default-image

দূরে থাকি বলেই বোধহয় ব্যথা বুকে এত প্রবলভাবে বাজে। দেশের ভেতর, তার ভালোমন্দ নিয়ে যারা আছেন, তাদের গায়ে অন্যের ছুড়ে দেওয়া থুথু লেগেও লাগে না। চোখ তুলে তাকালেই যেখানে মলের ভাণ্ড, সেখানে সবাই ব্যস্ত নাকে রুমাল দিতে, নয়তো গাড়ির জানালার কালো কাচ সেঁটে রাখতে। কে কী বলল তা নিয়ে ভাবার সময় কোথায় তাদের! তা ছাড়া চারদিকে এত থুথু যে, তা এখন সবার গা-সওয়া হয়ে গেছে।

আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি, তাদের কথা আলাদা। অন্য কোনো দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো, সে কথাটাই বলি, বলতে চাই। কিন্তু যখন কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশ পৃথিবীতে দুর্নীতিতে সেরা, দারিদ্র্যে প্রথম কয়েকটি দেশের একটি, সাংবাদিক পেটানোয় রেকর্ড-হোল্ডার, সংখ্যালঘু দমনে চ্যামিঙ্য়ন, মেয়েদের অধিকার হরণে শেষের দিক থেকে তিন নম্বর, তখন মুখটা ছোট হয়ে আসে। মন্ত্রী বাহাদুররা এবং কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী/কলাম লেখক— সেসব কথা বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে যতই উড়িয়ে দেন না কেন, আমরা তো জানি আয়নায় নিজের মুখখানি কেমন। চোখ বুজে নিজেকে বুঝ দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যকে ঢাকব কী করে?

বিজ্ঞাপন

মানি বা না মানি, বিদেশে বাংলাদেশের ‘ইমেজ’টি খুব সুন্দর নয়। ইমেজ সুন্দর না হলে নানা সমস্যা— তার একটি হলো বিদেশী বিনিয়োগে কমতি। ঋণ বা অনুদান পাঠালে কর্তামহাশয়েরা তার সিংহভাগ নিজেরাই খেয়ে ফেলেন, সে কারণে সাহায্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বেলায় হয়েছেও তাই। স্কান্ডেনেভিয়ার একটি দেশ ও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বলেছে, এরা উেকাচ চেয়েছেন। উেকাচ দেওয়া সম্ভব নয়, ফলে তারা সাহায্য দেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। সমস্যা আরো রয়েছে। ইমেজের কারণে বাঙালিদের বিদেশে ভিসা পেতে এখন চৌদ্দ মণ কাঠখড় পোড়াতে হয়। এয়ারপোর্টে পায়ের জুতো খুলতে হয়, টিপসই দিয়ে প্রমাণ করতে হয় টেররিস্ট নই। পদে পদে হেনস্থা।

ইমেজ সমস্যা যে একা বাংলাদেশের তা নয়। তার দেশের ভেতর আমেরিকা নিজেকে যত সাফ-সুতরো বলে দাবি করুক না কেন, দেশের বাইরে, বিশেষ করে মুসলিম ও আরব বিশ্বে তার সম্মান এখন হাঁটুর কাছে। সৌদি আরব বা পাকিস্তানিদের সমস্যাও একই রকম। কিন্তু এসব দেশের কেউই ছ্যা ছ্যা বলে তাদের ইমেজ সমস্যাকে কার্পেটের তলে লুকিয়ে রাখেনি। বরং কীভাবে তাদের ‘ইমেজ’ সংস্কার করা যায় সে কাজে পুরোদস্তুর লেগে গেছে। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টে একটি নতুন রাষ্ট্রদূতের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যার একমাত্র কাজ বিদেশে আমেরিকার ইমেজ ঘষামাজা করা। আধা ডজন কমিশন এখন কাজ করছে ঠিক কী করলে আমেরিকা তার ইমেজ ফিরে পাবে তার বুদ্ধি ও পথ বাতলে দিতে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন থেকেই তার ইমেজ সংস্কারের জন্য বিশ্বের সেরা পাবলিক রিলেশনস কোমঙ্ানির সাহায্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। পাকিস্তানও এখন সে পথে পা বাড়িয়েছে।

এ ব্যাপারে আমরা কী করতে পারি?

ঠিক এই প্রশ্নটির মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছিল গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান হোসেতে আমেরিকায় বসবাসরত প্রকৌশলী ও স্থপতিদের একটি সম্মেলনে। আরো অনেক আমন্ত্রিত বক্তা সেখানে ছিলেন— তাদের কেউ অর্থনীতিবিদ, কেউবা সম্মানিত বিজ্ঞানী, কেউবা সফল শিল্পপতি। আমার দায়িত্ব ছিল তথ্যব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি বিবেচনা করা। অভিবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, তাদের নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিত থেকে সে প্রশ্ন আলোচিত হলেও সমস্যাটির গুরুত্ব সব বাঙালির কাছেই সমান। দেশের ভেতরে বা বাইরে, সর্বত্রই এ ব্যাপারে তারা বিব্রত হন, এ নিয়ে কী করা যায় তা ভাবেন। কোনো সমাধান দেওয়ার জন্য নয়, এ প্রশ্ন নিয়ে আরো আলোচনা হবে, সে বিবেচনা থেকেই ছয়টি প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে আমরা নিজের ভাবনাগুলো হাজির করছি।

প্রশ্ন ১ : কোনো দেশের ইমেজ কী করে গঠিত হয়? এ ব্যাপারে তথ্যব্যবস্থার ভূমিকা কী?

