঙিন কাগজ। ছোট, আয়তাকার, টাকার নোট যে আকৃতির হয়। আবু তাহের নিচু হয়ে দেখল, হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচালো। তার চোখ চিকচিক করছে, হয়তো কাগজের টুকরোগুলো থেকে ছিটকে আসা আলোয়। ‘এসব কী দেখছি, ফজলু মিয়া?’

ফজলুও দেখতে চায়। কী এসব? সেও নিচু হলো, কিন্তু হাত দিয়ে একটা টুকরো তুলতে গিয়ে তার মনে হলো, হাতে কড়া লাগানো। তদুপরি পিঠের পেছনে বাঁধা।

আবু তাহের নিজেই তুলল একটা কাগজ। কাগজ মানে নোট, টাকার নোট। পঞ্চাশ টাকার। পঞ্চাশ টাকার গোলাপি কমলা নোটগুলোই আলো ছড়াচ্ছে।

আবু তাহের নোটটা উঁচুতে একটা লাইট বাল্বের সামনে তুলে ধরল। সময় নিয়ে দেখল। ফজলুও দেখল, যদিও কিছু অসঙ্ষ্ট গোলাপি কমলা রঙ ছাড়া প্রায় কিছুই তার চোখে পড়ল না। ফজলুকে দেখে আমাদের মনে হবে, সে যেন এক যক্ষ্মার রোগী। আর আবু তাহের যক্ষ্মার ডাক্তার। আলোর বিপরীতে ফজলুর বক্ষস্থলের এক্সরে প্লেট দেখছে এবং একটু পরেই বলবে, দুঃখিত, ভাই। আপনার লাংস দুটো বাঁচানো যাবে না।

‘কী বুঝলেন স্যার?’ এসআই মনির জিজ্ঞেস করল।

‘বোঝাবুঝির কিছু নাই। জাল।’

মনির এবার হাত চালালো নোটের স্তূপে। আরো দু-তিনজনও। ফজলু বুঝতে পারল, ব্লক রেইডে অন্তত আরেকটি থানা যোগ দিয়েছে। কারণ একটু আগে মায়ের দোয়া প্রেসে আরেকজন অফিসার ঢুকেছে, যাকে আবু তাহের একটা স্যালুট দিয়েছে। বলেছে, ‘স্যার, ঢাকার জাল নোটের অন্তত ফট্টি পার্সেন্ট যায় এই যাত্রাবাড়ি থেকে। ওই দেখেন স্যার।’

স্যার হাত বাড়িয়ে নোটগুলো নিলেন এবং নিবিষ্ট মনে দেখতে থাকলেন। জাল নোটের সন্ধানে আজ রাতের ব্লক রেইড। ফজলু ভাবল, স্যার বোধহয় নোটগুলো এখন খাবেন। তার ক্ষিধে পেয়েছে। নোটগুলো তার কাছে সুস্বাদু মনে হচ্ছে। স্যার বললেন, ‘ভালো করে দেখেন।’

শুরুর হৈ হৈ, বাঁশি, কর্কশ চিত্কার আর নেই। মায়ের দোয়া প্রেসে ঢুকে যেন ব্লক রেইডের তাড়াটা চলে গেছে। ব্লক রেইড যেন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। প্রেসের ভেতরে বাজারবাগ যেন পা টিপে হাঁটছে। মেশিনপত্র নাড়ছে, উঁকি মারছে সকল কোনাকানচিতে। উল্টাচ্ছে, হাতড়াচ্ছে কাগজের স্তূপ। দুইজন খালি করছে ফজলুর ছোট্ট টেবিলের ড্রয়ার।

ড্রয়ার থেকে বেরোলো নোটের আরো দুটি বান্ডিল। যেখানে লালু মিয়া পড়েছিল প্রথম ধাক্কায়, সেইখানে মেঝের ওপর। চোখের তিন ইঞ্চি দূরে বান্ডিল দুটি গড়িয়ে যেতে লালু মিয়া চোখ খুলল। হয়তো শব্দে, অথবা নোটগুলো থেকে ঠিকরানো আলোর প্রাবল্যে। যে কনস্টেবলটি বান্ডিলগুলো কুড়িয়ে তুলল, যার নাম শাজাহান, সে এক মুহূর্ত তাকিয়ে চিত্কার দিয়ে উঠল। ‘সব্বনাশ, স্যার। দেইখ্যা যান, স্যার।’

স্যার বলতে আবু তাহেরের স্যার এবং আবু তাহের দুজনই এগিয়ে এলেন, মানব অভ্যাসবশত। তারপর স্যার হুকুম করলেন, পুলিশ অভ্যাসবশত, ‘এইখানে নিয়া আস।’

এইখানে মানে ছয় কদম। স্যার কেন যাবেন সেপাইয়ের কাছে, ছয় কদম দূরে?

