default-image

৩১ মার্চ রাতেই আমরা (তাজউদ্দীন আহমদ ও আমি) দমদম এয়ারপোর্টে গেলাম, দিল্লি যেতে হবে। আমাদের সঙ্গে গোলক মজুমদার, শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় ও আরেকজন আছেন। দিল্লিতে যখন পৌঁছালাম, তখন ভোর হয়ে এসেছে। সেখানে বিএসএফের একটা গেস্ট হাউসে আমাদের নেওয়া হলো।

এরপর তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাত্ হয়। যত দূর মনে হয়, ৪ (এপ্রিল) তারিখের দিকে ইন্দিরা গান্ধী নিজে এসে তাজউদ্দীন সাহেবকে রিসিভ করেন।

তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আলোচনায় একটা কথা তাজউদ্দীন সাহেব খুব স্পষ্ট করে বললেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ।... আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক। এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং এটা আমরা নিজেরাই করতে চাই। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা দরকার হবে তা হচ্ছে, আমাদের মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার জন্য আপনার দেশের আশ্রয়, ট্রেনিংয়ের সমস্ত রকম সুবিধা এবং সে ব্যাপারে আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা আর অস্ত্র সরবরাহ। দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রচুর শরণার্থী এ দেশে ঠাঁই নেবে। তাদের আশ্রয় এবং আহারের ব্যবস্থা ভারত সরকারকে করতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

শ্রীমতী গান্ধী তাজউদ্দীন সাহেবের মতের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করার পর মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে দেশের ভেতরে-বাইরে এবং ভারতবর্ষের সঙ্গে সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক প্রসারিত করার প্রয়োজন এবং সেই সব দিক বিবেচনায় একটি সরকার গঠন করা অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়াল। সেই সরকার গঠনের ব্যাপারেই আমরা এম আর সিদ্দিকী, আবদুর রউফ—এঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাঁরা সবাই একমত হলেন, একটা সরকার গঠন এখনই প্রয়োজন। দিল্লিতে বসেই আমরা কিছু চিঠিপত্র পেলাম। যেমন—সৈয়দ সুলতান সাহেবের কাছ থেকে, ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক উদ্দিন ভূঞার কাছ থেকে। এই চিঠিগুলোতে লেখা ছিল, যেন অবিলম্বে সরকার গঠন করা হয় এবং তাজউদ্দীন সাহেব যেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান তখন দিল্লিতে উপস্থিত ছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব, রেহমান সোবহান ও আমি একসঙ্গে মিলে বক্তৃতার একটা খসড়া তৈরি করি। তাজউদ্দীন সাহেব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন, যার কিছু অংশ রেহমান সোবহান এবং কিছুটা আমি লিখি। দিল্লিতে বসেই বক্তৃতাটি টেপে ধারণ করা হয়। এই টেপটির মুখবন্ধে আমার কণ্ঠে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ধারণ করা হয়।

আমরা যাতে যোগাযোগের জন্য সীমান্ত এলাকাগুলোতে যেতে পারি, সে জন্য মিসেস গান্ধী একটা ছোট প্লেনের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল নগেন্দ্র সিংকে আমাদের সমর বিষয়ে সহায়তা করার জন্য উপদেষ্টা হিসেবে দিলেন। তারপর আমরা কলকাতায় ফিরে আসি।

default-image

পরদিন সকালবেলা প্লেনে করে ময়মনসিংহের ওপর যে তুরা পাহাড়, সেই পাহাড়ের কাছে আমরা নামলাম। ওখানে আমরা শুনতে পেলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব এবং আবদুল মান্নান সাহেব একটা রেস্টহাউসে আছেন, পাহাড়ের নিচে বিএসএফের লোক পাঠানো হলো। প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগল তাঁদের এসে পৌঁছাতে। আমরা সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন সাহেব দুজন সেখানেই একান্তে আলাপ করলেন। সব ঘটনা, যা ঘটেছে, সব বিবৃত করলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব ফিরে এসে বললেন, তাঁর সম্পূর্ণ মত আছে এবং আমাদের অভিনন্দন জানালেন। তারপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবকে নিয়ে আমরা আগরতলার পথে রওনা দিলাম।