কোনো ব্যক্তি বা কোনো বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বেলায় যেমন, কোনো দেশের বেলাতেও তার ইমেজ বা ভাবমূর্তি হচ্ছে মানুষের মনে তার সমের্ক যে ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তার যোগফল। একদিনে নয়, ধীরে ধীরে মানুষের মনে এই ভাবমূর্তির প্রতিষ্ঠা হয়। কোনো একটি ঘটনার ফলে কোনো ব্যক্তি মানুষের ভাবমূর্তি বদলে গেলেও দেশের বেলায় তা বদলানো তত সহজ নয়, তা ভালো বা মন্দ যে ভাবমূর্তিই হোক না কেন। ওয়ালটার লিপম্যানের কথা ধার করে বলা যায়, এসব ধারণা অনেকটা আমাদের মাথায় সেঁটে থাকা ছবির মতো (‘পিকচারস ইন আওয়ার হেড’)। একবার নয়, অনেকবার দেখার পর, শোনার পর, সে ছবি তৈরি হয়। তা একবার মাথায় সেঁটে গেলে শুধু একটি শব্দ বা একটি ছবি দিয়েই পুরো একটি দেশ বা জাতির চেহারা আমাদের মনে ভেসে ওঠে। সেসব ছবিই হয়ে পড়ে সে দেশ অথবা সে জাতির সিম্বল বা প্রতীকস্বরূপ। ‘হলিউড’ শব্দটা ধরুন। শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে জেগে ওঠে স্বল্পবসনা সুন্দরীদের ছবি। ‘সিলিকন ভ্যালি’ শুনলেই আমরা ভাবি তথ্যপ্রযুক্তির সদর দপ্তর। ‘মেড ইন জার্মানি’ শুনলে আমাদের মনে হয় নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি বা মেশিনের কথা। সোভিয়েত ইউনিয়ন শুনলে ভাবি গুলাগ, রেড স্কয়ার ও লিওনিদ ব্রেজনেভের মদোমাতাল মুখ।

বিজ্ঞাপন

কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী বিষয়ে কোনো বিশেষ ছবির জন্ম কেন হয়, তার নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হওয়া সম্ভব। কিন্তু যে বিষয় নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই তা হলো এসব কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে তা ক্রমশ আমাদের মাথায় আশ্রয় পায়। প্রায় সবক্ষেত্রেই তথ্যমাধ্যমের গাড়ি চড়েই এসব ছবি পাড়ি জমায়। তথ্যমাধ্যম বলতে আমি সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং আজকাল ক্রমশ জনপ্রিয় ইন্টারনেটের কথাই বোঝাচ্ছি। এই তথ্যমাধ্যমসমূহের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা এখন প্রায় নিরঙ্কুশ। দৈনন্দিন ঘটনাবলির জন্য তো বটেই, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, সে ধরনের মূল্যনির্ভর প্রশ্নে সিদ্ধান্তের জন্যও আমরা আজ দ্বিধাহীনভাবে প্রধানত জনপ্রিয় বা তথাকথিত মূলধারার তথ্যমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর সবখানেই আজকাল তথ্যমাধ্যম বৃহত্ ব্যবসায়ের অন্তর্গত। মালিকানার পার্থক্য সত্ত্বেও প্রায় সব জনপ্রিয় তথ্যমাধ্যমই বলতে গেলে একই ভাষায় কথা বলে, একই ইমেজ পুনঃ পুনঃ পরিবেশন করে। এদের কাজ, নোয়াম চোমস্কির ভাষায়, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণীর পক্ষে বা তাদের জন্য অনুকূল এমন নীতির পক্ষে অভিন্ন মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করা (‘টু ম্যানুফেকচার কনসেন্ট’)। তথ্যমাধ্যমের প্রভাবের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, দেশী-বিদেশী অধিকাংশ নীতিগত প্রশ্নেই আমাদের ধারণা বা বিশ্বাস প্রায় অভিন্ন। তারা আমাদের যেভাবে গেলাচ্ছে, আমরা সেভাবেই গিলছি। তথ্যের বিকল্প উত্স যে নেই তা নয়, কিন্তু মূলস্রোতধারার সংবাদ মাধ্যমের উপস্থিতি আজ এত প্রবল ও সর্বব্যাপী যে, কোনো বিকল্প তথ্যউেসর পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। যেমন টিকে থাকা অসম্ভব ১০ তলা সুপার মার্কেটের পাশে পাড়ার মুদিখানা অথবা ফাস্টফুডের ফুড কোর্টের পাশে পাড়ার পুরনো রুটির দোকান।

মূলধারাভুক্ত তথ্যমাধ্যম যে ‘ইমেজ’ সৃষ্টিতে সাহায্য করে, তা একদম বাস্তবতা বিবর্জিত, তা মোটেই নয়। বরং উল্টোটাই বেশি সত্য। আজকের তথ্যব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণিক, এই ইন্টারনেটের যুগে ডাহা মিথ্যা বলে পার পাওয়া খুব সহজ নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সত্যের একটি বিশেষ চেহারা, তার একপেশে চেহারা নির্মাণে তথ্যব্যবস্থা দায়ী, এ কথা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। তুলনা হিসেবে ফটোগ্রাফির সঙ্গে তথ্যমাধ্যমের বিচার করতে পারি। তার ফটোগ্রাফের বিষয় হিসেবে একজন চিত্রগ্রাহক লেন্স তাক করেন সে বিষয়ের কোনো একটি বহিরঙ্গ— তার কোনো একটি অ্যাঙ্গেলের দিকে। সে লেন্সে যে দৃশ্যটি ধরা পড়ে— ধরা যাক হাস্যরত একটি সুখী বালিকার মুখ— তা প্রামাণিক। তার নিকটবর্তী পরিপার্শ্বকে কার্যত নির্মূল করে লেন্সের ফোকাসটি পড়ে শুধু ওই হাসিমাখা মুখটির ওপর। যদি আরো খানিকটা পরিসর নিয়ে ফোকাসটি ফেলা হতো, তাহলে হয়তো দেখা যেত মেয়েটির হাতের বাঁ দিকে রয়েছে একটি ডাস্টবিন, সেখানে উচ্ছিষ্ট আহরণরত এক ডজন বালক-বালিকা এবং তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতারত একটি কুকুর। অন্য কথায়, প্রথম ছবিটি যে বাস্তব উদ্ধার করল, বাস্তবতার পূর্ণ আদলের সঙ্গে তার কার্যত কোনো মিলই নেই। আসলে সত্য বা বাস্তব কোনো স্নাপশট নয়, তার জন্য চাই একটানা ভিডিও। স্নাপশটের মাধ্যমে পূর্ণ সত্য উদ্ধারের পরিবর্তে সমঙ্ূর্ণ নির্বাচিত বা আরবিট্রারিলি— সে সত্যের শুধু একটি আদল বা বিশেষ চেহারা উদ্ধার সম্ভব হয়। অথচ সে একপেশে ছবিটি যখন আমরা বারবার দেখি, তাকেই আমরা একমাত্র সত্য বা বাস্তব বলে গ্রহণে দ্বিধান্বিত হই না। আর এভাবেই অর্ধ অথবা সিকি সত্য একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা পায়।