শাজাহানের হাত থেকে একটা বান্ডিল তুলে আবু তাহেরকে দিলেন স্যার। অন্যটি নিজে নিলেন। তারপর তারা দুজন এবং কনস্টেবল শাজাহান তাকালেন ফজলুর দিকে। ‘ফজলু মিয়া’, স্যার বললেন, ‘আমরা জানতাম তুমি টাকা জাল করো। কিন্তু তিন টাকার নোট?’

‘তিন টাকার নোট?’ ফজলু আর্তস্বরে পাল্টা জিজ্ঞেস করে।

‘দ্যাখ’। বলে তিনি তিন টাকার একটা নোট তুলে ধরলেন ফজলুর চোখের সামনে।

তিন টাকার নোট অবশ্যই। বেগুনি এবং কমলা রঙ। দুই টাকা আর পাঁচ টাকার মাঝখানে একটা সাইজ। একটা সাপের ছবি, হয়তো জাতীয় সাপ। নোটের নিচে মাঝখানে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের স্বাক্ষর, গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

পাগল, ফজলু ভাবল।

তিন টাকার নোটটা হাতে হাতে ফিরতে লাগল। এসআই মনির দেখল। এসআই রূপায়ণ দেখল। সার্জেন্ট বাদল দেখল। কনস্টেবল মহি মিয়া দেখল। মেকানিক ছাদেক আর মেকানিক তেজেন দেখল।

সবার চোখ ঘুরল ফজলুর দিকে। চোখে আগুন। সেই আগুনে তার চোখের ছায়া কিছুটা পুড়ল। যেন কিছু জ্যোতি ফিরল চোখে। সে দেখল, সকলেই যেন এক তীব্র অভিযোগের অনল ঢালছে চোখ থেকে।

‘আমি নোট জাল করি না’, ফজলু বলল।

‘তাহলে এগুলা কী?’ মেকানিক তেজেন জিজ্ঞেস করল। তার চোখের আগুনের কোনো ব্যাখ্যা পেল না ফজলু।

‘এগুলা জাল নোট, কিন্তু আমি করি নাই।’

বিজ্ঞাপন

‘তাহলে এইখানে ক্যামনে আইল?’ মেকানিক ছাদেক জিজ্ঞেস করল।

‘এই মেশিন পার্টের মধ্যে ছিল। বাইরে থাইকা আইছে।’

‘তাই বইলা তিন টাকার নোট?’ এক তীব্র গোঙানি দিয়ে জিজ্ঞেস করল লালু মিয়া। অথবা জিজ্ঞেস করল না।

‘তিন টাকার নোট কী হয়, কও লালু মিয়া?’ ফজলু এবার হাসার চেষ্টা করল।

‘একি কথা কন মিয়াভাই, তিন টাকার নোট হয় না?’ লালু মিয়া উত্তেজনায় মেঝেতে উঠে বসল।

‘কী কও লালু মিয়া? তিন টাকার নোট?’

‘স্যার, আমারে বান্ধেন, আমারে মারেন। আমারে ইহান থাইক্যা নিয়া যান। আমি মিয়া ভাইর কথা শুনি নাই।’ গোঙাতে গোঙাতে বলল লালু মিয়া।

‘আবু তাহের, বদমাশটাকে নিয়ে চলেন। থানায় চলেন। একটা বিহিত করতে হবে।’ স্যার বললেন।

‘দেখলেন স্যার, কেমন ঘাঘু। এখন পাগল সাজতাছে। বলে তিন টাকার নোট নাই।’ আহত গলায় বলল আবু তাহের। তারপর উচ্চস্বরে আদেশ দিল, ‘শাজাহান। এই বেটাকে গাড়িতে নিয়া তুলো।’

ফজলুর মনে হলো, তার নশ্বর দেহটার যে কিছুটা বাকি ছিল চাপা পড়তে, সেটুকুও পড়ছে। তার বুকে ভারী হয়ে উঠল ব্যথা। কিন্তু তার কষ্ট লাগল না, বরং মনে হলো যত শরীরে পড়ছে চাপ, তত মনটা নির্ভার হয়ে যাচ্ছে। একটু আমোদও লাগল তার। থানার এসি-ওসি সবাই কি সুন্দর তামাশা করছে তার সঙ্গে। যদিও সে ভেবে পেল না কে জাল নোটগুলো ক্রেটে ঢুকিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলল। আবদুর রাজ্জাক, নাকি লালু মিয়া? নাকি ওয়ার্ড কমিশনার আইয়ুবের ভায়রা মুকুল মিয়া, যার সঙ্গে আইয়ুবের কারণে তার বড় শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছে? নাকি দুই মেকানিক? কনস্টেবল মতি মিয়া? সার্জেন্ট বাদল? নাকি স্যার? কে এই স্যার, তাকে তো আগে কখনো দেখেনি সে!

