default-image

সাফিয়া খাতুনের বয়স এখন ৮৫ বছর। তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়ের মধ্যে জীবিত আছেন শুধু দুই মেয়ে ও এক ছেলে। এখন নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কাটে তাঁর সময়। এখনো চোখে ভাসে ছেলে জাহাঙ্গীরের শেষ বিদায়...শেষ চিঠি।

সেসব দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সাফিয়া বেগম বলেন, ‘চাকরি নেওয়ার পর মাত্র একবার বাড়িতে এসেছিল জাহাঙ্গীর। তখন কোলে মাথা রেখে কেবল দোয়া করতে বলত।’ বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর কয়েক দিন আগে মা একটি চিঠি পান। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘সামনের কোরবানি ঈদে বাড়ি আসব।’ এরপর কত কোরবানি ঈদ এল, গেল, জাহাঙ্গীর আর এলেন না।

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তেই জুটে যায় সেনাবাহিনীর চাকরি। কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তান। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পালিয়ে এসে যোগ দেন যুদ্ধে। ’৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন দেশের এই বীরসেনানী। তাঁরই ইচ্ছানুসারে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ প্রাঙ্গণে।

বিজ্ঞাপন

ছেলের মৃত্যুর ছত্রিশ বছর পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাফিয়া বেগম বললেন, ‘ছেলে গেছে, রাষ্ট্র পাইছি, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের মা হইছি; এর চেয়ে গর্বের আর কী থাকতে পারে!’ তার পরও একান্ত কিছু কষ্ট আছে: ‘সরকার ছেলের নামে জাদুঘর করে দিতে আছে, এইটারে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ওই জাদুঘরের জন্য জায়গাডার ব্যবস্থাও যদি সরকার করে দিত, তাইলে আরও ভালো হইত।’

নদীভাঙনে বিপর্যস্ত প্রত্যন্ত গ্রাম রহিমগঞ্জ। সিডরে গ্রামটির আরও লণ্ডভণ্ড দশা। এরই মধ্যে চলছে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার নির্মাণের কাজ। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বরিশাল জেলা পরিষদ ৪৯ লাখ টাকা ব্যয় করছে এই কাজে। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবার থেকে দান করা ৪০ শতাংশ জায়গার ওপরে নির্মীয়মাণ একতলা এই ভবনে থাকবে পাঠাগার, জাদুঘর ও মিলনায়তন। জাদুঘরে থাকবে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ব্যবহূত বিভিন্ন সামগ্রী। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভবনের কাজ শেষ হবে।

বদলে যাচ্ছে আগরপুর ইউনিয়নের নামও। শিগগিরই ইউনিয়নটির নাম হবে ‘জাহাঙ্গীরনগর’। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বছর দুয়েক আগে বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা সেতুর নাম হয়েছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু। কিন্তু বরিশাল নগরীতে এখন পর্যন্ত তাঁর নামে কিছু নেই। কেবল নগরীর কাশিপুরে নিজস্ব সম্পত্তির ওপর সরকারি টাকায় একতলা একটি ভবন করে দেওয়া হয় আশির দশকে। এ সময় বাড়ির সামনের একটি গলির নাম দেওয়া হয় শহীদ সরণি। এ ছাড়া মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে ’৭৩ সালে রহিমগঞ্জে তাঁদের বাড়ির সামনে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানটির দিকেও সরকার বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম নজর ছিল না। সে কারণে ওই স্কুলের অবকাঠামোগত সমস্যা প্রবল, শিক্ষার মানও খারাপ।

বিজ্ঞাপন