আমরা আগরতলায় পৌঁছালাম সন্ধ্যায়; তখন ওখানে চট্টগ্রাম, সিলেট এবং অন্যান্য এলাকার সদস্যরা উপস্থিত হয়েছেন। আমাদের প্রথম বৈঠক হলো কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা হলো যে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে সংগঠিত করব। কর্নেল ওসমানী তাঁর মতো করে পরিকল্পনার কথা বললেন যে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা যাবে।

১৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভীষণভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করা হলো। আমরা আগে থেকেই আম্রকাননে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলাম। স্টেজ তৈরি করা হয়েছিল।...সমস্ত পার্লামেন্ট সদস্যের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ হিসেবে ইউসুফ আলী সাহেবকে প্লেনিপোটেনশিয়ারি নিযুক্ত করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়, ইউসুফ আলী সাহেব ঘোষণাপত্রের বাংলা অনুবাদটি পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন সাহেব তাঁদের লিখিত বক্তৃতা দিলেন এবং এই বক্তৃতার কপি সাংবাদিকদের দেওয়া হলো। সে দিনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সাংবাদিকেরা কাভার করলেন যে এটা হলো আমাদের সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা বা আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ। তৌফিক ইলাহী (তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী), মাহবুব (মাহবুবউদ্দীন আহমদ) মেহেরপুরের আম্রকাননে গার্ড অব অনার দিলেন। তাজউদ্দীন ভাই এক বিদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এই জায়গার নামকরণ করেন ‘মুজিবনগর’। আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যুদ্ধের সময় সরকার শুধু এক জায়গায় উপস্থিত থাকবে না, যেখানে সরকার থাকবে সেটাই মুজিবনগর। তারপর আমরা চলে আসি।

সূত্র: স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র

আমীর-উল ইসলাম: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

আজকের অনুভূতি

ন্যায় ও সমাজ রূপান্তরই ছিল লক্ষ্য

একটি শোষণমুক্ত মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্য এ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে, বৈষম্য দূরীভূত হবে, সুযোগের সমতা বৃদ্ধি পাবে—এই লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, রূপান্তরকরণ কীভাবে ঘটানো যাবে। সে ক্ষেত্রে আমরা একটি নীতি গ্রহণ করেছিলাম। ৮০ হাজার নিয়মিত সদস্যসহ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ। স্বাধীনতার পর প্রতিটি ক্যাম্পের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ত করে রাখা—এটা সম্বল করেই জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই জাতির মধ্যে একটি দার্শনিক চিন্তাধারার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদের একটা মানবিক রূপ এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন ইত্যাদি আনার জন্য এই চিন্তা আমরা করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম যে বৈঠক হয়েছিল, সেখানে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। ক্যাম্প রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম ঐক্য ও নিরাপত্তা।

তখন সবকিছু ছাপিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে থাকা অস্ত্র সংগ্রহ করাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরিণত হলো। বঙ্গবন্ধু তখন দেখলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করায় অস্ত্র উদ্ধারই সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণই জনপ্রিয় উদ্যোগে পরিণত হলো।

একাত্তরে আমরা প্রমাণ করেছি, প্রচণ্ড দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ও মানবিকতাসম্পন্ন হয়ে প্রস্তুতি গ্রহণের যে বীজ, সেটা আমাদের সমাজে রয়ে গেছে। এখন সেটাকে নাড়া দিতে হবে; বঙ্গবন্ধু যেমনটা দিতে পেরেছিলেন। প্রত্যেক বাঙালির মধ্যেই একটা সততা ও মানবিকতাবোধের অঙ্কুর আছে। স্কুলের শিক্ষক, পরিবারের সদস্যরা চাইলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সেই অঙ্কুর বিকশিত হতে পারে। ভিয়েতনাম ও চীনে এ ধরনের সামাজিক চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশে এটা গড়ে তোলার ব্যাপারে পূর্ণ উপাদান রয়েছে।