৪.

ফজলুর মনে হলো, একটা পুরো দিন তাকে পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছিল। তিন টাকার নোট? থানায় ভোর থেকেই তাকে দেখতে এসেছে পাড়ার লোক, মুকুল মিয়া, মসজিদের ইমাম সাহেব, নূরুন্নাহার, ছেলে ইকবাল। ১০টার সময় এসেছেন উকিল সাহেব। তিনি কোর্টে যাবেন তার সঙ্গে। জামিনের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সে তো পরের কথা। তার আগে সবাই তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে শুরু করেছে যেন সে হিটলার, ইসরায়েল রাষ্ট্রের কাছে এত দিন পর ধরা পড়েছে। ফজলু প্রথমে কিছুটা কৌতুক বোধ করেছে, তিন টাকার নোট! ভেবেছে সবাই হাসবে শুনে। তা ছাড়া, সত্যি কথাটা হলো, এসব নোট সে জাল করেনি, বাইরে থেকে কেউ এনেছে, সেই মেশিন পার্টসের ক্রেটের ভেতরে করে। কিন্তু এই সত্যটি অতি দ্রুত চাপা পড়ে গেল-বস্তুত গত রাতেই পড়ে গিয়েছিল মায়ের দোয়া প্রেসের ভেতরে। বরং অনেক বেশি বড় হয়ে দেখা দিল ওই তিন টাকার জাল নোট। তিন টাকার জাল নোট, যা আদৌ সে জাল করেনি, ছাপায়নি। ফজলু যখন দেখল, কেউ হাসছে না বিষয়টা নিয়ে, এমনকি পত্রিকার আর চ্যানেলের সাংবাদিকরাও, তখন তার ভিন্ন একটা আশা জেগেছিল, অন্তত সে যে জাল নোট ছাপায় না এবং এ নোটগুলো বাইরে থেকে আনা, এ বিষয়টি দু-একজন বিশ্বাস করবে। যেমন ছেলে ইকবাল এবং উকিল সাহেব। কিন্তু ছেলে ইকবাল বলল, ‘বাবা, তিন টাকার নোটটা কেন জাল করতে গেলা?’

‘তিন টাকার নোট তো হয় না বাপজান।’

‘হয় না? তুমি কইতাছ এই কথা বাবা?’ ইকবাল অবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করেছে বাবাকে। নূরুন্নাহার ইকবালের হাত ধরে বলেছে, ‘চল, বাড়ি চল। এই মানুষের মতলব বুঝা মুশকিল।’ তারপর বলেছে, ফজলুকে ঝংকার দিয়ে, ‘কেন করতা গেছলা এই কামটা? অহন আমাদের কী অইব? খামু কী?’

সোর্স রাজ্জাক বলল, ‘পুলিশ ছাইরা দিলে ফেরেসটা বিক্রি কইরা দিয়েন। ফেরেস ছাড়ব, কিন্তু ভাইজানেরে ছাড়ব না। বৌত্ দিন।’

ফজলু কৌতুক এবং অবিশ্বাস, ক্রোধ এবং শত্রুতা, অসাড়তা ও অস্থিরতার মাঝামাঝি একটা অঞ্চলে সূক্ষ্মভাবে বিচরণ করতে লাগল। সকালের সূর্য উঠেছে, রাস্তায় মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, গাড়িঘোড়া চলছে, চড়ূই ডাকছে-কিন্তু এসব বাস্তবতাকে ান করে দিয়ে তিন টাকার একটি নোট উড়ছে ঘরময়, জগত্জুড়ে। যেন জগতের একমাত্র পতাকা। উকিল সাহেব তাকে বলেছেন, ‘হাকিম সাহেবের সামনে কিছুতেই বলবা না যে তিন টাকার নোট নাই। কিছুই বলবা না, যা বলার আমি বলব।’

ফজলু অবিশ্বাস নিয়ে তাকালো।

‘তাইলে জামিনের কোনো আশা থাকবে না।’

