default-image

অক্সফামের সমন্বয়কারী হিসেবে ভারতে ছয় লাখ নারী-পুরুষ ও শিশুর জন্য পরিচালিত শরণার্থী ত্রাণ কর্মসূচিতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব পালন করার সময় বিভিন্ন ব্যাপারে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। শরণার্থী শিবিরগুলোতে যাওয়ার সড়কপথগুলো ভারতীয় সামরিক যানবাহন ও যন্ত্রপাতিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আর ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও কুচবিহারের মতো দূরের জায়গাগুলোতে ত্রাণ সরবরাহ করা ছিল কঠিন। ব্রিটিশ জনগণ অক্সফামের প্রচার কার্যক্রমে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার কম্বল ও উলের কাপড় দান করেছিল। ‘আপনার বিছানা থেকে একটি কম্বল তুলে নিয়ে দান করে দিন’ এবং ‘আপনার শীতের জামাটা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, তা কারও জীবন বাঁচাতে পারে’—জনগণের প্রতি এই দুটি আহ্বান জানিয়েছিল অক্সফাম। ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘ভারতে শরণার্থীরা নতুন এক আতঙ্কের মুখোমুখি হয়েছে। শীতকালে রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যেতে পারে। শিশু ও বৃদ্ধরা এখনকার ঠান্ডায় মরে যাচ্ছে। পূর্ণবয়ষ্ক সুস্থ লোকজনও এই শীতে টিকতে পারবে না। জরুরিভিত্তিতে চাই গরম কাপড়চোপড়, শাল, সোয়েটার, কার্ডিগান বা উলের যেকোনো জামাকাপড়।’

অক্সফামের ঠিকানায় পাঠানো কম্বল ও গরম জামাকাপড়ের জন্য ডাকমাশুল ছাড় দিয়ে ব্রিটিশ পোস্ট অফিস এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আমরা এসব গরম কাপড় ও কম্বল দ্রুত পাঠানোর তাগিদ অনুভব করি। কিন্তু ট্রাকে করে সেগুলো বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছানো অনেক সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। যেমন কলকাতা থেকে আগরতলায় ট্রাক পৌঁছাতে অন্তত ১০ দিন সময় লেগে যেত। তাই আমরা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ এবং কুচবিহারের তৎকালীন মহারাজার বিমানঘাঁটিতে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর জন্য পুরোনো ডাকোটা বিমানের (ডিসি-৩ ও ডিসি-৬) ব্যবস্থা করলাম।

বিজ্ঞাপন

জরুরিভিত্তিতে ২৭ টন ত্রাণসামগ্রী সরবরাহের জন্য অক্সফাম যে বিমানটি ভাড়া করেছিল, তা নিয়েও আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। এতে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ওষুধ (মার্কিন প্রতিষ্ঠানের দান), ৩০ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং কম্বল ছিল। যুদ্ধের কারণে বিমানটিকে কলকাতায় অবতরণের অনুমতি না দিয়ে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাই আমাদের কর্মীদের সেখানে গিয়ে এসব ত্রাণসামগ্রীর শুল্ক ছাড় করিয়ে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। একই সময়ে আমি ওডিশায় ত্রাণ পাঠানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম। সেখানে এক মাস আগে শক্তিশালী এক ঘূর্ণিঝড়ে নয় হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে, আমি যে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি, তা ছিল ঠান্ডায় মানুষের মৃত্যু। ক্ষুধার কারণে মৃত্যুর মতোই ঠান্ডায় মারা যাওয়াটাও ছিল একই রকম ভয়ানক। অল্প দিনের শিশু এবং বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিল। নভেম্বরের শেষের দিকে একপর্যায়ে আমরা হিসাব করে দেখি, সবগুলো শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন অন্তত চার হাজার শিশু মারা যাচ্ছে।