default-image

সত্যের এ রকম আরবিট্রারি ব্যবহার একটি চতুর এবং কখনো কখনো মোটেই তেমন চতুর নয় এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো যায়। সামঙ্রতিক সময়েই তার বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। মূলধারার তথ্যমাধ্যমে ‘মৌলবাদ’ শব্দটির যে ব্যবহার দেখি, আমাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বিবেচনা করা যাক। ‘মৌলবাদী’ শব্দটির যে নির্বাচিত অভিধা এখন প্রদান করা হয়েছে, তার ফলে শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার জন্য নির্ধারিত বা অ্যাসাইনড চিত্রটিও আমাদের মাথার মধ্যে জেগে ওঠে। এখন মৌলবাদী মানেই মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমান। এরা সন্ত্রাসবাদী, মার্কিনবিরোধী এবং অতি প্রাচীন মূল্যবোধের অনুগত। জিহাদের জন্য প্রাণ উত্গর্সে তারা সদা তত্পর। মানছি, কোনো কোনো মুসলমান হয়তো মৌলবাদী এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ সন্ত্রাসবাদের সঙ্গেও জড়িত। কিন্তু মুসলমান, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ— এই তিনটি চিত্রের সমান্তরাল ব্যবহারের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমের চোখে এখন পৃথিবীর মুসলমান মাত্রই মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদী।

‘আমেরিকার নিগ্রো’ বা ‘আফ্রিকান-আমেরিকান’ চিত্রটির কথা বিবেচনা করা যাক। মূলধারা তথ্যমাধ্যমে সব কৃষ্ণকায়কে একটি অভিন্ন বা হমোজিনিয়াস গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই গ্রুপটির পরিচিতি মুখ্যত অনুন্নয়ন, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি ও ওয়েলফেয়ার ব্যবস্থার ভোক্তা হিসেবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমেরিকার কালো মানুষেরা এসব সমস্যার বাইরে নয়। কিন্তু সমস্যাটি বর্ণগত নয়, তা শ্রেণীগত। আমেরিকার এবং অধিকাংশ মূলধারার— তথ্যমাধ্যমে কৃষ্ণকায়দের ক্ষেত্রে নির্বিচারে শুধু এই চিত্রগুলোর পুনঃ পুনঃ প্রয়োগের ফলে দাঁড়িয়েছে এই যে, অনেকেরই চোখে তারা একটি ‘নেশন অব ক্রিমিনালস’ ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ আমেরিকার কালো মানুষেরা যে আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়, তারা যে সেরা গায়ক ও অভিনেতা, সেরা মানবাধিকার কর্মী ও ধর্মযাজক, সে কথা আমাদের মাথায় থাকেই না। এই ইমেজ নির্মাণ এখন এতটাই সর্বব্যাপী ও প্রতিবাদহীন যে, জেসি জ্যাকসনের মতো কৃষ্ণকায় নেতা পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, ওয়াশিংটনে একলা রাস্তায় কালো যুবকদের দেখলে তিনি সে পথ এড়িয়ে চলেন।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন ২ : বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কেমন?

এ উত্তর হয়তো অনেকেরই জানা। আমরা যা জানি বা যা জানি বলে ভাবি— তাই ঠিক কি না, তা পরখ করে দেখার জন্য আমি আমার বিভিন্ন দেশের সহকর্মীদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখেছিলাম : ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের মাথায় কোন ছবিটি ভেসে ওঠে। মোট ১৬ জন নারী-পুরুষ আমার প্রশ্নের জবাব দেন। জনপ্রিয়তার হিসেবে তাদের জবাবের তালিকাটি এ রকম :

জনাধিক্য

দারিদ্র্য

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

দুর্নীতি

গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র

সবুজ গ্রাম।

মানছি, এটি খুবই অবৈজ্ঞানিক জনমত গণনা, কিন্তু বাংলাদেশের একটি মোটামুটি বাস্তবসম্মত চেহারা— বিদেশে তার ইমেজ কেমন— তার একটি হিসাব এতে ধরা পড়ে। ব্যাপারটা আরেকটু বৈজ্ঞানিক করার জন্য আমি ইন্টারনেটে ‘গুগল’ সার্চ করি। সেখানে নির্বাচিত ‘কুব ড়িত্ফং’ ব্যবহার করে ১৫-২০ সেকেন্ডের মধ্যে আমি যে সার্চ-রেজাল্টস পাই, সেটি এ রকম :

দারিদ্র্য (৬৮৬,০০০ হিটস)

জনাধিক্য (৬৫০,০০০ হিটস)

সহিংসতা (৪৯৩,০০০ হিটস)

গণতান্ত্রিক (৩৯৪,০০০ হিটস)

দুর্নীতি (২৬৯,০০০ হিটস)

মৌলবাদী (১৩,৯০০ হিটস)

একক চিত্র বা সিম্বলের মাধ্যমে বাংলাদেশের এই যে পরিচয়, যার কোনোটিই ভুল বা মিথ্যা নয়, তা দেখে আমাদের জ্বর আসা স্বাভাবিক। এক ‘গণতান্ত্রিক’— এই পরিচয় ছাড়া এই চিত্রের কোনোটিই আমাদের আনন্দিত করে না, আমাদের আশাবাদী করে না। ধারণা করি, বাংলাদেশের ভেতর এই ছবির কোনোটিই হয়তো এখন আর তেমন বিস্ময় বা উদ্বেগের সৃষ্টি করে না। কিন্তু প্রবাসে এই চিত্রের কারণে আমাদের প্রতিদিন মাথা হেঁট হয়, আমরা দৈনন্দিন গ্লানির শিকার হই। (পত্রিকায় দেখেছি, সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ পর্যন্ত বিদেশে এলে ‘লজ্জায় অধোবদন হন’ বলে মন্তব্য করেছেন।) গত বছর বাংলাদেশ তৃতীয়বারের মতো ‘সেরা দুর্নীতিবাজ’ বলে ‘পুরস্কৃত’ হওয়ার পর আমার হাইস্কুলে পড়ূয়া মেয়ে মুখ গোমড়া করে বাসায় ফিরে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, এ কথা কি ঠিক যে বাংলাদেশ পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ দেশ?’ আমার ছোট মেয়ে, যে এখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে, তিন সপ্তাহ আগে ইউনিসেফের একটি ফ্লায়ার হাতে নিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দেখেছ, এখানে লিখেছে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশ, কী মিথ্যা কথা।’ সে এতই দুঃখ পেয়েছিল যে, ইউনিসেফের জন্য অর্থ সংগ্রহে যেতে তাকে আমি রাজি করাতে পারিনি।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের ইমেজ নিয়ে আমার একটি ভিন্ন ধরনের বিব্রতকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ঘরভর্তি মানুষ মিলে আমরা টিভিতে নামজাদা অভিনেত্রী রোজ্যান বারের হাসি-মস্করা দেখছিলাম। বেজায় মোটা তিনি, ক্যানকেনে গলায় কথা বলেন। মুখ টিপে হাসতে হাসতে তিনি জানালেন, রোগা কী করে হওয়া যায় তা জানার জন্য তিনি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। ডাক্তার তাকে জানালেন, ‘বাপু, তুমি মাসখানেক বাংলাদেশে গিয়ে থেকে আসো। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ রোজ্যানের সে কথা শুনে ঘরভর্তি মানুষ হেসে আকুল। আমি বুঝে পাই না এতে হাসির কী হলো। আমার এ কথা বুঝতে খানিক সময় লেগেছিল, রোজ্যান আসলে আমাদের দারিদ্র্য নিয়ে ঠাট্টা করছেন। দেশটি এত গরিব, সেখানে খাদ্যের এমন অভাব যে, সেখানে গেলে রোজ্যান না খেয়েই কচি বাঁশের মতো তন্বী হয়ে ফিরবেন।

