default-image

যুদ্ধের বছর আমার এইখানে খানেরা অনেক নির্যাতন করিছে। একদিন চুকনগর বাজারে আইসে খানেরা বেশুমার লোক মারিল। বৃহস্পতিবার সেই ঘটনাটা ঘটিল। সেদিন কত তারিখ ছিল সেটা আমার মনে নাই। বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের কয় তারিখ যেন! এইখানে সেই সময় বহু লোকজন বিভিন্ন জাগা থাকে আইছিল। সোমবার থাকে এইখানে লোক আসা আরম্ভ হইল। সোমবার আইল, মঙ্গলবারে আইল, বুধবারে আইল। বৃহস্পতিবার সকালেও আইল। একদল আসে একদল যায়। তখন আমাগো এখানে লোক গিজগিজ করতেছিল। এর মধ্যি বৃহস্পতিবার খুব সকালে আইয়ে গেল আরও অনেক লোক। দাকোপ, বৈঠাঘাটার লোক আমাগো এই চুকনগর আইসে বইয়া রইল। বৈঠাঘাটা, দাকোপে মনে হয় হিন্দু ছিল না। তারা সব এখানে আইসা পড়ছে। এখানে আইসে তারপর ইন্ডিয়া যাতি হতো। তখন তো এত গাড়ি-ঘোড়া ছিল না। তাই বেশির ভাগ লোক সড়ক দিয়া হাঁইটেই যাচ্ছিল। যাগো কপাল ভালো তারা গাড়ি পাইছে। কিন্তু ভাড়া নিছে অনেক।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার যখন গুলি আরম্ভ হইল তখন আমি আমার বাড়িত ছিলাম। বাজারের কাছেই আমার বাড়ি। হঠাত্ গুলি যখন আরম্ভ হয়া গেল তখন বাচ্চাকাচ্চা নিয়া কী করি। তখন পানির মধ্যে যাইয়ে মাথা পর্যন্ত ডাবায় দিয়ে থাকলাম। সেই সকাল ১০টা কি ১১টা থাকে চারটা পর্যন্ত। মনে হয় তিনটার পর গুলি বন্ধ হয়া গেল। তার আগে খালি গুলির শব্দ শুনতেছি, ফরফর শব্দ। একটানা ফরফর শব্দ শুনতেছি। কোনো বিরাম নাই। শেষ হয় আবার শুরু হয়। গুলি চলতেছে। খালি এই শব্দ শুনিছি। একবার পুকুর থাকে উঠে যাইয়ে দেখি যে আমার বাড়ির থাকে একটু দূরে মানুষ খালি দৌড়াদৌড়ি করতেছে। কেউ কেউ গুলির সামনে দিয়া যাইতেছে আবার কেউ গুলির উল্টা দিকে দৌড়াইতেছে। মানুষ মরতেছে। এক্কেরে ঝাঁকে ঝাঁকে মরতেছে। এটা দেইখা আমি আবার পুকরে ঝাঁপ দিলাম। ভাবিলাম আজ আর আমাগো বাঁচা নাই। গুলি বন্ধ হওয়ার পর চারটার দিকে পানি থাকে উঠি আলাম। বাজারে যাইয়া দেখি খালি মানুষের লাশ। যে দিকে তাকাই খালি লাশ আর রক্ত। সব মাটিতে পড়ি আছে।

এত লাশ দেইখা আমি ভয় পাইয়া বাড়ি পলায় আলাম। বাড়ি আইসে বাড়ির সবাইরে নিয়া চইলে গেলাম বয়সিং। বয়সিং যাইয়া দেখি ওখানে আবার নকশালে এরে ওরে কাটতেছে। তখন আবার ওহানতে শনিবারের দিন সকালে চইলে আলাম বাড়ি। শনিবার দিন সকালে বাড়ি চলি আইলে একজন আমারে ডাকতি আইল। সে আমারে কলো, তোমাকে ইউনিয়ন কাউন্সিলের অফিসে ডাকতেছে। শিগগির তুমি ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে যাও। চেয়ারম্যান সাব ওনে আছে। আমি তখন ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব ডাকিছে, তাই যাইতে হয়! না গেলেও তো বিপদ। তখন চুকনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল হক সাহেব। কাউন্সিল অফিসে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব আমারে বলতেছে, তোমারে এই লাশগুলো ফেলি দিতি হবে। তখন আমি কলাম, আমি একা আর কয়টা লাশ ফেলিব। একা তো এত লাশ ফেলানো সম্ভব না। তখন চেয়ারম্যান সাহেব কলো, তুমি একা না। এহানে আরও লোক আছে। তুমি তাগো সঙ্গে নিয়া লাশ ফেলবা। উনি আমারেসহ ২২ জনরে ডাইকে আনিছে। এর মধ্যি বিহারিপাড়ার কয়েকজন ছিল। চেয়ারম্যান সাহেব আমাগো বলিল, তোমাগো প্রত্যেককে টাকা দিব। লাশগুলো তোমরা নদীতে ফেলে দিবা।

বিজ্ঞাপন

ভয় আর টাকার লোভে সেই লাশ আমি নদীতে ফেলানো শুরু করিলাম। আমরা ২২ জনে লাশ সব বাঁশে বাঁধে ঘাড়ে করি নিয়া ফেলিলাম গাঙেতে। শনিবার দিন থাকেই ফেলানো শুরু করছি। ওই দিন ফেলছি। রবিবার সারা দিন ফেলছি। সোমবারও লাশ ফেলছি। তখন লাশ অনেক পইচে গেছিল। সোমবার দিন গর্তেই বেশি লাশ ফেলিছি। এগুলা পইচে গেছিল। একেকটা গর্তের মধ্যে আট-নয়টা লাশ ফেইলে মাটিচাপা দিছি। ওই রাস্তার ধারে কয়েকটা গর্ত করিছিলাম। সোমবারেই শেষ হইছে। তখন আর কোনো লাশ ছিল না। কত যে লাশ! চার হাজার পর্যন্ত গুনিছি। তারপর আর গুনি নাই। চার হাজার গুনিলাম আপনার সোমবার দুপুর পর্যন্ত। শনিবার থাকে আরম্ভ করি রবিবার, তারপর সোমবার দিন দুপুর পর্যন্ত চার হাজার গুনি ঠিক করা হইল। এইগুলা আমরা ২২ জন মিলি ফেলিছি। তারপরে বাজারে এবং পাথরখোলায় আরও যেগুলা ছিল, সেগুলা আর গুনা হয় নাই। এগুলা পইচে একদম খারাপ হয়ে গেছিল। সে জন্য এগুলা আর গুনতি পারি নাই। ওখানেও ৩০০-এর কম ছিল না। এর বাইরে গাঙে যা ছিল তা তো আমাগো গুনার মধ্যি না। গাঙেও তো বহু লোক মরি পড়িছিল। গাঙেও মেলিটারিরা গুলি করিছিল। মনে হয় ওহানেও ৪০০-৫০০ লোক মরিছে।

তথ্য: মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র