নভেম্বরের শেষ পর্যায়ে সীমান্তের বিভিন্ন কেন্দ্রে যখন প্রচুর গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল, আমাকে কিছু জায়গায় ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ, আমাদের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে কাজ করতে হচ্ছিল। এসব সিদ্ধান্ত ছিল খুব কঠিন। কারণ, আমরা এমন এক সময়ে শরণার্থীদের পরিত্যাগ করছিলাম যখন তারা একটা যুদ্ধের কথা ভেবে উত্তেজিত। তারা ভাবছিল, বাংলাদেশ সত্যিই একদিন স্বাধীন হবে, আর তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। তাদের সব রকমের আবেগই ছিল খুশি, আনন্দ, আর পাশাপাশি কিছু ভয়। বাড়ি ফিরে গিয়ে তারা কী পাবে? একটি শরণার্থী শিবিরের সংগঠককে আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি কী ভাবছেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনারা আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জীবন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। নিজের গ্রামে ফিরে যেতে পারলেই আমার ভালো লাগবে, যদিও বাড়িঘর হয়তো সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবু নিজের দেশ তো নিজের দেশই। কিন্তু এসব আশ্রয়কেন্দ্রে কাটানো দুর্ভোগের স্মৃতি সব সময়ই মনের মধ্যে রয়ে যাবে। ৫০টি শিশু একটিমাত্র ডিম নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে এবং দুধের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে করতে কোনো শিশু বমি করছে এবং মারা যাচ্ছে—এসব ঘটনা মনে থেকে যাবে। আমার মনে পড়বে, কীভাবে কাদার মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী কাতরাতে কাতরাতে সন্তান প্রসব করছিলেন। আহ্‌, বাংলাদেশে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে আমাকে আর কতদিন যে অপেক্ষা করতে হবে।’

আমার মূল্যবান দলিলপত্রের সংগ্রহশালা থেকে দেখতে পাই, বিজয় দিবসের এক দিন আগে (১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১) আমি কলকাতায় বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের আহ্বানে একটি সভায় যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিভিন্ন চাহিদা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। অক্সফামে আমি সেদিন যে তারবার্তা (টেলেক্স) পাঠিয়েছিলাম, তাতে লেখা ছিল: বাংলাদেশ সরকার আশা করে, ভারতে অবস্থানরত শরণার্থীদের অধিকাংশই জানুয়ারির শেষ নাগাদ ফিরে যাবে। এই এক কোটি মানুষের পাশাপাশি আরও আনুমানিক দুই কোটি মানুষ বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়েছে। এসব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের আনুমানিক চাহিদা প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টন। জরুরি যানবাহনের চাহিদা রয়েছে এক হাজার ট্রাক এবং ৫০০টি বাসের। আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাঁশ-জাতীয় উপকরণগুলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

১৯৭১ সালের অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক অনেক স্মৃতি আছে আমার। আর অবশ্যই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের স্মৃতিগুলো এখনো আমার মনে খুব স্পষ্টভাবে শেকড় গেঁথে রয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরটা আমরা যখন শুনলাম, আমার ৩৬ জন সহকর্মীর মধ্যে একই সঙ্গে স্বস্তি ও আনন্দ দেখা গিয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশই সীমান্তের ওপর থেকে এসেছিলেন শরণার্থী হিসেবে। একটি দল হিসেবে আমরা দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করতাম। তাই যখন শুনলাম, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, অনেকের নিঃশেষিত ক্লান্তি এবং আনন্দের অশ্রু ঝরল। আত্মসমর্পণের খবরটা শোনামাত্র আমি সহকর্মীদের এক দিনের ছুটি দিয়ে দিলাম। অনেক মিষ্টি বিতরণ করা হলো। আশপাশে অনেক গান শোনা গেল।

বিজ্ঞাপন

বিজয় দিবসের বিশেষ ছুটির দিনটায় আমি দপ্তরে গিয়ে একা একা বসে গভীর ভাবনায় ডুবে গেলাম। মনে পড়ল তুমুল ত্রস্ততায় ভরা গত কয়েকটি মাসের কথা। সেই দিনগুলোর সমাপ্তির মধ্য দিয়েই তো বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পার্ক সার্কাসের দপ্তরে একা একা বসে আমি বুঝতে পারছিলাম, যে শিশুদের ত্বক ভাঁজ খেয়ে ও ঢিলে হয়ে ছোট ছোট হাড়ের ওপর ঝুলে পড়েছিল, তাদের কথা আমি কখনোই ভুলে যেতে পারব না। মাথাটা তোলার শক্তি পর্যন্ত তাদের ছিল না। অনেক শিশুর পা ফুলে গিয়েছিল। অনেকে মায়ের কোলে অপুষ্টিতে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। ভিটামিনের অভাবে অনেক শিশু অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারও কারও সারা শরীরে এমন ঘা হয়েছিল, যা সেরে ওঠার নয়। তাদের মা-বাবার চোখে আমি দেখেছি সন্তানের আর কখনোই সুস্থ না হওয়ার হতাশা। দেখেছি সেই সব শিশুর মরদেহ, যে আগের রাতেই মারা গিয়েছিল।

অনুবাদ: আশিস আচার্য

জুলিয়ান ফ্রান্সিস: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য অক্সফামের ত্রাণ কর্মসূচির সমন্বয়কারী