‘কিন্তু তিন টাকার কোনো নোট নাই’, ফজলু বলল। তার গলায় এখন কোনো উত্তেজনা নেই। বিস্ময় নেই। যেন নিতান্ত আলস্য থেকে উঠে এসেছে কথাগুলো। উকিল সাহেব বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকালেন। বললেন, ‘ফজলু মিয়া, একটু চা খাও, মাথাটা ঠিক হবে।’

ফজলু খুশিই হলো। এক কাপ চায়ের বড় প্রয়োজন। মাথাটা শরীরে থাকতে চাইছে না আর।

হাজতে আরো চার মানুষ, তারা নির্জীব শুয়ে আছে মেঝেতে। তবে ঘুমিয়ে নেই। চা নিয়ে মতি মিয়া যখন উদয় হলো, কেউ নড়ল না। ফজলু অবাক হলো, কনস্টেবল মতি চা নিয়ে এসেছে? তার জন্য? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারল, কেন? কারণ মতির পেছন পেছন এসেছে জয়নবের মা। সে জানে, কাকে কোথায় কী পরমাণ পয়সা দিলে কোন কোন কাজ হয়। বেশ জাগতিক মেয়ে। জয়নবের মা দুটো পরোটা আর ভাজি এনেছে। ভাজির গন্ধে শোয়া মানুষগুলো একটু ঘাড় তুলল, কিন্তু সামনে যে মতি মিয়া! ফজলু একটা পরোটা খেল, তারপর চা খেল। জয়নবের মা চুপচাপ বসে দেখল, যেন জগতে এটিই ফজলু মিয়ার শেষ আহার ও পানীয় গ্রহণ।

চা খেতে খেতে ফজলুর খুব অস্বস্তি হলো। আতঙ্কও হলো। কথাটা কীভাবে জিজ্ঞেস করবে জয়নবের মাকে। জয়নবের মা যদি বলে, অন্যদের মতো, অন্যরা যা বলেছে, তা? যদি অন্যদের মতো হয় তার প্রতিক্রিয়া? কোথায় তখন যাবে সে?

জয়নবের মা-ই তাকে জিজ্ঞেস করল বরং, ‘কোটে কখন যাইবেন?’

সাড়ে ১০টায়।

‘কী অইব অহন?’

ফজলু চুপ করে থাকে। তারপর একটু সাহস হয় তার। কথাটা জিজ্ঞেসই করে ফেলে, ‘তিন টাকার নোট কি আছে সত্যি সত্যি, জয়নবের মা?

জয়নবের মা মাথা নাড়ে। নেই।

বুকের ভেতর থেকে একটা নিঃশ্বাস বেরোয় ফজলুর। নিজেকে খুব হালকা মনে হয়। যেন দুঃস্বপ্নটা খানিকটা তরল হতে শুরু করল।

‘তুমি কইতাছ?’

‘তিন টাকার নোট নাই, এইটা সত্যি’, জয়নবের মা বলে, তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম দেয় ক্লান্ত হয়ে পড়া সময়কে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘আবার আছেও।’

‘এইডা কী কইলা?’

‘ক্যান, দেহেন নাই? চাইরদিকে দেহেন নাই? কুনখানে নাই তিন টাকার লুট? কন?’

ফজলুর চোখ ছোট হয়ে আসে। কী বলছে মেয়েটা? কী মতলব তার কথার?

‘এট্টু চিন্তা কইরা দেহেন। তিন টাকার নুটে বুঝাই হইয়া গেছে দেশটা।’

জয়নবের মা আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। মতি মিয়া তাড়া দিচ্ছে। আর সময় দেওয়া যায় না।

৫.

জয়নবের মা চলে গেলে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে ফজলু। নিজের ওপর বিরক্ত হয় সে, চোখটা কি কানা হয়ে গেল? চোখে কি বুড়া বয়সের ছানি পড়তে শুরু করেছে? দুই হাতের তালুর পিঠ দিয়ে সে চোখ কচলায়। তারপর তার হাসি পায়। সে জোরে হেসে ওঠে। অট্টহাসি।

ফজলুর গলা মোটা, হাসিটাও মোটা। কিন্তু সেই হাসি কি এতই মোটা যে, হাজত পেরিয়ে, থানা পেরিয়ে একবারে রাস্তায় তা পৌঁছে যাবে। আর তিনটি স্কুলগামী মেয়ে সে হাসির শব্দে থমকে থেমে যাবে এবং একজন জিজ্ঞেস করবে অন্যদের, ‘কে হাসে রে?’ এবং অন্য দুজন প্রায় একসঙ্গে বলবে ‘কোনো পাগল হয়তো?’