হাসি শুনে খচ করে বুকে লাগে। আমরা যে গরিব সে কথা আমাদের চেয়ে ভালো কে জানে! কিন্তু গরিবি ছাড়া আর কোনো পরিচয় কি আমাদের নেই?

সেই ১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বলেছিলেন, তারপর থেকে হেন জায়গা নেই যেখানে বাংলাদেশে দারিদ্র্য তার প্রধান পরিচয় হিসেবে উদ্ধৃত হয়নি। আমেরিকার তথ্যমাধ্যমে যখনই গরিবির উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, অমনি বাংলাদেশ নামক দেশটি স্মরণ করা হয়। আমেরিকার একশ্রেণীর নাগরিকের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন দেশের সঙ্গে তুলনা করা হবে? অবশ্যই বাংলাদেশ। নিউইয়র্কের হার্লেমে শিশুমৃত্যুর হার অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। কতটা খারাপ তা বুঝব কী করে? বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করো, তাহলেই বুঝবে। সিডনির পানি ভয়াবহ রকম খারাপ। কিন্তু ভয়াবহ মানে কতটা খারাপ? নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজধানীর খাবার পানির যে মান, প্রায় তার কাছাকাছি।

প্রশ্ন ৩ : বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি তা কি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?

গত মাসে বাংলাদেশ চতুর্থবারের মতো ‘সেরা দুর্নীতিবাজ’ এ শিরোপা জিতে নেওয়ার পর শিশির ভট্টাচার্য্য প্রথম আলোয় একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ যেন একটি আপেল। বাইরেটা তার টুকটুকে লাল, আর ভেতরটা পোকায় ভরা।

আমার মনে হয় না শিশিরের আঁকা সে কার্টুনে বাংলাদেশের সঠিক চেহারা ধরা পড়েছে। তার কল্পনায় বাংলাদেশ যে আপেল, তার ভেতরটা যেমন পোকায় খাওয়া, বাইরেটাও তেমনি কীটদষ্ট। বাংলাদেশ গরিব, সে দুর্নীতিবাজ, নিজের দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সে নির্যাতন করে, সেখানে খোদ সরকার মৌলবাদীদের আশ্রয় দেয়, সহিংসতা সেখানে দৈনন্দিন ব্যাপার। এর কোনটা সত্য নয়? মন্ত্রী বাহাদুররা যাই বলুন, আমরা জানি এসব কথার ভেতর পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমের কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ নেই।

কিন্তু এও তো মানতে হবে যে, বাংলাদেশের পরিচয় শুধু এই তিন বা চারটি ইমেজের ভেতর দিয়ে প্রকাশ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দরিদ্র, কিন্তু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অন্য যেকোনো গরিব দেশের চেয়ে সে এগিয়ে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সে শিকার হয়, কিন্তু সাহস ও সংহতির সঙ্গে সে দুর্যোগকে সে প্রতিহতও করে। সামরিক-বেসামরিক দুঃশাসন তাকে বছরের পর বছর আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, কিন্তু সে দুঃশাসনের কাছে সে তো মাথা নোয়ায়নি। গণতন্ত্র ও বৃহত্তর মানবাধিকারের জন্য তার সংগ্রাম বিরামহীন থেকে গেছে। সরকারের ওপর ভরসা না রেখে সে দেশ অপ্রচলিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ঋণ খাতে বেসরকারি কর্মোদ্যম গড়ে তুলেছে। পৃথিবীর অনেক দেশের কাছেই তার সে উদ্যম এখন সাফল্যের মডেল হিসেবে প্রশংসিত। এ ছাড়াও তার রয়েছে অসম্ভব ধনী শিল্প ও সংস্কৃতি।

এই ছবিগুলো, যার সঙ্গে পৃথিবীর মানুষ খুব কমই পরিচিত, তার কোনটির জন্য আমাদের মাথা হেঁট হয়?

প্রশ্ন ৪ : বাংলাদেশের একপেশে ইমেজের জন্য কি পশ্চিমা তথ্যব্যবস্থা দায়ী?

মোটেই না। আয়নায় যদি টুটাফাটা বা কদাকার ছবি দেখা যায়, তার জন্য আয়নার কী দোষ? সে আয়না ভেঙে ফেললে কি সেখানে যে ছবি প্রতিফলিত হয় তা হাওয়া হয়ে যাবে? মোটেই না। বাংলাদেশে দুর্নীতি হয় বলেই না সে খবর পত্রিকায় ছাপা হয়। মৌলবাদীরা মেয়েদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেয় না বলেই না সে খবর বিদেশী পত্রিকায় শিরোনাম হয়। হিন্দুদের ঘর জ্বালিয়ে দেই বলেই না বিবিসি আমাদের সংখ্যালঘুদের নিয়ে তথ্যচিত্র বানায়। দোষ তো মোটেই বিদেশী তথ্যমাধ্যমের নয়, আমাদের।

কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ নিয়ে কোনো ভালো খবর নেই, তা তো হতে পারে না। পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্বন্ধে ভালো বা ধনাত্মক তেমন কিছু দেখি না, তার কারণ এই নয় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা আছে। আসলে ভালো খবরের জন্য পত্রিকার পাতায় কোনো খালি জায়গাই নেই। নিজের দেশের পত্রিকাতেই কোনো ভালো খবর দেখি না, বিদেশী পত্রপত্রিকা বা টিভি আমাদের ভালো খবর নিয়ে ভাববে, এমন আশা করা বাতুলতা। মানুষ কুকুরকে কামড়ালে তবেই না খবর হয়, কুকুর মানুষ কামড়েছে তা আবার কবে খবর হলো? এ কথা আগে যেমন সত্য ছিল, এই ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের যুগেও তেমনি সত্য। আসল কথা হলো, আজকের তথ্যমাধ্যম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ‘মন্দ’ খবর পরিবেশনায় আগ্রহী। যত বড় মড়ক তত বেশি কলাম-ইঞ্চি খবর। আর মন্দ টাকা যেমন ভালো টাকাকে বাজার থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে, মন্দ খবরও তেমনি ভালো খবরকে পত্রিকার পাতায় বা টিভির পর্দায় জায়গা দেয় না। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশ নিয়ে কোনো ভালো খবর ছাপা হয় না কেন, এ অভিযোগ করায় সে পত্রিকার সাবেক দক্ষিণ এশীয় ব্যুরো প্রধান বারবারা ক্রসেট এক সময় আমাকে বলছিলেন, ভালো বা মন্দ কোনো খবরই তো আমরা বানাই না। আমরা চোখে যা দেখি কেবল তাই পরিবেশন করি।

তার কথাটা হয়তো ঠিক। বিদেশী পত্রিকা যখন শুধু মন্দ খবর ছাপবে, তখন আমাদের সে খবরের শিরোনাম না হওয়ার একটাই পথ, আর তা হলো যতটা সম্ভব মন্দ খবর সৃষ্টি না করা। দেশের ভাবমূর্তির বারোটা বাজার পেছনে প্রধান কারণ সুশাসনের অভাব। সুশাসন মানেই হলো ‘ক্ষমতার দক্ষ, সত্, সমানুপাতিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক’ ব্যবহার। যে দেশে তার সরকার মাথা থেকে পা পর্যন্ত অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে গ্রাম সরকার পর্যন্ত সকল স্তরে ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারে সক্ষম, তাকেই বলব সুশাসিত দেশ। মাছের পচন যেমন ধরে তার মাথা থেকে, দেশের পচনও শুরু হয় রাজপ্রাসাদে। কথাটা আমার নয়, প্রাচীন ভারতীয় অর্থশাস্ত্রবিশারদ কৌটিল্যের। আমেরিকার আজকের যে সমস্যা তার প্রায় সবটাই হোয়াইট হাউসের দোরগোড়ায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সৌদি আরব বা পাকিস্তান, সেখানেও অবস্থা অভিন্ন। কথাটা বাংলাদেশের বেলায় কতটা সত্য তা বোধহয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। এক সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার পুরনো সরকারের নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে কতগুলো দুর্নীতির মামলা ঝোলান, সেটা হিসাব করলেই তা বোঝা যাবে।

মন্দ খবর যেসব কারণে হয়, তার টুঁটি চেপে ধরলেই কিন্তু বিদেশী পত্রপত্রিকায় আমাদের নিয়ে গল্প ফাঁদার সুযোগ কমে যায়। মন্দ খবরের টুঁটি চেপে ধরা মানে হলো সুশাসনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা। কিন্তু সে পথে না গিয়ে বাংলাদেশ সরকার মন্দ খবর বন্ধের যে সহজ পথটা বেছে নিয়েছে তা হলো বিদেশী সাংবাদিকদের আসতে না দেওয়া। অথবা যে বিদেশী পত্রিকা আমাদের নিয়ে সমালোচনা করে, দেশের ভেতর তার বিলি-বণ্টন বন্ধ করে দেওয়া। সমালোচনা করতে পারে, এই ভয়ে গত বছর নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক সাংবাদিককে বাংলাদেশে যেতে দেওয়া হয়নি। একই পত্রিকার আরেক সাংবাদিক ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে এসেছিলেন। তার পেছনে দুই ডিটেকটিভ বসিয়ে রাখা হয় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরোটা পথ। বিখ্যাত লেখক মনিকা আলীকে পর্যন্ত ভিসা দিতে অস্বীকার করা হয়েছিল, কারণ তিনি লেখক হিসেবে ভিসা চেয়েছিলেন।

এসব ফন্দি-ফিকিরের কোনোটাই বাংলাদেশের ইমেজ উন্নয়নে সাহায্য করে না, করবেও না।

প্রশ্ন ৫ : কিন্তু তাই বলে আমাদের ইমেজ বাড়াতে তথ্যমাধ্যমের কোনো দায়-দায়িত্বই কি নেই?

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বলে কিছু নেই। যা আছে তা হলো ভালো সংবাদিকতা এবং মন্দ সাংবাদিকতা। খবরের ভালো-মন্দ বিচারের দায়িত্ব সাংবাদিকের নয়। সব ধরনের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিবেশন করাই সংবাদপত্র বা অন্য সব তথ্যমাধ্যমের কাজ। সে কাজে ব্যর্থ হলেই তাকে বলব ব্যর্থ সাংবাদিকতা।

ভালো-মন্দ বিচারের মানেই হলো ভ্যালু জাজমেন্ট। রাজনীতি, মতাদর্শ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম— ভালো-মন্দের যে গজফিতাই আমরা ব্যবহার করি না কেন, তার মোদ্দা ফল দাঁড়াবে এই যে, দেয়ালের যে ধারে আমরা দাঁড়িয়ে তাকেই বলব ভালো, আর সব কিছু মন্দ। সরকার বা সরকারি পক্ষ যখন দায়িত্বশীল সংবাদিকতার অভাবের কথা বলে সাংবাদিকদের গাল দেন, তখন নিজেদের স্বার্থের এই গজফিতা ছাড়া আর কোনো মানদণ্ডই তারা ব্যবহার করেন না। দেশে খুনোখুনি বাড়ছে, এ কথা বললে দেশের মর্যাদাহানি হয় বলে সরকারের মন্ত্রী দাবি করতে পারেন। সে খবর না ছেপে গতকাল প্রধানমন্ত্রী মালিবাগে যে নতুন মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন, সে কথা তিন কলামে ছবি দিয়ে ছাপেন না কেন আপনারা— এ অভিযোগ তিনি আনতেই পারেন। কিন্তু সত্যি সত্যি যদি খুনোখুনি বাড়ে আর সে কথা পত্রিকা না লেখে, তাহলে সংবাদপত্র তার নির্ভরযোগ্যতা হারায়। আমরা তাকেই বলব মন্দ সাংবাদিকতা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামঙ্রতিক সময়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে প্রচারণার সূত্রে আমরা ‘সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব’ বলে অনেক কথাই শুনেছি। দেশের স্বার্থ আর সংবাদপত্রের স্বার্থ অভিন্ন। তাই দেশের জন্য যা ভালো তাই লিখতে হবে, দেশের জন্য যা ভালো নয়, তা চেপে যেতে হবে। দেশের স্বার্থ মানে সরকারের স্বার্থ, আর সরকারের স্বার্থ মানে সরকারপ্রধান যা বলেন তার পক্ষাবলম্বন। এই সরল যুক্তি মেনে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকদের ইরাকে মার্কিন আক্রমণকে সমর্থন করতে হয়, গুয়ানতানামো বে-তে জেনেভা চুক্তি লংঘন করে বিদেশী যুদ্ধবন্দি আটকে রাখা সমর্থন করতে হয়, তথাকথিত প্যাট্রিওট অ্যাক্টকে বাহবা দিতে হয়। আগ-পিছ বিবেচনা না করে, কোনো কোনো সাংবাদিক তা করেছেনও বটে। ইরাকে মার্কিন আক্রমণের ঠিক আগে আগে নিউইয়র্ক টাইমস-এর নামজাদা সাংবাদিক জুডিথ মিলারের সঙ্গে এক সেমিনারে অংশ নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। সে সেমিনারে জুডিথ মিলার আমাদের এ বলে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, সাংবাদিকতার চেয়ে দেশপ্রেম অনেক বেশি জরুরি। জাতির জীবনে কখনো কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যখন পেশাদারি দায়িত্বের চেয়ে নাগরিক দায়িত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তো, ঠিক কোন নাগরিক দায়িত্বের কথা জুডিথ মিলার বলছিলেন? আমরা জানি, সাদ্দাম হোসেনের কাছে পারমাণবিক মারণাস্ত্র আছে— এই যুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে বসে। জুড়িথ মার্কিন সরকারের সে দাবির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের কথাই বলছিলেন। তিনি নিজে শুধু যে সে সমর্থন দিয়েছেন তাই নয়, আগ বাড়িয়ে পত্রিকায় নানা প্রতিবেদন পাঠিয়ে জানিয়েছেন যে, তিনি নিজে সরেজমিনে তদন্ত করে সে মারণাস্ত্রের খোঁজ পেয়েছেন।

টাইমস-এর প্রথম পাতায় তার সে খবর বড় বড় করে ছাপাও হয়েছে। আমরা এখন জানি, জুডিথ সরকারি দাবি সমর্থন করে তার দেশপ্রেমে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু সত্যি কথা বলেননি। ইরাকে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তাকে সরকারি মুখপাত্র যা বলেছেন, বিনা প্রশ্নে সেটাই তিনি ছেপে দিয়েছেন। ইরাকে মার্কিন আক্রমণের ফলে ৫০ হাজার বা তারচেয়েও বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে কোনো কোনো পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। সে যুদ্ধকে সমর্থন আমি দেশপ্রেমও বলব না, তাকে সুস্থ বা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাও বলব না।

‘প্যাট্রিওটিজম, স্যার, ইজ দি লাস্ট রেফুজ অব এ স্কাউন্ড্রেল’, বলেছিলেন স্যামুয়েল জনসন। জুডিথ মিলারের দেশপ্রেম দেখে এখন আমরা বুঝি ড. জনসন কেন সে কথা বলেছিলেন। একজন সাংবাদিকের জন্য তার পেশাদারি দায়িত্বের সঙ্গে দেশপ্রেম গুলিয়ে ফেলা কখনোই উচিত নয়, কারণ দেশপ্রেমে প্রায় সবক্ষেত্রেই হয় সরকারি নীতির পক্ষে বা বিপক্ষে নীতিগত অবস্থানে পর্যবসিত হয়। জুডিথ মিলারের যুক্তি মেনে নিলে বলতে হবে যে, বব উডওয়ার্থ ও কার্ল বার্নস্টিন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জন্য নিক্সনের জারিজুরি ফাঁস করে মহা দেশপ্রেমবিরোধী কাজ করেছেন। কিন্তু দেশপ্রেমকে পকেটে রেখে যদি ঠাণ্ডা মাথায় তিনি ভেবে দেখেন তাহলে মানবেন যে, তাদের পেশাদারি দায়িত্ব পালন করে উডওয়ার্থ ও বার্নস্টিন কেবল ভালো সাংবাদিক বলেই নিজেদের প্রমাণ করেননি, দেশের বৃহত্তর স্বার্থকেই সমুন্নত করেছেন। অন্য কথায়, পেশাদারিত্বের সাঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি কোনো সংঘাত নেই। সেইমোর হার্স ইরাকের আবু গারাইব বন্দিশালায় আমেরিকান সৈন্যদের বেআইনি কার্যকলাপ ফাঁস করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের হানি করেছেন বলে কেউ কেউ বলবেন, কিন্তু তিনি কেবল যা সত্য তাই প্রকাশ করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে আইন ও ন্যায়বিচারেরও পক্ষাবলম্বন করেছেন।

তরুণ সাংবাদিক টিপু সুলতান ফেনীতে জয়নাল হাজারীর অত্যাচার ফাঁস করে দেওয়ায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিপর্যয়ে সাহায্য হয়েছে, কিন্তু দেশ যে হাজারীর মতো খুনির হাত থেকে বেঁচেছে, তাইবা অস্বীকার করি কীভাবে! ২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর সামঙ্রদায়িক হানাহানির খবর প্রচার করে প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদপত্র দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে কেউ কেউ দাবি করতে পারেন, কিন্তু তাদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচল, তাও তো ঠিক। তাদের জন্য কোনটা বেশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হতো— সত্যকে লুকিয়ে রাখা না সত্যকে প্রকাশ করা?

আমি বলব, সংবাদপত্র তথা সাংবাদিক তখনই তার নাগরিক দায়িত্ব সবচেয়ে ভালোভাবে পালন করেন যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে যা ঘটছে তা বস্তুনিষ্ঠভাবে অবলোকন করে ও তার পাঠককে সে সব ঘটনার গুরুত্ব বিষয়ে সচেতন হতে সাহায্য করে। আমেরিকায় ‘সাংবাদিকতার বিবেক’ বলে পরিচিত অধ্যাপক বিল কোভাচের একটি মন্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তার কথায়, ‘তথ্যমাধ্যমের একটা কাজ হলো সরকার এবং ক্ষমতাধর সকল প্রতিষ্ঠানের কাজ সন্দেহের চোখে দেখা। সরকার এবং এই সব প্রতিষ্ঠানের নীতি কী এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কি প্রভাব পড়বে, সে সম্বন্ধে তথ্যভিত্তিক বিতর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করা তাদের কাজের অন্তর্গত।’ অন্যভাবে, সদ্যপ্রয়াত প্যালেস্টাইনি বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাইদ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন তা ধার করে বলতে পারি, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে যতটা সম্ভব দূরে থেকে সে ক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত হানা হলো সাংবাদিকের একটি প্রধান কাজ। সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মেলালে সংবাদপত্র তার সেই ‘দায়িত্ব’ পালন করবে কী করে?

প্রশ্ন ৬ : প্রবাসী বাঙালিরা অথবা দেশের নেতা বা বুদ্ধিজীবীরা বিদেশে এসে দেশের সমালোচনা করেন, তাতে কি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না?

দেশের ভাবমূর্তি দেশের ভেতরে যে বাস্তবতা বিদ্যমান, তারই প্রতিফলন। সে বাস্তবতা নিয়ে কথা বলা বা তার সমালোচনা করা, তার সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার কি আছে? বরং কেউ যদি উল্টো সে বাস্তবতা চাপা দিয়ে মিথ্যা বা বানানো গাল-গপ্প চালাতে চায়, তাহলেই বরং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ছাত্রাবস্থায় এক পাইওনিয়ার ক্যামেঙ্ একদল রুশ ছাত্রছাত্রী আমাকে জিজ্ঞেসকরেছিল, তোমার দেশে কী কী গাড়ি বানানো হয়? সে সময় বাংলাদেশে কোন গাড়িই বানানো হতো না (এখনো হয় না), কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে কী করে বলি? আমি ভলভো গাড়ির নাম করেছিলাম। সেই সন্ধ্যায় মিথ্যা বলে পার পেলাম বটে, কিন্তু ছেলেমেয়েরা পরে যখন জানবে কথাটা মোটেই সত্য নয়, তখন আমার সে কথাসহ অন্যসব কথাই মিথ্যা বলে ধরে নেবে।

যে জিনিসটা কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই তা হলো, আমার দেশ গরিব, সেখানে ভলভো গাড়ি তৈরি হয় না, তার জন্য আমার কোনো অপরাধ নেই। আমি কেন আগ বাড়িয়ে সত্যকে ঢাকব? গলাচিপায় পুলিশ ঘুষ খায়, ঢাকার বাতাস ও পানি দূষিত অথবা দেশের রাজপুত্রকে টেন পার্সেন্ট উপরি না দিলে কোনো সরকারি কন্ট্রাক্ট জোটে না, এসবের কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় তা ঠিক কিন্তু এ সবের কোনো কিছুর জন্যই আমরা কেউ দেশের ভেতরে বা বাইরে দায়ী নই। অথচ সেই আমরাই যখন সচেতনভাবে এসব প্রতিরোধ না করে উল্টো তার পক্ষে সাফাই গাই, তখন নিজেরা অপরাধী হয়ে পড়ি। একথা দেশের ভেতরে যেমন সত্য, তেমনই সত্য দেশের বাইরে।

একটা কথা খুব ভালোভাবে বোঝা দরকার। সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করা মানে দেশের সমালোচনা করা নয়। দেশের মানুষ যখন সরকারের ব্যর্থ নীতির বিরোধিতা করে, তাতে দেশের ভাবমূর্তি মোটেই নষ্ট হয় না; বরং তা বাড়ে। উক্রাইনে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। দেশের মানুষ তার বিরোধিতা করে দিনের পর দিন প্রতিবাদ-মিছিল করেছে। দেশের রাষ্ট্রপতি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেছেন, ‘চুপ চুপ, বিদেশে সবাই আমাদের কী বলবে!’ কিন্তু উক্রাইনের ‘কমলা বিপ্লবে’র ফলে সে দেশের মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ও আস্থাই ব্যক্ত হয়েছে। তাতে উক্রাইনের সম্মানহানি হয়নি, বরং বেড়েছে। জাতিসংঘের সামনে মিছিল করে বাংলাদেশীরা যখন সংখ্যালঘু নিধনের বিরুদ্ধাচরণ করে অথবা মৌলবাদীচক্রের বিরোধিতা করেন, তখন শুধু বাংলাদেশের প্রতি তাদের ভালোবাসাই ব্যক্ত করে না, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পক্ষে তাদের জোর সমর্থনও প্রকাশ করেন। দেশের ভেতরে সরকার ও তার স্তাবকবৃন্দ তাদের কার্যকলাপের ভেতর দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংস করেছে। বিদেশের মাটিতে প্রবাসী বাঙালিরা যখন তার প্রতিবাদ করে, তখন দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও দায়িত্ব প্রকাশিত হয়।

যারা বিদেশে থাকেন, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধাচরণ করা তাদের দেশপ্রেমেরই একটি প্রকাশ। দেশের ভেতর সরকারি নিষেঙ্ষণযন্ত্র রয়েছে। প্রতিবাদ করলে জেল-জুলুুমের ভয় রয়েছে, পেছন থেকে ট্রাক তুলে দেওয়ার বিপদ রয়েছে। বিদেশের মাটিতে সে ভয়টা কম। তা ছাড়া বিদেশে বসে আমরা যখন প্রতিবাদের আওয়াজ তুলি, তার প্রতিধ্বনি অনেক জোরালোভাবে দেশের ভেতরে প্রতিফলিত হয়। দেশের ভেতরে দেয়ালে পিঠ রেখে যারা সংগ্রাম করছেন, সংহতির একটি আন্তর্জাতিক বেড়ির কথা জানতে পেরে তাতে তারা আশ্বস্ত হন, মনে বল পান।

প্রবাসে বাস করেন এমন কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, বিদেশে থেকে দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে তারা কী করতে পারেন? আমার উত্তর : খুব বেশি কিছু নয়, দেশের ভাবমূর্তি তখনই বদলাবে, যখন সে ভাবমূর্তির পেছনে যে বাস্তবতা আছে, তা বদলাবে। গরিবি না হটলে আমরা যে গরিব, সে ভাবমূর্তি বদলাবে কী করে? দুর্নীতি বন্ধ না হলে দেশে আমাদের দুর্নীতিবাজ বলাও বন্ধ হবে না।

তবে দেশের ভেতরই থাকি আর বাইরে, বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু ও পরিপ্রেক্ষিত বদলাতে আমরা সবাই সাহায্য করতে পারি। আমাদের নিয়ে তথ্যমাধ্যমে কেবলই মন্দ খবর। কিন্তু কখনো কখনো একজন মানুষ একাই ভালো খবরের বিষয়বস্তু হতে পারেন। প্রমাণ? অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অথবা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথা ভাবুন। অথবা ভাবুন একজন মনিকা আলী বা আইরীন খানের কথা। তাদের সাফল্য ব্যক্তিগত, কিন্তু যেখানে যখন যতবার তাদের নাম উচ্চারিত হয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশ নামটিও পত্রিকার পাতায় স্থান পায় (গুগলে ‘সার্চ’ করতে গিয়ে ১৫ সেকেন্ডে আমি অধ্যাপক ইউনূসের নামে ২৯,০০০ হিটস পেয়েছি)। পৃথিবীজুড়ে নাম কিনতে হবে এমন কোনো কথা নেই। প্রবাসে যে যেখানে থাকেন, সেখানে তার নিজের কাজের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলাতে সাহায্য করতে পারেন। নিউইয়র্কের সেই সত্ বাঙালি ট্যাক্সি ড্রাইভারের কথা ভাবুন। পেছনের সিটে একগাদা টাকা পেয়ে মালিকের কাছে তা ফিরিয়ে দিয়ে তিনি পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছেন, শহরের মেয়রের কাছ থেকে পদক পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে আমি পেনসিলভ্যানিয়ার এক ছোট্ট গ্রামে বসবাসরত অধ্যাপক মুশতাক ইলাহীর কথাও বলতে পারি। অধ্যাপনা ছেড়ে সে গ্রামে তিনি একটি খুদে রেস্তোরাঁ দিয়েছেন। গ্রামের কলেজে খণ্ডকালীন অধ্যাপনাও করছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ব্যাপারে যে কাজটি তিনি করেছেন তা হলো, প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সারা গ্রামের মানুষকে তিনি বাংলাদেশ দিবসের এক আনন্দমেলায় আমন্ত্রণ করে থাকেন। গান হয়, নাচ হয়, সঙ্গে থাকে বাংলাদেশের মুখরোচক নানা খাবার। তিনি একা নন, আশপাশের গ্রামে, শহরে যে কয় ঘর বাঙালি রয়েছেন, তারাও এ কাজে হাত লাগান। এ বছর নিউইয়র্ক থেকে আমিও সবান্ধবে গেছি সে মেলায় অংশ নিতে। বছরে মাত্র এক দিনের অনুষ্ঠান, অথচ সে গ্রামের মানুষ বছরের বাকি প্রতিটি দিন সে উত্সবের জন্য অপেক্ষা করে। শুনে হয়তো অবাক হবেন যে, এ বছর পেনসিলভ্যানিয়া স্টেট থেকে বিশেষ মঞ্জুরি দেওয়া হয়েছে, আগামী বছর এই বাংলাদেশী আনন্দ উত্সব যাতে আয়োজন করা যায় সে জন্য।

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলাতে প্রবাসীরা কী করতে পারেন, কী করছেন, তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি বাংলাদেশ ককাস বা বাংলাদেশ গ্রুপ গঠিত হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প থেকে বাংলাদেশের আর্সেনিক সমস্যা ইত্যাদি সব বিষয়ে কংগ্রেসের ভেতর বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলা ও আইন প্রণয়নে উদ্যোগ নেওয়া এই ককাসের কাজ। বর্তমানে মোট ১৫ জন কংগ্রেসম্যান এই ককাসের সদস্য। ককাস গঠনের উদ্যোগটি পুরোপুরি নেওয়া হয় প্রবাসী বাংলাদেশীদের তরফ থেকে। তারাই যার যার নিজের নির্বাচনী এলাকার কংগ্রেসম্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় সাহায্য করেছেন, তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। তবেই না তারা এই ককাসে অংশ নিতে রাজি হয়েছেন।

দেশের ভেতর যারা, বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ব্যাপারে তারা কী করতে পারেন? অনেক কিছু করার আছে, কিন্তু সবচেয়ে সহজ যে কাজটি তারা করতে পারেন তা হলো সত্ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনা। কেবল পার্লামেন্টে নয়, নিজের মহল্লার স্কুল কমিটিতে, ইউনিয়ন পরিষদে, গ্রাম সরকারে। বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি, তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তা একদিনে বদলাবে না। কিন্তু তা বদলানোর কাজটা তো আমরা এখনি শুরু করতে পারি। সরকারের জন্য বসে না থেকে নিজেরা প্রত্যেকে যে যার মতো করে। সরকার বদল সে কাজের একটি।

মনে রাখা দরকার, দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু সে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই না করা নিশ্চয় অপরাধ। দুর্নীতি রয়েছে, এমন দেশে বাস করাও কোনো পাপ নয়, কিন্তু দুর্নীতিকে প্রতিরোধ না করা অবশ্যই ভীরুতা ও পাপ। দেশে মৌলবাদী সহিংসতা বাড়ছে, তাতেও বাংলাদেশের লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সহিংসতার বিরুদ্ধে যদি রুখে না দাঁড়ানো যায়, দেশের সরকার বা জনগণ যদি উল্টো সে সহিংসতার পক্ষাবলম্বন করে, তাহলে সে দেশের মানুষ ও তার সরকার পৃথিবীর সব সভ্য মানুষের নিন্দার ভাগিদার হবে বৈকি। বাংলাদেশের মানুষ, তা তারা দেশের ভেতরই থাকুক আর বাইরে, ভেবে ঠিক করুন তারা কী চান : দুর্নীতি রুখবেন না দুর্নীতি পুষবেন, মৌলবাদ ঠেকাবেন না তাকে আশ্রয় দেবেন, দারিদ্র্য নিয়ে হা হুতাশ করবেন না তার মোকাবিলা করবেন।

নিউইয়র্ক, ১ ডিসেম্বর ২০০৪